বাংলাদেশে
যেকোনো বিদেশি মেহমান এলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় আলোচনায়
অনিবার্যভাবে জঙ্গিবাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। গণতন্ত্র, উন্নয়ন,
প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি পেছনে পড়ে থাকে। এটি আমাদের দুর্বলতারই লক্ষণ। আমরা
নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারলে অন্যদের সহায়তার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে গেছেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই
বিসওয়াল এবং ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর।
ঘুরেফিরে
তাঁদের আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি। সামনে
আসছেন ম মার্কিন মুখ্য উপসহকারীমন্ত্রী উইলিয়াম ই টড। তাঁরও আলোচনায় থাকবে
জঙ্গিবাদ। বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই, সে বিতর্ক মুলতবি রেখেও যে কথাটি
বলা যায়, তা হলো জঙ্গিবাদ একই সঙ্গে একটি দৈশিক ও বৈশ্বিক সমস্যা। সরকারের
নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি যতটা হালকাভাবে দেখছেন, ব্যাপারটি তত হালকা বলে
মনে হচ্ছে না। জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে কেউ খুন হলে সরকার প্রথমেই বিরোধী দলের
প্রতি সন্দেহের তির ছুড়ে এটাই প্রমাণ করতে চায় যে তাদের ইন্ধনেই এসব
হত্যাকাণ্ড ঘটছে। কিন্তু অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য–প্রমাণ তারা দেখাতে
পারছে না। এতে করে প্রায় প্রতিটি ঘটনা নিয়ে কিছুদিন হইচই হলেও পরে সবকিছু
মিইয়ে যায়। নতুন অঘটন ঘটলে সেটা নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু যার যায়,
সে-ই বোঝে ক্ষতিটা কত বিশাল। কোনো মতবাদ কিংবা রাষ্ট্রই মানুষের জীবন
ফিরিয়ে দিতে পারে না। সাম্প্রতিক কালে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে আরও একটি
বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে খুন হলেই সরকার
খুনিদের ধরার চেষ্টা না করে আক্রান্ত বা নিহত ব্যক্তির ঠিকুজি নিয়ে ব্যস্ত
হয়ে পড়ে।
যে চাপাতি বা গুলি মানুষের
প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, সে বিষয়ে তেমন উদ্বেগ নেই। বরং কার কোন লেখা বা কথা
কতটা বিপজ্জনক, সেসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতে থাকে। কেউ কারও ধর্মীয়
অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকলে দেশের প্রচলিত আইনেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নেওয়ার বিধান রয়েছে। ব্যক্তি এমনকি রাষ্ট্রও মামলা করতে পারে কিংবা
প্রতিকার চাইতে পারে। কিন্তু জঙ্গিদের সন্ত্রাসী হামলার পর আক্রান্ত
ব্যক্তির ওপর আঘাত হানা হলে সমাজে ভুল বার্তা চলে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি
কিংবা তাঁর পরিবার আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। একশ্রেণির পশ্চিমা মানবাধিকার
সংগঠনও এ ধরনের আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়ার ধুয়া তুলে সামাজিক
অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই—মুক্তিযুদ্ধের
মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে কেউ জীবনের নিরাপত্তা খুঁজবেন না।
তাঁরা এই দেশেই থাকবেন। এ দেশ তাঁদেরও। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জঙ্গিবাদের
বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হওয়া একক কোনো রাষ্ট্র বা শক্তির পক্ষে যে সম্ভব
নয়; তিন দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথিত সন্ত্রাসবিরোধী
লড়াই যৌক্তিক পরিণতি না পাওয়াই তার প্রমাণ। গেল শতকের সত্তরের দশকে
পেন্টাগন সোভিয়েত দখলদারি অবসানকল্পে আফগানিস্তানে যে বিষবৃক্ষ রোপণ
করেছিল, তা-ই এখন গোটা বিশ্বে বিষ নিশ্বাস ছড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যে
ধর্মীয় ভাবাবেগ মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল, সেই ভাবাবেগেই
তারা এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত।
সম্প্রতি এক ঘরোয়া আলোচনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল জঙ্গিবাদের প্রসার ও বিস্তৃতি নিয়ে। এ বিষয়ে তাঁর একাধিক বইও আছে। জঙ্গিবাদের প্রসারের মুখ্য দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের —সে কথা স্বীকার করেও তিনি যে সরল সত্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরলেন তা হলো, সোভিয়েত বাহিনীকে তাড়াতে সে সময়ে মুসলিম দেশগুলো থেকে হাজার হাজার মুসলিম তরুণ আফগানিস্তানে গিয়েছিল মুজাহিদ বাহিনীতে নাম লেখাতে। বাংলাদেশ থেকেও গিয়েছিলেন কয়েক হাজার। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে তারা তাঁদের প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন। হরকাতুল জিহাদ, বাংলাদেশ বা হুজিবি নেতা মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা দেশে ফিরে সরাসরি জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালায়। বোমাবাজিতে লিপ্ত হয়। এরপরই সংঘটিত হয় উদীচী ট্র্যাজেডি, রমনা বটমূল হত্যাকাণ্ড, সিপিবি সমাবেশে হামলা, কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বিশাল আকারে বোমা পুঁতে রাখার ঘটনা। এরপর ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যতগুলো বোমা হামলা হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটির সঙ্গে মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা জড়িত ছিলেন। মুফতি হান্নান বর্তমানে কারাগারে। ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলায় তাঁর ওপর মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলছে। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যার দায়ে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ অপর ছয় দুর্ধর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও তাঁদের অনেক সহযোগী রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার আসামিদেরও কেউ কেউ বিদেশে পলাতক।
তারপরও জঙ্গিবাদের হানা বন্ধ হচ্ছে না কেন? এর পেছনে কাদের ইন্ধন আছে? বিএনপি আমলে মদদদাতারা অনেকটা প্রকাশ্য ছিল। বাংলা ভাইকে গার্ড অব অনার দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন রাজশাহীর তৎকালীন পুলিশ সুপার। এখনো কী আড়ালে আবডালে কেউ প্রশ্রয় দিচ্ছে না? না দিলে তারা এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে কীভাবে? জঙ্গিরা কৌশল পরিবর্তন করেছে। আগে সমাবেশে-সিনেমা হলে হামলা চালাত। এখন ব্যক্তিকে টার্গেট করে হামলা চালাচ্ছে। এবং তাদের বেশির ভাগ নিশানাই অব্যর্থ। কিন্তু সরকার খুব কম ক্ষেত্রেই অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো সরকারের আমলে এই অপশক্তি এত শক্তি সঞ্চয় করল কীভাবে? তাহলে কী আমাদের সমাজের ভেতরই এমন সব উপাদান আছে, যারা জঙ্গিবাদকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশে তৈরি জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের যোগসাজশের কথা অস্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তাঁরাও নাকি আইএসকে হন্যে হয়ে খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু সিঙ্গাপুরে জীবিকার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের জঙ্গিবাদে দীক্ষা নেওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন তিনি? দেশে তৈরি জঙ্গিদের যদি তারা সিঙ্গাপুরে বসে পাকড়াও করতে পারে, তাহলে সিরিয়া ও ইরাকে ঘাঁটি গাড়া কি একেবারেই অসম্ভব?
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ যত জটিলই হোক না কেন, বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ততটা জটিল নয়; কেননা এখানে যারা গত দুই দশকে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা চালিয়ে আসছে, তাদের ভিত্তি যতটা না আদর্শগত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। বাংলাদেশের সমাজদেহে জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এখানকার জঙ্গিরা একযোগে ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা চালানোর পর বুঝে গেছে, ক্ষমতা দখল করার শক্তি তাদের নেই। তাই নিছক মানুষ হত্যা এবং সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করাই তাদের লক্ষ্য। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। আর সেটিও সম্ভব হয়েছে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির তীব্র বৈরিতা ও রেষারেষির সুযোগে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করুক কিংবা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানাক, সেটি মোটেই আমাদের জন্য গৌরবের নয়। আমাদের সমস্যা অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে না পারলেই তৃতীয় পক্ষ এসে নাক গলানোর সুযোগ পায়। আমরা যদি নিজেদের শক্তি ও বুদ্ধিবলে অপশক্তিকে পরাস্ত করতে পারতাম, তাহলে কেউ এ নিয়ে কথা বলার সাহস পেত না।
কয়েক দিন আগে নিশা দেশাই বাংলাদেশের সঙ্গে সন্ত্রাস দমনে একযোগে কাজ করার কথা বলেছিলেন। তিনি তাঁর বাংলাদেশ সফর সফল হয়েছে বলেও নিজের টুইটারে মন্তব্য করেছেন। এরপরই ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর দুই দিনের সফরে এসেও বললেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করবেন। তিনি এও বলেছেন যে প্রতিবেশী দুই দেশ পরস্পরের সমস্যা অনেক ভালো বোঝে। এর মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে, তৃতীয় কোনো দেশের সহায়তা ছাড়াই তাঁরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। কিন্তু জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে কামিয়াব করতে হলে প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ঐকমত্য। সেই ঐকমত্য হতে হবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। সমাজদেহে এমন কোনো জীবাণু রাখা যাবে না, যার পথ ধরে ক্যানসারের চেয়েও ভয়ংকর এই সংক্রামক ব্যাধি প্রবেশ করতে পারে। একটি দেশ তখনই নিজেকে শক্তিধর ভাবতে পারে, যখন তার পেছনে সমগ্র জনগোষ্ঠী কাতারবন্দী থাকে। একটি দেশের শক্তি কখনোই সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কিংবা সমরাস্ত্র দিয়ে যাচাই হয় না, যাচাই হয় সেই ভূখণ্ডের মানুষের সংহতি ও সমৃদ্ধি দিয়ে। ইউরোপের অনেক দেশই সামরিক শক্তিতে বলবান নয়। কিন্তু যেকোনো শক্তিধর দেশের চেয়ে তাঁদের রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতি।
গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ সংলাপ হলো, সেখানেও জঙ্গিবাদের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদু বললেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে বিদেশিরা দুবার চিন্তা করেন। বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না আসার পেছনে দায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদ, যা বাংলাদেশে বহুমাত্রিক নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। জঙ্গিবাদের কারণে যেসব নৃশংসতা চলছে, সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই, বিচারও নেই। বিদেশিদেরও হত্যা করা হচ্ছে। আর জ্বালানি ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। সংলাপে ৩৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া পিয়েরে মায়াদুর সঙ্গে বাংলাদেশে ইইউভুক্ত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, স্পেন—এই আট দেশের রাষ্ট্রদূতও উপস্থিত ছিলেন। এর অাগে প্রধান অতিথির ভাষণে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। কিন্তু তাঁর সেই আশ্বাসে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা তেমন আশ্বস্ত হতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশের মানুষের মনেও যে ভয় ও শঙ্কা রয়েছে, তা কাটানোর লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তবু আমরা আশায় বুক বঁাধি। তবু সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখি।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com
সম্প্রতি এক ঘরোয়া আলোচনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল জঙ্গিবাদের প্রসার ও বিস্তৃতি নিয়ে। এ বিষয়ে তাঁর একাধিক বইও আছে। জঙ্গিবাদের প্রসারের মুখ্য দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের —সে কথা স্বীকার করেও তিনি যে সরল সত্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরলেন তা হলো, সোভিয়েত বাহিনীকে তাড়াতে সে সময়ে মুসলিম দেশগুলো থেকে হাজার হাজার মুসলিম তরুণ আফগানিস্তানে গিয়েছিল মুজাহিদ বাহিনীতে নাম লেখাতে। বাংলাদেশ থেকেও গিয়েছিলেন কয়েক হাজার। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে তারা তাঁদের প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন। হরকাতুল জিহাদ, বাংলাদেশ বা হুজিবি নেতা মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা দেশে ফিরে সরাসরি জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালায়। বোমাবাজিতে লিপ্ত হয়। এরপরই সংঘটিত হয় উদীচী ট্র্যাজেডি, রমনা বটমূল হত্যাকাণ্ড, সিপিবি সমাবেশে হামলা, কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বিশাল আকারে বোমা পুঁতে রাখার ঘটনা। এরপর ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যতগুলো বোমা হামলা হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটির সঙ্গে মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা জড়িত ছিলেন। মুফতি হান্নান বর্তমানে কারাগারে। ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলায় তাঁর ওপর মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলছে। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যার দায়ে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ অপর ছয় দুর্ধর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও তাঁদের অনেক সহযোগী রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার আসামিদেরও কেউ কেউ বিদেশে পলাতক।
তারপরও জঙ্গিবাদের হানা বন্ধ হচ্ছে না কেন? এর পেছনে কাদের ইন্ধন আছে? বিএনপি আমলে মদদদাতারা অনেকটা প্রকাশ্য ছিল। বাংলা ভাইকে গার্ড অব অনার দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন রাজশাহীর তৎকালীন পুলিশ সুপার। এখনো কী আড়ালে আবডালে কেউ প্রশ্রয় দিচ্ছে না? না দিলে তারা এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে কীভাবে? জঙ্গিরা কৌশল পরিবর্তন করেছে। আগে সমাবেশে-সিনেমা হলে হামলা চালাত। এখন ব্যক্তিকে টার্গেট করে হামলা চালাচ্ছে। এবং তাদের বেশির ভাগ নিশানাই অব্যর্থ। কিন্তু সরকার খুব কম ক্ষেত্রেই অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো সরকারের আমলে এই অপশক্তি এত শক্তি সঞ্চয় করল কীভাবে? তাহলে কী আমাদের সমাজের ভেতরই এমন সব উপাদান আছে, যারা জঙ্গিবাদকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশে তৈরি জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের যোগসাজশের কথা অস্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তাঁরাও নাকি আইএসকে হন্যে হয়ে খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু সিঙ্গাপুরে জীবিকার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের জঙ্গিবাদে দীক্ষা নেওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন তিনি? দেশে তৈরি জঙ্গিদের যদি তারা সিঙ্গাপুরে বসে পাকড়াও করতে পারে, তাহলে সিরিয়া ও ইরাকে ঘাঁটি গাড়া কি একেবারেই অসম্ভব?
