![]() |
| জোসেফ ই স্টিগলিৎস |
আয়বণ্টন
ও অর্থনীতির কার্যক্রমের গতি–প্রকৃতি নিয়ে গত ২০০ বছরে দুই ধরনের
চিন্তাকাঠামো গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে একটি চিন্তার উদ্গাতা ১৯ শতকের উদারনৈতিক
অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ, যিনি প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ওপর জোর
দিয়েছিলেন। অন্য চিন্তাধারাটি এ ব্যাপারে অবগত যে স্মিথের উদারনীতিবাদের
কারণে দ্রুত সম্পদ ও আয়ের পুঞ্জীভবন হয়। সে কারণে এটি শুরুই হয়েছে এভাবে যে
লাগামহীন বাজার থেকে একচেটিয়াবাদের সৃষ্টি হয়। দুটি চিন্তাধারাই বোঝা
দরকার। কারণ, সরকারের নীতি ও বিরাজমান অসমতা–বিষয়ক আমাদের বোঝাপড়া এই উভয়
চিন্তাধারার দ্বারাই প্রভাবিত হয়। দুই ঘরানার মানুষই মনে করে, তাদের
চিন্তাধারায় বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে। ১৯ শতকের উদারনৈতিক ও
পরবর্তীকালে তাদের অনুসারীরা মনে করত, ব্যক্তির প্রাপ্তি তার সামাজিক
অবদানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থনীতিবিদদের পরিভাষায়, এটা হচ্ছে তাদের
‘প্রান্তিক পণ্য’।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার আগে যিনি রাজনৈতিক
অর্থনীতির ড্রামন্ড অধ্যাপক ছিলেন, সেই নাসাউ সিনিয়র বলেছিলেন, পুঁজিপতিরা
পুরস্কৃত হয় ভোগ করার জন্য নয়, সঞ্চয় করার জন্য, অর্থাৎ সংযমের জন্য।
মানুষের আয়ের বৈষম্য তাদের ‘সম্পদের’ মালিকানার বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত,
মানবিক ও আর্থিক পুঁজির মালিকানার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে কারণে অসমতা–বিষয়ক
পণ্ডিতেরা সম্পদের বণ্টনের ওপর জোর দেন, এমনকি তা কীভাবে প্রজন্ম থেকে
প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়, তার ওপরও। দ্বিতীয় চিন্তাধারা ‘ক্ষমতা’ থেকেই
শুরু করে, যার মধ্যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ অথবা শ্রমবাজারে শ্রমজীবীদের
ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ব্যাপারটিও রয়েছে। এই শাস্ত্রের পণ্ডিতেরা নজর
দিয়েছেন কী কারণে ক্ষমতা সৃষ্টি হয়, কীভাবে তা বজায় রাখা ও শক্তিশালী করা
যায়। আর অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে বাজার প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে না।
একই রকম তথ্যের কারণে শোষণ বিষয়ে যে গবেষণা হচ্ছে, সেটা এক গুরুত্বপূর্ণ
দৃষ্টান্ত। পশ্চিমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে উদার চিন্তাধারাই
প্রাধান্য বিস্তার করেছে। তা সত্ত্বেও অসমতা ও তা নিয়ে মানুষের মনে উদ্বেগও
ক্রমাগত বাড়তে থাকায় প্রতিযোগিতামূলক ঘরানা অর্থনীতির গতি–প্রকৃতি
ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যারা ব্যক্তিগত প্রাপ্তিকে প্রান্তিক পণ্যের
নিরিখে দেখে থাকে। সে কারণে আজ দ্বিতীয় ঘরানাটিরই বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে।
সর্বোপরি, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের
দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পরও যে হারে তাঁদের বোনাস দেওয়া হচ্ছে, তাতে এ
কথা মেনে নেওয়া কঠিন যে বেতনের সঙ্গে মানুষের সামাজিক অবদানের সম্পর্ক আছে।
ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিতভাবেই দেখা যায়, দাস, নারী ও বিভিন্ন
শ্রেণির সংখ্যালঘুরা যেভাবে শোষিত হয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার, অসমতা হলো
ক্ষমতা সম্পর্কের ফলাফল, এটা মার্জিনাল রিটার্নের ব্যাপার নয়।
আজকের
অর্থনীতিতে টেলিকম, কেব্ল টিভি ও সামাজিক মাধ্যমের ডিজিটাল শাখা, ইন্টারনেট
অনুসন্ধান, স্বাস্থ্যবিমা, ফার্মাসিউটিক্যাল, কৃষি বাণিজ্যসহ আরও অনেক
খাতকে প্রতিযোগিতার চোখে দেখলে বোঝা যায় না। এসব খাতে গোষ্ঠীতান্ত্রিক
(অলিগোপলিস্টিক) প্রতিযোগিতা বিরাজ করে, যেটা ঠিক পাঠ্যবইয়ের ‘বিশুদ্ধ’
প্রতিযোগিতা নয়। কিছু খাতকে ‘মূল্য গ্রহণকারী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেতে
পারে, যেগুলো এত ছোট যে বাজার মূল্যের ওপর তাদের কোনো প্রভাব নেই। কৃষি
হচ্ছে এর সবচেয়ে জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। কিন্তু এখানে সরকারের হস্তক্ষেপের
পরিসর বিশাল, আর তার মূল্যও প্রাথমিকভাবে বাজারের শক্তিগুলো নির্ধারণ করে
