![]() |
| সুপ্রিম কোর্ট |
আদালতে
বিচারাধীন কোনো বিষয়ের গুণগত দিক নিয়ে আদালতের বাইরে আলোচনা না করার নীতি
গণতান্ত্রিক সমাজের সর্বজনীন রীতি। সংবাদপত্র বা বৃহত্তর অর্থে গণমাধ্যম এই
রীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই বিচারাধীন বিষয়, তা যত রাজনৈতিক
গুরুত্বসম্পন্নই হোক না কেন, তা নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলে। কিন্তু একজন সাবেক
প্রধান বিচারপতি এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যান মন্ত্রিসভায় সদ্য অনুমোদিত
‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বিচারক (তদন্ত) আইন’-এর খসড়ার সমর্থনে যে
নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলন করলেন, তার পটভূমিতে বিতর্কটি উপেক্ষণীয় নয়। আদতে
তাঁর এই স্বতঃপ্রণোদিত (নাকি নির্দেশিত?) মন্ত্রিসভা তথা সরকারের
মুখপাত্রের ভূমিকা আদালত অঙ্গনেই শুধু নয়, অন্যদের মধ্যেও নানা প্রশ্নের
জন্ম দিয়েছে। ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাঠামোটি বিলোপ করে বিচারপতিদের অসদাচরণ বা
অসামর্থ্যজনিত অভিযোগের তদন্ত ও অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়া
হয়। ওই সংশোধনীটি সংবিধানসম্মত কি না, তা নিয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলা
আদালতে শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষাধীন থাকাকালে মন্ত্রিসভা বাংলাদেশ
সুপ্রিম কোর্ট বিচারক (তদন্ত) আইনের খসড়া অনুমোদন করলে জনমনে স্বভাবতই
প্রশ্ন জাগে যে সরকার কি কিছুটা তাড়াহুড়ো করছে? সংবিধানপ্রণেতাদের অন্যতম
ড. কামাল হোসেন স্পষ্টতই বলেছেন যে সরকারের উচিত ছিল রায় হওয়া পর্যন্ত
অপেক্ষা করা (ইত্তেফাক, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬)। অথচ পরদিন আইন কমিশনের
চেয়ারম্যান খায়রুল হক সংবাদ সম্মেলন করে এক ধাপ এগিয়ে বললেন যে বিচারপতির
অসদাচরণ বা অপসারণ প্রশ্নে সাংসদেরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এ
ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ ধারা অনুযায়ী দলীয় নির্দেশনা মানার বাধ্যবাধকতা
থাকবে না। ( ইত্তেফাক, ২৭ এপ্রিল, ২০১৬)। তাঁর এই ব্যাখ্যা বাস্তবতাবর্জিত।
সরকার ও আইন কমিশনের এই অস্বাভাবিক ও ত্বরিত সহযোগিতার পটভূমিতে ষোড়শ
সংশোধনীর বৈধতার বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, মন্ত্রিসভায়
গৃহীত আইনটি নিয়ে আলোচনায় কোনো বাধা নেই বলেই ধরে নেওয়া যায়। মন্ত্রিসভায়
অনুমোদিত আইনের খসড়াটি সম্পর্কে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব
মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের যা বলেছেন, তা স্মরণ করা যাক। তিনি বলেছেন,
সংবিধানের দায়বদ্ধতা থেকে এ আইন করা হচ্ছে। মূলত বিচারপতিদের অসদাচরণ ও
অসামর্থ্যের বিষয়টি আইনে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সংসদে আইনটি পাস হলে তিন
সদস্যের একটি কমিটি বিচারকের অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। খসড়া বিলে
একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতির
নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিটির অন্য দুজন সদস্য
হলেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এবং একজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং এঁরা মনোনীত
হবেন সরকার দ্বারা। তদন্তে কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য প্রমাণিত
হলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। এরপর সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের
ভোটে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, সেটি যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করলে খসড়া আইনে দুই বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। বিচারপতিদের যেন অসম্মান না হয়, সেই সুরক্ষা আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিলটি সম্পর্কে মতামত দেওয়ার জন্য খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক টেলিভিশনে বলেছেন যে এ বিষয়ে একটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ থাকায় প্রধান বিচারপতি এখন মতামত দেননি। তিনি আরও বলেছেন যে মতামত দেওয়ার সুযোগ এখনো আছে। তাঁর মতে, এই খসড়া তৈরিতে বিভিন্ন দেশের, বিশেষত কমনওয়েলথভুক্ত দেশে প্রচলিত আইন অনুসরণ করা হয়েছে।
কমনওয়েলথের অন্যান্য দেশের আইন অনুসরণের কথা ভাবার জন্য সরকার এবং আইনমন্ত্রী ধন্যবাদ পেতেই পারেন। বিচারপতির শপথ নিয়ে কেউ অসদাচরণ করবেন বা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো কাজ করবেন অথচ তার কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকবে না, সেটা একটি আদর্শ ব্যবস্থা হতে পারে না। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু কমনওয়েলথ দেশগুলোতে আসলে কী ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে?
