Monday, May 9, 2016

রূপকথা বাড়িয়ে দিল স্বপ্ন

মূল অবদান খেলোয়াড়দের। কিন্তু লেস্টার সিটির রূপকথার রূপকার তো
ক্লদিও রানিয়েরিই। পরশু কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামে দলের কাছে প্রিমিয়ার
লিগ শিরোপা তুলে দেওয়ার পর মুকুটটা তাই ইতালিয়ান কোচকেই
পরিয়ে দিলেন লেস্টার গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল l রয়টার্স
কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামে ম্যাচটা শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। বাইরে লেস্টার সিটির খেলোয়াড় আর সমর্থকদের উৎসব তখনো চলছে পুরোদমে। এরই মাঝে গলায় নীল রিবনে ঝোলানো পদক পরে সংবাদ সম্মেলনকক্ষে এলেন কোচ ক্লদিও রানিয়েরি। প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে খোশমেজাজে। হঠাৎই সংবাদ সম্মেলনকক্ষে ঢুকে পড়লেন কয়েকজন লেস্টার খেলোয়াড়। গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেলের হাতে সদ্য জেতা প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি। লেফটব্যাক ক্রিস্টিয়ান ফুকসের হাতে শ্যাম্পেনের বোতল। কাউকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই ফুকস সেই বোতল ঝাঁকি দিয়ে শ্যাম্পেনের ফোয়ারায় ভিজিয়ে দিলেন কোচ রানিয়েরিকে। পুরো ভিজে একাকার রানিয়েরির ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগল। খেলোয়াড়দের কাণ্ড দেখে তিনিও হেসে খুন। তারপর মুখের সেই হাসিটা সরিয়ে একটা নকল ভারিক্কি ভাব এনে স্মাইকেল আর ফুকসকে বললেন, ‘কাল সকালেই ট্রেনিং সেশন।’ নাচতে নাচতে সংবাদ সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্মাইকেল ও ফুকসের পাল্টা হাসি দেখেই বোঝা গেল, কোচের অভিনয়টা ধরে ফেলেছেন তাঁরা। কিসের অনুশীলন, এ তো তাঁদের উৎসবের সময়! ট্রফি জেতা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আগের সপ্তাহেই। পরশু কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামে এভারটনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা-উৎসবটা শুধু আরেকটু রাঙিয়ে নিল লেস্টার। ট্রফি হাতে পেয়ে আবেগে ভেসে গেলেন ক্লাবের অধিনায়ক ওয়েস মরগান, ‘অবশেষে যখন ট্রফিটা আমার হাতে তুলে দেওয়া হলো, অবিশ্বাস্য লাগছিল। আমি জোর করে আমার চোখের পানি আটকে রেখে ট্রফি হাতে নিয়েছি। এটা আমার জীবনের সেরা অনুভূতি।’ নিষেধাজ্ঞার কারণে মাঝে দুই ম্যাচ খেলতে পারেননি। কিন্তু পরশু ফিরেই জোড়া গোল করে যথারীতি লেস্টারের জয়ের নায়ক জেমি ভার্ডি। ৩৫ ম্যাচে ২৪ গোল করে লেস্টারের শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়কও ইংলিশ এই স্ট্রাইকার। সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে তাঁর কাছেও, ‘আমি এ অনুভূতিটা বর্ণনা করতে পারব না। মনে হচ্ছে যেন কেউ জাদু করে আমাকে দিয়ে সব করিয়ে নিয়েছে।’ আবেগে ভাসছেন গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেলও। বাবা পিটার স্মাইকেল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি গোলরক্ষক, ইউনাইটেডের হয়ে পাঁচবার প্রিমিয়ার লিগ জিতেছেন। এবার বাবার জুতোয় পা গলাতে পেরে ছেলে ক্যাসপার পাচ্ছেন আশৈশব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আনন্দ, ‘স্বপ্ন তো এমন সব মুহূর্ত দিয়েই গড়া হয়, ছোটবেলায় আপনি ঠিক এ রকম স্বপ্নই দেখেন।’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিমিয়ার লিগের ট্রফিটা হাতে পাওয়ার পর মাঠেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে এক দফা উৎসব করে এসেছেন কোচ রানিয়েরি। বয়স ৬৪ পেরিয়ে গেছে, প্রায় ৩০ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে এটিই তাঁর প্রথম লিগ শিরোপা! অথচ এমন অর্জনের পরও রানিয়েরির মধ্যে একেবারে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বলতে যেটা বোঝায়, সেই রকম কোনো প্রকাশ নেই। সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বললেন, ‘আমি এমনিতেই একটু ধীরস্থির মানুষ, তরুণ বয়স থেকেই। আপনি কি ভাবছেন, খুশিতে আমি এখন ডিসকোতে যাব? না। এখন ক্লাবের মালিক আর সবার পরিবারকে নিয়ে একটা পার্টি আছে। তারপর আমি বাড়ি যাব ঘুমাতে। তিন ঘণ্টা ঘুম দরকার আমার। তারপর চেলসির বিপক্ষে পরের ম্যাচটা (আগামী রোববার) নিয়ে ভাবতে হবে।’ রানিয়েরির ভাবনার দরজায় পরের মৌসুমটাও উঁকিঝুঁকি মারছে এখনই। এবার যেমন রূপকথা লিখে প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লেস্টার, আগামী মৌসুমেও এই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করার স্বপ্ন দেখাটা বাড়াবাড়িই। রানিয়েরি কিন্তু আশাবাদী, ‘আমি জানি পরের মৌসুমটা অন্য রকম হবে। কিন্তু সমর্থকেরা স্বপ্ন দেখছে। দেখুক না, জেগে ওঠার কী দরকার!’
সত্যিই তো, স্বপ্ন যদি এত মধুর হয়, জেগে ওঠার আসলেই কী দরকার! এএফপি, রয়টার্স।

No comments:

Post a Comment