Wednesday, May 4, 2016

কিশোরগঞ্জের চার রাজাকারের ফাঁসি, একজনের আমৃত্যু

রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়া হচ্ছে
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শামসুদ্দিন আহমেদকে l প্রথম আলো
মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কিশোরগঞ্জের চার রাজাকারকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অপর এক রাজাকারকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ। বিচারপতি আনোয়ারুল হক, বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ফাঁসির আদেশ পাওয়া চার আসামি হলেন কিশোরগঞ্জের আইনজীবী শামসুদ্দিন আহমেদ (৬০) ও তাঁর ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নাসিরউদ্দিন আহমেদ (৬২), রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নান (৮৮) ও হাফিজউদ্দিন আহমেদ (৬৬)। আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ পেয়েছেন আজহারুল ইসলাম (৬০)। এঁদের মধ্যে শামসুদ্দিন রায়ের সময় কাঠগড়ায় ছিলেন। বাকি চারজন পলাতক। ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ থেকে শামসুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি আসামিদের পলাতক দেখিয়ে ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তাঁদের বিচার শুরু হয়। এটি ট্রাইব্যুনালের ২৩তম রায়। ৩৩০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুদ্দিন-নাসিরউদ্দিনসহ পাঁচ আসামি পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ-আল-মালুম, সুলতান মাহমুদ, তুরিন আফরোজ, তাপস কান্তি বল, রেজিয়া সুলতানা প্রমুখ। শামসুদ্দিনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মাসুদ রানা। পলাতক চার আসামির পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবদুস শুকুর খান। রায় পর্যালোচনার পর আসামির সঙ্গে পরামর্শ করে আপিলের বিষ​েয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানান। যে অভিযোগে যে সাজা: প্রথম অভিযোগ ছিল করিমগঞ্জের বিদ্যানগর ও আয়লা গ্রামের আটজনকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা। এই অভিযোগে শামসুদ্দিন, নাসিরউদ্দিন ও মান্নানকে মৃত্যুদণ্ড এবং আজহারুল ও হাফিজকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। আয়লা গ্রামের মিয়া হোসেনকে হত্যার দ্বিতীয় অভিযোগে নাসিরউদ্দিনকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তৃতীয় অভিযোগ ছিল করিমগঞ্জের আবদুল গফুরকে অপহরণের পর খুদির জঙ্গল ব্রিজের ওপরে নিয়ে হত্যা। এই অভিযোগে হাফিজের মৃত্যুদণ্ড; শামসুদ্দিন, নাসিরউদ্দিন ও আজহারুলের আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং মান্নানকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। করিমগঞ্জ ডাকবাংলোতে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে ফজলুর রহমান মাস্টারকে অপহরণের পর নির্যাতন করে হত্যার চতুর্থ অভিযোগে পাঁচ আসামির সবাইকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে রামনগর গ্রামের পরেশ চন্দ্র সরকারকে হত্যা করে রাজাকাররা। এই অভিযোগে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ষষ্ঠ অভিযোগে আবু বক্কর সিদ্দিক ও রূপালীকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার দায়ে গাজী আবদুল মান্নানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সপ্তম অভিযোগে আতকাপাড়া গ্রামে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে মান্নানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এলাকায় সন্তোষ: প্রথম আলোর কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর কিশোরগঞ্জ সদর ও করিমগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শহরের মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয় থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের হয়। পরে আলোচনা সভা হয়। করিমগঞ্জ পৌর এলাকার ঘোনাপাড়া গ্রামের বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুনের (৮৫) স্বামী আবদুল হামিদকে হত্যা করেন নাসিরউদ্দিন ও তাঁর সঙ্গী রাজাকাররা। রায়ের পর রাবেয়া খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, স্বামীকে হত্যার পর রাজাকার নাসির তাঁদের বাড়িতে গিয়ে তাঁর কাছে ম্যাচ চান। এরপর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁদের ঘরবাড়ি। তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটি দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। ঘাতকদের ফাঁসি হওয়ায় বুকের ওপর থেকে একটা বড় পাথর সরে গেছে।’ ঘাতকদের বিচারের রায় কার্যকর দেখে মরতে চান এই বৃদ্ধা।

No comments:

Post a Comment