![]() |
| সন্তান খোঁজ না নিলেও মায়ের দোয়া সব সময় সন্তানের সাথেই থাকে |
আজ
বিশ্ব মা দিবস। সারা বিশ্বে বেশ ঘটা
করেই দিনটি মাকে উৎসর্গ করেছে শত কোটি মানুষ। দিনটিতে মাকে নানা উপহার দিয়ে
সন্তানেরা মায়ের প্রতি তাদের যে অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তা প্রকাশে ব্যস্ত
থাকে। যদিও মাকে ভালবাসার জন্য বিশেষ কোন দিনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু
গ্রামের অনেক মা জানে না ‘মা দিবস’ বলে কোনো দিবস আছে। আমাদের গ্রামীণ
মায়েরা এ দিবস সম্পর্কে না জানলেও সন্তানের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র
ভালোবাসার কমতি নেই। বড় হয়ে সন্তানরা কর্মব্যস্ততার মাঝে মাকে ভুলে থাকলেও
মা ভুলেন না। সন্তানদের সুখের জন্য একজন মা যে কতটা কষ্ট করেন তার বাস্তব
উদাহরণ মানিকগঞ্জের আরুয়া ইউনিয়নের বাউলিকান্দা গ্রামে মর্জিনা বেগম। ১৭
বছর আগে দুই শিশু সন্তান রেখে মর্জিনা বেগমের স্বামী ঢাকায় কাজের খোঁজে
গিয়ে আর ফিরেননি। পরে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার
জীবনযুদ্ধ। সংসারের হাল ধরতে কখনো অন্যের বাড়িতে, কখনো আবার কাজ করেছেন
ফসলের মাঠে। এখনো মর্জিনা বেগম কেয়ার বাংলাদেশের হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের একজন
তালিকাভুক্ত মাটি কাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
কিন্তু এই সংগ্রামী নারী
তার ছেলেকে বানাচ্ছেন এমবিবিএস ডাক্তার। ছেলে রিপন বিশ্বাস ঢাকার একটি
মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। মেয়ে সুরমা আক্তার এইচএসসি
পরীক্ষার্থী। তাকেও আইনজীবী বানাতে মা চান মর্জিনা। মর্জিনা বেগম জানান,
অভাবের মধ্যে দুই ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াকে আত্মীয়-স্বজন আর প্রতিবেশিরা বাঁকা
চোখে দেখতো। তাদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন
অনেকে। কিন্তু ছেলের একের পর এক ভালো রেজাল্টে সবাই খুশি হয়েছেন। এ পর্যন্ত
আসার পেছনে এলাকাবাসীও অনেক আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। মুখে এক গাল তৃপ্তির
হাসি হেসে তিনি জানান, আজ আর আমার কোনো কষ্ট নেই। আমি সব কষ্টের কথা ভুলে
গেছি। ছেলে ডাক্তার হচ্ছে, গরিব দুখীর সেবা করতে পারবে। মেয়েকে উকিল
বানাবে, যেন সেও মানুষকে আইনি সেবা দিতে পারে। ছেলে রিপন বিশ্বাসও তার
মায়ের এই কষ্টে অঝরে কাঁদে। তার স্বপ্নও একদিন তার মায়ের মুখে সে
পরিতৃপ্তির হাসি ফুটাবেই। তার গর্ব সে একজন আদর্শ মায়ের গর্ভে জন্মেছিল।
তেমনি কান্না মিশ্রিত এই সুখের ঠিক বিপরীতেও আছে কিছু মায়ের দুঃখগাঁথা।
মানিকগঞ্জের হতভাগী অনেক জননীর “মা দিবসের” কোন বিশেষত্ব জানা নেই।
তারা
জানেন না মা দিবস কী? তবুও তারা সবসময় দোয়া করেন তার সন্তান যেন ভালো থাকে।
কথা হলো, জেলার দৌলতপুরের ভাঙা আবুডাঙ্গা এলাকার প্রবীণ লালতারা বেওয়া
নামের এক জনমদুঃখী মায়ের সাথে। জেলা শহরের এক বাড়িতে কাজ করে জীবিকা
নির্বাহ করছেন। এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে ঢাকায় কাজ করে। বিয়ে
করে তারা সন্তানসহ ঢাকায় থাকে। লালতারা বেওয়া জানালেন, দুই সন্তান মাঝে
মাঝে ঈদে বাড়িতে আসে। অল্প-স্বল্প খরচ দেয়। কিন্তু তাতে তো চলে না। তাই
অন্যের বাড়িতে কাজ করি। কাজ না করলে খামু কী? শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে
বৃদ্ধ বয়সে এসেও ভিক্ষা করতে হচ্ছে এক অসহায় মা হাজেরা বেগমকে। ঘিওরের তরা
এলাকায় খুড়িয়ে খুড়িয়ে ভিক্ষা করছেন তিনি। বয়সের ভারে ঠিকমতো পথও চলতে
পারছিলেন না। ছেলে রায়হান বিয়ে শাদী করে শশুর বাড়িতে থাকে। একটিবারও খোঁজ
নেয় না গর্ভধারিনী এই মায়ের। তবু সন্তানের প্রতি তার কোন আক্ষেপ নেই। মা
দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বেশ অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে উওর দেন, সেইডা আবার কি
