Tuesday, May 10, 2016

আইনটি তৈরির পাশাপাশি সুরক্ষা চাই by শাহরিয়ার কবির

শাহরিয়ার কবির
মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকরণ অপরাধ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই আইনের খসড়া সম্পর্কে কিছু মতামত দিয়েছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুজ্জামান
প্রথম আলো : গত প্রায় সাড়ে চার দশকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ আইন কেন হয়নি? এখন এটা করার প্রয়োজন হলো কেন?
শাহরিয়ার কবির : একাত্তরের গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ অস্বীকার বা বিতর্কিত করার বিষয়টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হলোকাস্ট অস্বীকার আইনের আদলে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস অস্বীকার বন্ধে আইন করার দাবি জানিয়ে আসছে। এটা আগে হতে পারত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেভাবে বিকৃত হচ্ছে, তাতে আইনটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি।
প্রথম আলো : মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস বলতে কী বোঝাচ্ছেন?
শাহরিয়ার কবির : ১৯৭২-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই সরকারের সকল কার্যক্রমকে বৈধতা দিয়েছে। এই ঘোষণাপত্র অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আবার একাত্তরের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর থেকে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে বৈধতা লাভ করেছে। এখন এটাকে গৃহযুদ্ধ, বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ বা গন্ডগোল বলাটা অপরাধ। এই ঘোষণাপত্র অস্বীকার করার অর্থ মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালে ফিরিয়ে নেওয়া।
প্রথম আলো : মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে কি? এটা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তো শাস্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
শাহরিয়ার কবির : দেখুন, বিশ্বের কোনো দেশে শহীদদের তালিকা হয়নি। এটা করা সম্ভবও নয়। সাধারণত সরকার যেটা বলে, সেটিই স্বীকৃত বলে ধরা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির দাবি ছিল, নাৎসি বাহিনী ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছে। ইউরোপে মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা অনেক বেশি হলেও ওই সংখ্যা কেউ অস্বীকার করেনি। বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও অন্যায়।
আর ধর্ষণের সংখ্যা দুই লাখ বলা হয়। এটা রেডক্রস চার লাখ, মুনতাসীর মামুন পাঁচ লাখ এবং সর্বশেষ আবুল বারকাত ১০ লাখ বলছেন। যে কেউ তথ্যপ্রমাণ ও গবেষণার ভিত্তিতে এটা বলতে পারেন। কিন্তু কমিয়ে বলা বা লঘু করার প্রবণতা অনুমোদন করা যায় না। আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ অস্বীকার করা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য হতে হবে।
প্রথম আলো : আপনারা অনেক দিন ধরে আইনটি করার দাবি করছেন। কিন্তু হঠাৎ করে এটি গতি পেয়েছে কি?
শাহরিয়ার কবির : আইন প্রণয়নের দাবি এবং এটা করার প্রক্রিয়া বেশ পুরোনো। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর দলের অন্যতম নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে কদর্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দেন। তাঁরা পাকিস্তানপ্রেমের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর আইনটি করা যে জরুরি, সে চিন্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কাজ করতে পারে।
প্রথম আলো : আইনটি ভবিষ্যতে কেউ বাতিল করতে পারবে কি না...
শাহরিয়ার কবির : ভবিষ্যতে এই আইন যাতে কেউ বাতিল করতে না পারে, সে জন্য এর সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি করছি আমরা। ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩’-এর ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে। জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করলেও এটা বাতিল করতে পারেননি সাংবিধানিক সুরক্ষার কারণে।
প্রথম আলো : এ আইনে ব্যক্তির মামলা করার বিষয়টি সমর্থন করেন কি?
শাহরিয়ার কবির : আইনে এ ধরনের মামলার বাদী সরকারকে হতে হবে। নইলে যে কেউ হয়রানিমূলক মামলা করতে পারে। সম্প্রতি ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে শ খানেক মামলা হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিষয় নিয়ে এ ধরনের সুযোগ কাউকে দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া দেড় শ বছরের পুরোনো ফৌজদারি আইন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা রক্ষা করা যাবে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। আইনটি করতে হবে, আবার এর অপব্যবহার যাতে না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

No comments:

Post a Comment