কিছু
কিছু ট্রাকের পেছনে লেখা থাকে সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন। এতে করে অনেক শিশু মনে
করে পুরো বাংলাদেশের ওজন মাত্র ৫ টন! আসলে এর মানে হলো ৫ টন মাল বহনের
ক্ষমতাসম্পন্ন এ ট্রাক সমগ্র বাংলাদেশেই পরিবহন করতে পারবে। কিন্তু সমগ্র
বাংলাদেশ ৫টনি ট্রাকে না আঁটলেও মাত্র একটি কমপ্লেক্সে এঁেট যায়, তাহলে?
কেমন লাগবে যদি দেখেন জাতীয় সংসদ ভবনের পাশেই সাভারের স্মৃতিসৌধ! ঢাকার
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশেই দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির দাঁড়িয়ে আছে!
এটাই হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের
পাশে স্বাধীনতা কমপ্লেক্স পার্কে। এটি একই সাথে হেরিটেজ ও থিমপার্ক।
বাংলাদেশের সব দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোকে এখানে নতুন করে রূপায়ণ করা হয়েছে।
এ যেন বাংলাদেশের ভেতর আরেক বাংলাদেশ! মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১
একর জায়গার ওপর এটি স্থাপিত হয়। আগে এর নাম ছিল শহীদ জিয়া স্মৃতি
কমপ্লেক্স। তবে শুরু থেকেই এটি দর্শনার্থীদের কাছে মিনি বাংলাদেশ নামেই
পরিচিতি লাভ করে। শুরুতে এর দায়িত্বে ছিল কনকর্ড গ্রুপ। তখন ব্যাপক
জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এ পার্কটি। মাঝে রাজনৈতিক হাওয়া বদলে প্রশাসনিক নানান
জটিলতায় এটি বন্ধ থাকে। মাঝে জেলা প্রশাসনের হাত ঘুরে বর্তমানে গত বছরের
জুনে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়েল এন্টারপ্রাইজ আবার চালু করে। চালু হওয়ার
এক বছরের মধ্যেই এর জনপ্রিয়তা ফিরে এসেছে। টিকিট মূল্য বেড়েছে দু’দফায়।
চট্টগ্রাম
বিভাগ ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। বিশেষ করে
শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরে আসে। পার্কটিতে বাংলাদেশের নানা জায়গার মোট ১৪টি
দর্শনীয় স্থাপনার মিনি সংস্করণ আছে। ঢুকতেই ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন। তার পাশে
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
আছে ঢাকার সদরঘাটের আহসান মঞ্জিল, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দিনাজপুরের
কান্তজীর মন্দির, বাগেরহাটের সোনা মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল,
বড় কুঠি, ছোট কুঠি, রংপুরের পাহাড়পুর বিহার, সেন্ট নিকোলাস চার্চ, ঢাকার
লালবাগ কেল্লা, দরবার হল ও হাইকোর্ট বিল্ডিং। তবে এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শুরু
থেকে এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। চব্বিশতলা বিল্ডিং সমান উঁচু প্রায়
২৫০ ফুট উচ্চতার টাওয়ারটিতে দাঁড়িয়ে পুরো চট্টগ্রাম শহর দেখা যায়। দেখা যায়
কর্ণফুলী নদী, নদীর মোহনার সমুদ্রে মিশে যাওয়া। টাওয়ারের চূড়ায় রয়েছে
রিভলবিং রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টটি ঘূর্ণায়মান বলে খেতে খেতেই পুরো শহর
উপভোগ করা যায়। খাবারও মানসম্মত। রেস্টুরেন্টের অতিথিদের জন্য টাওয়ার
পর্যবেক্ষণ ফ্রি। নচেৎ টাওয়ার টিকিট জনপ্রতি ৬০ টাকা। তবে দীর্ঘ দিনের
অব্যবস্থাপনা ও সংস্কার না হওয়ায় টাওয়ারটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণই বটে।
কমপ্লেক্সটির পরতে পরতে রয়েছে বিস্ময়। ঢুকতেই সংসদ ভবন এবং তৎসংলগ্ন লেক।
লেকে
বিশাল বিশাল রাজহাঁস ভাসছে। বোটগুলোকে এ আদলই দেয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের
নৌভ্রমণ আনন্দদায়ক করতে। মুসলিম দর্শনার্থীরা ঘুরতে ঘুরতে নামাজের সময় হয়ে
গেলে সোনা মসজিদটি খুঁজে নিলেই হলো। এই বিখ্যাত স্থাপনাটিই কমপ্লেক্সের
