Wednesday, May 4, 2016

অন্তহীন লাশের মিছিল by হায়দার আকবর খান রনো

অভিজিৎ ও দীপনের দুই বাবার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতে। আরও অনেকের মতো অভিজিৎ ও দীপন মৌলবাদী জঙ্গিদের চাপাতির আঘাতে নিহত হয়েছিলেন। বড় নিষ্ঠুর ছিল হত্যাকাণ্ড। কিন্তু তার চেয়েও বেদনাদায়ক মনে হয়েছে নিহত ব্যক্তিদের বাবাদের মানসিক অবস্থা। কবি সোহরাব হাসান দুই বাবার সাক্ষাৎকার পড়ে চোখের জল সংবরণ করতে পারেননি। কবি মানুষ, তাই একটু বেশি অনুভূতিপ্রবণ। কিন্তু আমরাও বেদনাহত না হয়ে পারি না। দুই বাবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। অধ্যাপক অজয় রায় সরাসরি আমার শিক্ষক ছিলেন ফিজিকস ডিপার্টমেন্টে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক একদা ছাত্ররাজনীতিতে আমার সহকর্মী ছিলেন, যদিও তিনি সামান্য জুনিয়র। দুজনেই বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন সরাসরি রাজনৈতিক দল না করলেও, প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। কবি সোহরাব হাসান যথার্থই তাঁদের মহান মানুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে লিখেছেন, ‘আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অভিজিৎ-দীপনেরা বাঁচতে পারেন না। রাষ্ট্র তাঁদের রক্ষা করতে পারে না। বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বহনকারী বাংলাদেশে কেন এমনটি ঘটল?’ এই ‘কেন’র উত্তর বেশ কঠিন। এমন হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যেদিন আমরা বিজয় লাভ করছিলাম, সেদিন ভেবেছিলাম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক পথে না গেলেও অন্তত দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতার চির অবসান ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভাবাদর্শকে খণ্ডন করেই তো এই দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই দেশে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় জঙ্গি মৌলবাদ ফিরে আসবে, তা আমি সেদিন ভাবতেও পারিনি। কিন্তু আমার ভাবনা যে ভুল ছিল, তা তো দেখাই যাচ্ছে। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসনের মধ্যেও সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা গোপনে বাসা বেঁধে আছে। হিন্দুর জমি এখনো দখল হয়। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি সরাসরি সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শকে মদদ দিয়ে চলেছে। নারীবিদ্বেষী হেফাজতকে দিয়ে বিপ্লব করার ও ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেছিল। সরকারি দল অতটা অবশ্যই নয়। বরং আমি শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ দেব এই কারণে যে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে পেরেছেন। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ থাকলে তা সম্ভব হতো কি না, বলা যায় না। তারপরও বলব, মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রশাসনও কিছুটা দায়ী। তারা জঙ্গি দমনে ব্যর্থ হয়েছে। এতগুলো হত্যাকাণ্ড হয়ে গেল, বিচার হয়নি কোনোটারই, তদন্ত হয়েছে অনেক কম। আসামিরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ায় বাইরে। এমনকি সরকারের কারও কারও কথাবার্তায় মৌলবাদী অপশক্তি কিছুটা আশকারা যে পায়, তার অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
গত বছর যখন একের পর এক ব্লগার হত্যা চলছিল—অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়—তখন আগস্ট মাসে পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক হত্যাকারী ধরার দিকে কতটা তৎপর ছিলেন জানি না। কিন্তু জনগণকে নসিহত করেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন লেখা লিখতে নিষেধ করছেন। তার পরপরই গত বছরের আগস্ট মাসেই এক আলোচনা সভায় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান পুলিশপ্রধানের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে ব্লগারদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখালেখি বন্ধ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বার্তা সঠিক। তবে তাঁরা সঠিক সময়ে সঠিক বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন সময় ব্লগার হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।’
আমরা আরও দেখেছি গত বছরের আগস্ট মাসেই আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগ এক বিবৃতিতে ব্লগারদের নাস্তিক ঘোষণা করে শাস্তি দাবি করেছিলেন। আমরা দেখেছি, খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকেও নাস্তিক ঘোষণা করেছিলেন। রাজনীতিতেও দুই বড় প্রতিপক্ষ যদি আস্তিক-নাস্তিক নিয়ে মেতে থাকে এবং মৌলবাদের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করে, তবে এই হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকবেই। এসব কারণেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন অভিজিতের বাবা ও দীপনের বাবা। প্রথম আলোর গত ২৯ এপ্রিলের সংখ্যায় তাঁদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। অভিজিতের বাবা শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক অজয় রায় সরকারকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, ‘খুনি ধরার ইচ্ছে নেই, সক্ষমতাও নেই।’ দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘বিচার–প্রক্রিয়ায় আমার আস্থা নেই। আছে শুধু অনাস্থা।’ এত দিনে তদন্ত কিছুটা অগ্রসর হলে, বিচার–প্রক্রিয়া ঠিকমতো চললে, এমন অনাস্থার কথা তাঁরা নিশ্চয়ই প্রকাশ করতেন না। প্রথম আলোর একই সংখ্যায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘একের পর এক কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ভিন্নমতাবলম্বীদের। তাঁদের স্বজনেরা মনে করেন, বিচারহীনতার কারণে বন্ধ হচ্ছে না গুপ্তহত্যা।’ আমরা যাঁরা চাপাতির আঘাতে নিহত ব্যক্তিদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও নিজেদের তাঁদের স্বজন বলেই বলে মনে করি, তাঁরাও বিশ্বাস করি যে বিচারহীনতাই গুপ্তহত্যার বিস্তার ঘটাতে উৎসাহিত করছে। অভিজিৎ-দীপন অথবা ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়ই নন, চাপাতির আঘাতে অথবা পিস্তলের গুলিতে একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক নিরীহ মানুষ মৌলবাদী গুপ্ত সন্ত্রাসীদের দ্বারা। লাশের মিছিল যেন ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এ যেন অন্তহীন লাশের মিছিল। যাঁরা ব্লগে লেখালেখি করেন না, তাঁরাও নিরাপদ নন। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাঙা রেকর্ডের মতো বলেই চলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো। তাঁদের বিবেচনায়, বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ ইত্যাদি করতে না পারলেই পরিস্থিতি খুব ভালো। হ্যাঁ, এখন আর হরতাল হয় না। প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ বিএনপি এখন বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। বাম ও উদারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তেমন শক্তিশালী নয়। তাতেই যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সন্তুষ্ট থাকেন, তবে বলব, তিনি ভুল করছেন। রাজনৈতিক দলের বাইরেও আছে বিশাল জনগণ। জনগণকে যদি সামান্যতম নিরাপত্তা না দিতে পারেন, তাহলে শুধু কথায় আশ্বস্ত করা যাবে না। ক্ষোভ জমতে থাকবে। ধূমায়িত ক্ষোভ থেকে বিস্ফোরণও ঘটতে পারে।
গুপ্তঘাতকের হাতে খুন হচ্ছেন বিদেশি নাগরিক, সমাজকর্মী, সাধু, মন্দিরে সমবেত হওয়া হিন্দু নাগরিক, শিয়া মুসলমান, মহররমের তাজিয়া মিছিলে যোগদানকারী ধর্মপ্রাণ মুসলমান—কে না? এমনকি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বিদেশি মিডিয়া, মানবাধিকার সংস্থা—সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবু উদ্বেগহীন সরকার ও তাদের মন্ত্রী ও নেতারা। সব দোষ বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব থেকে সরকারের কর্তারা অব্যাহতি পেতে পারেন না। শোনা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যার কারণ নাকি তাঁর সংগীতপ্রিয়তা। তিনি খুবই ধার্মিক ছিলেন। তাঁর কোনো ব্যক্তিগত শত্রুও ছিল না। একটা অপরাধ, তিনি নিজে সুরসাধক ছিলেন এবং নিজ গ্রামে সংগীতের স্কুল করেছিলেন। যে মৌলবাদী গুপ্তঘাতক ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদেরও হত্যা করে, তারা সংগীতচর্চা এমনকি সাংস্কৃতিক চর্চাকেও ইসলামবিরোধী বলে মনে করে এবং তাদের বিবেচনায় একমাত্র প্রতিকার হলো খুন। এরাই উদীচীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা ফাটিয়েছিল। এরাই সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। হত্যার এই যদি কারণ হয় এবং তা যদি অব্যাহত ধারায় চলতে থাকে, তাহলে আমরা কোন অন্ধকার যুগে প্রবেশ করতে চলেছি। খুনের রাজনীতি, গুপ্তঘাতক সন্ত্রাসীর দাপট এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করছে। ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নানের হত্যার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন হামলা-খুনের ঘটনার জন্য দেশটির সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলকে দোষ দিলেও এখন পর্যন্ত যেসব নথিপত্র পাওয়া গেছে, তাতে এই ইঙ্গিতই মেলে যে স্থানীয় পর্যায়ের বা আইএস কিংবা আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী এগুলোর জন্য দায়ী।’ বাংলাদেশ সরকার অবশ্য আইএস বা আল-কায়েদার সংশ্লিষ্টতার কথা বারবার অস্বীকার করে এসেছে। সরকার হয়তো দেখাতে চায় যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নেই। কিন্তু চোখ বন্ধ করে রাখলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকে? অস্বীকার করলেই কি বহির্বিশ্বের কাছে অজানা থাকে? প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন যে জঙ্গিবাদ আছে শুনলে ওরা ‘হামলে পড়বে’। ওরা কারা তা তিনি স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেননি। রাষ্ট্রীয় পদে থেকে কোনো দেশের নাম উচ্চারণ করা অসুবিধাজনক। তবে এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে ওরা মানে পশ্চিমা মহল। জঙ্গিবাদ দমনের নামে মার্কিন প্রশাসনসহ অন্যরা জাতিসংঘের নামে আমাদের দেশে সরাসরি ঢুকে পড়তে পারে। এমন আশঙ্কাকে অবশ্যই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আমরা জানি, আইএস সৃষ্টির পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। ইরাক বা সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট নামক ভয়ংকর সংস্থাটি যাদের খুন করছে, তাদের টার্গেট ধর্মপ্রাণ মুসলমান; ইসরায়েল টার্গেট নয়। ২০১৫ সালের প্রথম দিকে ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অদ্রি কুর্থ ক্রনিন বলেছেন, ‘আইএস এখন ওয়াশিংটন কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাবেক ইরাকি সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আমেরিকান ট্যাংক, কামান ও অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত।’ অতএব জঙ্গি দমনের নামে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র থাকতেও পারে। কিন্তু সরকার যদি জনগণকে নিরাপত্তা দিতে পারে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনকে দক্ষ করে আন্তরিকতার সঙ্গে জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে দমন করতে পারে, তাহলে কোনো ষড়যন্ত্রই কার্যকর হতে পারে না। আমরা তো খুব বেশি কিছু চাইছি না। একটা নিরাপদ জীবন চাই। মুক্তচিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। আমরা সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ধর্মের নামে খুন বন্ধ হোক, এটাই চাই। প্রতিটি খুনের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। এটা কি খুব বেশি চাওয়া হলো? দায়িত্বশীল সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এই ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা।
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

No comments:

Post a Comment