Monday, May 30, 2016

বাজেট কাঠামোর সংস্কার ছাড়া গুণগত পরিবর্তন আনা যাবে না

প্রফেসর ড. এম এ মান্নান বাংলাদেশের ব্যতিক্রমধর্মী একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করেছেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপনা করেছেন। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ড. মান্নান ৮০-এর দশকে দেশে ফিরে তার তত্ত্বীয় ভাবনার বাস্তব প্রয়োগে উদ্যোগী হয়ে সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন তিনি নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে ব্যতিক্রমধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় এবং দাতব্য মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন। আসন্ন বাজেট উপলক্ষে নেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক কাঠামো অনুসরণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৌলিক গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। এ জন্য আমাদের নিজস্ব সমাজবাস্তবতাকে সামনে রেখে বাজেট কাঠামোর মৌলিক সংস্কার আনতে হবে। ড. মান্নানের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মাসুমুর রহমান খলিলী ও মাসুম বিল্লাহ
প্রশ্ন : কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উত্থাপন করা হবে। এই বাজেটকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
প্রফেসর ড. এম এ মান্নান : যেভাবে প্রতি বছর বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে, তাতে নতুন কিছু সেভাবে থাকে না। এটা যোগ-বিয়োগের একটি সমষ্টি মাত্র। একটা কনভেনশনাল প্যাটার্নে পশ্চিমা ধাঁচে প্রতি বছর একইভাবে বাজেট তৈরি করা হয়। অনেকেই বোঝেন না যে, পশ্চিমা সভ্যতা বর্তমানে একটি মরণোন্মুখ সভ্যতা। তারা নিজেরই ঘর সামলাতে পারছে না। আমেরিকার বর্তমান প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ ঋণ প্রায় পৌনে তিন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাদের বাজেটের ৭৪ শতাংশের মতো। আমেরিকার ম্যানুফেকচারিং সেক্টরের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। আমেরিকা কেবল অস্ত্রশিল্প ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বা কমপিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ হারিয়েছে। এ কথা অনেকেই জানেন না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সেখানে মাত্র ০.৯ শতাংশ। ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বে ১.১ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হার নিয়ে কোনো সভ্যতাই টিকে থাকতে পারে না। কোনো সভ্যতাকে টিকে থাকতে হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ন্যূনতম হার হতে হয় ১.৭ শতাংশ। এটা আমার কথা নয়, পিউ রিসার্চসহ আমেরিকার আরো যেসব খ্যাতনামা গবেষণা সংস্থা আছে তাদের ভবিষ্যদ্বাণী। অনেকে স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্যাশ অব সিভিলাইজেশন’-এর কথা বলেন; কিন্তু এর তো দরকার নেই। কেউ যদি ধূমপান করে, অ্যালকোহল খায়, তাহলে তার ফুসফুস যে নষ্ট হয়ে যাবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা আপনার সিদ্ধান্ত, আপনি ওই কাজগুলো করবেন কি না। ঠিক এই ঘটনাগুলোই আজকের পশ্চিমা দুনিয়ায় ঘটে চলেছে। ওরা গে-ম্যারেজ করছে, সেম সেক্স ম্যারেজ করছে, পরিবারগুলো ভেঙে গেছে। তাই ওই সমাজ তো ভেতর থেকেই ভেঙে পড়তে বাধ্য। ওরা কিন্তু ওদের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে এ কথা সমানভাবে সত্য। আমেরিকা এখন পেনশনারদের টাকা দিতে পারছে না। ওদের প্রতি ডলারের ৭০ শতাংশই ধার করা অংশ। ওরা কেবল কাগজের টাকা ছাপিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত পশ্চিমা বিশ্বকে সাহায্য দিতে গিয়েই আমেরিকা পরাশক্তি হয়ে বসে। এখন তো প্রকৃত অর্থে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি আর আমেরিকা নয়, চীন।
