Tuesday, May 10, 2016

আয়তন বাড়ছে, সেবা কমবে না তো?

উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেরই আয়তন বাড়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। দুটি সিটি করপোরেশনেই আটটি করে ইউনিয়ন যুক্ত হবে এবং আয়তনের দিক থেকে দুটিই দ্বিগুণ আকার ধারণ করবে। স্বাভাবিকভাবে বাড়বে জনসংখ্যাও। ঢাকা উত্তরের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৬ লাখ ২৬ হাজার ১৭। আর দক্ষিণের জনসংখ্যা হবে ৭৫ লাখ ৫৮ হাজার ২৫। দুই সিটি করপোরেশন মিলে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৮১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১। তবে জনসংখ্যার এই হিসাব ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে করা। এরপর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। ধারণা করা যায়, এই সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান আয়তন ও জনসংখ্যা নিয়েই যেখানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আয়তন দ্বিগুণ করে দুই কোটি নাগরিককে সেবা দিতে তারা কতটুকু প্রস্তুত? দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এটা পরিষ্কার হয়েছে যে সিটি করপোরেশনের বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতা বজায় রেখে আধুনিক নগরব্যবস্থাপনার কাজটি কার্যত অসম্ভব। এই দিকটিতে কোনো নজর না দিয়ে দুই সিটির আয়তন বাড়িয়ে কী ফল দেবে? বাড়তি এলাকা ও জনসংখ্যার চাপ দুই সিটি করপোরেশন নিতে পারবে তো? নাকি বর্তমানে যে সেবা তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে, বাড়তি চাপে তা থেকেও বঞ্চিত হব আমরা?
এটা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে যে ঢাকা শহর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। ঢাকা শহরের নাগরিক সেবা ও সুবিধা নিশ্চিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সংখ্যা ৫০টির বেশি। একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সমন্বয় নেই। ঢাকার দুই মেয়র এ মাসেই তাঁদের মেয়াদের এক বছর পূরণ করেছেন। প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁরা কাজ করতে পারেননি। এ জন্য তাঁরা বিভিন্ন সময়ে সমন্বয়হীনতাকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুই মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় তাঁদের দুজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন এ সময়ের মধ্যে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সমন্বয়হীনতাকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেছিলেন। ‘আমার মনে হয়েছে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে সমন্বয়হীনতা। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে আমরা একটি সেমিনার করেছি। সেখানে দেখা গেল ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ’ সমন্বয়হীনতার সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকও। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছয় মাসের অভিজ্ঞতা বলে, ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু করতে হলে ও নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সমন্বয় সংস্থা দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা প্রয়োজন। অনেক কিছুই মেয়রদের কাছে থাকা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের কিছু পুলিশ থাকা দরকার। নানা ধরনের দখল উচ্ছেদে তাদের কাজে লাগানো যাবে।’ আনিসুল হক বলেছেন, ‘আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি সমন্বয়ের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছি। তিনি বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।’ দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মধ্যেও এ ধরনের সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে আমরা বুঝতে পারি যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এ ধরনের কাজের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন। তবে নগর বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে এমন প্রস্তাবও এসেছে যে ঢাকা নগরের এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ের জন্য একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। নগরের সেবাদানকারী বিভিন্ন সংস্থা ও দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি গঠন করে একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে এর প্রধান করা যায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারণ নিশ্চয় দরকারি হয়ে পড়েছে। ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলো সিটি করপোরেশনের আওতায় না আসায় অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খলভাবে গড়ে উঠছে। সিটি করপোরেশনে আওতায় এনে বিধিবিধান কার্যকর করতে না পারলে পরে নগর সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে এই অঞ্চলগুলো নগরের সুবিধা ভোগ করে থাকলেও যথাযথ কর দেয় না। এসব বিবেচনায় দুই সিটির আয়তন বৃদ্ধির বিষয়টিকে বাস্তবসম্মত হিসেবে বিবেচনা করেই বলতে চাই, সবকিছু আগে সিটি করপোরেশন দুটিকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিন। প্রতিষ্ঠান দুটিকে কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। এখানে নির্বিকার থাকার সুযোগ নেই। সমন্বয়হীনতার ফাঁস থেকে সিটি করপোরেশন দুটি মুক্তি না পেলে সম্প্রসারিত সিটি করপোরেশনে নাগরিক সেবার মান বরং কমার আশঙ্কাই বাড়বে।

No comments:

Post a Comment