আইনমন্ত্রীর কনভেনশন ও আইনের শাসন (প্রথম আলো, ৫ আগস্ট, ২০১৫) শীর্ষক এক নিবন্ধে আমি গত বছরের ৭ জুলাই প্রকাশিত কমনওয়েলথ সচিবালয়ের একটি গবেষণা ‘দ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেনিওর অ্যান্ড রিমুভাল অব জাজেস আন্ডার কমনওয়েলথ প্রিন্সিপলস: অা কম্পেন্ডিয়াম অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব বেস্ট প্র্যাকটিস’-এ বিভিন্ন দেশে চালু বিধি এবং রীতির মূল্যায়ন আলোচনা করেছিলাম। ওই গবেষণা বলছে, কমনওয়েলথভুক্ত অধিকাংশ দেশেই কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করেন প্রধান বিচারপতি অথবা একটি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন। এই ব্যবস্থাটিকেই ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’ বা সেরা চর্চা হিসেবে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেখানে কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা পালনের সুযোগ রাখার দৃষ্টান্ত নেই। যে দেশে একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে রক্তপাত, অঘোষিত সেনাশাসনের অভিজ্ঞতা আছে, সেই দেশে সাবেকদের (বিচারপতি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল) স্বাধীন, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা কীভাবে আশা করা যায়? একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি যেভাবে সরকারের সাফাই দিতে অতি উৎসাহ দেখান তাতে করে সন্দেহ জাগা কি অন্যায়? সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কয়েক মাস ধরে যেভাবে প্রকাশ্যে প্রধান বিচারপতি এবং আদালতের জন্য মানহানিকর বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আমরা কীভাবে ভুলে যাব?
কমনওয়েলথ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং আদালতের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে ২০০৪ সালে একটি নীতিমালা চূড়ান্ত করে, যা ল্যাটিমার হাউস প্রিন্সিপলস নামে পরিচিত। সেই ল্যাটিমার হাউস প্রিন্সিপলস বলছে, অভিযুক্ত বিচারককে ‘একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে’ শুনানির সুযোগ দিতে হবে। কমনওয়েলথের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে যে একেকটি অভিযোগের সময় একেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন, কিংবা এক ব্যক্তিনির্ভর কোনো ট্রাইব্যুনাল না হওয়াই ভালো। কেননা, তাতে অভিযুক্ত বিচারকের প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি বা বিদ্বেষ দেখানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একটি স্থায়ী কমিশন বা ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা কম। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, বিশেষত জাতিসংঘের গৃহীত নীতিমালাও বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং শুনানি ও অপসারণ-প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। অবশ্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর ৩৮ শতাংশ বিচারকের অসদাচরণ ও অপসারণে সংসদীয় ব্যবস্থা এখনো বহাল রেখেছে। সুতরাং, আইনমন্ত্রী কমনওয়েলথের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অনুসৃত পথে যাচ্ছেন না। বিচারকদের অপসারণে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। এই ব্যবস্থাটির উদ্ভব ঘটে অষ্টাদশ শতকে, ইংল্যান্ডে। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ একজন বিচারককে অপসারণের পক্ষে ভোট দিলে তখন রাজা তাঁকে অপসারণ করতেন। কিন্তু উনিশ শতকের গোড়া থেকে আজ অবধি সে দেশে এ রকম অপসারণের ঘটনা ঘটেনি। কমনওয়েলথের ওই গবেষণাপত্রে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করাকে ‘ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে গুরুতর সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি হতে পারে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, পার্লামেন্টারি কমিটি ল্যাটিমার হাউস নীতিমালা অনুযায়ী অভিযুক্ত বিচারকের ‘একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে শুনানির অধিকার’ নিশ্চিত করতে পারে না। তারপরও যে গুটিকয় দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালু আছে, সেসব দেশেও প্রাথমিক অনুসন্ধান বা তদন্তের কাজটিতে একটি স্বাধীন এবং অসংসদীয় কমিটিকে কাজে লাগানো হয়। ব্রিটেন ও ভারতে পার্লামেন্ট হচ্ছে দুই কক্ষবিশিষ্ট। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে কোন একক দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রেকর্ড নেই এবং এমপিরা অহরহই দলের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে থাকেন। ভারতেও উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিরল। অথচ আমরা যে শুধু পার্লামেন্টারি অভিশংসন-ব্যবস্থার পথে হাঁটছি তা নয়, প্রাথমিক তদন্তের কাজটিও সাংসদদের একটি কমিটির হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। শুধু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একজন বিচারককে অপসারণের বিধান বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থায় কোনোভাবেই অভিযুক্ত বিচারকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গ্যারান্টি হতে পারে না। সংবিধানের ৭০ ধারা বহাল থাকা অবস্থায় কোনো সাংসদ দলীয় প্রধানের ইচ্ছার বাইরে ভোট প্রদানের ক্ষমতা যে রাখেন না, এই সত্য এমন ব্যক্তির পক্ষেই অস্বীকার করা সম্ভব, যিনি হয় মোহাবিষ্ট নয়তো অপ্রকৃতিস্থ।
আমাদের জনপ্রশাসনে একজন আমলার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করেন প্রশাসনে কর্মরত ঊর্ধ্বতন অন্য কোনো কর্মকর্তা। প্রতিরক্ষা বাহিনীতেও তা-ই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সেখানেও তদন্তের ভার অন্য শিক্ষকদের ওপর পড়ে। এগুলোর কোনোটিতেই অবসরপ্রাপ্ত আমলা, জেনারেল বা অধ্যাপককে ডাকা হয় না। এমনকি পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তও পুলিশ করে। যদিও উন্নত গণতন্ত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বটি পালন করে আলাদা একটি স্বাধীন সংস্থা। বাংলাদেশেও সেই দাবি অনেক দিনের। কিন্তু পুলিশকে তুষ্ট রাখতে সরকার তাতে কান দেয়নি। অথচ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে এখন তা তদন্তের দায়িত্ব প্রথমে সাংসদ এবং তারপর অবসরে যাওয়া বিচারপতির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কেমন ন্যায়বিচার?
আমাদের আদালত দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত নন—এমন কথা দীর্ঘদিন ধরেই চালু আছে। বিশেষত বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইন না থাকায় যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার একটা দীর্ঘ ইতিহাস ইতিমধ্যেই নানা ধরনের তিক্ততার জন্ম দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের অন্যতম কারণও যে সেটাই, সে কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না। বেশ কিছুকাল ধরে তাই দাবি উঠছে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগের আইন তৈরির। সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার কথা বলে আসছে। কিন্তু আপাতত মনে হচ্ছে, নিয়োগের আইন না করে সরকার অপসারণের আইনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নিন্দুকেরা বলেন যে সরকার বিচার বিভাগকে দুর্বল করে দিতে চায়। আমরা তা বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু তাহলে তো আগে নিয়োগের আইন করে তবেই অপসারণের কথা ভাবতে হবে। আর অপসারণেও সংসদের ভূমিকা বর্জনই যে শ্রেয়, তা তো কমনওয়েলথ সচিবালয়ের গবেষণা এবং ল্যাটিমার হাউস নীতিমালায় প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। ল্যাটিমার হাউস নীতিমালা অনুসরণের অঙ্গীকার বাংলাদেশও যে করেছিল, সে কথাটি ভুলে যাওয়া সমীচীন হবে না।
কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করলে খসড়া আইনে দুই বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। বিচারপতিদের যেন অসম্মান না হয়, সেই সুরক্ষা আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিলটি সম্পর্কে মতামত দেওয়ার জন্য খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক টেলিভিশনে বলেছেন যে এ বিষয়ে একটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ থাকায় প্রধান বিচারপতি এখন মতামত দেননি। তিনি আরও বলেছেন যে মতামত দেওয়ার সুযোগ এখনো আছে। তাঁর মতে, এই খসড়া তৈরিতে বিভিন্ন দেশের, বিশেষত কমনওয়েলথভুক্ত দেশে প্রচলিত আইন অনুসরণ করা হয়েছে।
কমনওয়েলথের অন্যান্য দেশের আইন অনুসরণের কথা ভাবার জন্য সরকার এবং আইনমন্ত্রী ধন্যবাদ পেতেই পারেন। বিচারপতির শপথ নিয়ে কেউ অসদাচরণ করবেন বা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো কাজ করবেন অথচ তার কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকবে না, সেটা একটি আদর্শ ব্যবস্থা হতে পারে না। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু কমনওয়েলথ দেশগুলোতে আসলে কী ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে?