জাপান নেমে গেছে তৃতীয় স্থানে। জাপানও তার অর্থনীতি নিয়ে মারাত্মক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা আজ এ রকম একটি মরণোন্মুখ সভ্যতাকে অনুসরণ করে চলেছি আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য। এর কোনো দরকার ছিল না। আমাদের দেশেই অনেক পণ্ডিত, মেধাবী লোক রয়ে গেছেন; যারা আমাদের চিন্তা-চেতনা ও কৃষ্টি-ঐতিহ্যের আলোকে এবং আমাদের উন্নয়নের প্রয়োজনে মানানসই বাজেট দিতে সক্ষম। পশ্চিমা অর্থনৈতিক দর্শন থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই যে আমরা শহরকেন্দ্রিক বড় বড় প্রকল্প দেখি, গ্রামের মানুষকে শহরে এনে জড়ো করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা দেখি; এটা আসলে অর্থনীতির স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের মতো। আর বিশ্বব্যাংকের মতো পশ্চিমা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় স্বৈরশাসকদের সমর্থন করেছে। কারণ সেখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। এ জন্যই সেখানে প্রচুর টাকা দেয়া হচ্ছে। আমরা পশ্চিমা ধারণায় ৭ শতাংশ জিডিপি করার কথা বলছি। কিন্তু এই ধারণা দিয়ে তো কেবল বৈষম্য বাড়ছে। এ ব্যাপারে বাজেট কিছু বলছে না। করের বোঝা চাপানো হচ্ছে; কিন্তু এই করের বোঝা চাপানোর প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলা হচ্ছে না। কারণ দেশের ধনীরা এই করের কত অংশ দেন।
এখনো ৮৮ শতাংশ কর দেন এ দেশের গরিব মধ্যবিত্তরা। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট বাড়ালে বা কমালে এসব গরিব মানুষের কিছু আসে যায় না। তাই আসলে বাজেট হওয়া উচিত গরিবদের জন্য। করপোরেট সেক্টরের জন্য আলাদা বাজেট করা যেতে পারে। আমাদের করপোরেট সেক্টরের আকার তো ১০-১২ শতাংশের বেশি নয়। অথচ পুরো বাজেট যেন তাদের জন্যই করা হয়। আমাদের বাজেটে করপোরেট সেক্টরটি নন-ফর্মাল সেক্টরটিকে মার্জিনাল করে ফেলেছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়; কিন্তু বাজেটের বড় অংশ হওয়া উচিত ৯০ শতাংশ মানুষকে ঘিরেই; কিন্তু এটা বললেই তো হবে না। যারা অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা করেন তাদের এ জন্য বিকল্প ভাবনা বা আইডিয়া নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আমলাতন্ত্র দিয়ে এটা হবে না। এর জন্য থিঙ্কট্যাঙ্ক তৈরি করতে হবে। সেসব মানুষকে একত্র করতে হবে, যারা সত্য কথা বলেন। আমি বিশ্বাস করি না যে, বাংলাদেশে সত্যি কথা বলার লোক নেই। চিকিৎসা হতে হবে ‘কাস্টমার টেইলরড’। ক্যান্সারের জন্য ক্যান্সারের চিকিৎসাই করতে হবে, মাথাব্যথার চিকিৎসা করলে হবে না। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আমাদের মূলত নজর দিতে হবে বিশাল নন-ফর্মাল সেক্টরটি রয়ে গেছে, সে দিকে। এ যাবৎকাল আমাদের অর্থমন্ত্রীদের যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব তাদের দু-একজন ছাড়া কেউই প্রকৃত অর্থনীতির লোক ছিলেন না। বর্তমান অর্থমন্ত্রী অনেক যোগ্য ও মেধাবী এতে সন্দেহ নেই; কিন্তু তিনিও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ঔপনিবেশিক চিন্তাধারায় তিনি ভালো বাজেট ‘অ্যাডমিনিস্ট্রিটর’ হতে পারেন, কিন্তু অর্থনীতির যে দর্শন, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যে অর্থনৈতিক দর্শনের প্রয়োজন সেখানে তার ঘাটতি থাকাই স্বাভাবিক। এ জন্য আমাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি অনুধাবন করা প্রয়োজন।
