ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রার্থিতা (মার্কিন
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে) নিয়ে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় এটা নয় যে, তার মতো একজন
লোক শীর্ষ পদের জন্য লড়ছেন, বরং তা হলো তিনি হিলারি প্রশাসনে বিপর্যয়কর
প্রভাব ফেলতে যাচ্ছেন। এখন এই পাগলামি বছরে- আসলে ১৮ মাস ধরে বিরতিহীন
সার্কাসে- সংবাদমাধ্যম যে উন্মাদনায় রিপাবলিকান নমিনীর বিরুদ্ধে তীব্র
বিদ্বেষ ও বিষোদ্গার ছড়াচ্ছে, তেমনটা আমার জীবনে কখনো মূলধারার কোনো দলের
প্রার্থীর বিরুদ্ধে দেখিনি। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত যথাযথভাবেই এর
উপযুক্ত ছিলেন। হ্যাঁ, এখন আমরা সবই দেখছি, সৃষ্টিশীল ধ্বংস সাধনের মাধ্যমে
ট্রাম্প ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে সম্ভবত রিপাবলিকান পার্টিকে নতুন করে গড়ে
তুলছেন।
আমার মতো আরো অনেকের মতে, দলটি বাস্তবতা থেকে কতটুকু পর্যন্ত দূরে
রয়েছে, সেটা বিবেচনায় রাখলে মনে হবে, এটা আসলেই ভালো জিনিস। ট্রাম্প নিউকন
(নব্য-রণশীল) যুদ্ধবাজদের আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়েছেন, ইরাক এবং অন্যত্র
বিপর্যয়ের জন্য জর্জ ডব্লিউ বুশকে দায়ী করেছেন, বিদেশে যুদ্ধ থেকে ফিরে
আসার সুর তুলছেন, পুতিনের সাথে আলোচনায় আগ্রহের কথা ঘোষণা করেছেন। মার্কিন
সংবাদমাধ্যম সেগুলোকে বিষাক্ত ও ভয়ঙ্কর জিনিস বলে ঘোষণা করছে (যদিও সাবেক
প্রতিরামন্ত্রী চাক হ্যাগেল সম্প্রতি হঠকারিতার সাথে পরামর্শ দিয়েছেন,
রাশিয়াসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এবং আমাদের উচিত হবে পুতিনের
সাথে সার্বণিক আলোচনা করা)। অন্য অনেকের মতো, আমি বেশ উৎসাহের সাথে ধনী ও
গরিবের মধ্যকার ব্যবধান, লোভাতুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, ন্যায্য
মজুরি, বিনা বেতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিা, আরব-ইসরাইলি ইস্যু নিরসনে
ভারসাম্যপূর্ণ মার্কিননীতির (আকুলভাবে কাম্য!) আহ্বান ইত্যাদি যে বিষয়গুলো
দশকের পর দশক ধরে রাজনৈতিক আলোচনারবহির্ভূত বিষয় গণ্য হচ্ছিল, সেগুলো
নির্বাচনী প্রচারকাজে নিয়ে আসার বার্নি স্যান্ডার্সের চমক ল করছি। বার্নির
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমনকি তিনি খুব সম্ভবত মনোনয়ন পাবেন না সেটা
মনে রেখেও, তিনি যুদ্ধপ্রিয়, প্রান্তিকবাদী হিলারিকে বাম দিকে ঠেলে
দিয়েছেন।
হিলারি তা অনেকটা স্বীকারও করেছেন। এটাই হবে বার্নির শ্রেষ্ঠতম
অবদান। আমি আশা করব, স্যান্ডার্স যেসব ইস্যু উত্থাপন করেছেন, সেগুলো আর
কখনো রাজনৈতিক টুথপেস্টের টিউবে ফিরে যাবে না। এটা ছিল আশাবাদ। কিন্তু এখন
জুড়ে বসেছেন ট্রাম্প। তিনি রিপাবলিকান পার্টির তথা নিউকন, যুদ্ধপ্রিয়, ওয়াল
স্ট্রিটের অর্থভোগী, মৌলবাদী খ্রিষ্টান, টি পার্টি এবং মার্কিন বৈশ্বিক
শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাপুষ্ট রিপাবলিকানদের প্রতি যা করছেন, তাতে করে
ডানপন্থীরা বিশেষ করে নিউকনেরা ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়েছে। তারা যেকোনো মূল্যে
ট্রাম্পকে আটকানোর জন্য বেপরোয়া চেষ্টা করছে। ডোনাল্ডের প্রতি তাদের ভীতি
এত প্রবল হয়ে উঠেছে যে, তাদের অনেকে এর মধ্যেই বলে ফেলেছে, তারা হিলারিকে
ভোট দেবে। ঠিক এই জায়গাটাতেই ভয়। হিলারিকে এখন ঠিক কী করতে হবে- লোকপ্রিয়
অভিমতের স্রোতে নৌকা ছেড়ে দেয়া? শেষ কথা হলো স্যান্ডার্সের বামপন্থীদের ভোট
বাগানোর জন্য ডেমোক্র্যাট পার্টির নমিনী হিলারিকে আর না ভাবলেও চলবে, যদিও
তাদের অনেকে নির্বাচনের দিনে ঘরে বসে থাকতে পারে।
