Friday, May 20, 2016

মমতা ম্যাজিক শপথ নেবেন রাজপথে

মমতা ম্যাজিকে আচ্ছন্ন গোটা পশ্চিমবঙ্গ। সর্বত্রই তার জয়জয়কার। সবুজ আবিরে ভাসছে গোটা রাজ্য। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ফের নবান্নের মুখ্যমন্ত্রীর মসনদেই বসতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামী ২৭শে মে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। দক্ষিণবঙ্গের শক্ত মাটিতে প্রত্যাশিতভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস ভালো ফল করেছে, তবে উত্তরবঙ্গের অনুর্বর মাটিতেও এবার তৃণমূল কংগ্রেস ভালো আসন পেয়েছে। ভোটও পেয়েছে উত্তরবঙ্গে গতবারের তুলনায় অনেক বেশি। আর তাই একলাফে তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ভোট ৬.৮৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৪৭.৩৪ শতাংশে নিয়ে গেছে।
মধ্যবিত্তের অসন্তোষকেও সহজেই জয় করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাই কলকাতার ১১টি আসনেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বা অসন্তোষের কোনো ছায়া পড়েনি। সারদা দুর্নীতি, নারদ স্টিং অপারেশনে প্রকাশ্যে অর্থ নেয়ার ছবি, সিন্ডিকেটের দাপট বা ফ্লাইওভার ভেঙ্গে যাওয়ার মতো ঘটনাও কোনো রেখাপাত করেনি। ফলে  সবকটি আসনেই বিজয়ী হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা নিজেও কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে কংগ্রেসের দীপা দাশমুন্সীকে ২৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন। অনেক জেলাতেই বিরোধীরা কোনো আসন জেতার সুযোগই পায়নি। তবে এই দুর্দান্ত বিজয় সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম জেল থেকে প্রার্থী হওয়া সাবেক পরিবহনমন্ত্রী মদন মিত্র। সারদা দুর্নীতির অভিযোগে মদন মিত্র এক বছরের বেশি সময় জেলে রয়েছেন। মমতার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎমন্ত্রী মণীশ গুপ্ত, অইনমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য্য, কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী, সাবিত্রী মিত্র, উপেন বিশ্বাস প্রমুখ মমতা ম্যাজিক থাকা সত্ত্বেও পরাজিত হয়েছেন। আবার সাংবাদিক, শিল্পী ও অভিনেতা প্রার্থীরা সহজেই জয়ী হয়েছেন রাজনীতির কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এই ভূমিধ্বস বিজয়কে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল। ভোট পরবর্তী সমীক্ষার অঙ্ককে ছাপিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ঝড় তুলে ফিরে এসেছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছে তারা। আর সেই ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে ক্ষমতার স্বপ্নসন্ধানী বাম-কংগ্রেস জোট। সেই ঝড়ে বিরোধী জোটের প্রধান সেনাপতি সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার গণনা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, মমতাই ভূমিধ্বস বিজয়ের পথে এগিয়ে চলেছেন। প্রথম তিন-চার রাউন্ড গণনার শেষে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, তৃণমূল কংগ্রেস ২০০-র বেশি আসন পেতে চলেছে। দিনের শেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর জানা গেছে, তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ২১৪টি আসন। ২৯৪ সদস্য বিশিষ্ট বিধানসভায় জয়লাভের জন্য ম্যাজিক ফিগার হলো ১৪৮। গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ১৮৪টি আসন। তবে বিরোধী বাম-কংগ্রেস জোট গণনার আগের দিন পর্যন্ত যেভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ২০০ আসন পাবার লক্ষ্যে অবিচল বলে জানিয়েছিলেন, তাদের এদিন হতাশই হতে হয়েছে। তারা ৭৫টি আসন পেরোতে পারেনি। বিশেষ করে বামদের পরাজয় সবচেয়ে শোচনীয়। তাদের ভোট যেমন কমেছে তেমনি কমেছে আসন সংখ্যাও। ২০১১ সালে যখন মৃত্যু ঘণ্টা বেজেছিল তখনও বামরা পেয়েছিল ৬২টি আসন। কিন্তু এবার তারা পেয়েছে মাত্র ২৯টি আসন। ভোট পেয়েছে মাত্র ২৬.৭ শতাংশ। বামেদের ভোট আগেরবারের তুলনায় কমেছে ১৩.