অর্থনীতি গভীর অনুধাবনের বিষয়। দু-একটি নিবন্ধ পড়েই ইকোনমিস্ট হওয়া যায় না। আজ আমরা জিডিপি বাড়াচ্ছি, কিন্তু এটা তো শুভঙ্করের ফাঁকি। এটা অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফাঁকিটা হলো, আমরা গ্রামের অর্থনীতিকে অবহেলা করছি। আমরা শহরমুখী উন্নয়ন ঘটাচ্ছি। বিশ্বব্যাংক ঠিক এটাই চায়। দাতারা এটাই চায়। এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কলোনিয়াল প্যাটার্ন। তাই আমাদের প্রথম কাজটি হওয়া উচিত বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনয়ন। বিশ্বব্যাংক গত ৬০ বছরে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিটি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। যে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বব্যাংক গঠিত হয়েছিল, তারা সে দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারেনি; বরং দারিদ্র্য আরো বেড়েছে। যে ৩৫টি অনুন্নত দেশ ছিল এখনো তাই আছে। তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে বলতে কান ঝালাপালা করে ফেললেও কেবল বৈষম্যই বেড়েছে। তারা জিডিপি বাড়ানোর কথা বলছে; কিন্তু পশ্চিমা অর্থনীতিতে জিডিপির যে সংজ্ঞা, বিশ্বব্যাংকের দেয়া যে সংজ্ঞা, তার সাথে আমাদের মতো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তো মিল নেই। আমরা কেন তাদের দেয়া সংজ্ঞা অনুসরণ করব? সার্বিকভাবে বাজেটব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার আনতে হবে।
প্রশ্ন : আপনি বাজেটের যে সংস্কারের কথা বলছেন সেটির কাঠামো কেমন হবে?
প্রফেসর মান্নান : আমাদের বাজেটে একটি মৌলিক সংস্কার আনতে হবে। অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার জন্য স্বেচ্ছাসেবা খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ জন্য বাজেটটি হবে ত্রিমুখী বাজেট। এই ত্রিমুখী বাজেটের প্রথম অংশ হবে বাজারভিত্তিক বা করপোরেট সেক্টর অর্থনীতির। এর মূল লক্ষ্য হবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, অপচয় কমানো এবং প্রশাসনের পরিধি কমিয়ে আনা। দ্বিতীয় অংশ হবে নন-করপোরেট সেক্টর। একে তৃণমূল অর্থনীতির বাজেটও বলা যায়, যার লক্ষ্য হবে দারিদ্র্যবিমোচন। গ্রাম ও স্থানীয় পর্যায়ের সর্বনি¤œ স্তরের জনগণ যেমনÑ ভূমিহীন মজুর, প্রান্তিক চাষি, ক্ষুদ্র কারিগর, ব্যবসায়ী, শহুরে বেকার এসব জনগণ হবে এই বাজেটের টার্গেট। তাদের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে জীবনের ন্যূনতম প্রান্তিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করা। সঞ্চয়প্রবণতা বাড়াতে আগ্রহী করা। তাদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা। বাজেটের তৃতীয় অংশ হবে হতে স্বেচ্ছাসেবা খাত বা ভলান্টারি সেক্টর। এর লক্ষ্য হবে বিশেষ করে সামাজিক তহবিল গঠন এবং সামাজিক বিনিয়োগের জন্য ইসলামি অর্থ বণ্টন ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছামূলক কাজগুলো সম্পাদন। এ জন্য যে কাজগুলো করতে হবে সেগুলো হচ্ছেÑ জাকাত, সাদকা, ওয়াক্ফ, ক্যাশ ওয়াক্ফ ইত্যাদির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দানের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রণয়ন ও পরিচালনা; প্রচলিত, অপ্রচলিত ও স্বেচ্ছামূলক খাতের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট যোগ্য গ্রাহকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন; এবং পল্লী ও শহরাঞ্চলের উদ্বৃত্ত স্বেচ্ছাশ্রম কাজে লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ। বাজেটের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও সংস্কার আনতে হবে।
প্রশ্ন : বাজেট ব্যবস্থায় রাজস্ব সংস্কারটি কিভাবে হবে?
