Wednesday, May 4, 2016

সৌদি আরবের সংস্কার by ইশাক দিওয়ান

ইশাক ​রিদওয়ান
তেলের দাম ব্যাপক হারে কমা শুরু হওয়ার আজ দুই বছর পর শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বড় পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে, যে পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনুভূত হবে। এই পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে, বিশেষ করে মধ্য আয়ের দেশ সৌদি আরবের জন্য। কারণ, তাদের তো আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিপুল সম্পদ তহবিল নেই। ফলে তারা এখন সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। মনে হচ্ছে, সৌদি আরব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। কিছুদিন আগেই তারা টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা ভিশন ২০৩০ পেশ করেছে। এই পরিকল্পনাটি উচ্চাভিলাষের জন্য যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি সমালোচিতও হয়েছে। এর একটি উচ্চাভিলাষ হচ্ছে, আগামী দুই দশকের মধ্যে এই রাজতন্ত্রকে পৃথিবীর ১৫ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করা, যে অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষ শ্রমিক, উন্মুক্ত বাজার ও সুশাসন। এটা অর্জনের জন্য সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে, নিজের সম্পদের পোর্টফোলিওকে আরও বহুমুখী করা, বিশালাকার রাষ্ট্রীয় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরামকোর শেয়ার বিক্রি করে সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠন করা। কিন্তু এই ভিশন ২০৩০ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে: শ্রমিকের অংশগ্রহণের নিম্নহার। বর্তমানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪১ শতাংশ কাজে নিয়োজিত রয়েছে, অথচ ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে এ হার ৬০ শতাংশ। যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা মূলত এমন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যেখানে শ্রমিক আধিক্য রয়েছে। এটা সৌদি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, ফলে অন্য যেকোনো সমস্যার চেয়ে এই সমস্যা আমলে নেওয়া কঠিন হবে। শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, উৎপাদনশীলতাও বাড়াতে হবে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত অন্য দেশগুলো যেমন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের চেয়ে সৌদি আরবের জনসংখ্যা কম, মাত্র দুই কোটি (বিদেশি ব্যতীত)। ফলে দেশটির শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা কম থাকলে চলবে না। বস্তুত, এখন তেল থেকে আহরিত রাজস্বের পরিমাণ মাথাপিছু সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার। ফলে এটা টেকসই বিকল্প হওয়ার মতো জায়গায় নেই। সফল হতে হলে সৌদি আরবকে নিজের প্রণোদনার কাঠামো বদলাতে হবে, যাতে বেসরকারি খাতের নবসৃষ্ট কাজে সৌদি নাগরিকেরাই ঢুকতে পারেন, বিদেশিরা নয়। বর্তমানে মনে হচ্ছে, রাজতন্ত্রের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ফয়সালা নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজপরিবারের সমঝোতার ওপর, যেখানে রাজতন্ত্রের শ্রমশক্তি আমদানির পূর্ণ নিশ্চয়তা আছে, যারা জনগণকে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দেয়। এই বন্দোবস্ত শুরু হয়েছে ১৯৭০-এর দশকে, যখন উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো কর্মসূচি স্থানীয় ব্যবসায়ী পরিবারগুলোকে ঠিকাদারে পরিণত করে, যারা তখন নিয়োগের জন্য অধিকতর ভিসা দেওয়ার জন্য লবি করে। পরবর্তীকালে এই ফার্মগুলো বিশালাকার বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে নিজেদের মুনাফা বজায় রাখার জন্য বিদেশি সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা বজায় রাখে। ফলে এই গালফ কো-অপারেশনভুক্ত দেশগুলোই এখন পৃথিবীর একমাত্র অঞ্চল, যেটি এখনো শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ এখানকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মজুরি-দক্ষতার অনুপাত পৃথিবীর সর্বনিম্ন। ফলে এই রাজতন্ত্র এমনভাবে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেটা আধুনিক অর্থনীতির ইতিহাসে আর দেখা যায় না। ২০১৫ সালে সৌদি আরবে ৯০ লাখ অভিবাসী শ্রমিক ছিলেন, সংখ্যাগত দিক দিয়ে যাঁরা ছিলেন দেশটির মোট শ্রমশক্তির ৬০ শতাংশ। বেসরকারি খাত ছিল দেশটির প্রবাসীদের আখড়া, যাঁরা অন্তত ৮৩ শতাংশ পদে আসীন ছিলেন। খুব কম দেশেই এমনটা হয় যে দেশীয় শ্রমিকদের এ রকমভাবে বিদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। কিন্তু সৌদি নাগরিকদের তা করতে হয়। কারণ, প্রায় ৩০-৪০ লাখ সৌদি নাগরিক বর্তমানে রাষ্ট্রীয় খাতে কাজ করেন, যাঁদের মজুরি বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি। যদি দেশটির প্রবাসী সরকারি খাতের শ্রমিকদের মধ্যকার মজুরির ব্যবধান নাটকীয়ভাবে না কমে, তাহলে সৌদি নাগরিকেরা কোনোভাবেই বেসরকারি খাতে কাজ করতে আসবেন না। বিদ্যমান প্রণোদনা ব্যবস্থায় যদি কোম্পানিগুলোর বেসরকারীকরণ ও সরকারি খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে সৌদি নাগরিকেরা চাকরি হারাবেন। অন্যদিকে প্রযুক্তি পুঁজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে অনেক অদক্ষ কাজের পদ বিলুপ্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, অনেক উচ্চ দক্ষতাপূর্ণ চাকরির গ্রেড অবনমন করে সেগুলো মাঝারি দক্ষতার চাকরিতে পরিণত করতে হবে। কোম্পানিগুলোকে শুধু সৌদি নাগরিকদের এ পদে আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট টাকা খরচ করলেই হবে না, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে তাদের প্রশিক্ষণও দিতে হবে। এসব থেকে বোঝা যায়, শ্রমবাজার আরও আঁটসাঁট হবে। ফলে এর কার্যকর সমাধান খোঁজার জন্য দেশটিকে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমাতে হবে, যাতে বেসরকারি খাতের মজুরি সৌদি আরবের সংরক্ষিত মজুরির সমান হয়। আর বিকল্প হচ্ছে, ধীরে ধীরে একটি দরিদ্র কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। ইতিমধ্যে দেশটির বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে, আর এর মধ্যে যদি নিরুৎসাহিত কর্মীদের ধরা হয়, তাহলে সংখ্যাটা আরও বড় হবে। প্রতিবছর দুই লাখের বেশি মানুষ শ্রমবাজারে ঢোকেন। শিক্ষার মান বাড়তে থাকায় সামাজিক চাপও বাড়বে, বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সৌদি তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। আসলে সৌদি আরবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পেছনে মূল বাধাটি নিহিত রয়েছে এর বিশেষ রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় তার লভ্যাংশ ভাগাভাগি করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ সামাজিক বিন্যাস চাপের মুখে পড়ে যাচ্ছে। জনগণ ও ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেওয়া কমানো হলে এটা আরও দুর্বল হবে। ক্ষমতাসীন সৌদরা কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটা অনিশ্চিত। দেশটির উদ্যোক্তাদের সমর্থন দেওয়া হলে নিপীড়ন বেড়ে যেতে পারে, জনগণকে সমর্থন দেওয়া হলে গণতন্ত্রায়ণের দাবি উঠবে। প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা ভিশন ২০৩০-সহ অন্যান্য সংস্কার কর্মসূচির সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
ইশাক দিওয়ান: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফার সেন্টারের মিডল ইস্ট ইনিশিয়েটিভের অ্যাফিলিয়েট।

No comments:

Post a Comment