মসজিদ। এ যেন রথ দেখা কলা বেচা একসাথে! মসজিদে একপাশে পর্দা ঘিরে মহিলাদের
নামাজের সুব্যবস্থাও আছে। আছে ইমামের পেছনে জামাতে নামাজ আদায়ের সুযোগ।
কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক জানালেন তারা ধর্মপ্রাণ দর্শনার্থীদের যেন কোনো
অসুবিধা না হয় সেদিকে সচেতন। শত শত বছরের পুরনো মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের
অনুভূতিই আলাদা। হোক না মডেল! এ ছাড়াও এতে রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ
জনগোষ্ঠীর ট্রাইবাল হাউজ মডেল। প্রতিটি বিভাগের বাড়িঘরের মডেলসহ রয়েছে
উপজাতিদের বাসস্থানের মডেল। পেছনের দিকে একটি কৃত্রিম ঝরনা রয়েছে।
কমপ্লেক্সের এক দিকে গড়ে তোলা হয়েছে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। তাতে মজার মজার
বিভিন্ন রাইড রয়েছে।
এখানে টাওয়ারের পর
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মনোরেল। যদিও ব্যবস্থাপক জানালেন, কালুরঘাট
বেতারকেন্দ্রের ওয়েভ তরঙ্গ সমস্যার কারণে আপাতত সেটি বন্ধ আছে। তবে টয়
ট্রেন রয়েছে। এতে চড়ে পার্কটি ঘুরে দেখা যায়। পার্কে ঘুরতে আসা কয়েকজনের
সাথে কথা হয়। তারা জানান, এখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই ভালো। শহুরে
জটিলতায় একটু ঠাণ্ডা প্রশান্ত পরিবেশ পেতেই এখানে আসা। চাঁদগাঁও এলাকা থেকে
মিসেস মুনমুন এসেছিলেন সন্তানদের নিয়ে। বললেন, ‘সবার পক্ষে তো পুরো দেশ
ভ্রমণ করা সম্ভব হয় না। সব সময় বইয়ে পড়া হয় বা ছবিতে দেখা হয়। সে ক্ষেত্রে
এখানে এসে স্বচক্ষে স্থাপনাগুলো দেখে আমরা তো অবশ্যই, সাথে শিশুরাও অনেক
কিছু শিখতে পারে। দেশ সম্পর্কে গর্ববোধ করে। এত সুন্দর সুন্দর স্থাপনা আছে
আমাদের দেশে, ভাবতেই ভালো লাগে।’ তার কথার সত্যতা পাওয়া গেল পার্কটি ঘুরে।
ব্যতিক্রমী একটি উদ্যোগ বলে সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কয়েকজন দুঃখ
প্রকাশও করলেন, এমন একটি জনপ্রিয় ও শিক্ষামূলক কমপ্লেক্সটি বারবার বন্ধ হয়ে
যাওয়ায়। আহসান মঞ্জিলের নিচতলার একপাশে অফিস।
আরেকপাশে
অপার বিস্ময় নিয়ে বসে আছে দুর্লভ একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। স্বাধীনতা
কমপ্লেক্স পাবলিক লাইব্রেরি। এখানে দর্শনার্থীরা বসে বই পড়তে পারেন।
পার্কটি খোলার সময় থেকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত যে কেউ এখানে স্টাডি করতে
পারেন। লাইব্রেরির বই বাইরে নেয়া যাবে না। তবে ব্যাপক সংস্কারকাজ হয়েছে
কমপ্লেক্সটিতে, বোঝা যায়। এখনো চলছে। তারপরও কমপ্লেক্সটির এককালের ভগ্নদশার
চিহ্ন ঢাকতে পারেনি পুরোপুরি। কথা হয় কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আলী
জনির সাথে। তিনি জানালেন, কমপ্লেক্সটির বেহাল দশার কথা। গত এক বছরে তাদের
টিম অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে পার্কটিকে আবার দর্শনযোগ্য করে
তুলেছেন। কমপ্লেক্সটি ঘিরে তাদের আরো অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। ধীরে ধীরে সব
বাস্তবায়ন হবে। পার্কে প্রবেশমূল্য এক শ’ টাকা। ছোট শিশুদের জন্য টিকিট
প্রয়োজন নেই।
রাত ৮টার পর টাওয়ার
পর্যবেক্ষণ ও রেস্টুরেন্টে খেতে চাইলে পার্কে প্রবেশমূল্য দিতে হবে না।
পার্ক বন্ধ হয়ে গেলেও খাওয়াদাওয়া ও টাওয়ার পর্যবেক্ষণ রাত ১০টা পর্যন্ত
চলে। ভরা জোছনায় চাঁদ স্পর্শের বাসনায় মন উচাটন হলে যেতে পারেন টাওয়ারে।
নিচে কর্ণফুলীর কালো বুকে ভাসমান জাহাজের আলোর ফুটকিগুলো যেন তারার মেলা।
জোছনা যদি নাও থাকে, মৃদুমন্দ বাতাসে মাথার ওপর আর নিচের দুই তারার মেলার
অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি মোহগ্রস্ত করেই ছাড়বে।

No comments:
Post a Comment