আইনমন্ত্রীর কনভেনশন ও আইনের শাসন (প্রথম আলো, ৫ আগস্ট, ২০১৫) শীর্ষক এক নিবন্ধে আমি গত বছরের ৭ জুলাই প্রকাশিত কমনওয়েলথ সচিবালয়ের একটি গবেষণা ‘দ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেনিওর অ্যান্ড রিমুভাল অব জাজেস আন্ডার কমনওয়েলথ প্রিন্সিপলস: অা কম্পেন্ডিয়াম অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব বেস্ট প্র্যাকটিস’-এ বিভিন্ন দেশে চালু বিধি এবং রীতির মূল্যায়ন আলোচনা করেছিলাম। ওই গবেষণা বলছে, কমনওয়েলথভুক্ত অধিকাংশ দেশেই কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করেন প্রধান বিচারপতি অথবা একটি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন। এই ব্যবস্থাটিকেই ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’ বা সেরা চর্চা হিসেবে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেখানে কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা পালনের সুযোগ রাখার দৃষ্টান্ত নেই। যে দেশে একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে রক্তপাত, অঘোষিত সেনাশাসনের অভিজ্ঞতা আছে, সেই দেশে সাবেকদের (বিচারপতি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল) স্বাধীন, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা কীভাবে আশা করা যায়? একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি যেভাবে সরকারের সাফাই দিতে অতি উৎসাহ দেখান তাতে করে সন্দেহ জাগা কি অন্যায়? সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কয়েক মাস ধরে যেভাবে প্রকাশ্যে প্রধান বিচারপতি এবং আদালতের জন্য মানহানিকর বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আমরা কীভাবে ভুলে যাব?
কমনওয়েলথ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং আদালতের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে ২০০৪ সালে একটি নীতিমালা চূড়ান্ত করে, যা ল্যাটিমার হাউস প্রিন্সিপলস নামে পরিচিত। সেই ল্যাটিমার হাউস প্রিন্সিপলস বলছে, অভিযুক্ত বিচারককে ‘একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে’ শুনানির সুযোগ দিতে হবে। কমনওয়েলথের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে যে একেকটি অভিযোগের সময় একেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন, কিংবা এক ব্যক্তিনির্ভর কোনো ট্রাইব্যুনাল না হওয়াই ভালো। কেননা, তাতে অভিযুক্ত বিচারকের প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি বা বিদ্বেষ দেখানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একটি স্থায়ী কমিশন বা ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা কম। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, বিশেষত জাতিসংঘের গৃহীত নীতিমালাও বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং শুনানি ও অপসারণ-প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। অবশ্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর ৩৮ শতাংশ বিচারকের অসদাচরণ ও অপসারণে সংসদীয় ব্যবস্থা এখনো বহাল রেখেছে। সুতরাং, আইনমন্ত্রী কমনওয়েলথের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অনুসৃত পথে যাচ্ছেন না। বিচারকদের অপসারণে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। এই ব্যবস্থাটির উদ্ভব ঘটে অষ্টাদশ শতকে, ইংল্যান্ডে। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ একজন বিচারককে অপসারণের পক্ষে ভোট দিলে তখন রাজা তাঁকে অপসারণ করতেন। কিন্তু উনিশ শতকের গোড়া থেকে আজ অবধি সে দেশে এ রকম অপসারণের ঘটনা ঘটেনি। কমনওয়েলথের ওই গবেষণাপত্রে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করাকে ‘ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে গুরুতর সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি হতে পারে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, পার্লামেন্টারি কমিটি ল্যাটিমার হাউস নীতিমালা অনুযায়ী অভিযুক্ত বিচারকের ‘একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে শুনানির অধিকার’ নিশ্চিত করতে পারে না। তারপরও যে গুটিকয় দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালু আছে, সেসব দেশেও প্রাথমিক অনুসন্ধান বা তদন্তের কাজটিতে একটি স্বাধীন এবং অসংসদীয় কমিটিকে কাজে লাগানো হয়। ব্রিটেন ও ভারতে পার্লামেন্ট হচ্ছে দুই কক্ষবিশিষ্ট। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে কোন একক দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রেকর্ড নেই এবং এমপিরা অহরহই দলের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে থাকেন। ভারতেও উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিরল। অথচ আমরা যে শুধু পার্লামেন্টারি অভিশংসন-ব্যবস্থার পথে হাঁটছি তা নয়, প্রাথমিক তদন্তের কাজটিও সাংসদদের একটি কমিটির হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। শুধু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একজন বিচারককে অপসারণের বিধান বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থায় কোনোভাবেই অভিযুক্ত বিচারকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গ্যারান্টি হতে পারে না। সংবিধানের ৭০ ধারা বহাল থাকা অবস্থায় কোনো সাংসদ দলীয় প্রধানের ইচ্ছার বাইরে ভোট প্রদানের ক্ষমতা যে রাখেন না, এই সত্য এমন ব্যক্তির পক্ষেই অস্বীকার করা সম্ভব, যিনি হয় মোহাবিষ্ট নয়তো অপ্রকৃতিস্থ।
আমাদের জনপ্রশাসনে একজন আমলার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করেন প্রশাসনে কর্মরত ঊর্ধ্বতন অন্য কোনো কর্মকর্তা। প্রতিরক্ষা বাহিনীতেও তা-ই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সেখানেও তদন্তের ভার অন্য শিক্ষকদের ওপর পড়ে। এগুলোর কোনোটিতেই অবসরপ্রাপ্ত আমলা, জেনারেল বা অধ্যাপককে ডাকা হয় না। এমনকি পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তও পুলিশ করে। যদিও উন্নত গণতন্ত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বটি পালন করে আলাদা একটি স্বাধীন সংস্থা। বাংলাদেশেও সেই দাবি অনেক দিনের। কিন্তু পুলিশকে তুষ্ট রাখতে সরকার তাতে কান দেয়নি। অথচ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে এখন তা তদন্তের দায়িত্ব প্রথমে সাংসদ এবং তারপর অবসরে যাওয়া বিচারপতির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কেমন ন্যায়বিচার?
আমাদের আদালত দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত নন—এমন কথা দীর্ঘদিন ধরেই চালু আছে। বিশেষত বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইন না থাকায় যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার একটা দীর্ঘ ইতিহাস ইতিমধ্যেই নানা ধরনের তিক্ততার জন্ম দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের অন্যতম কারণও যে সেটাই, সে কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না। বেশ কিছুকাল ধরে তাই দাবি উঠছে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগের আইন তৈরির। সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার কথা বলে আসছে। কিন্তু আপাতত মনে হচ্ছে, নিয়োগের আইন না করে সরকার অপসারণের আইনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নিন্দুকেরা বলেন যে সরকার বিচার বিভাগকে দুর্বল করে দিতে চায়। আমরা তা বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু তাহলে তো আগে নিয়োগের আইন করে তবেই অপসারণের কথা ভাবতে হবে। আর অপসারণেও সংসদের ভূমিকা বর্জনই যে শ্রেয়, তা তো কমনওয়েলথ সচিবালয়ের গবেষণা এবং ল্যাটিমার হাউস নীতিমালায় প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। ল্যাটিমার হাউস নীতিমালা অনুসরণের অঙ্গীকার বাংলাদেশও যে করেছিল, সে কথাটি ভুলে যাওয়া সমীচীন হবে না।
কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।

No comments:
Post a Comment