বাপু, এই কতা তো আগে হুনি (শুনি) নাই।
প্রবীণ জননী জমিলা বেগম। বয়স প্রায় ৬০ পেরিয়েছে। জোকা এলাকায় থাকেন অন্যের
বাড়িতে আশ্রয়ে।
তিনি জানান, স্বামী মানিক মিয়া বহু আগে তাকে ছেড়ে অন্যত্র
বিয়ে করে সংসার করছেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়ি
বসবাস করছেন। ছেলেও বিয়ে শাদী করে অন্যত্র থাকে। খোঁজ নেয় না বৃদ্ধা মায়ের।
ধুলো কালি মাখা গাল বেয়ে তরতর করে জল বেরিয়ে গেল ঝলসানো চোখের। আড়ষ্ট
কণ্ঠে জানালেন, মায়ের পরিচয় দিতে খুব লজ্জা লাগে তার ছেলের। তবুও দোয়া করি
আল্লায় যেন ওদের সুখে রাখে। কথা হয় আরেক প্রবীণ দুঃখি জননী জরিনা বেগমের
সাথে। বয়সের ভারে ক্লান্ত সদর উপজেলার ভাটবাউর এলাকার ৬৫ বছরের জরিনার
কষ্টের সীমা নেই। স্বামী নেই। সংসারে আছে চার মেয়ে ও দুই ছেলে। কেউ তার
ভরণপোষণ করেন না। ইটভাটায় কয়লা ভাঙার কাজ করে নিজের ও স্বামী পরিত্যক্ত
মেয়ের দুবেলা দু’ মুঠো খাবার যোগাড় করতে হচ্ছে। বললেন, এই বয়সে আগুনে পুইড়া
কাম করতে আর ভালো লাগে না। কিন্তু কি আর করুম কপালে কষ্ট থাকলে তো করতেই
অইবো। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই একটা দিনের জন্য কাম ছাড়া বসে নেই। জানি
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ কইরাই মরতে অইবো।
গড়পাড়া গ্রামের খোদেজা বেগম ১০
বছর ধরে মাটি কাটার কাজ করছেন। অসুস্থ স্বামী ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার
চালাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন এই নারী। একমাত্র ছেলেও তাদের ভাত-কাপড় দেয়
না। খোদেজা জানালেন, কাম করে ১৮০ টাকা পাই। কিন্তু এই টাকায় অসুস্থ স্বামী ও
মেয়েকে নিয়ে এই টাকায় চলে না। তাই ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকার কিস্তিতে
লোন করতে হয়েছে। ডাউটিয়া গ্রামের আরেক মা পারভিন বেগম জানালেন, রোদে পুড়ে
ইটভাটায় সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করে মজুরি পাই মাত্র ১৯০
টাকা। এই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। ঘরে স্বামী শ্বাসের রোগী। তিন ছেলের
মধ্যে দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। স্বামী ও ছোট ছেলে নিয়ে অল্প
টাকায় সংসার চালাতে না পারায় ৩০ হাজার টাকা লোন করা হয়েছে। সপ্তাহে সাড়ে
সাত শ’ টাকা কিস্তি সারতে হয়। এদের একজন ফুলজান বেগম। বয়স ৫০-এর কাছাকাছি।
সদর উপজেলার উকিয়ারা গ্রামের শহিদ উদ্দিনের মেয়ে ফুলজানের স্বামী হাকিম
উদ্দিন সাত বছর আগে দুর্ঘটনায় মারা যান। রেখে যান চার সন্তান। স্বামীর
মৃত্যুর পর তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সন্তানদের মুখে দু’বেলা খাবার
তুলে দিতে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে।
কখনো মাটি কাটার কাজ, কখনো
ইটভাটায় কয়লা ভাঙার কাজ আবার কখনো রাজমিস্ত্রির জোগান দিয়েছেন। ফুলজানের
চেহারা রোদ ও আগুনের তাপে পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেলেও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে
যাচ্ছেন তিনি। কথা বলার সময় দু’চোখের কোণে পানি টলমল করছিল। বার বার কাপড়ের
আঁচল দিয়ে পানি মোছার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। এক পর্যায়ে কেঁদে ওঠেন
হাউমাউ করে। শুধু বলেন, “আমাগোর মতো মানুষের কষ্টের কথা আপনে লেইখ্যা কি
করবেন। এত কষ্ট কইরা পোলা দুইডারে বড় করছি। ওরা এহন ম্যালা ট্যাহা কামায়।
শহরে থাহে (থাকে)। একবারও খবর নেয় না আমার। ওগো দেকবার খুউব মন চায়।”
জীবনের চরম সঙ্কটকালে পরম সান্তনার ছবি হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে মমতাময়ী
মায়ের প্রিয় মুখ। কেননা এসব দিবসের চাইতে জীবন বাঁচানোর তাগিদই তাদের কাছে
এখন মুখ্য। তবুও তারা সবসময় দোয়া করে তার সন্তান যেন ভালো থাকে।

No comments:
Post a Comment