![]() |
| নজিবুর রহমান |
বাজেটের
আকার বাড়তে থাকায় প্রতিবছরই রাজস্ব আদায়ে চাপ বাড়ছে। এর ওপর আগামী বাজেটে
মূসক আইন বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যবসায়ীদের চাপে আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
(এনবিআর)। এমনই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বাজেট, নতুন মূসক আইন, কর ফাঁকিসহ নানা
বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহাঙ্গীর শাহ
প্রথম আলো: আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন কী হবে?
নজিবুর রহমান: আগামী বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করা। অন্যদিকে যাঁরা এ ধরনের সুযোগের অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের জন্য সুযোগ সংকুচিত করা হবে। আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে শুল্ক কর ফাঁকি দেওয়া নিবৃত করা হবে। সব মিলিয়ে আগামী বাজেট হবে অসৎ ব্যবসায়ীদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক, আর সৎ ব্যবসায়ীরা প্রণোদনা পাবেন। সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে থাকেন, এমন পদক্ষেপও থাকবে। করের বোঝা না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি করা হবে।
প্রথম আলো: প্রতিবছরের মতো আগামী অর্থবছরেও বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকছে। এ লক্ষ্য অর্জনে আপনি কতটা আশাবাদী?
নজিবুর রহমান: অর্থনীতি তথা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বাড়ছে। এতে নতুন নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত যত অ্যাক্টর বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আছেন, তাঁদের সবাইকে নিয়ে সমানভাবে এগিয়ে যাওয়া। যাঁরা আমদানি-রপ্তানির কাজে থাকেন, তাঁরা যথাযথভাবে কার্যক্রম চালাবেন। আবার ব্যাংক, বিমা, মুদ্রাবাজারের মতো আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়মনীতির মধ্যে থেকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বেগবান করবেন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবেন। আবার রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে যাঁরা সরাসরি সম্পৃক্ত, তাঁরা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবেন। করদাতার সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রেখে রাজস্ব আদায় করবেন তাঁরা। এই যে বহুমাত্রিক কর্মপ্রবণতা; এগুলো যদি সঠিকভাবে যথানিয়মে চলে, তাহলে যত বড় লক্ষ্যই থাকুক না কেন, তা অর্জনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সমস্যা হবে না। এ জন্য এনবিআর অংশীজন তথা করদাতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে কাজ করছে।
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া বেশ কিছু দামি গাড়ি জব্দ করেছে এনবিআর। এ ধরনের ধনী মানুষের শুল্ক কর ফাঁকির বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
নজিবুর রহমান: এখন সময়ের দাবি হলো, করদাতারা রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। করযোগ্য আয় থাকলে কর পরিশোধ করবেন। আবার যাঁরা আমদানি-রপ্তানি করেন, তাঁরা যথাযথ শুল্ক কর পরিশোধ করবেন। আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) সংগ্রহ করে তা সরকারি কোষাগারে জমা করবেন। আয়করদাতারা করযোগ্য আয়ের ওপর কর দেবেন। এ তিন কার্যক্রমে ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ যদি ভাবেন, রাজস্ব বোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাবেন, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। রাজস্ব বোর্ডের সামর্থ্য এখন বহুগুণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, শুল্ক গোয়েন্দা সেল ও ভ্যাট ইন্টেলিজেন্স এখন অনেক বেশি সক্রিয়। তাঁরা ঘুরেফিরে পরীক্ষা করে ফাঁকির ক্ষেত্র চিহ্নিত করছেন। চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন—ধরা পড়বেই। রাজস্ব বোর্ড এই এমন অবস্থানেই যাচ্ছে। যাঁরা সচ্ছল মানুষ, তাঁদের মধ্যে সচেতনতা দেখছি। তাঁরা স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়েই কর দিচ্ছেন। শুল্ক কর যথাযথভাবে পরিশোধ না করে অনেকে দামি দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন। আয়ের সক্ষমতা থাকলে অবশ্যই দামি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করবেন তাঁরা। কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্রকে বঞ্চিত করেছেন; ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে শুল্ক কর ফাঁকি দিয়ে দামি গাড়ি চালাচ্ছেন। আমাদের কাছে অনেক তথ্য আছে। আমরা অনুসন্ধান করছি এবং আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। সবার জন্য বার্তা হলো, রাজস্ববান্ধব অবস্থান গ্রহণ করুন; তাহলে বিব্রতকর ও আইনগত ঝামেলায় পড়তে হবে না।
প্রথম আলো: আগামী জুলাই মাস থেকে নতুন মূসক আইন বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ মূসক আইন নিয়ে ব্যবসায়ীরা আপত্তি করছেন। এ বিষয়ে সুরাহার পথ কী?
