১৬ এপ্রিল ২০১৬। সকাল সোয়া ৮টায় তালেয়া
ভাবীর ফোন, জানালেন, কিছুক্ষণ আগে ডিবি পরিচয়ে কিছু লোক শফিক রেহমানকে বাসা
থেকে তুলে নিয়ে গেছে। আমি তখনই খবরটি জানিয়ে ফোন করেছিলাম শফিক রেহমানের
ল’ইয়ার মো: আসাদুজ্জামান এবং ধানের শীষের সম্পাদক সায়ন্থ সাখাওয়াৎকে। সকাল
১০টার দিকে শফিক রেহমানের বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন তালেয়া রেহমান। এখানে বিস্তারিত জানলাম, চারজন
ব্যক্তি বৈশাখী টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বাড়িতে ঢোকে। তাদের
সকালের নাশতা দেয়া হয়। এরপর শফিক রেহমান তাদের মুখোমুখি হলে এক রকম জোর করে
তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় বাড়ির দারোয়ানদের বলে
যায় যে, তারা ডিবির লোক। এভাবে জোর করে নিয়ে যাওয়ার সময় শফিক রেহমান তার
স্ত্রীকেও বলে যেতে পারেননি। নিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির লোকজন তার স্ত্রীকে
ঘটনাটি জানায়। তালেয়া ভাবীর সেদিনের চেহারা আমি কোনো দিন ভুলব না। ঘটনার
আকস্মিকতায় হতবিহ্বল, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আতঙ্কিত এবং অসহায়ত্ব তার চেহারায়
স্পষ্ট। ভাবীর একটা কথা এখনো কানে বাজে ‘এমন খারাপ সময় জীবনে আর কখনো
আসেনি’।
ব্যক্তি পরিচয়ের তিন দশক
সালটা ১৯৮৫। পঁচাশির ডিসেম্বরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন জমে উঠতে শুরু করেছে। তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন লিখে চলেছে। পত্রিকাটির সম্পাদক শফিক রেহমান পাঠকদের কাছে একজন হিরো। তার সাহসী এবং তথ্যবহুল লেখা সেই সময় তরুণদের করে তোলে সাহসী এবং রাজনীতি সচেতন। তখন ঢাকায় মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে মাঝে মাঝে জনসভা করতে অনুমতি দেয়া হতো। সে রকম জনসভায় আমিও মাঝে মাঝে যেতাম। এ রকম এক জনসভার কাছাকাছি পৌঁছে দেখলাম একটি গাড়ির সামনে কয়েকজনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শফিক রেহমান। যায়যায়দিন-এর সম্পাদক আমার সামনে। তার সাথে কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। আমি তার পত্রিকার একজন পাঠক বলতেই তিনি আমি কী করি, পত্রিকাটি কেন পড়ি ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি আরো বললেন, যায়যায়দিন-এর ওপর যেকোনো সময় বিপদ নেমে আসতে পারে। পত্রিকাটি সরকার বন্ধ করার চেষ্টা করলে পত্রিকাটি রক্ষা করতে পাঠকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
ব্যক্তি পরিচয়ের তিন দশক
সালটা ১৯৮৫। পঁচাশির ডিসেম্বরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন জমে উঠতে শুরু করেছে। তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন লিখে চলেছে। পত্রিকাটির সম্পাদক শফিক রেহমান পাঠকদের কাছে একজন হিরো। তার সাহসী এবং তথ্যবহুল লেখা সেই সময় তরুণদের করে তোলে সাহসী এবং রাজনীতি সচেতন। তখন ঢাকায় মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে মাঝে মাঝে জনসভা করতে অনুমতি দেয়া হতো। সে রকম জনসভায় আমিও মাঝে মাঝে যেতাম। এ রকম এক জনসভার কাছাকাছি পৌঁছে দেখলাম একটি গাড়ির সামনে কয়েকজনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শফিক রেহমান। যায়যায়দিন-এর সম্পাদক আমার সামনে। তার সাথে কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। আমি তার পত্রিকার একজন পাঠক বলতেই তিনি আমি কী করি, পত্রিকাটি কেন পড়ি ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি আরো বললেন, যায়যায়দিন-এর ওপর যেকোনো সময় বিপদ নেমে আসতে পারে। পত্রিকাটি সরকার বন্ধ করার চেষ্টা করলে পত্রিকাটি রক্ষা করতে পাঠকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