না। জেসন ফারম্যানের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার
কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্স (সিইএ) বাজারের ঘনীভবন ও তার কিছু
ব্যঞ্জনার্থের সমীক্ষা করেছে। সিইএর হিসাব অনুসারে, প্রমিত মেট্রিক্স দেখে
বোঝা যায়, বাজারের ঘনীভবনের হার বেড়েছে, কখনো কখনো তা নাটকীয়ও বটে। দেখা
যাচ্ছে, শীর্ষ ১০ ব্যাংকের হাতে সঞ্চিত আমানতের পরিমাণ ৩০ বছরের মধ্যে ২০
শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে, ১৯৮০ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এটি
ঘটেছে। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বাজারের এই ক্ষমতা
বেড়েছে। সম্পর্কযুক্ত অর্থনীতি ও স্থানীয় সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির কথাই
চিন্তা করুন।
আরেকটি কারণ হলো, ফার্মগুলো শিখে গেছে কীভাবে অন্যের প্রবেশ
ঠেকানো যায়। মাইক্রোসফট ও ওষুধ কোম্পানিগুলো এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত, কখনো
কখনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সহায়তা করে, যারা ট্রাস্টবিরোধী আইন
প্রয়োগে শিথিলতার সাফাই গায়, আর বাজারের শক্তি হ্রাস করার ব্যর্থতার যুক্তি
দেয় এই বলে যে বাজার ‘প্রাকৃতিকভাবেই’ প্রতিযোগিতামূলক। রাজনৈতিক ক্ষমতা
কাজে লাগিয়ে বাজারের শক্তির নগ্ন এস্তেমাল করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা
যায়, বড় ব্যাংকগুলো মার্কিন কংগ্রেসে লবিং করেছে, যাতে বাণিজ্যিক
ব্যাংকগুলোকে আর্থিক ব্যবস্থার অন্যান্য খাত থেকে আলাদা রাখার যে আইন আছে,
তা সংশোধন বা বাতিল করা হয়। তথ্য-উপাত্ত থেকেই এর ফলাফল পরিষ্কার বোঝা যায়,
যেখানে অসমতা শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, ফার্মগুলোর মধ্যেও বাড়ছে। সিইএর
প্রতিবেদনে জানা যায়, ‘৯০ শতাংশ ফার্মই মনে করে বিনিয়োগ থেকে লাভের পরিমাণ
গড়পড়তা লাভের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি করতে হবে। অথচ সিকি শতাব্দী আগে এর পরিমাণ
ছিল দুই গুণের কাছাকাছি।’ ২০ শতকের মহান অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুমপেটার
বলেছিলেন, একচেটিয়া ক্ষমতা নিয়ে মানুষের বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
কারণ, এই একচেটিয়াতন্ত্র খুবই সাময়িক হবে। বাজারের জন্যই মারাত্মক
প্রতিযোগিতা হবে, ফলে তা বাজারের মধ্যকার প্রতিযোগিতার স্থান করে নেবে। আর
মূল্য যাতে প্রতিযোগিতামূলক থাকে, এটা তা-ও নিশ্চিত করবে। অনেক আগে আমি যে
তাত্ত্বিক কাজ করেছিলাম, সেখানে শুমপেটারের বিশ্লেষণের ভুল দেখিয়েছিলাম। আর
এখন তো বাস্তব ফলাফল দেখেও তা বোঝা যায়। আজকের বাজারের বৈশিষ্ট্য হলো,
একচেটিয়া মুনাফার উচ্চ হার।
এর নিহিতার্থ বেশ গভীর। বাজার অর্থনীতির অনেক ধারণাই প্রতিযোগিতামূলক মডেলের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, যেখানে মুনাফার পরিমাণ সীমিত, যেটা মানুষের সামাজিক অবদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ নিয়ে দ্বিধা সৃষ্টি হয়। বাজার যদি মৌলিকভাবে দক্ষ ও ন্যায্য হতো, তাহলে একদম তার উন্নয়নে সবচেয়ে ভালো সরকারের পক্ষেও কিছু করা কঠিন। কিন্তু বাজার যদি শোষণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অবাধ প্রতিযোগিতার যুক্তিই উধাও হয়ে যায়। তাই সে ক্ষেত্রে শিকড় গাড়া ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইটা স্রেফ গণতন্ত্রের নয়, এটা দক্ষতা ও যৌথ সমৃদ্ধিরও লড়াই।
এর নিহিতার্থ বেশ গভীর। বাজার অর্থনীতির অনেক ধারণাই প্রতিযোগিতামূলক মডেলের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, যেখানে মুনাফার পরিমাণ সীমিত, যেটা মানুষের সামাজিক অবদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ নিয়ে দ্বিধা সৃষ্টি হয়। বাজার যদি মৌলিকভাবে দক্ষ ও ন্যায্য হতো, তাহলে একদম তার উন্নয়নে সবচেয়ে ভালো সরকারের পক্ষেও কিছু করা কঠিন। কিন্তু বাজার যদি শোষণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অবাধ প্রতিযোগিতার যুক্তিই উধাও হয়ে যায়। তাই সে ক্ষেত্রে শিকড় গাড়া ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইটা স্রেফ গণতন্ত্রের নয়, এটা দক্ষতা ও যৌথ সমৃদ্ধিরও লড়াই।

No comments:
Post a Comment