নজিবুর রহমান: নতুন আইন নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে আমরা ব্যাপকভাবে আলোচনা করছি। সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে মূসক পরিশোধে ডিজিটাল পদ্ধতি বাস্তবায়ন চলছে। নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে মূসক ব্যবস্থা টেকসই অবস্থানে পৌঁছাবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় এই আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আপত্তি নিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেই তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আশা করি, অর্থমন্ত্রীর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে নতুন মূসক আইনের সফল বাস্তবায়ন হবে। সম্ভাবনা ব্যবহার করে আইনটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমানের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মূসক আদায় বাড়বে। অনলাইনে মূসক পরিশোধের সুযোগ থাকবে। ফলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘বাড়তি সম্পর্ক’ রাখার প্রয়োজন হবে না, ঘরে বসেই মূসক দেওয়া যাবে।
প্রথম আলো: নতুন মূসক আইনে ভোক্তা পর্যায়ে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
নজিবুর রহমান: নতুন মূসক আইনে সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করে, এমন পণ্য বা সেবায় মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন। ব্যবসায়ীরা প্রতিটি স্তরে যথাযথভাবে উপকরণ রেয়াত নিলে সামগ্রিকভাবে কর ভার (ট্যাক্স ইনসিডেন্স) কমবে। নতুন আইনে মৌলিক খাদ্য, নির্ধারিত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহনসেবা, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মৎস্য চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবা—এসব ক্ষেত্রে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো: টাকা পাচার-সংক্রান্ত আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পানামা পেপারসে বাংলাদেশের অনেকের নাম আছে। এনবিআর কি তাঁদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে?
নজিবুর রহমান: এনবিআর এমন বিষয়ে নিয়মনীতির আওতার মধ্যে থেকে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করে থাকে। পানামা পেপারসে যদি বাংলাদেশের কারও নাম থাকে, তবে এনবিআরের দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যতিক্রম হবে না।
প্রথম আলো: মামলায় হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এ বিপুল রাজস্ব আদায়ে এনবিআর কতটা উদ্যোগী?
নজিবুর রহমান: রাজস্ব মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আমরা বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিয়েছি। কর অঞ্চলগুলোতে লিগ্যাল ফোকাল পয়েন্ট তৈরি করছি। আবার পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য লিগ্যাল সলিউশন গ্রুপও তৈরি করা হয়েছে। এনবিআরের তিনজন সদস্য পুরো বিষয়টি তদারক করছেন। আমি নিজেও তদারক করছি। রাজস্ব মামলা ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। বিভিন্ন আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়সহ অন্য কার্যালয়গুলোর সহযোগিতা পাচ্ছি। রাজস্ব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে আমরা উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়েছি। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মামলা ব্যবস্থাপনায় এখন উন্নততর পদ্ধতি অনুসরণ করছে এনবিআর। আবার অহেতুক মামলার সৃষ্টি যাতে না হয়, সে জন্য রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। যাতে তাঁরা করদাতাবান্ধব মনোভাব নিয়ে কাজ করতে পারেন। অহেতুক মামলা যাতে না হয়, সে জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থাও সক্রিয় করেছি। ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এনবিআরের এ-সংক্রান্ত জাতীয় সেমিনারে এসে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আমরা সেইভাবে কাজ করছি।
প্রথম আলো: গতানুগতিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো কী ধরনের?
নজিবুর রহমান: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই গতানুগতিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এনবিআরের সঙ্গে সরকারের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি হয়েছে। ভালো কাজ করলে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বীকৃতি দিচ্ছি, পদায়ন করছি। এনবিআরে এখন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। হয়রানি, দুর্নীতি, অনিয়মের প্রমাণ পেলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়তই একধরনের পারফরম্যান্স ইনডেক্সের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রতি মাসেই কর্মকর্তাদের রিপোর্ট দিতে হচ্ছে। আবার শুল্ক, আয়কর ও মূসক-সংক্রান্ত তিনটি নতুন আইন বাস্তবায়ন করা হবে। এতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে শুল্ক কর পরিশোধ করতে পারবেন করদাতারা। ফলে করদাতাদের হয়রানির শঙ্কা থাকবে না। “নতুন মূসক আইনে সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করে, এমন পণ্য বা সেবায় মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন। ব্যবসায়ীরা প্রতিটি স্তরে যথাযথভাবে উপকরণ রেয়াত নিলে সামগ্রিকভাবে কর ভার (ট্যাক্স ইনসিডেন্স) কমবে।
* নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে ১৫%-২০% মূসক আদায় বাড়বে
* শুল্ক কর পরিশোধ না করে অনেকে দামি দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন
* আগামী বাজেটের মূল দর্শন হবে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি এবং যাঁরা সুযোগের অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের জন্য সুযোগ সংকুচিত করা
প্রথম আলো: আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন কী হবে?