প্রফেসর মান্নান : আমি ট্যাক্স রিফর্মের কথা বলছি। ট্যাক্স প্রাইভেটাইজেশন করার কথাও বলছি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবেÑ ধরা যাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতি বছর একটি বাজেট করা হয়। সরকার ওই বাজেটের টাকা দেয়। জনগণের কাছ থেকে ট্যাক্স নিয়েই ওই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া হয়। এখন যদি সমাজের এমন কিছু লোক বা প্রতিষ্ঠানকে ঠিক করা যায় যারা প্রতি বছর সরকারকে ট্যাক্স দেন ঠিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের সমান। তাদের বলা হলো যে, তারা যে ট্যাক্স দেন তা সরকারকে না দিয়ে তারা ওই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেবেন। তাদের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নির্বাহ হবে। সরকার কেবল দেখবে তারা ঠিক মতো টাকাটা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিচ্ছেন কি না। এমনটি হলে, ওই লোকগুলো যেমন ট্যাক্স আদায়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পাবেন, তেমনি ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার প্রবণতাও তাদের মধ্যে কমে যাবে। মানুষ যখন দেখবে একটি সমাজসেবামূলক কাজের সাথে সে জড়িত হচ্ছে, তার নাম একটি ভালো কাজের জন্য প্রশংসিত হচ্ছে, তখন সেখানে তার ব্যয়ের আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে।
এভাবে রাষ্ট্রের এমন অনেক কাজই করা সম্ভব। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত পুরোপুরি এভাবে পরিচালনা করা যায়। এক সময় মুসলিম বিশ্বে এই দু’টি খাতের জন্য সাধারণ জনগণকে অর্থ খরচ করতে হতো না। সরকার বা সমাজের ধনী ব্যক্তিরাই তা পরিচালনা করতেন। ওয়াক্ফ বা দাতব্যের মাধ্যমে এগুলো পরিচালিত হতো। আমরাও তা করতে পারি। এটা হলো সোশ্যাল অ্যাসাইনমেন্ট। যোগ্য মানুষকে এই অ্যাসাইনমেন্ট দিতে হবে। আমাদের চিন্তাধারা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পুরনো আইডিয়ার জায়গায় নতুন আইডিয়া আনতে হবে। তা নাহলে সমাজ অগ্রসর হবে না। আমরা প্রযুক্তির পরিবর্তন করছি। নতুন নতুন প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটাচ্ছি। তাহলে নতুন আইডিয়ার সমাবেশ ঘটাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
প্রশ্ন : জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর সরকার এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে? প্রবৃদ্ধি বা বিকাশে আসলে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার কতটা প্রতিফলন ঘটছে? কিভাবে জিডিপির হিসাব করা যেতে পারে?
