রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধসের সঙ্গে সঙ্গে
আমাদের দেশের প্রশাসনেও ধস নেমেছে, তা না হলে পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী
কর্মকর্তাকে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের হাতে লাঞ্ছিত হতে দেখতাম না। আমরা
জানতাম যে সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলা বা অপমান করার মানে হলো
সরকারকে এবং সরকারব্যবস্থাকে অবমাননা করা। তবে ওই নির্বাহী কর্মকর্তা
তাৎক্ষণিকভাবে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন, তা জানা যায়নি। শুধু একটি
তদন্তের কথা কয়েক দিন শোনা গেলেও আরও বিভিন্ন ঘটনার চাপে ধামাচাপা পড়েছে
ওই প্রসঙ্গ। নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী ভয়ভীতির কারণে নিজের রক্ষায়
ক্ষমতাটুকুও প্রয়োগ করতে পারেননি। কিছুসংখ্যক রাজনীতিবিদ পরিচয় প্রদানকারী
নেতার অসদাচরণের কারণে খোদ রাজনীতিবিদেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি
জনমনে রাজনীতিবিদদের ভাবমূর্তির অবনতি ঘটেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও
গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। প্রশাসনে অতি রাজনৈতিকীকরণ এবং প্রশাসনের একধরনের
অসহায়তা ক্রমেই বাংলাদেশের প্রশাসনব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা
এসব ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণেই প্রতীয়মান। দলীয়করণের প্রভাবে এখন মেধাভিত্তিক
নয়, পরিচয়ভিত্তিক পদায়ন ও পদোন্নতি, এমনকি নতুন নিয়োগও প্রভাবিত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের প্রশাসন তো স্বাধীনভাবে কোনো কাজই করতে পারছে না। কারণ,
সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক স্থানে স্থানীয় নেতা অথবা সাংসদদের
পূর্বানুমতি বা তাঁদের সম্মতি ছাড়া প্রশাসন আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাও প্রয়োগ
করতে পারছে না। এর উদাহরণ হালে নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া ঘটনা। এ ঘটনা অত্যন্ত
দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। নারায়ণগঞ্জের সাংসদ সেলিম ওসমান স্থানীয় সাত্তার লতিফ
হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের সঙ্গে যে আচরণ করেছেন,
তাতে বিস্মিত হইনি। তবে বিস্মিত হয়েছি প্রশাসনের অসহায়ত্বের খবরে। বিস্মিত
হয়েছি বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অসহায়ত্বের বিবরণ বিবিসি বাংলার
অনুষ্ঠান ‘প্রবাহ’তে শুনে। ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে ওই স্কুল
প্রাঙ্গণে ঘটনার জের ধরে বিপুল পুলিশ এবং বন্দর থানার ওসির উপস্থিতিতে অনেক
মানুষের উত্তেজিত হয়ে ওঠায় তিনি ঘাবড়ে গিয়েছিলেন।
তিনি একজন নির্বাহী
ম্যাজিস্ট্রেট, যাঁর তাৎক্ষণিক ১৪৪ ধারা জারি করার, গ্রেপ্তার করার এবং
তাৎক্ষণিক বিচারের ক্ষমতাও রয়েছে। ওই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেন তাঁর
রাষ্ট্র প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেননি, কেন পুলিশের ওসি তাঁর ক্ষমতা
প্রয়োগ করতে পারেননি, তার সংক্ষিপ্ত কারণ, আমাদের দেশের রাজনৈতিক
সংস্কৃতি এমনই হয়ে উঠেছে যে একজন সাংসদ মোটামুটি মোগল সুবেদারের সমকক্ষ।
শুধু তা-ই নয়, সেখানে জমায়েত হওয়া লোকজন ছিল সরকারি দলের। তারপর সাংসদ
স্কুলের প্রধান শিক্ষককে তাঁর অনুসারীদের সামনে ক্ষমতার দাপট দেখালেন।
ইতিমধ্যে উচ্চ আদালত নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে জবাব চেয়েছেন। আমাদের
রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমনই হয়েছে, মনে হয় যে আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
সময়েই রয়েছি। ওই সময়ে ইংরেজ বাহাদুর এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা নিজেদের
কর্তৃত্ব আর প্রভাব বিস্তার ও বজায় রাখার জন্য নিজেদের দারুণভাবে
মহিমান্বিত করার প্রয়াসে আর নেটিভদের তাক লাগিয়ে ক্ষমতা জাহির করার যেসব