নজিবুর রহমান: আগামী বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করা। অন্যদিকে যাঁরা এ ধরনের সুযোগের অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের জন্য সুযোগ সংকুচিত করা হবে। আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে শুল্ক কর ফাঁকি দেওয়া নিবৃত করা হবে। সব মিলিয়ে আগামী বাজেট হবে অসৎ ব্যবসায়ীদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক, আর সৎ ব্যবসায়ীরা প্রণোদনা পাবেন। সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে থাকেন, এমন পদক্ষেপও থাকবে। করের বোঝা না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি করা হবে।
প্রথম আলো: প্রতিবছরের মতো আগামী অর্থবছরেও বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকছে। এ লক্ষ্য অর্জনে আপনি কতটা আশাবাদী?
নজিবুর রহমান: অর্থনীতি তথা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বাড়ছে। এতে নতুন নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত যত অ্যাক্টর বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আছেন, তাঁদের সবাইকে নিয়ে সমানভাবে এগিয়ে যাওয়া। যাঁরা আমদানি-রপ্তানির কাজে থাকেন, তাঁরা যথাযথভাবে কার্যক্রম চালাবেন। আবার ব্যাংক, বিমা, মুদ্রাবাজারের মতো আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়মনীতির মধ্যে থেকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বেগবান করবেন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবেন। আবার রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে যাঁরা সরাসরি সম্পৃক্ত, তাঁরা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবেন। করদাতার সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রেখে রাজস্ব আদায় করবেন তাঁরা। এই যে বহুমাত্রিক কর্মপ্রবণতা; এগুলো যদি সঠিকভাবে যথানিয়মে চলে, তাহলে যত বড় লক্ষ্যই থাকুক না কেন, তা অর্জনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সমস্যা হবে না। এ জন্য এনবিআর অংশীজন তথা করদাতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে কাজ করছে।
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া বেশ কিছু দামি গাড়ি জব্দ করেছে এনবিআর। এ ধরনের ধনী মানুষের শুল্ক কর ফাঁকির বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
নজিবুর রহমান: এখন সময়ের দাবি হলো, করদাতারা রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। করযোগ্য আয় থাকলে কর পরিশোধ করবেন। আবার যাঁরা আমদানি-রপ্তানি করেন, তাঁরা যথাযথ শুল্ক কর পরিশোধ করবেন। আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) সংগ্রহ করে তা সরকারি কোষাগারে জমা করবেন। আয়করদাতারা করযোগ্য আয়ের ওপর কর দেবেন। এ তিন কার্যক্রমে ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ যদি ভাবেন, রাজস্ব বোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাবেন, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। রাজস্ব বোর্ডের সামর্থ্য এখন বহুগুণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, শুল্ক গোয়েন্দা সেল ও ভ্যাট ইন্টেলিজেন্স এখন অনেক বেশি সক্রিয়। তাঁরা ঘুরেফিরে পরীক্ষা করে ফাঁকির ক্ষেত্র চিহ্নিত করছেন। চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন—ধরা পড়বেই। রাজস্ব বোর্ড এই এমন অবস্থানেই যাচ্ছে। যাঁরা সচ্ছল মানুষ, তাঁদের মধ্যে সচেতনতা দেখছি। তাঁরা স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়েই কর দিচ্ছেন। শুল্ক কর যথাযথভাবে পরিশোধ না করে অনেকে দামি দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন। আয়ের সক্ষমতা থাকলে অবশ্যই দামি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করবেন তাঁরা। কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্রকে বঞ্চিত করেছেন; ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে শুল্ক কর ফাঁকি দিয়ে দামি গাড়ি চালাচ্ছেন। আমাদের কাছে অনেক তথ্য আছে। আমরা অনুসন্ধান করছি এবং আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। সবার জন্য বার্তা হলো, রাজস্ববান্ধব অবস্থান গ্রহণ করুন; তাহলে বিব্রতকর ও আইনগত ঝামেলায় পড়তে হবে না।
প্রথম আলো: আগামী জুলাই মাস থেকে নতুন মূসক আইন বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ মূসক আইন নিয়ে ব্যবসায়ীরা আপত্তি করছেন। এ বিষয়ে সুরাহার পথ কী?