৬৫ শতাংশ। তবে কংগ্রেস গতবার তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে যা আসন পেয়েছিল এবার বামদের সঙ্গে জোট করে তার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে ৪৪টি আসন। ভোটও প্রায় ৪ শতাংশ বাড়িয়ে তারা নিয়ে যেতে পেরেছে ১১.৭ শতাংশে। এদিকে বিজেপি এবার তিনটি আসন পেয়েছে। ভোটের হার মোটামুটি ১১ শতাংশে ধরে রেখেছে। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ের তিনটি আসনই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা তাদের দখলে রেখেছে। আর ১টি আসন পেয়েছে নির্দল প্রার্থী।
পশ্চিমবঙ্গে এবার দীর্ঘ একমাস ধরে সাত দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিরাপত্তায়। আর তাই এবারের ভোট নিয়ে কেউ ভোট লুট বা ব্যাপক রিগিংয়ের অভিযোগ তুলতে পারেনি।
২৭শে মে রাজপথে শপথ নেবেন মমতা
দুর্দান্ত বিজয়ের পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অদ্ভুত রকম শান্ত ও নির্লিপ্ত। পরিবর্তনের ঝড় তুলে ২০১১ সালে বিজয়ের পর ২০শে মে শপথ নিয়েছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায় ও তার মন্ত্রিসভা। তবে এবার তিনি শপথ নেবেন আগামী ২৭শে মে শুক্রবারের শুভদিনে। রাজভবনে নয়, তিনি শপথ নেবেন রেড রোডের রাজপথে। বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্বাচনে বিপুল জয় নিশ্চিত হবার পরেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালিঘাটে হরিশ মুখার্জি রোডের বাসভবন থেকে বেরিয়ে এসে সকলকে বিজয়ের চিহ্ন সংকেত জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, মানুষের হাসিই আমার হাসি। সেইসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষকে কৃতজ্ঞতার ঢালি দিয়ে বাংলাকে শ্রেষ্ঠ করার শপথ নেওয়ার দিন আজ। তিনি জানিয়েছেন, আগামীকাল নির্বাচিত বিধায়করা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন করবেন। এবং পরের শুক্রবার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। তবে বিজয় উৎসবের পরিবর্তে রাজ্য জুড়ে হবে ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এদিন মমতা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রজনীতিতে একটা লক্ষ্মণ রেখা থাকা দরকার। পারস্পরিক সম্মান থাকা দরকার। অথচ এবারের নির্বাচনে যেভাবে তার বিরুদ্ধে কুৎসা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে তাকে তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয় বলে মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দলের বিরুদ্ধে গত দুবছর ধরে বদনাম করা হয়েছে, মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে। কুৎসা ও মিথ্যাচার করা হয়েছে। তবু মানুষ নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে ভোট দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য। তবে তিনি নির্বাচনের সময় আধাসামরিক বাহিনীর বাড়াবাড়ি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা নিয়ে এদিন সোচ্চার হয়েছেন। এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, আমরা উন্নয়নকে হাতিয়ার করেই মানুষের কাছে সাধ্যমত যাবার চেষ্টা করেছিলাম। অর্জুনের মতো আমাদের  লক্ষ্য ছিল স্থির। আমরা সেখানে পৌঁছাতে পেরেছি।  তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, এই জয়ের ফলে দায়িত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছে। গরিব মানুষের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করার পাশাপাশি তিনি সকলের কাছে আবেদন করেছেন শান্তি বজায় রাখার জন্য। আগামী দিনে বিজেপির সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় যাবেন না বলে জানিয়ে মমতা বলেছেন, ওরা ভাগ করার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তবে বিজেপিকে ইস্যুভিত্তিক সমর্থন দেবেন বলে জানিয়েছেন। কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে তিনি বার্তা দিয়েছেন পুরনো বন্ধু বলে।
মমতাকে জয়ের শুভেচ্ছা