প্রফেসর মান্নান : জিডিপি বা জাতীয় আয়ের যে হিসাব করা হয় তাতে পাশ্চাত্যের ফর্মুলা অনুসরণ করা হয়। অথচ আমাদের দেশের অর্থনীতির যে বৈশিষ্ট্য তার সাথে বেশ পার্থক্য রয়েছে আমেরিকা বা পশ্চিমা অন্যান্য দেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যের। স্থূল জাতীয় আয় বা জিএনপি বলতে আমরা বুঝি, কোনো এক বছরের উৎপাদিত মোট পণ্য ও সেবার মূল্য। জিএনপি হিসাবের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কোনো দেশের মোট জিএনপিকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকেরা সাধারণত অর্থনীতির হ্রাস-বৃদ্ধির প্রতি সব সময় ল রাখতে আগ্রহী, যা কেবল বাজারের মধ্য দিয়ে আসে। উৎপাদনের উপাদান হিসেবে কর্মসংস্থানের কমবেশির প্রতিও ল রাখা হয়। কারণ, যারা বাজারে শ্রম বিক্রি করছে, তাদের সেই শ্রমমূল্যও জিএনপি হিসাবে আসে। অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকেরা যা জানতে চান, এর মাধ্যমে তারা তা জানতে পারেন। এরপরও জিএনপির ব্যবহার ও এর গড় সংখ্যাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয়; কিন্তু আমাদের অর্থনীতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা স্বল্প। মুসলিম সমাজে অনানুষ্ঠানিক স্বেচ্ছাসেবা খাতের শক্তিশালী উপস্থিতি এবং বাজার অর্থনীতির সঙ্কীর্ণতার কারণে বাংলাদেশসহ ইসলামি বিশ্বের সমস্যাগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরতে জাতীয় আয় হিসাবকে পরিশুদ্ধ ও পুনঃশ্রেণীবিন্যাস করা প্রয়োজন। জাতীয় আয়ে যোগ হতে পারে এমন অনেক বিষয় আছে; যেমনÑ পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক সেবা, পণ্যের উৎপাদন এবং গৃহবাসীর প্রকৃত ভোগ ইত্যাদি। এমন অনেক বিষয় আছে, সমাজের আর্থসামাজিক বাস্তবতার বিবেচনায় যেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও স্বেচ্ছামূলক খাত, সম্ভাব্য আয়ের প্রবাহ, এগুলোর তাৎপর্য এবং হার ও পরিবর্তনের গতি নির্দেশ করতে পারে।
পশ্চিমারা জিডিপি হিসাব করতে গিয়ে যেসব বিষয় বাদ দেয়, সেগুলো আমাদের জিডিপি হিসেবে যোগ করতে হবে। যদি আমরা তা করি, তাহলে দেখা যাবে কেবল নি¤œমধ্য আয় কেন, মধ্য আয়েরও অনেক ওপরে আমরা চলে গেছি। আমাদের সমাজের অনেক মূল্যবোধ রয়ে গেছে, যেগুলোকে আমরা অর্থনীতির হিসেবে বিচার করছি না; কিন্তু সেগুলোরও মূল্য রয়েছে। আমাদের পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোন, নানা-দাদা একসাথে বাস করেন। এমন অনেকের ভরণপোষণ করছেন আপনি। কিন্তু এগুলো জিডিপির হিসাবে আসছে না। তাই আমি মনে করি, আমাদের জিডিপি নতুনভাবে হিসাব করা দরকার। আমাদের জিডিপি হিসাব করতে হবে আমাদের নিজস্ব সম্পদের ভিত্তিতে। জিডিপি হিসাবের জন্য আমাদের নিজস্ব সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে, সূচক তৈরি করতে হবে। পশ্চিমারা জিডিপিতে যেসব বিষয় বাদ দেয়, সেগুলো দিয়েই আমাদের জিডিপি গণনা শুরু করতে হবে। আমেরিকাতে কেউ যদি মারা যায়, তাকে কবরস্থ করার জন্য ২০ হাজার ডলার খরচ করতে হয়। এটা বিশাল একটি ব্যবসা। অনেক প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসার সাথে জড়িত। অথচ আমাদের বাবা-মা যখন মারা গেছেন আমরা তখন এসব কিছু নিয়ে ভাবতেও পারিনি। দেখেছি, গ্রামের লোকজন এসে স্বেচ্ছাশ্রমে সব কিছু করে গেছেন। এর জন্য কাউকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হয়নি, এখনো আমাদের গ্রামগুলোতে এই চর্চা রয়েছে। বড়জোর মৃত ব্যক্তির রূহের মাগফিরাত কামনায় সামান্য কিছু আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। এমন অনেক কিছু আছে, যেগুলো আমাদের এখানে আমরা অর্থনৈতিকভাবে বা প্রবৃদ্ধির সাথে হিসাব করি না। আমাদের অর্থনীতিতে জাতীয় আয় হিসাবে মোট উৎপাদনের বিন্যাস কাঠামো সম্পর্কে উল্লেখ থাকতে হবে। ধরা যাক, কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কোনো বিলাসদ্রব্য, দু’টিরই বিক্রিমূল্য ১০০ টাকা করে। জিএনপি গণনায় শুধু উৎপাদনের আকারই বর্ণনা করা হয় না।
এখানে মান ও উৎপাদন সম্পর্কেও অধিকতর তথ্য পাওয়া যাবে। বর্তমান হিসাববিজ্ঞানে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন একটি নদী দূষিত করে, আর সরকার বহন করে দূষণমুক্ত করার খরচ, তখন জিএনপিতে কেবল খরচটুকুই যুক্ত হয়; কিন্তু নদী দূষণটুকু বাদ দেয়া হয় না। মাথাপিছু আয়ের অংশ থেকে অর্থনৈতিক কল্যাণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা মোট ভোগের কত শতাংশ, তার ভিত্তিতে জাতীয় আয় প্রকাশ করা। সামাজিকভাবে ন্যূনতম পণ্য ও সেবা; যেমনÑ খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিা, নিরাপদ পানি, বিনোদন ও সরকারি সেবা নির্ধারণ করা যায়, যা সমাজের সদস্যদেরকে প্রদান করতে হবে। এটা ভোগ পরিমাপের ভিত্তি হতে পারে এবং তা অর্থনৈতিক কল্যাণে অবদান রাখে। আমাদের অর্থনীতিবিদেরা এ ধরনের ভোগের হ্রাস-বৃদ্ধির প্রতি ল রাখতে পারেন এবং মোট ভোগের শতাংশ হিসাবে এই মৌলিক ভোগের মাত্রায় কমবেশি, আমাদের অন্য কোনো বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক কল্যাণ পরিমাপের একটি দিকনির্দেশনা দিতে পারে। ১৯৭০ দশকের প্রথম দিকে দুই অর্থনীতিবিদ প্রফেসর উইলিয়াম নর্দানস ও জেমস টেবিন পশ্চিমা অর্থনীতির ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কল্যাণ পরিমাপের এমইডব্লিউ (MEW) উদ্যোগ নেন। জিএনপি যখন উৎপাদনের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়, তখন এমইডব্লিউ হলো সরাসরি মানবকল্যাণে নিয়োজিত গৃহস্থালি পণ্যের মোট ভোগ। এমইডব্লিউর ভিত্তি হিসাবে যে অনুভূতি কাজ করে তা হলো, গৃহের কল্যাণ নির্ভর করে ভোগের ওপর, যা হলো অর্থনৈতিক তৎপরতার চূড়ান্ত উৎপাদন (product)। অর্থনীতিবিদদ্বয় পশ্চিমা অর্থনীতির ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কল্যাণের হিসাব দাঁড় করালেও তারা সামাজিকভাবে স্বীকৃত জীবনমানের ন্যূনতম পর্যায় কিভাবে নির্ধারণ করা যায় তার কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আমাদের সমাজেও প্রযোজ্য হতে পারে।
প্রশ্ন : প্রবৃদ্ধির কতটা সুবিধা দরিদ্রদের কাছে যাচ্ছে? সম্পদ সুষম বণ্টনের ব্যাপারে যে প্রশ্ন সারা বিশ্বে উত্থিত, সেটির ব্যাপারেই বা করণীয় কী রয়েছে?
