Sunday, May 15, 2016

আমাদের অদম্য মেয়েরা

মাসুদা আক্তার
এবার এসএসসি পরীক্ষায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ও উত্তীর্ণের সংখ্যা বেশি। দেশের ১০টি শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি পাস করেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এবার ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি পাস করেছে। কারিগরিতে মেয়েদের পাসের হার ৮৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর ছেলেদের পাসের হার ৮২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ১০টি শিক্ষা বোর্ডে ছেলেরা জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৭ হাজার ৭২৭ জন আর মেয়েরা পেয়েছে ৫২ হাজার ৩৪ জন। তবে জিপিএ-৫ পাওয়া মেয়েদের এই সংখ্যাই-বা কম কিসে? এই সংখ্যাও তো উদ্‌যাপন করার মতো একটি সংখ্যা।আমাদের দেশে যেখানে মেয়েরা প্রায় সব ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, সেখানে মেয়েদের এই সাফল্য আমাদের মনে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়। আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। আমাদের দেশের মেয়েরা যেকোনো অংশেই ছেলেদের তুলনায় কম নয়, তার স্বাক্ষর তারা প্রতিনিয়তই রাখছে। কোনো কিছুই তাদের সাফল্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।এই তো আজকের প্রথম আলো পত্রিকাতেই বের হলো এ রকম কয়েকজন অদম্য মেয়ের কথা। এদের একজন হচ্ছে রুপা খাতুন। লেখাপড়ার খরচ চালাতে না পারায় বালিকা বয়সেই রুপা খাতুনকে বিয়ে দিয়েছিলেন গরিব বাবা। বিয়ের সময় যৌতুক না চাইলেও পরে বরের পরিবার থেকে দাবি করা হয় এক লাখ টাকা। দিতে না পারায় রুপাকে তালাক দেওয়া হয়।
রুপা খাতুন
কিন্তু তাতে ভেঙে পড়েনি রুপা। নতুন উদ্যমে পড়ালেখা শুরু করে সে। পরের বছরই জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় সে। এবার এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার চান্দেরআড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে সেই অদম্য মনোবলের স্বাক্ষর রেখেছে রুপা।রুপার মতোই দুঃখকষ্টকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার খায়রুন্নাহার। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০০৯ সালে মারা যান খায়রুন্নাহারের বাবা। স্কুলপড়ুয়া দুটি ছোট মেয়েকে নিয়ে মা শাহিদা বেগম পড়েন ভীষণ বিপদে। বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে ও শিশুদের পবিত্র কোরআন পড়িয়ে সংসার চালানো শুরু করেন তিনি। এই আয়ে সংসার চলছিল না। তাই নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় প্রাইভেট পড়ানো শুরু করে খায়রুন্নাহার। সেই আয়ে সংসারের এবং রুপা ও তার বোনের পড়ালেখার খরচ চলে। এবার কাউখালী উপজেলার এসবি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ২০১২ সালের ১৩ আগস্ট রংপুর শহরের বাবু খাঁ এলাকায় নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের ছোড়া অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়ে দুই চোখ হারায় মাসুদা। কিন্তু তাতে মোটেও সে দমে যায়নি। বড় ভাইয়ের কাছে শুনে শুনে পড়া চালিয়ে এসেছে সে। এবার মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৩.৬ পেয়ে এসএসসি পাস করেছে। যেতে চায় আরও বহুদূর। উচ্চতর পড়াশোনা করতে চায় সে।
খায়রুন্নাহার
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আরেক লড়াকু মেয়েকে। তিনি নরসিংদীর সদর উপজেলার হাওয়া আক্তার জুঁই। স্বামী তাঁকে নিষেধ করেছিল পড়ালেখা করতে। কিন্তু জুঁই তাঁর পড়ালেখা  চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এই অপরাধে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে জুঁইয়ের ডান হাতের পাঁচটি আঙুল কেটে ফেলেন পাষণ্ড স্বামী। কিন্তু দমে যাননি জুঁই। ২০১২ সালে অন্যের সাহায্য নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। জিপিএ ৪.৩০ পান। এখন তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে স্নাতক পড়ছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আইনজীবী হওয়া। এখন জুঁই সেই লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে চলেছেন।রুপা, খায়রুন্নাহার, মাসুদা ও জুঁইদের দেখে আমরা নতুন করে উজ্জীবিত হই। শত কষ্টের মাঝেও তারা তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। তারা সত্যিই অদম্য। আরও অনেক রুপা, আরও অনেক খায়রুন্নাহার আরও অনেক জুঁই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সারা দেশে। এদের অনেকে দারিদ্র্যের কারণে ও সুযোগের অভাবে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারছে না। সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ পেলে তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে এতে কোনোই সন্দেহ নেই। সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের উচিত এদের পাশে দাঁড়ানো, এদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। একটু উৎসাহ, একটু সুযোগ এদের নিয়ে যাবে বহুদূর।

No comments:

Post a Comment