ভোট গণনার চার ঘণ্টার মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদি নিজেই টুইট করে সে কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, মমতাজির সঙ্গে কথা হয়েছে। অসাধারণ এই জয়ের জন্য তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। এর পরেই তিনি জানিয়েছেন, রাজ্যে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার জন্য তার প্রতি শুভ কামনাও রইল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও মমতাকে তার বিজয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মমতার জয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু, অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন ও আরও অনেক বিশিষ্ট মানুষ।
বামরা নেমে এসেছে তৃতীয় স্থানে দলের অন্দরে শুরু লড়াই
হাত ও হাতুড়ির জোট মেনে নেয়নি পশ্চিমবাংলার মানুষ। হাত হলো কংগ্রেসের ও হাতুড়ি সিপিআইএমের নির্বাচনী প্রতীক। নিচুতলার কর্মীদের তাগিদেই নাকি এই জোট করতে বাধ্য হয়েছিলেন বাম নেতারা। আপত্তি ছিল অবশ্য বাম শরিক আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআইয়ের মতো দলের। কিন্তু সিপিআইএমের চাপে ঢোক গিলে জোট মানতে হয়েছে বাম শরিকদের। এমনকি সিপিআইএমের মধ্যে প্রশ্ন ছিল এই জোট নিয়ে। ভোটের আগেই আলোচনায় এসেছিল, বহু মানুষ এই অনৈতিক জোটকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য জীবনে প্রথম কংগ্রেসকে ভোট দিলেও অনেক মানুষই এবার জোট থেকে দূরে সরে থেকেছেন। ভোটবাক্সেও তার প্রতিফলন যে ঘটেছে তা স্পষ্ট হয়েছে ফল থেকে। এককথায় এবারের নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে বামদের। ক্ষমতা হারিয়ে গতবার প্রবল পরিবর্তনের ঝড়েও তারা ৬২টি আসন ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এবার তারা বৃহত্তম বিরোধী দলের তকমা হারিয়ে নেমে এসেছে ৩২টিতে। ভোটের শতাংশ হিসেবেও বামরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে।  সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রসহ রবীন দেব, অসীম দাশগুপ্ত সহ দলের বহু হেভিওয়েট  নেতা পরাজিত হয়েছেন শোচনীয়ভাবে। আর হারের পরেই সিপিআইএমের অন্দরে শুরু হয়েছে জোট নিয়ে বিতর্ক। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু নির্বাচনের আগে জোট নিয়ে কিছু না বললেও বৃহস্পতিবার সকালে তিনি বিতর্ককে উস্‌কে দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে জোট তো হয় নি, হয়েছে ঘোঁট। কামারহাটি কেন্দ্রের বিজয়ী প্রার্থী সিপিআইএমের মানস মুখার্জিও এই অনৈতিক জোটের বিরুদ্ধেই সওয়াল করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের জোটপন্থি সিপিএম নেতাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন দলের পলিটব্যুরোর সদস্য বৃন্দা কারাট।  তিনি বলেছেন,  জোটের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না ভুল, তা এবার বিচার করে দেখা দরকার। সিপিআইএমের প্রকাশ কারাট লবি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার ঘোর বিপক্ষে ছিল। কেন্দ্রীয় কমিটির  বৈঠকে কেরলের নেতারা এই জোটের  ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সূর্যকান্ত মিশ্র, মোহাম্মদ সেলিমরা  জোটের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন। ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট  দেখা গেছে, বামদের কোনো লাভ হয়নি জোট করে। মমতাকে হঠানো  তো দূরের কথা, শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবেও উঠে আসতে পারেনি বামরা। বরং এবার বামদের ভোট কমে গিয়ে নেমে এসেছে ২৮.৬ শতাংশে। সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র পরাজয়কে মেনে নিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্র রক্ষায় আমাদের সংগ্রাম চলবে। তবে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী এই হারের কোনো অজুহাত না দিলেও তিনি জানিয়েছেন, তৃণমূল কংগ্রেস সিপিআইএমেরই জেতা আসনে জিতেছে, কংগ্রেসের জেতা আসনে তারা জিততে পারেনি।

No comments:

Post a Comment