সংবাদপত্রে নতুন বাজেট নিয়ে আলোচনার
শুরুতেই দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, ‘সংবাদপত্র শিল্পের জন্য কোনো সুখবর নেই।’
এটা কারো ব্যক্তিগত কথা নয়, বর্তমান সরকারের জোরালো সমর্থক একটি দৈনিক
পত্রিকার হেডিং। সুসংবাদ তো নেই-ই, বরং সংবাদপত্র শিল্পের স্বার্থে
নিউজপ্রিন্ট আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারসহ যেসব দাবি এবার অর্থমন্ত্রী ও
রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে তুলে ধরা হয়েছিল, সেগুলো উপেক্ষা করা
হয়েছে। তদুপরি পত্রিকার শ্রেণিভুক্ত বিজ্ঞাপন বিলের ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো
ভ্যাটের বোঝা। কথায় বলে, ‘সাধ আছে, সাধ্য নেই।’ যদি না থাকে সাধ্য বা
সক্ষমতা, তা হলে সাধের পরিকল্পনার ‘পরী উড়ে যায়, আর কল্পনা মাটিতে পড়ে
হা-হুতাশ করে।’ আমাদের সরকারের দশাও অনেকটা তেমন। এবারের বাজেট প্রসঙ্গে
তাই বহুল প্রচারিত পত্রিকার লিড হেডিংÑ ‘আকাক্সা বিপুল, সামর্থ্য কম।’
এমনকি সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক সংবাদপত্রের মূল শিরোনাম : ‘বড় স্বপ্ন, কঠিন
বাস্তবতা।’ চাঁদ ধরার জন্য হাত বাড়ালেও পা দুটো মাটিতে রাখাই বুদ্ধিমানের
কাজ। না হয় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উল্লম্ফনের পরিণতি পতনজনিত
মারাত্মক আঘাত। খুব দরিদ্র এক লোক স্বপ্নে দেখেছিল, সে ডাল আর আলু ভর্তা
দিয়ে গরম ভাত খাচ্ছে।
এটা শুনে আরেকজন বলেছিলÑ ‘যখন স্বপ্নই দেখলে, তখন ডাল
ভর্তা কেন, ঘি দিয়ে খাওয়ার দৃশ্য দেখাই উচিত ছিল।’ এসব কথার কথা নয়, কাজের
কথা। তাই আমাদের সবার, বিশেষ করে দেশের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার।
তাদের মনে থাক বা না থাক, তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার প্রস্তাবিত
বাজেট গত বৃহস্পতিবার সংসদে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত। অত্যন্ত
উচ্চাভিলাষী এই বিশাল বহর বাজেটে আয় হবে দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ঘাটতি ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। ব্যাপারটা দাঁড়াল এমনÑ গিন্নি দিলেন
মাসিক খরচের লম্বা ফর্দ। কর্তার মোট আয় সে তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। অতএব,
টানাটানির মধ্য দিয়ে মাসের শুরু। এবারকার বাজেট দেখলে বোঝা যায়, ৭১.৩
শতাংশ অর্থই জনগণের পকেট থেকে আদায় করা হবে। বাকিটা ধারকর্জ। তবে এর মাঝে ৯
শতাংশ বৈদেশিক ঋণ আর মাত্র ১.৬ শতাংশ বৈদেশিক অনুদান। অপর দিকে ১৮.১
শতাংশই অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন থেকে জোগাড় করতে হবে। এর মানে, দেশের ব্যাংকগুলো
থেকে সরকারের বিপুল ঋণ নেয়া বজায় থাকবে। নতুন বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে,
বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থই আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর থেকে।
তাদের আদায় করতে হবে দুই লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর দাবি,
টার্গেট উচ্চাভিলাষী হলেও তা অর্জনের জনবল ও সামর্থ্য সরকারের আছে।