রিপাবলিকানদের, বিশেষ
করে নিউকনদের বিপুল সমর্থন হিলারিকে পার করিয়ে দেবে। হিলারি সত্যি সত্যি এই
রিপাবলিকান সমর্থন গ্রহণ করবেন এবং এর সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবেন।
বস্তুত, তার মৌলিক রাজনৈতিক ঝোঁক বামপন্থার দিকে নয়, সব দিক থেকেই ওই পথের
দিকেই। আর এর মানে হচ্ছে, নিশ্চিতভাবেই আমরা যে প্রেসিডেন্ট হিলারি
কিনটনকে পেতে যাচ্ছি, তিনি হবেন মধ্য ডান হিসেবে কোনোমতে উৎরে যাওয়া ওবামার
তুলনায় অনেক ডানপন্থী। সংেেপ বলা যায়, বামপন্থার দিকে হিলারিকে নেয়ার জন্য
বার্নি যে বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, যা ছিল ভারসাম্যপূর্ণ সরকারের জন্য
অতি দরকারি, সেটা সরে গেল। বার্নির প্রভাব এবং তার প্লাটফর্মের টাটকা
বাতাসে বুকভরে দম নিচ্ছিলেন, হিলারি এবং রিপাবলিকানদের মধ্যকার নতুন
দহরম-মহরমে তলিয়ে যাবে। রবার্ট ক্যাগান ও চার্লস ক্রুথামামের মতো প্রধান
নিউকন ব্যক্তিত্বরা উৎসাহভরে ও প্রকাশ্যে তাকে গ্রহণ করে নেবেন।
দেয়াল লিখন
পরিষ্কার : হিলারির চার পাশে ভিড় করে থাকা উপদেষ্টা, পরামর্শদাতা, তথাকথিত
বুদ্ধিজীবী এবং বিশেষ সহকারীরা (তাদের অনেকে এমনকি ওবামার দলেও অনুপ্রবেশ
করে ফেলেছিলেন) এবং পররাষ্ট্রনীতিতে টানা পরাজয়ের মধ্যেও অন্ধভাবে তাতে
লেগে থাকা ব্যক্তিরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ফিরে এসে সেই জর্জ ডব্লিউর আমলের
পরাজয়-জর্জরিত পররাষ্ট্রনীতির দিকে নিয়ে যেতে চাইবে। আর এর ফলে
যুক্তরাষ্ট্র কার্যত বিশ্বের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ হবে যাদের রাজনৈতিক
বর্ণচ্ছটা সাহসিকতার সাথে ডান থেকে মধ্যপথে গিয়ে সেখানেই থমকে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র্রে কোনো বামপন্থা নেই। আমরা একটা বর্ণালীর মাত্র অর্ধেকের
মধ্যেই কাজ করি। আমি কেন মিনমিনিয়ে ‘বামপন্থী’- এমনকি নিজেকে পরিচিত করতেও
ব্যবহার করছি? কারণ যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থী একটি নোংরা শব্দ। রাজনীতিবিদেরা
স্বাধীনভাবে যে শব্দটি উচ্চারণ করতে পারেন সেটা হলো ডানপন্থী। কিন্তু
কাউকে বামপন্থী বলাটা যুদ্ধ ঘোষণামূলক শব্দ, এটা অ-আমেরিকান শোনায়। নিউকন ও
রিপাবলিকান এস্টাবলিশমেন্টকে হিলারির দরজায় পাঠিয়ে দেয়াটা হবে আমাদের
রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ট্রাম্পের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে বড় তি।
তিনি এখন হিলারির
মধ্যে সবচেয়ে বাজে যে প্রবণতা সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন বলে আমাদের অনেকের মনে
হচ্ছে, তা হলো, এই জাতির সবচেয়ে বড় জটিলতার প্রতি বার্নি যে আলোকপাত
করেছিলেন, সেগুলোর প্রতি নমনীয় হওয়া বা ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল
করা। সত্যিকার অর্থে, নিজের পরাজয়ের মাধ্যমে ট্রাম্প পরবর্তী প্রশাসনকে
চূড়ান্তভাবে রাঙিয়ে তার সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। গ্রাহাম এফ. ফুলার
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান,
র্যান্ডের সাবেক সিনিয়র রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এবং বর্তমানে সাইমন ফ্রেসার
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অ্যাডজান্ট প্রফেসর। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তিনি বেশ
কয়েকটি বই লিখেছেন। এগুলোর অন্যতম হলো এ ওয়ার্ল্ড উইথআউট ইসলাম, দি ফিউচার
অব পলিটিক্যাল ইসলাম। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে মুসলিম বিশ্বে বসবাস ও কাজ
করছেন।
No comments:
Post a Comment