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ যত জটিলই হোক না কেন, বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ততটা জটিল নয়; কেননা এখানে যারা গত দুই দশকে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা চালিয়ে আসছে, তাদের ভিত্তি যতটা না আদর্শগত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। বাংলাদেশের সমাজদেহে জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এখানকার জঙ্গিরা একযোগে ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা চালানোর পর বুঝে গেছে, ক্ষমতা দখল করার শক্তি তাদের নেই। তাই নিছক মানুষ হত্যা এবং সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করাই তাদের লক্ষ্য। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। আর সেটিও সম্ভব হয়েছে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির তীব্র বৈরিতা ও রেষারেষির সুযোগে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করুক কিংবা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানাক, সেটি মোটেই আমাদের জন্য গৌরবের নয়। আমাদের সমস্যা অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে না পারলেই তৃতীয় পক্ষ এসে নাক গলানোর সুযোগ পায়। আমরা যদি নিজেদের শক্তি ও বুদ্ধিবলে অপশক্তিকে পরাস্ত করতে পারতাম, তাহলে কেউ এ নিয়ে কথা বলার সাহস পেত না।
কয়েক দিন আগে নিশা দেশাই বাংলাদেশের সঙ্গে সন্ত্রাস দমনে একযোগে কাজ করার কথা বলেছিলেন। তিনি তাঁর বাংলাদেশ সফর সফল হয়েছে বলেও নিজের টুইটারে মন্তব্য করেছেন। এরপরই ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর দুই দিনের সফরে এসেও বললেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করবেন। তিনি এও বলেছেন যে প্রতিবেশী দুই দেশ পরস্পরের সমস্যা অনেক ভালো বোঝে। এর মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে, তৃতীয় কোনো দেশের সহায়তা ছাড়াই তাঁরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। কিন্তু জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে কামিয়াব করতে হলে প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ঐকমত্য। সেই ঐকমত্য হতে হবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। সমাজদেহে এমন কোনো জীবাণু রাখা যাবে না, যার পথ ধরে ক্যানসারের চেয়েও ভয়ংকর এই সংক্রামক ব্যাধি প্রবেশ করতে পারে। একটি দেশ তখনই নিজেকে শক্তিধর ভাবতে পারে, যখন তার পেছনে সমগ্র জনগোষ্ঠী কাতারবন্দী থাকে। একটি দেশের শক্তি কখনোই সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কিংবা সমরাস্ত্র দিয়ে যাচাই হয় না, যাচাই হয় সেই ভূখণ্ডের মানুষের সংহতি ও সমৃদ্ধি দিয়ে। ইউরোপের অনেক দেশই সামরিক শক্তিতে বলবান নয়। কিন্তু যেকোনো শক্তিধর দেশের চেয়ে তাঁদের রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতি।
গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ সংলাপ হলো, সেখানেও জঙ্গিবাদের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদু বললেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে বিদেশিরা দুবার চিন্তা করেন। বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না আসার পেছনে দায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদ, যা বাংলাদেশে বহুমাত্রিক নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। জঙ্গিবাদের কারণে যেসব নৃশংসতা চলছে, সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই, বিচারও নেই। বিদেশিদেরও হত্যা করা হচ্ছে। আর জ্বালানি ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। সংলাপে ৩৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া পিয়েরে মায়াদুর সঙ্গে বাংলাদেশে ইইউভুক্ত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, স্পেন—এই আট দেশের রাষ্ট্রদূতও উপস্থিত ছিলেন। এর অাগে প্রধান অতিথির ভাষণে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। কিন্তু তাঁর সেই আশ্বাসে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা তেমন আশ্বস্ত হতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশের মানুষের মনেও যে ভয় ও শঙ্কা রয়েছে, তা কাটানোর লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তবু আমরা আশায় বুক বঁাধি। তবু সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখি।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

No comments:
Post a Comment