গণতান্ত্রিক সরকারের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো জবাবদিহিতা। এ জন্য প্রদর্শন
করতে হয় স্বচ্ছতা। বাজেট বক্তৃতায় ঘাটতি বাজেটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ
তথ্যের ঘাটতিও ছিল। এটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী। নয়া দিগন্ত
জানিয়েছে, মন্ত্রী বাজেট বক্তব্যে সরকারি সাফল্যের বয়ানে উদার হলেও
ব্যর্থতা তুলে ধরায় শুধু কার্পণ্য নয়, বেমালুম চুপ মেরে গেছেন। যেমন,
ব্যাংকিং খাতের মহাবিপর্যয়ের বিষয় অনেকটা গায়েব! ‘এই বিপর্যয়ের প্রতিকার
এবং সরকারি ব্যাংক থেকে লোপাট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধারের কী
ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে অথবা কোনো অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তার কোনো তথ্য
নেই বাজেট বক্তৃতায়।’ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলেও এবার বাজেটের মূল ভাষণে
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লোপাটের বিশ্ব তোলপাড় করা অঘটনের কোনো বিবরণ
নেই। এ ব্যাপারে মন্ত্রী কিছু কথা বলেছেন, শেষ মুহূর্তে। এটা বিস্তারিত ও
গুরুত্ব দিয়ে বলা উচিত ছিল আগেই। এত বড় একটা বিষয় ধামাচাপা দিলে অনেক কথা
শুনতে হবে আশঙ্কা করেই হয়তো এ ব্যাপারে শেষলগ্নে অর্থমন্ত্রীকে বক্তব্য
দিতে হলো। তিনি কালো টাকা এবং সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বসানোর বিষয় এড়িয়ে গেলেও
তা সচেতন মানুষের নজর এড়ায়নি। প্রবৃদ্ধির সাথে সঙ্কটও বাড়ছে বর্তমান
সরকারের কয়েকটা catch-word আছে যেগুলো কারণে-অকারণে ঘনঘন উচ্চারণ করছেন
মন্ত্রীসহ বড় নেতারা। এত বেশি এগুলো বলা হচ্ছে যে, এসব কথা এখন বিরক্তিকর
হয়ে উঠেছে। যাকে বলা হয় cliche. যেমনÑ উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন
প্রভৃতি।
এখনকার সরকারের কাছে সুশাসনের চেয়ে উন্নয়ন বড় আর অর্থনীতির সব বিষয়ের মধ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি। আর সব কিছুকে গৌণ করে যেভাবেই হোক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে সরকারের অ্যাটেনশন (মনোযোগ) যত বাড়ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে অর্থনীতির সত্যিকার বোদ্ধা ব্যক্তিদের টেনশন (উৎকণ্ঠা)। কারণ, দেহের সব রক্ত মুখে এসে জড়ো হওয়া সুস্বাস্থ্য নয়। তেমনি প্রবৃদ্ধির টার্গেট পূরণ করাই অর্থনীতির সুষম অগ্রগতি বোঝায় না।
২০১৬-১৭ সালের জন্য বাজেটে, মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। বর্তমান অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭.০৫ শতাংশ। এটা পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব। বর্তমান সরকারের আমলেই দেখা গেছে, ব্যুরোর হিসাবের সাথে সরকারের মন্ত্রণালয় একমত হয় না কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ শতাংশ পর্যন্ত। তা অন্তত ৮ শতাংশ করা দরকার বলে অর্থনীতিবিদদের অভিমত।
