Saturday, May 21, 2016

একই কায়দায় এবার কুষ্টিয়ায় খুন

কুষ্টিয়ায় হামলায় নিহত হোমিও চিকিৎসক মীর
সানাউর  হমানের লাশ বাড়িতে নেওয়ার পর
কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। কুষ্টিয়া শহরের
পূর্ব মজমপুর এলাকা থেকে গতকাল বিকেলে
তোলা ছবি l প্রথম আলো
সাত দিন আগে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা বান্দরবানে কুপিয়ে হত্যা করা হয় একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে। এর রেশ না কাটতেই চলতি মাসে তৃতীয় হামলার ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল শুক্রবার সকালে পশ্চিমাঞ্চলের জেলা কুষ্টিয়ায়। একই কায়দায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে হোমিও চিকিৎসক মীর সানাউর রহমানকে (৫৮)। কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে সানাউরের সঙ্গে থাকা কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুজ্জামানকে (৩৮)। মাথায়-ঘাড়ে সাত-আটটি আঘাত পাওয়া সাইফুজ্জামানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকালই ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। আঘাত ঠেকাতে গিয়ে তাঁর হাতের দুটি আঙুলও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর গতকাল বিকেলে র্যাব-১২-এর পরিচালক শাহাবুদ্দীন খান সাংবাদিকদের বলেন, সারা দেশে সম্প্রতি জঙ্গিদের যেসব হামলা শনাক্ত হয়েছে, তারা যে প্রক্রিয়ায় অপরাধ করেছে, তার সঙ্গে এই হত্যার মিল রয়েছে। তাই এটাকে মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। নিহত সানাউরের বন্ধু-স্বজনেরাও সন্দেহ করছেন জঙ্গিগোষ্ঠীকে। তাঁরা বলেন, সানাউর ও সাইফুজ্জামানের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। দুজনই বাউল চর্চা করতেন। এর আগেও দেশে বাউলদের ওপর হামলা হয়েছে। সে কারণে তাঁরা এটিকে জঙ্গি হামলা হিসেবে দেখছেন। কুষ্টিয়া শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত গ্রাম শিশিরমাঠ এলাকায় সানাউরকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। ওই এলাকায় তাঁর বাগানবাড়ি রয়েছে। ১০ বছর ধরে তিনি সেখানে প্রতি শুক্রবার বিনা মূল্যে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। গতকালও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। গতকালের ঘটনাসহ চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের ১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। এর মধ্যে হিন্দু মঠের পুরোহিত, সাধু, বৌদ্ধ ভিক্ষু, ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান, শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা, পীরের অনুসারী, দরজি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, মার্কিন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তা ও সমকামী অধিকার আদায়ের কর্মী রয়েছেন। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক দুই জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ও আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার নামে দায় স্বীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, দেশীয় দুই জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) এসব ঘটনায় জড়িত বা প্রধান সন্দেহভাজন। এর মধ্যে চলতি মাসের গত ২০ দিনেই তিনটি হামলা হয়েছে। ৬ মে রাজশাহীর পবা উপজেলায় পীর হিসেবে পরিচিত মো. শহীদুল্লাহর (৬৫) গলাকাটা লাশ পাওয়া যায় তানোরের একটি আমবাগানে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাচ্ছিলেন, পথে দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে। এরপর ১৪ মে বান্দরবানে বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষুকে (৭০) গলা কেটে হত্যা করা হয়। এই দুটি হত্যাসহ সর্বশেষ কুষ্টিয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী দায় স্বীকার করেনি। এসব কোনো ঘটনারই এখন পর্যন্ত কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে গতকালের ঘটনায় জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা এটা ভাবছি না।
নিহত মীর সানাউর রহমান ও আহত সাইফুজ্জামান
তবে সব বিষয় নিয়েই পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।’ তিনি বলেন, সানাউরের বাংলো বাড়ির জমি নিয়ে কোনো বিরোধ থাকতে পারে, রোগী দেখা বিষয়ে নারীঘটিত কিছু থাকতে পারে, পূর্বশত্রুতা থাকতে পারে—প্রাথমিকভাবে এসব সন্দেহকে বিবেচনা করা হচ্ছে। যেভাবে হত্যা: নিহত সানাউর অন্তত ১০ বছর ধরে শিশিরমাঠ এলাকায় তাঁর বাগানবাড়িতে প্রতি শুক্রবার মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন। পাঁচ বছর ধরে এ কাজে তাঁকে সহায়তা করতেন বন্ধু ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুজ্জামান। গতকাল সকাল নয়টার দিকে তাঁরা দুজন কুষ্টিয়া শহর থেকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন সাইফুজ্জামান। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাগানবাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার আগে রাস্তার দুই পাশে একটি নির্জন বাগানের মাঝে তাঁদের ওপর হামলা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি চাপাতি (এলাকায় ডাসা বলে) ও কাঠের বাটাম উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, চলন্ত অবস্থাতেই কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত করে মোটরসাইকেল থেকে তাঁদের ফেলে দেওয়া হয়। এরপর সানাউরকে কোপানো হয়। সাইফুজ্জামান বাধা দিতে গেলে তাঁকেও কোপায় খুনিরা। ঘটনাস্থলেই চিকিৎসক মীর সানাউর রহমানের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর একটি মোটরসাইকেলে তিনজনকে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখেছেন এলাকার লোকজন। গুরুতর আহত সাইফুজ্জামানকে প্রথমে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে বেলা একটার দিকে তাঁকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ প্রতিবেদক গতকাল সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, রাস্তার ওপর পড়ে আছেন নিথর সানাউর। পাশে তাঁর পুরোনো মোটরসাইকেলটি। তাঁর হাতের একটি কাটা আঙুলও রাস্তায় পড়ে ছিল। শত শত নারী-পুরুষের ভিড়। সেলিম নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘চেঁচামেচি শুনে আমরা কয়েকজন মিলে মাঠের দিকে এগিয়ে যাই। গিয়ে দেখি, দুজন রাস্তায় পড়ে আছে। এর মধ্যে একজন সানাউর ডাক্তার। অন্যজনকে আমরা চিনতে পারিনি। এর মধ্যে জীবিত ওই ব্যক্তিকে এলাকার লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনার পরপর মোটরসাইকেলে করে তিন যুবককে পালিয়ে যেতে দেখেছে অনেকে।’ বিকেল চারটার দিকে সানাউরের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত করেন চিকিৎসক অরবিন্দু পাল ও আশরাফুল হাসান। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, সানাউরের ঘাড়ের ওপরে ও মাথার পেছনে পাঁচটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

No comments:

Post a Comment