Wednesday, May 11, 2016

সংযুক্ত মার্কিন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র? by হাসান ফেরদৌস

বার্নি স্যান্ডার্স
চমকাবেন না, এখনো ‘মার্কিন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ বা ‘সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ নামে কোনো দেশ বিশ্বের মানচিত্রে আবির্ভূত হয়নি। তবে বার্নি স্যান্ডার্স যদি দৈবক্রমে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে সে পথে আমেরিকা কদম দুয়েক এগিয়ে যাবে, এমন ভরসা করা একদম ভুল হবে না। বাংলাদেশের পাঠক, আশা করি কথাটার ভেতর যে পরিহাস রয়েছে, তা আপনাদের চোখ এড়ায়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন মৃত, তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রেরও মৃত্যু হয়েছে, এটা মোটামুটি গৃহীত সত্য। চীন, ভিয়েতনাম অথবা কিউবা, একসময়ের সব বাঘা বাঘা সমাজতান্ত্রিক দেশ পথ পরিবর্তন করে বাজার অর্থনীতি বেছে নিয়েছে। সমাজতন্ত্রের এই মৃত্যুকে আমেরিকা নিজের সাফল্য হিসেবে দাবি করে থাকে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে কাবু করতে সে কম চেষ্টা করেনি। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত দেশ ভেঙে টুকরো টুকরো হলে আমেরিকা আনন্দে ডুগডুগি বাজিয়েছিল। সে সময় এক পণ্ডিত এমন দাবি করেছিলেন, সমাজতন্ত্রের পতনের ভেতর দিয়ে ধনতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে। আর এই বিজয়ের ভেতর দিয়ে ইতিহাসেরও সমাপ্তি হলো।
ভাবতে পারেন, সেই আমেরিকায় এখন খোলামেলাভাবে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে! সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স কোনো রাখঢাক ছাড়াই নিজেকে সমাজতন্ত্রী তকমা দিয়ে যে রাজনৈতিক বিপ্লব শুরু করেছেন, তাতে হিলারি ক্লিনটনের ঘাম ছুটে গেছে। এত দিন এ দেশে সমাজতন্ত্র শব্দটা শোনামাত্রই লোকে বক্র চোখে তাকাত, যেন খুব নোংরা বা ভয়ানক কিছু একটা বলা হলো। স্যান্ডার্স তা একদম বদলে দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, মার্কিন মূল্যবোধের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। সবার খাওয়া-পরা-চিকিৎসা-চাকরির অধিকার থাকবে, সে কথা তো এ দেশের সব প্রধান রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবীই বলে গেছেন। আমেরিকার শাসনতন্ত্রেও সে কথা লেখা আছে। তাহলে নতুন আর কী হলো? বরং এখন যেভাবে ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠীর হাতে ধনের পাহাড় জমেছে, যেভাবে সব ক্ষমতা স্বল্প কয়েকজনের হাতে বাঁধা পড়েছে, যেভাবে অসাম্য বেড়েছে, সেটাই মার্কিন চেতনার পরিপন্থী।কথাটা একদম মিথ্যা নয়। ১৯৪১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে এক ঐতিহাসিক ভাষণে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সবচেয়ে স্পষ্টভাবে আমেরিকান স্বপ্নের যে ছবিটি আঁকেন, স্যান্ডার্সের আঁকা সম্ভাবনার সঙ্গে তার তেমন কোনো তফাত নেই। রুজভেল্ট সেই ভাষণে শুধু আমেরিকার জন্য নয়, বিশ্বের সব মানুষের জন্য চারটি ‘স্বাধীনতা’ বা ‘মুক্তি’র কথা বলেছিলেন। সেগুলো হলো: কথা বলার স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, অভাব থেকে মুক্তি ও ভীতি থেকে মুক্তি।
