Tuesday, May 10, 2016

জনগণের ক্ষমতায়নই গণতন্ত্র by সৈয়দ আবুল মকসুদ

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে উঠেছে কয়েকটি দলিলকে ভিত্তি করে। যেমন, ১৯৫৩-এর ডিসেম্বরে রচিত যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, ছেষট্টির বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, উনসত্তরের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা এবং একাত্তরের ১০ এপ্রিলের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’। যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের এই দলিলগুলো ভালোমতো পঠিত থাকা অবশ্যকর্তব্য। শুধু এগুলো নয়, ১৯৯১-তে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর আরও দু-একটি দলিলকে ভুলে গেলে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। তা হলো ১৯৮৩-এর মধ্য ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রণীত ১০ দফা ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের পাঁচ দফা দাবিনামা। এসব দলিলে দেশবাসীর গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল। একুশ দফা থেকে ১১ দফার মর্মকথা ছিল রাষ্ট্রে সরকারি দলের লোকদের ক্ষমতায়ন নয়, জনগণের ক্ষমতায়ন চাই। জনগণের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার খর্ব করা চলবে না। ওই সব দলিলে বর্ণিত দফাগুলোর চেতনার আলোকেই সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। গণতন্ত্রের মূলনীতি ধ্বংস করে দিলে জনগণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে এবং পরিণামে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, ক্ষতি হয় নাগরিকদের। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ধর্মভীরু। নিজ নিজ ধর্মের প্রশ্নে সংবেদনশীল। কখনো কখনো মৃদু ঠোকাঠুকি থাকলেও মোটের ওপর সম্প্রীতির সঙ্গেই বসবাস করছে হাজার বছর ধরে। ফলে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সহিষ্ণু সমাজ গড়ে উঠেছে। যার যার ধর্মকর্মে সব সময়ই দেশের মানুষ স্বাধীন ছিল। আপত্তি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারে। বিশেষ করে ধর্মীয় রাজনীতি যখন বিভেদ ও ঘৃণার জন্ম দেয়, তখন তা প্রাণঘাতী রোগজীবাণুর কাজ করে। ওই জিনিসটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পছন্দ করে না। অথচ ওই বস্তুই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে প্রতিক্রিয়াশীল কোনো কোনো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। চার দশক ধরে তারা শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। বহির্বিশ্ব থেকেও পেয়েছে আনুকূল্য। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার গত সরকারের সময় ধর্মীয় রাজনীতির সংগঠনগুলো মাথা উঁচু করার সবচেয়ে বেশি সুযোগ পায় এবং সেই সুযোগের মারাত্মক অপব্যবহার করে। বাংলাদেশের মানুষের সামরিক-আধা সামরিক সরকারের অধীনে বসবাসের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে তারা বহু প্রজন্ম ধরে নিজেদের পছন্দের নির্বাচিত মানুষটিকেই পেয়ে আসছে। এমনকি আইয়ুব খানের সময়ও প্রেসিডেন্ট এবং প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হতেন মৌলিক গণতন্ত্রীদের পরোক্ষ ভোটে, কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার তাঁরা নিজেরাই নির্বাচিত করতেন। এলাকার তুলনামূলক ভালো নেতাকেই তাঁরা বেছে নিতেন। হয়তো সরকার-সমর্থকদের মধ্যেই যিনি অপেক্ষাকৃত জনবান্ধব, তাঁকেই তাঁরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন। আইয়ুব খান যে কৌশলে গ্রামপর্যায়ে তাঁর ক্ষমতা পাকা করতে চেয়েছিলেন, ৫০-৫৫ বছর পরে সে কৌশল যে সুফল দিতে পারে না, সে বিষয়টি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক ও রোডম্যাপ রচয়িতারা অনুধাবন করতে পারেননি। আমরা বিশেষভাবে সরকারকে অনুরোধ করেছিলাম সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন না দিতে। গণতান্ত্রিক সরকার গণমানুষের কথা শুনবে, এমন প্রতিশ্রুতি তারা কখনো দেয়নি। প্রাজ্ঞ নীতিনির্ধারকেরা ভুলটা করেছেন একটি জায়গায়। মারামারি-কাটাকাটি করে নিজেদের পছন্দের লোকটিকে ‘নির্বাচিত’ করে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসিয়ে দিলেই গোটা ইউনিয়ন আমাদের সমর্থক হয়ে যাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের হাতে আছে, মোটরসাইকেলসহ চেঙ্গিস খাঁর সৈনিকদের মতো প্রবল পরাক্রান্ত ক্যাডার আছে, এখন সব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নিজেদের লোক হলে সবই হবে আমাদের। আমাদের দেওয়া সুবিধাভোগীরা যা খুশি তাই করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার যে দল-মতের মানুষই নির্বাচিত হোন না কেন, তাঁদের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই কাজ করতে হয়। তাঁরা খুব ভালো জানেন তা না করলে তাঁর শ্বশুরবাড়ির সামনের খালের ওপরে কালভার্ট করার জন্য গম বা অর্থ বরাদ্দ পাবেন না। সুতরাং মনোনয়ন-বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে গায়ের জোরে তাঁকে নির্বাচিত (?) করে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসানোর প্রয়োজন ছিল না। যে ক্ষেত্রে এতকাল দুর্নীতি ছিল না, সেখানে যোগ হলো এবার নতুন মাত্রা। মনোনয়ন-বাণিজ্যে এবার কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে, তা সরকার-সমর্থক অর্থনীতি সমিতির নেতারা জানেন কি না জানি না। মদনভষ্মের মতো দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। টাকা দিয়ে মনোনয়ন কিনে চেয়ারে বসলে সে টাকা তুলতে হবে, তা নির্বোধেও বোঝে। সরকারি বরাদ্দ থেকে অত টাকা উঠবে না। তাহলে মনোনয়ন পেতে যে টাকা লেগেছে, তা তোলার উপায় কী? বাংলার মাটিতে তার সহজ উপায় না থেকেই পারে না। দেড় শ বছরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবারই ইতিহাস সৃষ্টি করল। চার ধাপের নির্বাচনে এবারই প্রথম ৬৫ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন। সরকারি দল ও নির্বাচন কমিশনের কর্তারা বললেন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। এই একটি কথা তাঁরা শতভাগ সত্য বলেছেন। ‘ধারাবাহিক ঘটনা’ নয়, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। পৃথিবীর প্রতিটি অপমৃত্যু বা অপজখমই বিচ্ছিন্ন, একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন হলেই তা বেদনার নয়, তা নির্বাচন কর্মকর্তারা মনে করলেও আমরা করি না। গণতন্ত্রের স্বাদ নিতে গিয়ে নির্বাচনকেন্দ্র থেকে লাশ হয়ে মর্গে গিয়ে ওঠার বাসনা সাধারণত কোনো মানুষই পোষণ করে না। যিনি চাঁদপুরে মারা গেলেন আর যিনি ঠাকুরগাঁওয়ে নিহত হলেন, দুজন তো বিচ্ছিন্ন ঘটনাতেই মরলেন। একসঙ্গে জোট বেঁধে মরেননি। দুজন একই বন্দুকের গুলিতেও নিহত হননি। এ ধরনের মৃত্যুর চেয়ে বরং ঘরে বসে বিরিয়ানি খেতে খেতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে পছন্দের লোককে বিজয়ী করা হাজার গুণে গ্রহণযোগ্য। চার ধাপের নির্বাচনে আহত হয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি। গাদাবন্দুকের গুলিতে কারও বাহু বা ঊরুর আধা কেজি মাংস উড়ে গেছে। প্রতিপক্ষের ঘুষিতে কারও নাকের বাঁশি ফেটে গেছে, ইএনটির ডাক্তারের সাধ্য নেই তা ঠিক করার। কারও পাঁজরের তিনটি হাড় চূর্ণ হয়েছে। প্রবলের পদাঘাতে কারও শরীরের এমন জায়গা বিধ্বস্ত হয়েছে, যা সে কাউকে বলতেও পারছে না, আশ্রয় নিয়েছে বিছানায়। কত দিন শয্যাগত থাকতে হবে তার নিশ্চয়তা নেই। তবে অধিকাংশেরই আঘাতটা লেগেছে মাথায়, চোয়ালের হাড় ও থুতনিতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধটা হয়েছে ‘ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে’। একজন নির্বাচন কমিশনারের অভিমত ‘সহিষ্ণুতার অভাব’ থেকে। মোদ্দা কথা হলো, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলে এমন মানুষ মারা যেত না, জখমের সংখ্যাও হতো খুব কম। বাংলাদেশে মানুষ ক্রসফায়ারে মরে, এবার ইউনিয়ন পরিষদ ক্রসফায়ারে পড়ল। এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য হলো, সহিংস কর্মকাণ্ড যা হওয়ার তা হয়েছে পনেরো আনাই সরকারি দলের লোকদের মধ্যে। বাঙালিদের মধ্যে এতকাল বিদ্রোহী ছিলেন মাত্র একজনই, আমাদের জাতীয় কবি, এখন দেখছি সরকারি দলে হাজার হাজার বিদ্রোহী। টাকার বিনিময়ে দলের অযোগ্য ব্যক্তি পেয়েছেন নমিনেশন, জনপ্রিয় যোগ্য ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাঙা মন কবে জোড়া লাগে ঠিক নেই। তা ছাড়া, এলাকায় যে ব্যক্তিগত শত্রুতার সৃষ্টি হলো, তা খুব অল্প দিনে দূর হবে না। তা ছাড়া, যে বাড়ির লোক মারা গেছেন বা যাঁরা মারাত্মকভাবে পঙ্গু হয়েছেন, তাঁরা এই ঘটনার প্রতিশোধ না নিয়ে গান্ধীজির অহিংস নীতিতে দীক্ষা নেবেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন। গ্রামীণ সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অতি মূল্যবান সম্পদ। ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সেখানে স্নেহ-মায়া-মমতার বন্ধনে সবাই আবদ্ধ। সব প্রতিষ্ঠানই তো ধ্বংস হয়ে গেছে। গ্রামের ওই জায়গাটুকুও যদি শেষ হয়ে যায়, বাঙালির আর থাকলটা কী? হিংসায় বিভক্ত হয়ে একটি সমাজ ও রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও ঐক্য খুব দরকার। গ্রামে সব দলেও যেমন আছেন অতি ভালো মানুষ, দলের বাইরেও হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, অবাঙালি বিভিন্ন জাতির মধ্যে আছেন যোগ্য ও জনপ্রিয় মানুষ। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-আধা সরকারি কর্মকর্তা, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সমাজসেবক ও সাংস্কৃতিক কর্মী বহু আছেন, যাঁদের ওপর রয়েছে জনগণের অাস্থা। নির্দলীয় নির্বাচন হলে তাঁদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। সেই কারণেই ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সময়ও বহু হিন্দু মুসলমানপ্রধান এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতার পরে দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে, দেশবাসীর যে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে বিভিন্ন দলিলে, তা হলো—জনগণের ক্ষমতায়ন। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া ঘোরতর অন্যায়। দেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সব সময় চেয়েছে তাদের ন্যূনতম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। ছাত্রসমাজের মধ্যে যারা মেধাবী ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, তাদের সামনে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। সত্তর ও আশির দশকের মতো সংগ্রামী ছাত্রনেতা নেই। ছাত্রনেতা আর ছাত্রদের সরদার এক জিনিস নয়। শ্রমিক নেতৃত্ব শেষ হয়ে গেছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধায় এক কালের কোনো কোনো শ্রমিকনেতার আর্থিক অবস্থা এখন মাঝারি শিল্পপতির মতো। দেশে মাথা ও বিবেক বিক্রির হাট বসেছে। চড়া দামে মাথা হোক বাক্যন্ত্র হোক, যে যা পারছে বিক্রি করে দিয়েছে। জনগণের শেষ সম্পদ তার ভোটাধিকার। সেটি খোয়া গেলে নাগরিকদের আর কিছুই থাকে না। নাগরিকেরা তখন নিঃস্ব ও রিক্ত। কোনো অবস্থা ও ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। যেকোনো অনুপযোগী ব্যবস্থা সংশোধনযোগ্য। সে জন্য একই আইন বারবার সংশোধনের প্রয়োজন হয়। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবারই প্রথম। এই নির্বাচনের সমস্যা থেকে শিক্ষা নিয়ে, এই ব্যবস্থার পর্যালোচনা করে, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে দেশ ও জনগণ উপকৃত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও কিছুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

No comments:

Post a Comment