প্রয়াস নিতেন, এখনো তেমন হাবভাব লক্ষণীয়। ইংরেজ শাসনকে মহিমান্বিত করতে
তৈরি করেছিল লাট সাহেবের বাসভবন আর ছোটখাটো ইংরেজ সাহেবেরা কোথাও গেলে
নেটিভরা যেভাবে স্বাগত জানাত, তার অধুনা সংস্করণ আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনেও
দেখা যায়। আমাদের বড়, মাঝারি, এমনকি পাতিনেতাদের গলায় মালা পরানোর
সংস্কৃতি, বিশাল বিশাল তোরণ আর নেতার আগমনে স্কুলের কার্যক্রম বাদ দিয়ে
প্রধান শিক্ষক থেকে স্থানীয় আমলাদের রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্বাগত
জানানোর দৃশ্য দেখে ইংরেজ শাসনের কথাই মনে পড়ে। আমাদের এই সংবর্ধনা আর
মালা গলায় পরানোর সংস্কৃতি এমনই হয়েছে যে স্থান-কাল-পাত্র, এমনকি উপলক্ষ
সবকিছুই গৌণ হয়ে গেছে। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। আমি আমার পৈতৃক বাড়িতে
যাওয়ার পথে ধারেকাছে এক উপজেলার বাজারের রাস্তায় ব্যারিকেডের সামনে
দাঁড়াতে হলো। রাস্তার অধিকাংশ এবং বাজারের বিশাল এলাকাজুড়ে প্যান্ডেল
তৈরি হচ্ছিল। তৈরি করা হচ্ছিল অসংখ্য তোরণ। সরকারি দলের এক স্থানীয় নেতাকে
অভ্যর্থনার প্রস্তুতি চলছিল। ওই নেতার ওই দিন বিকেলে সেখানে পৌঁছানোর
কথা ছিল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে ওই নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর
সফরসঙ্গী হয়ে কোনো বিদেশ সফর থেকে দেশে ফিরেছেন এবং আজকে তিনি সংবর্ধনা
নিতে তাঁর এলাকায় আসবেন, তাই এত আয়োজন।
পরে শুনেছি যে এত আয়োজনের জন্য ওই
প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারে ব্যাপক চাঁদাবাজি হয়েছে। জানি না প্রশাসন কী
করছিল। অগত্যা গাড়ি নিয়ে সামনে যেতে না পেরে হেঁটেই সামনের ফেরি পর্যন্ত
গিয়েছিলাম। এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। মাত্র কয়েক দিন আগে বরিশালের সাংসদের
সড়কপথে আগমনকে আনুষ্ঠানিকতা দিতে গিয়ে শ-খানেক মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায়
নিজেদের মধ্যে মারামারির ও আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় নেতা, তিনি
সাংসদ হলে তো কথাই নেই, নিজের বাড়িতে অথবা নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিত
হওয়ার আগেই মহাসড়ক হোক আর যেকোনো ব্যস্ত রাস্তাঘাটই হোক, সড়কজুড়ে কয়েক
শ মোটরসাইকেলসহ সমর্থকেরা নেতার গাড়ির আগে-পিছে মিছিল আকারে ‘এসকর্ট’
করে নিয়ে যান, যেমনটা আমরা রাষ্ট্রীয় অতিথি বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেখি।
ওই নেতা গাড়ি থেকে স্মিতহাস্যে জনতার উদ্দেশে হাত নাড়ান। এমন দৃশ্য মনে
করিয়ে দেয় ভারতে ইংরেজ শাসনের কথা। নেতাদের ফুলের মালা গলায় পরার এত শখ যে
তাঁরা স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করতেও সময় পান না। দেশে তো বটেই, বিদেশেও
নিজেকে কত বড় নেতা জাহির করতে সব প্রয়াসই নেন। গলায় মালা আর বাদ যায় কেন?
আর বিদেশি কেউ সঙ্গে থাকলে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি ওঠানোর হিড়িক পড়ে। গলায়
মালা আর বিদেশের মাটিতে নিজেকে জাহির করার খায়েশ যে কত বিপদ ডেকে আনতে
পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ বিএনপির হঠাৎ বড় নেতা হয়ে ওঠা আসলাম চৌধুরী।
অভ্যাসবশত বড় নেতা হওয়ার পর বিদেশে এক বিদেশির সঙ্গে স্বভাবসিদ্ধভাবে
মাল্য-ভূষিত হয়ে বিরাট নেতৃত্বের ওজনে গদগদ হয়ে যে ছবিগুলো তুললেন,
সেগুলোই এখন তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তিনিই নন, এখন তাঁর দলকেও
এই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। এমনটি তখনই হয়, যখন রাজনৈতিক দলেও
রাজনৈতিক মেধা নয়, বরং পরিচয়তন্ত্র ও চাটুকারিতাই প্রাধান্য পায়। যার
খেসারত এখন ওই বিরোধী দলকে দিতে হচ্ছে। শুরু করেছিলাম আমাদের দেশে
সম্মানিত ব্যক্তিদের অসম্মান করার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তার
পেছনে বহুবিধ কারণ থাকলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক অবক্ষয়কে দায়ী
বলে মনে করি। রাজনীতিতে আগে বড় মাপের মানুষ ছিলেন। আজ অর্থই বড় নেতার