২০১৪-১৫ সালে প্রবৃদ্ধির টার্গেট ছিল ৭.৩ শতাংশ। অর্জিত হয়েছে ৬.৫৫ শতাংশ। ২০১৫-১৬ সালে ৭.০ শতাংশ টার্গেট ছাড়িয়ে গেছে অর্জনের হার। এতে উৎসাহিত হয়ে সরকার নতুন বাজেটে এর টার্গেট করেছে ৭.৫ শতাংশ। কিন্তু সরকারের পরিসংখ্যানটি নিয়ে শুধু দেশের থিঙ্কট্যাঙ্ক সিপিডি প্রশ্ন তোলেনি, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বা উন্নয়নসহযোগীরাও ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। সরকার বলছে, বিদায়ী বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.০৫ শতাংশ, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্থা (এসকাপ) বলেছে ৬.৮০ শতাংশ, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের মতে এটা ৬.৬০ শতাংশ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব মতে ৬.৪০ শতাংশ, আর বিশ্বব্যাংক মনে করে বাস্তবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে আরো কমÑ ৬.৩০ শতাংশ। সরকারের প্রচারণায় মনে হতে পারে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেই দেশের হয়ে গেল বিরাট অগ্রগতি। বাস্তবে দেশ পরিচালনায় এটা সরকারের সার্বিক সাফল্যের অনেক সূচকের একটি মাত্র।
এখনকার সরকারের কাছে সুশাসনের চেয়ে উন্নয়ন বড় আর অর্থনীতির সব বিষয়ের মধ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি। আর সব কিছুকে গৌণ করে যেভাবেই হোক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে সরকারের অ্যাটেনশন (মনোযোগ) যত বাড়ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে অর্থনীতির সত্যিকার বোদ্ধা ব্যক্তিদের টেনশন (উৎকণ্ঠা)। কারণ, দেহের সব রক্ত মুখে এসে জড়ো হওয়া সুস্বাস্থ্য নয়। তেমনি প্রবৃদ্ধির টার্গেট পূরণ করাই অর্থনীতির সুষম অগ্রগতি বোঝায় না।
২০১৬-১৭ সালের জন্য বাজেটে, মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। বর্তমান অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭.০৫ শতাংশ। এটা পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব। বর্তমান সরকারের আমলেই দেখা গেছে, ব্যুরোর হিসাবের সাথে সরকারের মন্ত্রণালয় একমত হয় না কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ শতাংশ পর্যন্ত। তা অন্তত ৮ শতাংশ করা দরকার বলে অর্থনীতিবিদদের অভিমত।
২০১৪-১৫ সালে প্রবৃদ্ধির টার্গেট ছিল ৭.৩ শতাংশ। অর্জিত হয়েছে ৬.৫৫ শতাংশ। ২০১৫-১৬ সালে ৭.০ শতাংশ টার্গেট ছাড়িয়ে গেছে অর্জনের হার। এতে উৎসাহিত হয়ে সরকার নতুন বাজেটে এর টার্গেট করেছে ৭.৫ শতাংশ। কিন্তু সরকারের পরিসংখ্যানটি নিয়ে শুধু দেশের থিঙ্কট্যাঙ্ক সিপিডি প্রশ্ন তোলেনি, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বা উন্নয়নসহযোগীরাও ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। সরকার বলছে, বিদায়ী বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.০৫ শতাংশ, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্থা (এসকাপ) বলেছে ৬.৮০ শতাংশ, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের মতে এটা ৬.৬০ শতাংশ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব মতে ৬.৪০ শতাংশ, আর বিশ্বব্যাংক মনে করে বাস্তবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে আরো কমÑ ৬.৩০ শতাংশ। সরকারের প্রচারণায় মনে হতে পারে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেই দেশের হয়ে গেল বিরাট অগ্রগতি। বাস্তবে দেশ পরিচালনায় এটা সরকারের সার্বিক সাফল্যের অনেক সূচকের একটি মাত্র।