প্রফেসর মান্নান : আসলে বৈষম্য বেড়ে গেলে শুধু প্রবৃদ্ধি হলেও গরিবেরা এতে উপকৃত হয় না। আমরা বারবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলি, কিন্তু সুষম বণ্টনের হিসাব করি না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ালে হবে না, সুষম বণ্টনও দরকার হবে। একসময় ‘ট্রিকল ডাউন’ থিওরি ছিল। তখন মনে করা হতো, প্রবৃদ্ধি বাড়লে ধনীদের কাছ থেকে তা চুইয়ে নিচে গরিবদের ওপর পড়বে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ধনীরা খুবই স্বার্থপর। তাদের আঙুলের ফাঁক গলে সম্পদ আর নিচের দিকে পড়ছে না। তাই সেই ’৬০-এর দশকেই ‘ট্রিকল ডাউন’ থিওরি পরিত্যক্ত হয়েছে। ধনীরা সম্পদের শেয়ার করতে চায় না। তারা কেবল জমাতে চায়। তাই উন্নয়ন করতে চাইলে সম্পদের বিতরণ হতে হবে ‘টার্গেট ওরিয়েন্টেড’। আমি যখন কোনো শিল্প করব আমাকে ভাবতে হবে কতজন, কারা সেখানে চাকরি পাচ্ছে। যেমন ধরুন, কেউ কোনো গ্রামে ধান ছাঁটার মেশিন বসানোর কথা ভাবল। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঢেঁকি বিদায় নেবে। আমাদের গ্রামগঞ্জে ঢেঁকি ভানার কাজ করেন মূলত গ্রাম্য বউ-ঝি কিংবা গরিব বিধবা নারীরা। ফলে ধানছাঁটার মেশিন বসানো মাত্রই এই গ্রাম্য বউ-ঝি, বিধবারা বেকার হয়ে যাবেন। তাই উন্নয়ন করার আগে আমাদের ভাবা উচিত, এই উন্নয়নের ফলে কারা লাভবান হচ্ছে আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়নকে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথেও যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ ধানছাঁটা মেশিন বসানোর আগে আমাদের ওইসব বউ-ঝির কর্মসংস্থানের কথা ভাবতে হবে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে অংশটুকু বাজারের মধ্য দিয়ে যায়, তার ভিত্তিতে হিসাব করা হয় জিএনপি; কিন্তু এ থেকে মাথাপিছু উৎপাদনের প্রকৃত বণ্টন ও বিন্যাস সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। আবার বাজারবহির্ভূত লেনদেনের ব্যাপারেও জিএনপি নীরব; কিন্তু আমাদের অর্থনীতিতে বিতরণের প্রকৃতি সম্পর্কেও নির্দেশনা থাকতে হবে। মাথাপিছু জিএনপি, নিট জাতীয় উৎপাদন থেকে আমরা মোটামুটি আয় হিসাব করতে পারি। আর্থিক েেত্র এ ধরনের তথ্য কার্যকর ও গুরুত্ববহ নির্দেশক এবং এটি দিয়ে অর্থনীতির সার্বিক পরিবর্তনের হার ও গতি বোঝা যায়; কিন্তু এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, ব্যক্তির আয় কতভাবে জাতীয় গড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে আমরা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণকে সহজেই চিহ্নিত করতে সম। জিএনপি মূলত উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যত ধরনের আয় উপাদান সৃষ্টি হয় তার সব হিসাব করে; কিন্তু এটা আমাদের বলে না, কোন বাড়িতে ব্যক্তিভিত্তিক প্রকৃত আয় কত। ব্যবসায় সঞ্চয়, করপোরেট কর ইত্যাদির মাধ্যমে আয় বোঝা যায়; কিন্তু তাতে ব্যক্তির অবস্থা প্রতিফলিত হয় না। জিএনপি হলো আর্থিক পরিমাপ। দান-সাহায্য এতে অন্তর্ভুক্ত হয় না; কিন্তু আমাদের সমাজে দান-সদকার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটা অন্যকে স্বেচ্ছায় দেয়া থেকেও অনেক বেশি। অনেক সময় দান-সদকা ও সেবার মূল্যের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কিছু বাধ্যতামূলক এবং সমাজ ও পরিবারের মধ্যে এ ধরনের সেবার মূল্য পরিমাপের জন্য বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন; কিন্তু সমাজের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা কিভাবে কাজ করছে, তা অনুধাবনের েেত্র সহায়ক হতে পারে। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদেরাই স্বীকার করেছেন, জাতীয় আয়ের হিসাব থেকে আন্তঃপারিবারিক সেবা বাদ দেয়ায় বিভিন্ন দেশের প্রকৃত অবস্থার মধ্যে ব্যাপক গরমিল দেখা যায়।
বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে পরিবারের ধারণা পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক ব্যাপক। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থানজুড়ে আছে সেবা বিনিময়। এ ধরনের আন্তঃপারিবারিক সেবার প্রকৃতি ও পরিমাণ নির্ণয় করা জরুরি। মুসলমানেরা যে জাকাত দেন, তার হিসাব করা তুলনামূলক সহজ। জিএনপির শতকরা হিসাবে জাকাতের হিসাব হওয়া উচিত। অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, দরিদ্র জনগণের অবস্থার উন্নয়নে এই হিসাবকে নীতি চলক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ওপরে আলোচিত দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় আয় হিসাব করা জটিল মনে হলেও যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না, এমন অনেক উপাদানকেই এ হিসাব থেকে বাদ দেয়া কঠিন। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান দফতরের পুনর্গঠনের মাধ্যমে উপরিউক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা গেলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণের হার ও গতি অনুধাবন করা যাবে। এভাবে জাতীয় পরিকল্পনা আরো বাস্তবমুখীও করা যাবে। জাতীয় আয়ের সঠিক হিসাব করা আমাদের জন্য বেশি জরুরি।
প্রশ্ন : বিকেন্দ্রীকরণের ওপর আপনি জোর দিতে চাইছেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সেটি কিভাবে হবে?
প্রফেসর মান্নান : আসলে আমাদের এখানে ভালো কথা বলার লোকের অভাব নেই। অভাব শুধু ভালো কাজ করার লোকের। বিকেন্দ্রীকরণের জন্য আমাদের বাজেটে নন-ফরমাল সেক্টরকে টার্গেট করে কিছু করতে হবে। একজন রিকশাচালক কিভাবে তার জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটাতে পারেন, বাজেটে সে দিকে কিন্তু নজর দেয়া হয় না। অথচ দেয়া দরকার। আমাদের মন্ত্রীদের রাস্তার যানজট দূর করার প্রয়াস চালাতে দেখি। গাড়ি বাইরে থেকে ঢাকা শহরে ঢোকার প্রয়োজন যেন না হয় সে দিকে তাদের নজর নেই। বিশ্বের ১৪৪টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থা এখন সবচেয়ে খারাপ। আরেকটি শহর ছিল সিরিয়ার দামেস্ক। তার কথা না হয় বাদই দিলাম।
আমরা এমন ব্যবস্থা করছি যাতে সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকায় এসে জড়ো হচ্ছে। কেন ঢাকার বাইরে উন্নয়ন হবে না, কেন মানুষ ঢাকার বাইরে চলে যাবে না, সবাইকে ঢাকা আসতে হবে, এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। আমি সিরাজগঞ্জে মেডিক্যাল কলেজ, টেকনিক্যাল কলেজ করেছি ঠিক এ চিন্তা থেকেই। মানুষের এখন ঢাকার বাইরে যাওয়া উচিত। শুধু ক্ষমতাই নয়, অর্থনীতিকেও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তাহলে কিন্তু আর আমাদের যানজটে আটকে থাকতে হবে না। মেট্রোরেল, পাতাল রেলের দরকার হবে না। এসব প্রকল্পের টাকা দিয়েই মানুষকে ঢাকাবিমুখী করা যায়। তাই বলছি, আমাদের ডেভেলপমেন্ট পলিসিকেই রিভার্স করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। গরিবদের টার্গেট করে বাজেট করতে হবে, তাদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। বড় বড় অবকাঠামো করে স্বল্পমেয়াদি কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনের মতো ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারে না।

No comments:

Post a Comment