পরিচয়।
তাঁর প্রকৃত শিক্ষা আর তিনি সমাজে শ্রদ্ধার আসনে আসীন কি না, তা বড়
কথা নয়। আমাদের সমসাময়িক যাঁরা, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে শিক্ষকের সম্মান
করার বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে কত গুরুত্ব দেওয়া হতো। নিচের ক্লাসের
পাঠ্যপুস্তকে সম্রাট আলমগীরের পুত্রের কাহিনি পড়েছিলাম। ওই গল্পটি এমন ছিল
যে একদিন সকালে হিন্দুস্তানের মহাপরাক্রমশালী সম্রাট দেখলেন যে শাহজাদা
তাঁর শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছেন আর ওস্তাদ নিজের হাতে পা পরিষ্কার করছেন।
হঠাৎ সম্রাটকে দেখে সবাই থতমত খেলেন। সম্রাট আলমগীর ওস্তাদকে ডেকে পাঠালেন।
কম্পমান শিক্ষক বা ওস্তাদ হাতজোড় করে কম্পমান অবস্থায় শাহজাদাকে দিয়ে
এমন কাজ করানোর জন্য অনুক্ষমা চাইবেন। ওই শিক্ষকের কিছু বলার আগেই সম্রাট
বললেন, ‘আপনি শাহজাদাকে সঠিক শিক্ষা দিচ্ছেন না। সঠিক শিক্ষা এবং শিক্ষকের
সম্মান করা শেখালে শাহজাদা শুধু পায়ে পানি ঢালা নয়, নিজের হাতে আপনার পা
ধুয়ে দিত।’ ওই শিক্ষক হতবাক হয়ে দরবার ত্যাগ করলেন। মায়ের ভক্তির
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গল্প, আব্রাহাম লিংকনের চেরিগাছ কাটা এবং সত্যের
সামনাসামনি হওয়ার গল্পগুলো এখনো পড়ানো হয় কি? আমাদের দেশের
শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ছোট ছোট শিশু গাধার মতো পিঠে
ব্যাগবোঝাই বই বহন করছে আর পরে জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি, ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ
পাস। আমরা মানুষ গড়ছি, না কিছু তোতাপাখি তৈরি করছি। এখন শিক্ষকেরা উচ্চ
স্বরে ছাত্রদের শাসন করতে পারেন না, এমনকি স্কুলগুলোতেও নয়। মনে করুন আজ
থেকে ৪০-৫০ বছর আগের কথা, বাবা-মায়ের অধিকারই শিক্ষকদের সমাজ দিয়েছিল। আর
আমাদেরই পরের প্রজন্ম বা তার পরের প্রজন্মদের সময়ে দেখছি ছাত্র কর্তৃক
শিক্ষক লাঞ্ছিত, রাজনীতির কারণে ভাইস চ্যান্সেলর বা প্রিন্সিপাল বা প্রধান
শিক্ষকের রুমে তালা। এঁদের মধ্য থেকেই তো বেশির ভাগ নেতা এবং সাংসদ জন্ম
নেন। কাজেই তাঁদের কাছ থেকে কতটুকু শৃঙ্খলা, সৌজন্যবোধ এবং অপরকে সম্মান
করার রীতি আশা করা যায়?
নারায়ণগঞ্জে যে ঘটনা ঘটেছে তা বিচ্ছিন্ন নয়। অহরহ এমন ঘটনা ঘটেই চলছে। এ ধরনের ঘটনা যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার এবং চিন্তার অবতারণা করে, তার মধ্যে প্রধানত আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনের অসহায়ত্ব এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি দ্বারা দেশ ও সমাজ পরিচালিত, সেখানে গলদ হলে সবখানেই এমন অবস্থা হবে। শেষ করার আগে মাও সেতুংয়ের কথা মনে পড়ল। মাছের পচন ধরে মাথা থেকে। রাজনীতি আর রাজনীতিবিদেরাই সমাজের মাথা। পরিশেষে নিগৃহীত শিক্ষকের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমিই আমার পরবর্তী প্রজন্মকে সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে পারিনি। সে কারণেই আপনার এমন অপমান।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com
নারায়ণগঞ্জে যে ঘটনা ঘটেছে তা বিচ্ছিন্ন নয়। অহরহ এমন ঘটনা ঘটেই চলছে। এ ধরনের ঘটনা যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার এবং চিন্তার অবতারণা করে, তার মধ্যে প্রধানত আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনের অসহায়ত্ব এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি দ্বারা দেশ ও সমাজ পরিচালিত, সেখানে গলদ হলে সবখানেই এমন অবস্থা হবে। শেষ করার আগে মাও সেতুংয়ের কথা মনে পড়ল। মাছের পচন ধরে মাথা থেকে। রাজনীতি আর রাজনীতিবিদেরাই সমাজের মাথা। পরিশেষে নিগৃহীত শিক্ষকের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমিই আমার পরবর্তী প্রজন্মকে সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে পারিনি। সে কারণেই আপনার এমন অপমান।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

No comments:
Post a Comment