Wednesday, May 11, 2016

প্রশিক্ষণ ব্যতিরেকে পদায়ন কাঙ্ক্ষিত নয় by আলী ইমাম মজুমদার

চাকরিতে নিয়োগের পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ একটি আবশ্যক বিষয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে চাকরিতে প্রবেশের আগেই। যেমন সামরিক বাহিনীর ক্যাডেটরা দীর্ঘ দুই বছর প্রশিক্ষণ সফলভাবে সমাপ্ত করার পর কমিশন পান। আর পুলিশের নবনিযুক্ত এএসপি, সাব-ইন্সপেক্টর এমনকি কনস্টেবলদের পদায়ন হয় প্রশিক্ষণের পর। বেসামরিক প্রশাসনের অন্য অঙ্গগুলোতে কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের তেমন ব্যবস্থা নেই। ধরে নেওয়া হয় তাঁরা কাজ করতে করতে সিনিয়র সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখে নেবেন। তবে কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের বেশ কিছু পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পরই মাঠপর্যায়ে পদায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমনটা হচ্ছে না। স্বাধীনতার পরপর একসঙ্গে বিভিন্ন ক্যাডারে ব্যাপকসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তখন থেকেই প্রশিক্ষণ ছাড়া পদায়ন অনেকটা নিয়ম হয়ে পড়ে। প্রশাসন ক্যাডারেও এটা লক্ষ করা যায়।
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সাধারণ প্রশাসন ও উন্নয়নকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। পালন করেন ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনা, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ব্যবস্থা ও ভূমি হুকুমদখলসহ ভূমি–সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ। আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পালন করতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের প্রসার ভোটকেন্দ্র থেকে পরীক্ষার কেন্দ্র। সুতরাং ভাবা সংগত যে, তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়েই এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত হবেন। এ জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তবে অনিয়মিত নিয়োগ ও বিভিন্ন ব্যাচে নিয়োগকৃত কর্মকর্তার সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের, এসব প্রশিক্ষণে বিশাল জট সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে মাঠপর্যায়ে, এমনকি নীতিনির্ধারণী স্তরে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংকট চলছে। আইন ও প্রশাসন বিষয়ে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পাঁচ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এটা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিসিএস প্রশাসন একাডেমি। সেখানে এখন মূলত ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ চলছে। আগের ব্যাচগুলোরও কেউ কেউ আছেন। আবার আগের ব্যাচগুলোর কিছু কিছু কর্মকর্তা এ প্রশিক্ষণই নেননি, এমনও আছেন। ৩২তম ব্যাচে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য নেই। ৩৩তম ব্যাচ মাঠ প্রশাসনে কাজ করছে প্রায় দুই বছর। তাঁদের কেউ কেউ এর মধ্যে বনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করছেন বা করেছেন। যাঁরা আইন ও প্রশাসন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেননি, তাঁদেরও মাঠপর্যায়ে পালন করতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। অথচ এই ক্যাডার সদস্যদের জন্য এটি অত্যাবশ্যক পেশাগত প্রশিক্ষণ। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, এই প্রশিক্ষণে বিভিন্ন আইন ও তা প্রয়োগের ধারণা দেওয়া হয়। আলোচিত হয় প্রশাসন পরিচালনার বিভিন্ন কার্যপদ্ধতি। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা এখানে আমন্ত্রিত হন তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণার্থীদের অবগত করতে।
এরপর আসে বনিয়াদি প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে। প্রশিক্ষণটি ছয় মাস মেয়াদি। আর সব ক্যাডারের জন্য প্রযোজ্য। এটা পরিচালনার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি)। প্রশিক্ষণে মূলত বাংলাদেশ বিষয়াবলি, প্রশাসন ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন অর্থনীতি ইত্যাদি আলোচিত হয়। এর একটি উদ্দেশ্য বিসিএস কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি। সব ক্যাডার থেকেই কিছু কর্মকর্তা নিয়ে এই প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। সেখানেও বড় ধরনের জট সৃষ্টি হয়েছিল। কিছুকাল আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে একটি বাস্তবধর্মী দৃঢ় উদ্যোগ নিয়ে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে এর দায়িত্ব দেয়। এতে যদিও মান সমান থাকছে না আর আন্তক্যাডার সম্প্রীতির সুযোগও কমে গেছে, তাও সেই জট এখন অনেকটা কেটে গেছে। ৩২ ও ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা বনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এখন। আশা করা যায়, এটা অন্তত নিয়মিত হয়ে যাবে। তবে তা আবশ্যক চাকরিতে প্রবেশের পরপর। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ভূমি ব্যবস্থাপনা। তাঁরা ভূমি রেকর্ড তৈরি ও সংরক্ষণ, নামজারি, সরকারের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দোবস্তের প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, ভূমি হুকুমদখলসহ যাবতীয় কাজ করে থাকেন। ভূমি জরিপ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যেমন এই ক্যাডারের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। তেমনি উপজেলা পর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি দায়িত্বপূর্ণ পদ। এ পদে সাধারণত পদায়ন হয় চাকরি শুরুর বছর তিনেকের মধ্যে। সে সময় তাঁরা হয়তো বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এর মধ্যে ভূমি আইনও থাকে। জানা যায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে পদায়নের আগে দুই সপ্তাহের একটি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে এর উভয়টিই সার্ভে ও সেটেলমেন্ট প্রশিক্ষণের প্রতিকল্প নয়। এ প্রশিক্ষণ দুই মাস মেয়াদি। এর মধ্যে ছয় সপ্তাহ যৌথ ক্যাম্পে থেকে কর্মকর্তারা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেন। আর দুই সপ্তাহ সরেজমিনে প্রশিক্ষণ নিতে হয় মাঠে জরিপ কার্যক্রমের। সেখানে তাঁদের কাজ করতে হয় আমিন, কানুনগোদের সঙ্গে। মাঠে জরিপের চেইনও টানতে হয়।
এই প্রশিক্ষণ ব্যতীত কর্মকর্তাদের ভূমি ব্যবস্থাপনায় আস্থার সঙ্গে কাজ করা কঠিনই বটে। আর কার্যত এ প্রশিক্ষণটি উপেক্ষিত। এটা শুষ্ক মৌসুমে হয়ে থাকে, নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে। চার ব্যাচে ৩০০ জনের প্রশিক্ষণ-সুবিধা রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মনোনয়নও দেয়। জানা যায়, উপস্থিতির হার কমবেশি অর্ধেক। এটা হতাশাব্যঞ্জক। ব্যাচ ধরেও প্রশিক্ষণ হয় না এখানে। সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ২২ থেকে ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। বেশ কিছু কর্মকর্তা এ প্রশিক্ষণই নেননি। তবে দু-একটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ব্যতীত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশিক্ষণ থেকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া বা বিলম্বিত করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে বনিয়াদি, আইন ও প্রশাসন এবং সার্ভে ও সেটেলমেন্ট প্রশিক্ষণ ব্যতীত মাঠ প্রশাসনে পদায়ন না দেওয়াই সংগত। আগে মোটামুটি এ নিয়মটিই চলছিল। কিন্তু এখন সরাসরি প্রথমেই মাঠ প্রশাসনে পদায়ন করা হয়। সেখানেও কনিষ্ঠ কর্মকর্তার সংকট চলছে। তাই জেলা প্রশাসকেরা তাঁদের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দেন। আবার তাঁদের চাকরিতে যোগদান প্রায় ৩০ বছর বয়সে। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই সংসারি হয়ে গেছেন বা পদায়নের পরপরই তা হন। এসব কর্মকর্তা ক্ষেত্রবিশেষে প্রশিক্ষণে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। আবার জেলা প্রশাসকেরাও তাঁদের ছাড়তে উৎসাহবোধ করেন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের কেউ কেউ কোনো উচ্চ পদাধিকারীর পিএস বা এপিএস হয়ে পড়েন। তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেন এসব প্রশিক্ষণের আদেশ। এতে অপূর্ণ থাকে তাঁদের দক্ষতা।
বিশেষ করে সার্ভে ও সেটেলমেন্ট প্রশিক্ষণ ব্যতিরেকে ভূমি ব্যবস্থাপনার কাজ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। আজ এ দেশে বিভিন্ন সমস্যার মূলে ভূমি প্রধান উপাদান বলে মনে করা হয়। এসব সমাধান করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শুধু হাল রেকর্ড নয়—সিএস, আরএস, এসএ এবং বিএস খতিয়ান ও নকশা পর্যালোচনা করারও প্রয়োজন হয়। সার্ভে ও সেটেলমেন্ট প্রশিক্ষণ ছাড়া এসব কাজ করা একপ্রকার অসম্ভব। ভূমি হুকুমদখল উন্নয়নকাজের জন্য এই প্রশিক্ষণ সব সময়ই প্রয়োজন হয়। এতে মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণেও ভূমি আইন–সংক্রান্ত উপযুক্ত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা আবশ্যক। তাই পদায়নের আগেই তাঁদের একের পর এক প্রশিক্ষণগুলো দিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা নেওয়া সংগত হবে। এমনকি চাকরিতে স্থায়ীকরণের শর্ত হিসেবেও আলোচিত তিনটি মৌলিক প্রশিক্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
উল্লেখ্য, ভারতীয় প্রশাসনিক সার্ভিসে (আইএএস) সদস্য গ্রহণ নিয়োগপত্র নিয়ে যোগদান করেন মশৌরীর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী একাডেমিতে। প্রথম চার মাস এখানে সর্বভারতীয় ও কেন্দ্রীয় সার্ভিসের নবনিযুক্ত সব কর্মকর্তাই থাকেন। অনেকটা আমাদের বনিয়াদি প্রশিক্ষণের মতো। চার মাস পর শুধু আইএএসরাই থাকেন আরও পাঁচ মাস, পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য। এই নয় মাস পর তাঁদের পাঠানো হয় নির্ধারিত রাজ্যে। সেখানে তাঁরা রাজ্য সরকারের সচিবালয়, বিভিন্ন সংস্থাসহ জেলা প্রশাসকদের কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকেন। এ পর্বটা এক বছরের। পরবর্তী তিন মাস আবার যেতে হয় মশৌরীতে। এভাবে দুই বছর কাটার পর চাকরি স্থায়ী হয়। পদায়নের জন্য পাঠানো হয় বিভিন্ন রাজ্যে। আমাদের ব্যবস্থাও একসময়ে অনুরূপই ছিল। ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও রয়েছে। প্রয়োজন শুধু দৃঢ়তা। উপযুক্ত মানের কর্মকর্তার জন্য মেধা, সময়োচিত নিয়োগ ও কার্যকর প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। এর জন্য প্রচেষ্টাও নিতে হবে। সে প্রচেষ্টারই একটি অংশ সময়োচিত পেশাগত প্রশিক্ষণ।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

No comments:

Post a Comment