রুজভেল্টের কথা ধার করে স্যান্ডার্স প্রস্তাব রেখেছেন, প্রকৃত মুক্তির জন্য সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। মানুষকে অভাব থেকে মুক্তি দিতে হবে, তার জন্য পূর্ণ জীবনযাপনের সব সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ‘৭০ বছর আগে রুজভেল্ট যে কথা বলেছিলেন, আমিও সেই কথাই বলি।’ শুদ্ধ অঙ্কের হিসাব করে বার্নি স্যান্ডার্স আমাদের দেখিয়েছেন, ধনতন্ত্রের নামে আমেরিকার ১ শতাংশের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ মানুষ এখন পুরো দেশটাকে নিজেদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। এক ওয়ালমার্ট কোম্পানির মালিক, একই পরিবারের ছয় শরিকের হাতে যে সম্পদ জমা হয়েছে, আমেরিকার ৪০ শতাংশ মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও তা বেশি। মাত্র ৪০০ পরিবার আজ আমেরিকার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে, যেমন খুশি আইন বানাতে পারে, যাকে খুশি ক্ষমতায় বসাতে পারে। এর নাম গণতন্ত্র নয়, এর নাম ‘অলিগার্কি’ বা গোষ্ঠীতন্ত্র। বার্নি স্যান্ডার্স এই ব্যবস্থাটা ভেঙে তাকে খানিকটা গণতান্ত্রিক করতে চান। সে কাজের জন্য প্রয়োজন একদিকে বিত্তহীনদের আয়ের পথ বাড়ানো, অন্যদিকে বিত্তবানদের বল্গাহীন সম্পদের পাহাড়ের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। তিনি সাধারণ শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ঘণ্টাপ্রতি ১৫ ডলার করতে চান, ওয়ালস্ট্রিটের সবচেয়ে বড় বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে কয়েক টুকরো করতে চান, ধনকুবেরদের পোয়াবারো হয় এমন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে চান। চলতি আয়কর ব্যবস্থা, যার ফলে সবচেয়ে ধনীদের সবচেয়ে কম আয়কর দিতে হয়, তার সংস্কার চান। প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে চান। নতুন চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্যে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে চান।
এর কোনটা এমন কী ভয়াবহ প্রস্তাব যে তাতে মাথায় বাজ পড়বে? বস্তুত যেভাবে স্যান্ডার্সের ‘রাজনৈতিক বিপ্লব’ এ দেশের তরুণ ও যুবকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট—অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসমতার বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ ক্রমশ এক হচ্ছে। এর জন্য যদি সমাজতন্ত্র চালু করতে হয়, তো তাতেও আপত্তি নেই। এক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখছি, এখন আমেরিকার ৪০ শতাংশ মানুষ ‘সমাজতন্ত্র’ কথাটাকে আর নেতিবাচক চোখে দেখে না। বলাই বাহুল্য, ধনিক গোষ্ঠী ও তাদের প্রতিনিধি হিসেবে রিপাবলিকান পার্টি বার্নি স্যান্ডার্সের কথায় মোটেও খুশি নয়। রিপাবলিকানেরা যেখানে সরকারের ভূমিকা ছাঁটতে চান, স্যান্ডার্স সেখানে তা বাড়াতে চান। রিপাবলিকানেরা যেখানে আয়কর কমাতে চান, স্যান্ডার্স সেখানে বড়লোকদের ওপর আয়কর বাড়াতে চান। তাতে রিপাবলিকানদের তো রাগ হবেই। তবে ক্লাসিক্যাল সমাজতন্ত্রে উৎপাদন খাতের ওপর সরকারি মালিকানার যে ব্যবস্থা ছিল, স্যান্ডার্স তার বিরোধী। মালিকানা নয়, তিনি সম্পদের ওপর অধিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেছেন। এই নিয়ন্ত্রণের একটা বড় লক্ষ্য হবে কোনো ব্যক্তি বা করপোরেশন যাতে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার মতো বিশাল না হয়ে পড়ে, তার ওপর নজরদারি করা। ২০০৮ সালে আমেরিকা যে অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার গভীর খাদে পড়ে যায়, তার অন্যতম কারণই ছিল গুটি কয়েক অতিবৃহৎ আর্থিক সংস্থার বেসামাল অবস্থা। সেই অবস্থা যাতে আবারও না ঘটে, সে লক্ষ্যে স্যান্ডার্স এসব প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে কয়েক টুকরো করতে চান। এদিকে তাঁর সঙ্গে অর্থনীতিবিদ গলব্রেথ ও শুমেখারের প্রস্তাবিত কর্মসূচির বড় কোনো ফারাক নেই। ‘স্মল ইজ বিউটিফুল’—এ তো শুমেখারেরই কথা।