নজিবুর রহমান: নতুন আইন নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে আমরা ব্যাপকভাবে আলোচনা করছি। সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে মূসক পরিশোধে ডিজিটাল পদ্ধতি বাস্তবায়ন চলছে। নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে মূসক ব্যবস্থা টেকসই অবস্থানে পৌঁছাবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় এই আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আপত্তি নিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেই তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আশা করি, অর্থমন্ত্রীর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে নতুন মূসক আইনের সফল বাস্তবায়ন হবে। সম্ভাবনা ব্যবহার করে আইনটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমানের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মূসক আদায় বাড়বে। অনলাইনে মূসক পরিশোধের সুযোগ থাকবে। ফলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘বাড়তি সম্পর্ক’ রাখার প্রয়োজন হবে না, ঘরে বসেই মূসক দেওয়া যাবে।
প্রথম আলো: নতুন মূসক আইনে ভোক্তা পর্যায়ে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
নজিবুর রহমান: নতুন মূসক আইনে সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করে, এমন পণ্য বা সেবায় মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন। ব্যবসায়ীরা প্রতিটি স্তরে যথাযথভাবে উপকরণ রেয়াত নিলে সামগ্রিকভাবে কর ভার (ট্যাক্স ইনসিডেন্স) কমবে। নতুন আইনে মৌলিক খাদ্য, নির্ধারিত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহনসেবা, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মৎস্য চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবা—এসব ক্ষেত্রে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো: টাকা পাচার-সংক্রান্ত আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পানামা পেপারসে বাংলাদেশের অনেকের নাম আছে। এনবিআর কি তাঁদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে?
নজিবুর রহমান: এনবিআর এমন বিষয়ে নিয়মনীতির আওতার মধ্যে থেকে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করে থাকে। পানামা পেপারসে যদি বাংলাদেশের কারও নাম থাকে, তবে এনবিআরের দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যতিক্রম হবে না।
প্রথম আলো: মামলায় হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এ বিপুল রাজস্ব আদায়ে এনবিআর কতটা উদ্যোগী?
নজিবুর রহমান: রাজস্ব মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আমরা বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিয়েছি। কর অঞ্চলগুলোতে লিগ্যাল ফোকাল পয়েন্ট তৈরি করছি। আবার পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য লিগ্যাল সলিউশন গ্রুপও তৈরি করা হয়েছে। এনবিআরের তিনজন সদস্য পুরো বিষয়টি তদারক করছেন। আমি নিজেও তদারক করছি। রাজস্ব মামলা ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। বিভিন্ন আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়সহ অন্য কার্যালয়গুলোর সহযোগিতা পাচ্ছি। রাজস্ব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে আমরা উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়েছি। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মামলা ব্যবস্থাপনায় এখন উন্নততর পদ্ধতি অনুসরণ করছে এনবিআর। আবার অহেতুক মামলার সৃষ্টি যাতে না হয়, সে জন্য রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। যাতে তাঁরা করদাতাবান্ধব মনোভাব নিয়ে কাজ করতে পারেন। অহেতুক মামলা যাতে না হয়, সে জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থাও সক্রিয় করেছি। ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এনবিআরের এ-সংক্রান্ত জাতীয় সেমিনারে এসে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আমরা সেইভাবে কাজ করছি।
প্রথম আলো: গতানুগতিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো কী ধরনের?
নজিবুর রহমান: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই গতানুগতিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এনবিআরের সঙ্গে সরকারের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি হয়েছে। ভালো কাজ করলে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বীকৃতি দিচ্ছি, পদায়ন করছি। এনবিআরে এখন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। হয়রানি, দুর্নীতি, অনিয়মের প্রমাণ পেলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়তই একধরনের পারফরম্যান্স ইনডেক্সের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রতি মাসেই কর্মকর্তাদের রিপোর্ট দিতে হচ্ছে। আবার শুল্ক, আয়কর ও মূসক-সংক্রান্ত তিনটি নতুন আইন বাস্তবায়ন করা হবে। এতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে শুল্ক কর পরিশোধ করতে পারবেন করদাতারা। ফলে করদাতাদের হয়রানির শঙ্কা থাকবে না। “নতুন মূসক আইনে সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করে, এমন পণ্য বা সেবায় মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন। ব্যবসায়ীরা প্রতিটি স্তরে যথাযথভাবে উপকরণ রেয়াত নিলে সামগ্রিকভাবে কর ভার (ট্যাক্স ইনসিডেন্স) কমবে।
* নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে ১৫%-২০% মূসক আদায় বাড়বে
* শুল্ক কর পরিশোধ না করে অনেকে দামি দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন
* আগামী বাজেটের মূল দর্শন হবে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি এবং যাঁরা সুযোগের অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের জন্য সুযোগ সংকুচিত করা

No comments:
Post a Comment