২০১৪-১৫
সালে ইথিওপিয়ার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ১০ শতাংশেরও কিছু বেশি। এ জন্য কেউ বলবে না
যে, এটি উন্নত দেশ। ২০১৪ সালে আফ্রিকার কঙ্গোর মতো দেশও ৯ শতাংশের বেশি
প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অথচ ভারতের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭ শতাংশের কাছাকাছি।
তখন আয়ারল্যান্ড মাত্র ৫.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তাই বলে কি মনে
করা যায় যে, এটি ইথিওপিয়া বা কঙ্গোর চেয়ে পিছিয়ে আছে? বাংলাদেশের একটা
কৃতিত্ব হলো এক দশকেরও অধিককাল গড় প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ধরে রাখা। এ
কারণেই বাংলাদেশ গত বছর প্রথমবারের মতো স্বল্প আয়ের দেশের তকমা ত্যাগ করতে
সক্ষম হয়েছে। অবশ্য সরকার যেভাবে এই সাফল্যের প্রায় সবটাই নিজের অবদান বলে
দেখাতে চায়, বাস্তবতা তা বলে না। মূলত জনগণের সংশ্লিষ্ট অংশ তথা কৃষিজীবী,
গার্মেন্ট কর্মী ও প্রবাসীদের অব্যাহত কঠিন শ্রম এবং কৃষি ক্ষেত্রে
প্রাকৃতিক আনুকূল্য এই কৃতিত্বের বড় কারণ। যা হোক, আমরা স্বল্পমধ্যম আয়ের
দেশ হয়ে যতই বগল বাজাই না কেন, ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়া
সহজ নয় বলেই মনে করা হচ্ছে।
অথচ সরকারের আশা, আর পাঁচ বছর পরই বাংলাদেশ
উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের সারিতে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বল্পমধ্যম
আয়ের ফাঁদে আটকা পড়লে কত দিনে উত্তরণ ঘটবে বলা কঠিন। উপমহাদেশের শ্রীলঙ্কা
৪৩ বছর, আফ্রিকার কঙ্গো ৪৮ বছর, ফিলিপাইন ৪৯ বছর, বলিভিয়া ৬০ বছর, এমনকি
গুয়াতেমালা ৭৫ বছরেও এ ফাঁদ থেকে বের হতে পারছে না। কালো টাকা ও ভালো টাকা
নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম : সাফল্যের ফিরিস্তি, ব্যর্থতায় চুপ।’
সংশ্লিষ্ট রিপোর্টের শুরুতে বলা হয়েছে, ‘অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতাকে এক
কথায় এভাবেই অভিহিত করা যায়।’ মন্ত্রী বাজেট উপস্থাপনের সংখ্যার দিক দিয়ে
যতই রেকর্ড গড়–ন, তার ব্যর্থতার রেকর্ডও কম নয়, যার মধ্যে ‘কালো টাকা’
সবিশেষ উল্লেখ্য। তিনি এ বিষয়ে আগে যতই গরম গরম কথা বলুন না কেন, কাজের
বেলায় একেবারে ঠাণ্ডা। অর্থমন্ত্রী বাজেটে কালো টাকা নিয়ে ভালো-মন্দ কোনো
কিছুই না বলে চুপ থেকেছেন। মানে, কালো টাকা বহাল রইল আর সমাজের কৃষ্ণশক্তিও
স্বস্তির শ্বাস ফেলল। অর্থমন্ত্রীর বয়স আশি ছাড়িয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই।
তাতে কী?
এখনো তিনি অনেক বড় ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন; কার্যকরও করছেন;
কিন্তু শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি আর বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠনের মতো কিছু বেসিক বা
মৌলিক ইস্যুতে তিনি কেন যেন নরম হয়ে যান। কালো টাকার বেলায়ও তার মতো ভালো
মানুষ শক্ত মনোভাব দেখাতে পারেন না। কালো টাকা নিঃসন্দেহে ভালো টাকা নয়।