আমেরিকায় যাঁরা সমাজতন্ত্র শব্দটা শুনলেই চোখ কপালে তোলেন, তাঁরা হয়তো লক্ষ করেন না, এ দেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা (সোশ্যাল সিকিউরিটি) ইত্যাদি মিলিয়ে এ দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সরকারের হাতে। আমেরিকায় সমাজতন্ত্র অলীক কল্পনা, এমন কথা বলায় স্যান্ডার্স উত্তর দিয়েছেন, একসময় সোশ্যাল সিকিউরিটি, ৪০ ঘণ্টার কর্ম সপ্তাহ ও ন্যূনতম মজুরির ধারণাও অলীক বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন তা আমেরিকার জীবনের অংশ হয়ে পড়েছে। তার মানে কি আমেরিকায় সমাজতন্ত্র প্রায় আসে আসে? না, সে কথা বলি না। তবে সমাজতন্ত্র শুনলেই আর নাক সিটকানো যাবে না। এক কোটির বেশি মানুষ স্যান্ডার্সের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, সেই ভোট তো সমাজতন্ত্রের পক্ষেই। আর কিছু না হোক, সব মানুষের কল্যাণে সরকারের ভূমিকা আছে, স্যান্ডার্স সেই বিষয়টির প্রতি আমাদের নজর ফেরাতে বাধ্য করেছেন, এই কৃতিত্বটুকু তাঁকে দিতেই হবে। মধ্যপন্থী হিলারি ক্লিনটনকে তিনি ক্রমশ বামমুখী করেছেন, সেটাও কম বড় কথা নয়। আয়ের বৈষম্য, ন্যূনতম বেতন ও শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে স্যান্ডার্সের যুক্তি তিনি মেনে নিয়েছেন। এমনকি যে ওয়ালস্ট্রিটের কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা চাঁদা হিসেবে তুলেছেন হিলারি, তার ওপরেও সরকারি নজরদারি বাড়ানোর ব্যাপারে স্যান্ডার্সের সঙ্গে একমত হয়েছেন তিনি।
স্যান্ডার্সের রাজনৈতিক বিপ্লবের সাফল্য এখানেই। সমাজতন্ত্রই বলি বা উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থা বলি, একসময় যে ধারণাগুলো মুখে আনলেই ‘কমিউনিস্ট’ বলে গালি শুনতে হতো, তাকে মূলধারার আলাপ-আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি। তাঁর বিপ্লবের এটি প্রথম ধাপ। এখন যা দরকার তা হলো এই সমাজতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তাকে জাতীয় নীতির অন্তর্ভুক্ত করা। অধিকাংশ পণ্ডিত একমত, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পাবেন না স্যান্ডার্স। সুপার ডেলিগেট নামে পরিচিত দলের কর্তা-ব্যক্তিদের সমর্থন হিলারির প্রতি। সে কথা স্যান্ডার্স নিজেও জানেন। এই মুহূর্তে তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য লড়ছেন না। তাঁর লড়াই, যে বিষয়গুলো তিনি নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে সক্ষম হয়েছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে তা অন্তর্ভুক্ত করা। প্রেসিডেন্ট যে-ই হোন, সেই ইশতেহার উপেক্ষা করা তাঁর পক্ষে সহজ হবে না।
রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র মৃত। বাংলাদেশেও একসময় আমরা সমাজতন্ত্রকে জাতীয় নীতির অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, কিন্তু এখন তার কথা জানতে হলে ইতিহাসের বই ঘাঁটতে হয়। অথচ সেই সমাজতন্ত্রের ভাবনা এখন বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে ‘সাম্রাজ্যবাদের শেষ ঘাঁটি’ যুক্তরাষ্ট্রে।
এটা কি ইতিহাসের মৃত্যু, না নতুন ইতিহাসের জন্ম?
৮ মে ২০১৬, নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

No comments:

Post a Comment