Sunday, May 15, 2016

প্রিয়াঙ্কাং শরণং গচ্ছামি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রিয়াঙ্কা গান্ধী
লেখার একেবারে শুরুতেই ভদ্রলোকের পরিচয়টা দেওয়া যাক। নাম, প্রশান্ত কিশোর। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসকে দুরমুশ করে জনতা পার্টি যখন ভারতে ক্ষমতায় এল এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন মোরারজি দেশাই, সেই ১৯৭৭ সালে প্রশান্ত কিশোরের জন্ম। তার মানে, ভদ্রলোকের বয়স এখন উনচল্লিশ। সাকিন আপাতত দিল্লি হলেও জন্মসূত্রে বিহারি। জনস্বাস্থ্য নিয়ে আট বছর জাতিসংঘে কাজ করেছেন। তবে সেটা তাঁর পরিচিতির কারণ নয়। এই মুহূর্তে তিনি এ দেশের সবচেয়ে নামী ‘পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট’। তাঁকে নিয়ে মিডিয়ায় এত চর্চার কারণ, তিনিই নাকি নরেন্দ্র মোদি ও নিতীশ কুমারের ললাটে জয়তিলক পরিয়েছেন! সেই প্রশান্ত কিশোর এখন দায়িত্ব নিয়েছেন কংগ্রেসের এবং সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসকে ফিরে আসতে হলে প্রিয়াঙ্কাকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একমাত্র প্রিয়াঙ্কাই হতে পারেন এই রাজ্যে কংগ্রেসের জিয়নকাঠি। জাতিসংঘের চাকরি ছেড়ে বছর কয়েক আগে প্রশান্ত সিটিজেনস ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্ন্যান্স নামে এক সংস্থা খোলেন। গত লোকসভা ভোটের আগে এই সংস্থা নরেন্দ্র মোদির প্রচারপর্বের পুরো দায়িত্বটা নিয়ে নেয়। মোদির ভাবমূর্তি তৈরি থেকে শুরু করে নির্বাচনী কৌশল ঠিক করা, প্রায় সবটাই ছিল প্রশান্তর দায়িত্ব। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেই তিনি দায়িত্ব নেন বিহারে নিতীশ কুমারের মহাজোটের। সেখানেও প্রশান্ত পান অভাবিত সাফল্য। তারপর থেকেই তাঁর ওপর পড়তে শুরু করে প্রচারের আলো। আলোড়ন পড়ে যায় মিডিয়ায়। তাঁকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয় রাজনৈতিক মহলে। প্রশান্ত বেছে নেন কংগ্রেসকে। ২০১৯ পর্যন্ত তিনি নাড়া বেঁধেছেন কংগ্রেসের সঙ্গে। আপাতত উত্তর প্রদেশ তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের স্বর্ণযুগ তিনি আগামী বছর ফিরিয়ে আনতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখন জোর শোরগোল। আসছে বছর এই ‘মিনি ইন্ডিয়া’র বিধানসভা ভোট। কয়েক দশক ধরেই সেখানে ‘প্লেয়ার’ বলতে মোটামুটি তিনটা দল। সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি ও বিজেপি। চতুর্থ পার্টি হিসেবে কংগ্রেসকে খাতা-কলমে ধরা হলেও এই শতাব্দী-প্রাচীন দলটা অনেকটা ওই তিমি মাছের মতো ডুবন্ত থেকে ভাসন্ত হয়ে ভুস করে জল ছিটিয়ে ফের গা-ঢাকা দেয়। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের উপস্থিতি আজ বহু বছর ধরেই অমাবস্যার রাতে জোনাকির আলোর মতো ইতিউতি জ্বলে। এই ঘুমন্ত ও পঙ্গু দলটার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে দাঁড় করানোর মতো অসাধ্য সাধন প্রশান্ত কিশোর কী করে করবেন, সেটাই আপাতত জল্পনাকে তুঙ্গে তুলেছে। সেই জল্পনা আরও উসকে দিয়েছে প্রশান্তর প্রথম প্রেসক্রিপশন। প্রিয়াঙ্কাকে দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসতে হবে। উত্তর প্রদেশ নিয়ে প্রশান্তর টিমের এই ‘ব্লু প্রিন্ট’ জানাজানি হওয়ামাত্র কংগ্রেসিরা চনমনে হয়ে উঠেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে এই দাবিও জোরালো হচ্ছে। প্রশান্ত রাজ্যের ৬৬০টি জেলার কংগ্রেস কর্তাদের বৈঠক করে এই প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তিনি আগ্রায় সব জেলার কর্তাদের এক সম্মেলনে ডাকেন। কয়েক দিন আগে সেই সম্মেলন হয়ে গেল। আমরা জানলাম, ৬০০ জেলার কর্তারা এক সুরে বলেছেন, প্রিয়াঙ্কা যদি দায়িত্ব নেন, কংগ্রেস তাহলে রাজ্য তোলপাড় করে দেবে। গান্ধী পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এ এক অভিনব পন্থা। এত দিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে যে দাবি উঠত, এই প্রথম তা সংঘবদ্ধভাবে উঠল। এবং উঠলও এমন একজনের মাধ্যমে, কংগ্রেসের ‘ফার্স্ট ফ্যামিলি’, যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, পরিবার কি মেনে নেবে এই দাবি? প্রিয়াঙ্কা কংগ্রেসের রাজনীতিতে নেই যে তা নয়, আবার আছেনও যে তা-ও বলা যাবে না। গান্ধী পরিবারের খাসতালুক বলে পরিচিত উত্তর প্রদেশের গায়ে গা-লাগা তিন জেলা আমেথি, রায়বেরিলি ও সুলতানপুর ফি-বার ভোটের সময় তাঁর কাছে লক্ষ্মণের গণ্ডি। এই খাসতালুকের বাইরে তিনি আজ পর্যন্ত পা দেননি। ভোটের পরেও কখনো কখনো ভাইবোন নির্বাচন কেন্দ্রে যান। কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করেন। দু-একটা দিন কাটান। তারপর ফিরে আসেন। জেলা কর্তারা বলেছেন, এভাবে গণ্ডির মধ্যে প্রিয়াঙ্কার আটকে থাকা চলবে না। সব বাধা কাটিয়ে তাঁকে এগিয়ে আসতে হবে। একমাত্র তাহলেই উত্তর প্রদেশে পটাপট জ্বলে উঠবে কংগ্রেসের বাতি।
প্রশ্ন হলো, গান্ধী পরিবার প্রিয়াঙ্কাকে সেই লাইসেন্স দেবে কি?
প্রিয়াঙ্কাকে সক্রিয়ভাবে কংগ্রেসের রাজনীতিতে নিয়ে আসার দাবি অনেক দিনের। প্রিয়াঙ্কা নিজে কখনো বলেননি তিনি গুরুদায়িত্ব নিতে আগ্রহী। আবার সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করবেন না, তা-ও বলেননি কখনো। তাঁর মা ও ভাইয়ের কথা, সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি প্রিয়াঙ্কারই। প্রকাশ্যে এ কথা বললেও জনপ্রিয় ধারণা, সোনিয়া বা রাহুল কেউই চান না প্রিয়াঙ্কা এখনই দলের কোনো না কোনো দায়িত্ব নিয়ে সংসারের বন্ধনকে পেছনে ফেলে ষোলোআনা রাজনীতিক হয়ে উঠুন। কেন চান না, তার ব্যাখ্যাও আছে। সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা, প্রিয়াঙ্কাকে সামনে নিয়ে আসার অর্থ রাহুলের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া। সোনিয়া ও রাহুল দুজনের কাছেই সেটা হবে নৈতিক হার মানার শামিল। প্রশান্ত কিশোর গান্ধী পরিবারের এই বাধ্যবাধকতা বিলক্ষণ জানেন। তবু তিনি সেই প্রিয়াঙ্কা কার্ডটাই খেললেন! এবং কোন সময় খেললেন? যখন নিতীশ কুমার ‘সংঘ মুক্ত ভারতের’ ডাক দিয়ে বিহারের মহাজোট ফর্মুলাকে উত্তর প্রদেশে নিয়ে আসতে চাইছেন। নিতীশের তত্ত্ব অনুযায়ী তাঁর দল, লালু প্রসাদের দল, জাট নেতা অজিত সিংয়ের দল এবং মুলায়ম সিং যাদবের দল সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস যদি একজোট হয়ে নামে, তাহলে উত্তর প্রদেশে বিজেপি ভোঁ-কাট্টা হয়ে যাবে। এই মহাজোট আদৌ হবে কি না, কিংবা হলেও তা কতটা পোক্ত হবে, সেই সন্দেহ থাকছেই। কারণ, উত্তর প্রদেশ আর যাই হোক, নিতীশ-লালুদের বাড়ির উঠোন নয়। তা ছাড়া ‘মিনি ইন্ডিয়া’র রাজনীতিতে মায়াবতীর যে আসনটা পাতা আছে, তাকে উপেক্ষা করা কারও পক্ষে সম্ভবও নয়। তবু নিতীশ উদ্যোগী। কেননা, বিহার বিজয়ের পর তাঁর চোখে এখন প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন লেপ্টে গেছে। কংগ্রেসের কাঁধে বন্দুক রেখে নিতীশ সর্বভারতীয় স্তরের কিস্তিটা মাত করতে চাইছেন। প্রশান্ত এসব বিবেচনা করেই দলের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে প্রিয়াঙ্কা কার্ডটা খেলেছেন। তিনি এটুকু বোঝেন, দেশে বিজেপির একমাত্র বিকল্প কংগ্রেস। আর সেই কংগ্রেস কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না উত্তর প্রদেশের জমি যদি ঝুরঝুরে থাকে। প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে সোনিয়া-রাহুলের আপত্তির কারণটা জানা বলেই প্রিয়াঙ্কার গণ্ডি প্রশান্ত স্রেফ উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান। তাঁর বিশ্বাস, বর্ণ হিন্দুদের যাঁরা কংগ্রেসকে ছেড়ে বিজেপিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, প্রিয়াঙ্কার চার্ম তাঁদের ফিরিয়ে আনবে। সঙ্গে আনবে দলিত ও অনগ্রসরদের সমর্থন। সবার ওপর রয়েছে বিপুল নারী শক্তি। প্রশান্ত জানেন, উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের এমন কোনো ‘মুখ’ নেই, যাকে ঘিরে রাজ্য দখলের আশা করা যায়। রাহুল সেই ‘মুখ’ হতে পারেন না। কেননা, তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। তা ছাড়া রাহুলকে ওই পদে মনে নেওয়ার অর্থ হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্য কাউকে খাঁড়া করা। কংগ্রেসের প্রথম পরিবারের পক্ষে সেটা হবে হারাকিরিরই শামিল। অতএব, বিকল্প একটাই। প্রিয়াঙ্কা। রাজনীতিতে আনকোরা মুখের আকর্ষণ সব সময় প্রবল। সেই মুখ যদি গান্ধী পরিবারের এমন কেউ হয়, যাঁর মধ্যে মানুষ ইন্দিরা গান্ধীর আদল খুঁজে পান, তাহলে সোনায় সোহাগা। প্রশান্ত জানেন, তাঁর ‘প্রেসক্রিপশন’ মানলে কংগ্রেসের পোয়াবারো, না মানলে দায় সোনিয়া-রাহুলের। দোষের ভাগী তিনি হবেন না। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক কংগ্রেস নেতা, কেন্দ্র ও রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত অজিত পাঁজার একটা কথা মনে পড়ছে। কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় তিনি বলেছিলেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিত্বের প্রধান আকর্ষণ ছিল তাঁর হাসি। ইন্দিরার হাসি রাজীব পেয়েছিলেন। সোনিয়া বা রাহুল সেই হাসি পাননি। পেয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ ওই প্রিয়াঙ্কাই।’ প্রিয়াঙ্কা, তাঁর হাসি ও ব্যক্তিত্বকে মূলধন করে প্রশান্ত কিশোর ২০১৭ সালের তৃতীয় চ্যালেঞ্জটা উতরাতে চাইছেন। সফল হলে পরের টার্গেট ২০১৯-এর লোকসভা ভোট।

No comments:

Post a Comment