অনেকে বলেন, ‘কালো টাকা মানেই অন্যায় বা অসৎ পন্থায় অর্জিত না-ও হতে পারে
এবং অপ্রদর্শিত আয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।’ ভালো কথা; কিন্তু বৈধ আয় হলেও তার কর
যথাসময়ে যথাযথভাবে না দিয়ে বিষয়টা গোপন রাখা নিঃসন্দেহে বৈধ নয়। আমরা সাদা
মনের মানুষ চাই; কিন্তু সে তুলনায় প্রকৃত ‘সাদা টাকা’র দিকে আমাদের অনেকেরই
আগ্রহ কম। এ সুযোগে কালো টাকার পরিমাণ ও প্রতাপ বাড়ছে আর কালোকে
হোয়াইটওয়াশ করে ‘সাদা’ বানানো হচ্ছে। বলা বাহুল্য, কালো টাকাকে আইনের ফাঁকে
‘সাদা’ বানালেই এর মালিকের মন ‘সাদা’ হয়ে যাবে না। উৎস খোলা রেখে কালো
টাকার বিরুদ্ধে গলাবাজি মানে, জনগণকে প্রতারিত করা। অতীত থেকেই দেখা গেছে,
প্রতি বছর বাজেটে সাধারণ মানুষ তথা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত জনগণের চেয়ে
প্রভাবশালী কোনো কোনো মহলের স্বার্থ প্রাধান্য পায় অনেক ক্ষেত্রে। কারণ
তারা সুসংগঠিত প্রেশার গ্রুপ হিসেবে তৎপর থাকেন এবং সরকারের হাই-লেভেলেও
তাদের লোকজন আছেন। কালো টাকার ব্যাপারে সরকারের গরম কথা নরম কাজ নীতিও এর
প্রমাণ। একটি পত্রিকা লিখেছে, ‘ব্যবসায়ীদের দাবিতে বর্তমান মেয়াদে
প্রতিবারই অর্থমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছেন; কিন্তু কোনোবারই
তাতে তেমন সাড়া পাননি তিনি।
এবার প্রাক-বাজেট আলোচনায় আবাসন খাতের
ব্যবসায়ীরা কালো টাকা সাদা করার সুযোগটি বহাল রাখার দাবি জানিয়েছিলেন।’
সরকার সে দাবি মেনে নিয়েছে। লক্ষণীয়, ওই সুযোগটির কোনো মেয়াদ নেই। অর্থাৎ
তা অনির্দিষ্টকাল অব্যাহত থাকবে। এ দিকে মাত্র দশ শতাংশ জরিমানা দিলেই
‘অপ্রদর্শিত আয়’ হয়ে যাবে বৈধ। তরুণের শিক্ষা ও প্রবীণের পেনশন শিক্ষাই
জাতির মেরুদণ্ড। দেখা যাক, বাজেট মেরুদণ্ডটি দৃঢ় না দুর্বল করবে। টাকার
অঙ্কে ও শতাংশের হিসাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কিঞ্চিত বাড়লেও ওয়াকিবহাল মহলের
অভিমত, এটা শুভঙ্করের ফাঁক। কারণ, প্রয়োজনের তুলনায় তা শুধু কম নয়, অনেক
কম। ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ এবং বাজেটের ২০
শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। বাংলাদেশে এটা প্রযুক্তিসহ বাজেটের
১৬ শতাংশেও পৌঁছেনি। অন্য দিকে, এটা জিডিপির মাত্র দুই থেকে আড়াই শতাংশ।
এবার বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলিয়ে বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৫.৬ শতাংশ।
তবে প্রযুক্তির অনেক ব্যয় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নয়। বর্তমান সরকারের একজন
প্রিয়ভাজন বুদ্ধিজীবী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, ‘এ অঞ্চলে যত দেশ আছে,
সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই শিক্ষার পেছনে অর্থ ব্যয় করে সবচেয়ে কম। যেখানে
জিডিপির ৬ শতাংশ খরচ করার কথা, তা কমতে কমতে ২ শতাংশ থেকেও নিচে নেমে
এসেছে।
কী সর্বনাশা কথা! যে দেশে শিক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে কম, সে দেশের
ছেলেমেয়েদের হাতে আমরা কী তুলে দেবো? এই দুঃখ আমরা রাখব কোথায়?’ বাংলাদেশ
স্বল্পমধ্যম আয়ের দেশ হওয়া নিয়ে সরকারের স্বভাবসুলভ প্রপাগান্ডার অন্ত নেই;
কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেলে বাংলাদেশের সমস্যাও হবে। তা হলো, কিছু
গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সাহায্য প্রাপ্তির সমস্যা। কোনো মানুষকে কিছুটা
সচ্ছল হতে দেখলে অন্যরা তাকে ভিক্ষা দিতে চায় না। এ ব্যাপারটা অনেকটা সে
রকম। এ দিকে সমস্যা হচ্ছে জনসংখ্যার ক্ষেত্রেও। সর্বাধিক ঘন জনবসতির দেশ
হিসেবে বাংলাদেশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রায় নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে। অন্য দিকে,
মানুষের গড় আয়ু আল্লাহর রহমতে বেড়ে গেছে। এতে মোট জনগোষ্ঠীতে বাড়ছে
প্রবীণের সংখ্যা। প্রয়োজনে এই প্রবীণদের ভরণপোষণের দায় সরকারের ওপর বর্তায়;
কিন্তু তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই সরকারি চাকুরে ও পেনশনভোগী। অর্থমন্ত্রী
জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি চাকরি
করছেন। তারাই কেবল অবসর নিয়ে পাচ্ছেন পেনশন সুবিধা। বাকি ৯৫ শতাংশের মধ্যে
যারা বেসরকারি খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবী, এমন ৮ শতাংশ অবসরের পরে
পেনশন পান না; শুধু গ্র্যাচুইটি পান। বাদবাকি যে বিপুলসংখ্যক চাকুরে, অবসর
গ্রহণের পর অর্থাৎ প্রবীণ বয়সে পেনশন কিংবা গ্র্যাচুইটি, কোনোটাই পান না
তারা।
এই প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন পেনশন চালুর বিষয়ে ভাবনার উল্লেখ করলেন
অর্থমন্ত্রী। উদ্যোগটা প্রশংসনীয় এবং তা অনেক আগেই চালু হওয়া উচিত ছিল।
মন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, পর্যায়ক্রমে সরকারি, আধা-সরকারি ও ব্যক্তি
খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশীদারিত্বমূলক পেনশন পদ্ধতি চালুর ব্যাপারে ভেবে
দেখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ডিপোজিট পেনশন স্কিমের মতো কোনো উপযোগী
ব্যবস্থা সরকারি নিয়ন্ত্রণে ও সমন্বিতভাবে চালু হতে পারে। প্রবীণদের প্রতি
সরকারের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব রয়েছে। তবে সবার জন্য পেনশনের চিন্তাভাবনার
পেছনে শুধু তাদের আর্থসামাজিক সুরক্ষাই নয়, সরকারের লাভক্ষতির হিসাবও কম
নয়। অর্থমন্ত্রী এটা গোপন রাখেননি বাজেট বক্তৃতায়। তার ভাষায়, এ ব্যবস্থায়
প্রবীণদের সুরক্ষার সাথে তহবিলও সৃষ্টি হবে, যা সহায়ক হবে দীর্ঘমেয়াদি
বিনিয়োগ চাহিদা পূরণে। এতে আর্থিক খাত হবে উপকৃত। পরিশেষে পাঁচকাহন বিশ্বের
সেরা বিজ্ঞানী আইনস্টাইন অনেক কঠিন তত্ত্ব সহজে বুঝতে পারলেও আয়কর
প্রসঙ্গে এসে ঠেকে যেতেন। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, আয়কর
বুঝতে পারা।’ হয়তো সে জন্য আয়কর দেয়ার পন্থা সহজ করতে বাজেটে সুবিধা দেয়া
হয়েছে অনলাইনে আয়কর পরিশোধের। তবে এই ‘সহজ’ কাজ যাতে ভুক্তভোগীদের কাছে
‘কঠিন’ না মনে হয়, সে জন্য কর্তৃপক্ষ সচেতন থাকতে হবে।
কারণ সরকার বলছে,
রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় খাত হবে আয়কর। এখন এই আয়ের বিশাল টার্গেটে পৌঁছার
জন্য রাজস্ব বোর্ড যদি চাপাচাপি করে, তাতে অনেকের কাছে অনলাইন সুবিধা
ঝামেলা হয়ে উঠবে। মুঠোফোনে কথা বলার খরচ বাড়ছে। মোবাইলে কথা বলাসহ সিম
