Sunday, May 15, 2016

একজন পরোপকারী পুরুষের প্রতিচ্ছবি

এ কে এম আহসান
এই জগৎ-সংসারে কিছু লোক আছেন, যাঁদের জীবনের ব্রত হচ্ছে পরোপকার করা। পরলোকগত এ কে এম আহসান, সাবেক সিএসপি, ছিলেন তেমনই একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২৩ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায়। মারা যান ২০০৪ সালের ৫ মে। তাঁর বাবার নাম ছিল সৈয়দ আবদুন নূর ও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি সমবায় অফিসের বড়বাবু ও বড় ভাই এ কে এম মহসিন ছিলেন প্রাদেশিক প্রশাসন সার্ভিসের একজন সদস্য। এ কে এম মহসিনও বর্তমানে পরলোকগত। সুদর্শন এ কে এম আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করার পর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম ও সমগ্র পাকিস্তানে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি ছিলেন বিলেতের রয়্যাল ডিফেন্স কলেজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আমলাতান্ত্রিক চাকরিজীবনে এ কে এম আহসান মহকুমা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার, লেবার কমিশনার, সমবায় সমিতিগুলোর নিবন্ধক ইত্যাদি পদে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বেশ কিছুদিন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ই ঢাকার দিলকুশায় কৃষি ভবন নির্মিত হয় এবং কৃষকদের মাঝে রাসায়নিক সার বিতরণও ছিল এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেসব সার মজুত রাখার জন্য তিনি অসংখ্য গুদামও নির্মাণ করেছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় কৃষি খামার গড়ে তুলে তিনি কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে একজন প্রকল্প পরিচালকের তত্ত্বাবধানে তিনি পানি সেচ প্রকল্প চালু করেন এবং ইরি ধানের দুটি জাতের প্রবর্তন করেন। এই সেচ ও ইরি ধান প্রকল্প যদি প্রবর্তিত না হতো, তাহলে বোধ করি তৎকালীন এই দেশের অর্ধেক লোকই না খেয়ে মারা যেত। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফা সামরিক শাসন জারির পর প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ইয়াহিয়া খান যে ছয়জন বাঙালিকে ইসলামাবাদে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে কেন্দ্রীয় সচিব পদে অভিষিক্ত করেন, এ কে এম আহসান ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সেখানে কৃষি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে তিনি তাঁর দক্ষতার প্রচুর স্বাক্ষর রেখেছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি অন্যান্য বাঙালি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সঙ্গে ক্যাম্পে বন্দী ছিলেন। বস্তুত তিনি ছিলেন পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি সমিতির প্রেসিডেন্ট। তাঁর মারাত্মক অসুস্থ দুই শিশুপুত্রের কারণে সবাই তাঁকে সবার আগে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও তিনি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে একেবারে সবার শেষে দেশে ফেরেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এ কে এম আহসান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রথম দর্শনেই বঙ্গবন্ধু বলে উঠেছিলেন, ‘এই আহসানই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সে-তুংয়ের কাছে আমাকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে পাঠাতে অনেক সাহায্য করেছিলেন। অতঃপর বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য পদে পদায়ন করেন, যে পদ থেকে পরে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান। জীবনের শেষ লগ্নে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগানের মতো স্মৃতিভ্রংশ রোগে ভুগছিলেন। সে যাহোক, এবারে এ কে এম আহসানের মানবিক গুণাবলির কথা বলি। আমাদের ইসলামিক পরিভাষায় ‘হক্কুল্লাহ’ ও হক্কুল ইবাদ’ বলে দুটো কথা আছে—হক্কুল্লাহ হচ্ছে ‘আল্লাহর হক আর হক্কুল ইবাদ হচ্ছে তদ্সৃষ্ট মানুষের হক। আহসান সাহেব বলতেন, পরকালে পার পেতে হলে শুধু হক্কুল্লাহ দিয়ে হবে না, হক্কুল ইবাদও লাগবে। বস্তুত এ দুটো শব্দ আমি তাঁর কাছ থেকেই প্রথম শুনেছি ও জীবনে উদ্দীপ্ত হয়েছি। এখন তাঁর মানবতাবোধ ও পরোপকারের কিছু উদাহরণ দিই:
এক. চাকরির শুরুতে এ কে এম আহসান তখন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি মহকুমার এসডিও। একদিন সরকারি গাড়িতে কোথাও যাওয়ার সময় হঠাৎ বন্যার পানির তোড়ে গাড়িটা ঝিলাম নদীতে পড়ে ভেসে যেতে থাকে। তিনি তখন নিজের জীবন বিপন্ন করে ওই গাড়ির পাঞ্জাবি চালককে উদ্ধার করে ডাঙায় নিয়ে আসেন। ওই চালক সাঁতার জানতেন না এবং তিনি ছিলেন সাত সন্তানের বাবা।
দুই. এ কে এম আহসান ঢাকার গুলশানের একটি প্লটের মালিক ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর প্লটটি বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি একটি ট্রাস্ট গঠন করেন ও তাঁর গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার নামে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করে আলোর দীপশিখা জ্বালান। এ ছাড়া আত্মীয়-অনাত্মীয় নির্বিশেষে কত লোককে চাকরিবাকরি ইত্যাদি দিয়ে তিনি যে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
তিন. আমার নিজের কথা বলতে গেলে, ১৯৫৬ সালে যখন দেশে দুর্ভিক্ষ চলছিল, তখন আমি গ্রামের হাইস্কুলে ক্লাস এইটের ফার্স্ট বয়। সিলেটের ডিসি হিসেবে আমার স্কুলে তিনি পরিদর্শনে এলেন। ক্লাসের ফার্স্ট বয়, বাবার আর্থিক অসচ্ছলতা ইত্যাদি বিবেচনায় তিনি আমাকে তথা আমার পরিবারকে ওই দুর্যোগের দিনে রিলিফ ফান্ড থেকে বেশ কিছু টাকা বরাদ্দ দিয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আমি উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হলে তিনি তদবির করে আমার বেকার বড় ভাইকে প্রায় নিখরচায় বিলেত পাঠিয়ে আমার উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আমার রক্তের সম্পর্কের কোনো আত্মীয় ছিলেন না, কিন্তু যখনই দেখা হয়েছে, বলতেন, ‘বাবা, স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রেখো।’ মানুষের টাকার ঋণ হয়তো শোধ করা যায়, কিন্তু স্নেহের ঋণ শোধ করা যায় না। আমি মনে করি, আহসান সাহেব ও তাঁর স্ত্রীর মতো মানব-মানবী বেশি বেশি জন্ম নিলে পৃথিবীটা আরও অধিকতর বাসযোগ্য স্থান হতো। আমি রম্যলেখক। তাই স্যারের স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রেখো প্রসঙ্গে একটি মজার গল্প বলে লেখাটির যবনিকাপাত করার স্পৃহা সংবরণ করতে পারলাম না: তিনজন মধ্যবয়সী লোক—একজনের মাথায় টাক, একজনের দাঁত সব বাঁধানো, একজনের চোখে চশমা—একদা একজন কৃষকের বাড়িতে রাত্রিবাস করতে বাধ্য হলেন। কৃষকের কিশোর বয়সী একমাত্র ছেলেটির জন্মগতভাবে দুই কান নেই; এটার উল্লেখে সে স্বভাবতই খুব লজ্জা পায়। কাজেই অতিথিদের বলে দেওয়া হলো, তাঁরা যেন কিছুতেই এটার উল্লেখ না করেন। কিন্তু পরদিন সকালে নাশতা খাওয়ার সময় ছেলেকে উদ্দেশ করে একজন বললেন, ‘বাবা, চুলের যত্ন নিয়ো, নতুবা শীঘ্রই আমার মতো টাক মাথা হয়ে যাবে, আরেকজন বললেন, বাবা, দাঁতের যত্ন নিয়ো, নতুবা আমার মতো অল্প বয়সে দাঁত হারাবে। তৃতীয়জন অতঃপর বললেন, ‘বাবা, চোখের যত্ন নিয়ো, নতুবা চোখ নষ্ট হলে পরে আমার মতো চশমা নিতে হবে। কিন্তু তোমার তো কান নেই, চশমা আটকাবে কী দিয়ে?’
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

No comments:

Post a Comment