ব্যবহারের যেসব সুবিধা পাওয়া যায়, সেগুলোর সম্পূরক শুল্ক ৩ শতাংশ করা
হয়েছে। অর্থাৎ আগের ১০০ টাকার জায়গায় এখন প্রায় ১২২ টাকা খরচ করতে হবে এ
জন্য। অপর দিকে, আমরা জাতি হিসেবে ‘কাজ কম, কথা বেশি’ নীতির ভক্ত।
Talkative জনগোষ্ঠী তো বটেই, এর সাথে চলছে Talk Show -এর উৎপাত। মোবাইল
ফোনের ব্যয় বাড়লেও আমরা যে কথা কমিয়ে কাজ বাড়িয়ে দেবো, তার সম্ভাবনা কম।
এমনিতেই বাজেট আসন্ন হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসমেত নানান পণ্যের দাম বেড়ে
যায়। এর সম্ভাব্য কারণ, কর ও শুল্ক বাড়ার শঙ্কা। এবার বাজেটের সাথে রোজা
যোগ হয়ে মুনাফাখোরদের ‘সোনায় সোহাগা’। এক মাস আগে থেকেই অনেক আইটেমের দাম
বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবার। সর্বশেষ, বাজেট ঘোষণার সাথে সাথে চিনি, ডাল, ছোলার
দাম আরো বেড়েছে। রোজায় এগুলোর চাহিদা বেশি। বলা হচ্ছে, আমাদের বর্তমান
অর্থমন্ত্রী এতবার বাজেট উপস্থাপন করে রেকর্ড গড়ছেন। এটা তো তার কৃতিত্ব নয়
এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল হিসেবে। যে জন্য তিনি অর্থমন্ত্রী, সে
কাজগুলোতে কতটা সফল তিনি?
বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ
সৃষ্টি, কালো টাকার উৎসরোধ, বিদেশে অর্থপাচার বন্ধ করা, গণমানুষকে করভারে
পীড়িত না করা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নৈরাজ্যের অবসান, শেয়ারবাজারে আস্থা
ফিরিয়ে আনাÑ এসব ক্ষেত্রে যদি তার এই দীর্ঘমেয়াদে রেকর্ড সৃষ্টি করতে
পারতেন, তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন দেশ ও জাতির কাছে। বাজেট কোনো বছরই
সবাইকে খুশি করতে পারে না। তা সম্ভবও নয়। তবে গণতান্ত্রিক বলে দাবিদার
সরকারের কাছে জনগণের সঙ্গত প্রত্যাশা থাকে অনেক। তদুপরি, আমাদের বর্তমান
সরকার নিজের প্রত্যয়-প্রতিশ্রুতি, সামর্থ্য ও সাফল্য, মিশন ও ভিশন নিয়ে
অহরহ কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে আসছে। অপর দিকে, গত কয়েক বছরে সন্তোষজনক
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতির অঙ্গনে সঙ্কট বৃদ্ধি পেয়ে জনমনে অসন্তোষ কম
সৃষ্টি করেনি। এই প্রেক্ষাপটে এবার ‘ডিজিটাল’ সরকারের কাছ থেকে দেশবাসী
স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছে বহু কিছু, কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ ও
পদক্ষেপ overdue হয়ে আছে, অনেকাংশে সেগুলোও নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে। এ
অবস্থায় নাগরিকদের শঙ্কা বাড়াতে পারে শেক্সপিয়রের একটি উক্তি : ‘এটা
খারাপের শুরু। তবে এর চেয়েও খারাপ কিছু দূরে রয়েছে।’ পাদটীকা : ক. প্রতি
বছর বাজেট ঘোষণা দিলেই বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ে কেন? একজন জবাব দিলেন,
বাজেট = বাজে+ট। আর ‘ট’ মানে টাকা। অতএব, বাজেট মানে টাকা-পয়সা সম্পর্কিত
বাজে ব্যাপার। খ. একজন অশিক্ষিত লোককে প্রশ্ন করা হলো, নতুন বাজেট ঘোষণা
করা হলে টের পান নাকি? তার জবাব : ‘পাইমু না মানে? যখন জিনিসপাতির দাম বিনা
কারণে বাইড়া যায়, তখন বুঝতে পারি যে, আবার বাজেট আইসা পড়ছে।’
No comments:
Post a Comment