এর কয়েক
দিন পরই যায়যায়দিন-এর সম্পাদকীয়তে দেখলাম, সারা দেশের পাঠকদের নিজ নিজ
এলাকায় রিডার্স রাইটস কমিটি নামে সংগঠন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এই
সংগঠনটি যায়যায়দিন-এর পক্ষে কাজ করবে। আমার এলাকায় রিডার্স রাইটস কমিটির
শেরে বাংলা নগর কমিটি গঠন করেছিলাম। এর কনভেনর ছিলাম আমি। ছিয়াশিতে ‘ত্রিশ
সেট অলঙ্কার’ শীর্ষক কভার স্টোরির জন্য যায়যায়দিন দ্বিতীয় দফা নিষিদ্ধ হয়
এবং শফিক রেহমানকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হলে অনেকের মতো আমিও আমার কমিটির
সদস্যদের নিয়ে একটি ব্যানারসহ জাতীয় প্রেস কাবের সামনে জড়ো হয়েছিলাম।
এরশাদের পতনের আগে যায়যায়দিন আর প্রকাশিত হতে পারেনি। পরে শফিক রেহমানের
কাছে শুনেছি, এরশাদ লোক মারফত শফিক রেহমানের কাছে শর্তসাপেক্ষে যায়যায়দিন
পুনঃপ্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এরশাদের সাথে শফিক রেহমান কোনো
কম্প্রোমাইজ করেননি। একদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সাথে
শফিক রেহমানের ছবিসহ একটি নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে জানলাম,
তিনি লন্ডনে স্পেকট্রাম নামে বহুভাষাভিত্তিক প্রাইভেট রেডিও স্টেশন
প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরপর ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পত্রিকায় তার দেশে ফেরার
কথা জেনে গেলাম দেখা করতে। জানলাম আবার বের হবে যায়যায়দিন, এবারে শুধু পাঠক
নয়, হয়ে গেলাম একজন যাযাদিকর্মী। ছয় বছর পর ১৯৯২-এর মার্চে আবার
নিউজপ্রিন্টের কভারে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন প্রকাশিত হওয়ার পর একটি দৈনিক
পত্রিকার ফিচার সম্পাদক লিখেছিলেন, ১৯৮৪-৮৬ সময়ে যায়যায়দিন-এর মাধ্যমে শফিক
রেহমান এ দেশে একটি বিপ্লব ঘটান। তিনি আবার যায়যায়দিন প্রকাশ করেছেন।
তিনটি বিষয়ের একটি ছিল ভালোবাসা
১৯৯২ সালের শেষের দিকে শফিক রেহমান বলেছিলেন, তিনি আগামী বছর অর্থাৎ ১৯৯৩-এ যায়যায়দিন-এ তিনটি বিষয় ছাড়বেন এবং বিষয় তিনটিই এ দেশের পাঠক গ্রহণ করবে। সে সময় তিনি সেই তিনটি বিষয়ের একটিও কাউকে বলেননি। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভালোবাসা বিষয়ে লেখা চেয়ে যায়যায়দিনে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। তখনো পত্রিকায় কর্মরত আমরা কেউ জানি না কী হতে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত যায়যায়দিন-এ পাঠকদের ভালোবাসা বিষয়ক লেখা থেকে নির্বাচিত কয়েকটি লেখা এবং শফিক রেহমানের একটি লেখায় ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস প্রকাশ করা হয়েছিল। এ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে এ দেশে ভালোবাসা দিন হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই শুরু। এর পরেরটা ইতিহাস। ১৯৯৩-এ ভালোবাসাবিষয়ক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের পর সেই বছর মা দিবস, বাবা দিবসকে সামনে রেখে যায়যায়দিন পাঠকদের লেখা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। যায়যায়দিন শুরু করেছিল, এখন এ দেশে মা দিবস এবং বাবা দিবসও বেশ সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে।
সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক
২০০৬ সালের ৬ জুন সাপ্তাহিক যায়যায়দিন বন্ধ করে প্রকাশ করা হয় দৈনিক যায়যায়দিন। ঢাকায় তেজগাঁওয়ে নিজস্ব ভবনে দৈনিক যায়যায়দিন-এর কার্যক্রম শুরু হয়। তেজগাঁওয়ে লাভ রোডের নামকরণ শফিক রেহমানেরই দেয়া। শফিক রেহমানের প্রস্তাবিত এই নাম ঢাকা সিটি করপোরেশন গ্রহণ করেছিল।যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স নির্মাণের জন্য তেজগাঁওয়ে শফিক রেহমানকে ৬৬ কাঠা সরকারি জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। শুধু শফিক রেহমান নন, আরো অনেক পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল তেজগাঁওয়ে জমি পেয়েছিল। শফিক রেহমান নগদ অর্থে এই জমি সরকারের কাছ থেকে কেনেন। সেই জমির ওপর বস্তি ছিল। সেই বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ না করে তাদের বিকল্প জায়গায় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন শফিক রেহমান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তদবির করে সেই জায়গায় বসবাসকারীদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করেই যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স নির্মাণের কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। এ জন্য দৈনিক যায়যায়দিন প্রকাশের সময় বেশ কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। শফিক রেহমানের মানবিক দিক এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে? দৈনিক যায়যায়দিনকে ঘিরে তার ছিল সুদূরপ্রসারী এক মহাপরিকল্পনা। দৈনিক যায়যায়দিন শুধু পত্রিকা হিসেবেই মানুষের চাহিদা পূরণ করবে না, এই পত্রিকার মাধ্যমে কর্মপোযোগী এবং দক্ষ মানবগোষ্ঠী তৈরির চিন্তাভাবনা ছিল। কিন্তু এসব পরিকল্পনাই থমকে দাঁড়ায়, বলা যায়, তছনছ হয়ে যায় ওয়ান-ইলেভেনে মিলিটারি সমর্থিত সরকার আসায়। শফিক রেহমানের দীর্ঘ দিনের লালিত এবং নিজের চিন্তায় গড়া যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্সটাই হাতছাড়া হয়ে যায় এবং তিনি যায়যায়দিন সম্পাদনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
নতুন লেখক তৈরিতে বিপ্লব
শফিক রেহমান বিপ্লব ঘটিয়েছেন লেখক তৈরিতে। তার জীবনের একটি বড় সময় ব্যয় করেন নতুন লেখকদের পরামর্শ দিয়ে এবং তাদের লেখা এডিট করে। কম বয়সী থেকে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত বহু ব্যক্তিকে তিনি লেখক হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। দেশের জনপ্রিয়তম সাপ্তাহিক পত্রিকা যায়যায়দিন-এ এমন অনেক ব্যক্তিকে দিয়ে লিখিয়েছেন যারা অন্য পেশায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত ছিলেন, তবে লেখালেখির জগতের বাইরে ছিলেন, তাদের তিনি লিখতে উৎসাহিত করেছেন এবং তারা নিয়মিত যায়যায়দিন-এ লিখতেন। দেখেছি, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে পাঠানো এক একটি লেখা কী ধৈর্য সহকারে তিনি পড়েন, এডিট করেন, এমনকি কারো কারো লেখার প্রথম বা শেষ অংশ নিজেই লিখে দেন।
১৯৯৩ সাল থেকে যায়যায়দিন-এ এবং এখন মৌচাকে ঢিলে বহু বিষয়ের ওপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। যেমনÑ ভালোবাসা, গৃহবধূর বেতন কত, প্রাইভেট টিউশন, চায়নিজ রেস্টুরেন্ট, বিটিভির খবর, পুলিশ, মোবাইল ফোন, বিয়ে বাড়ি, আংটি, হসপিটাল ইত্যাদি। এসব বিষয়ের ওপর সারা দেশ থেকে হাজার হাজার গল্প, প্রবন্ধ আসে। এসব লেখার প্রত্যেকটি শফিক রেহমান পড়েন এবং প্রয়োজনে এডিট করেন। এ থেকে বোঝা কঠিন নয় যে, নতুন লিখিয়েদের লেখার পেছনে তিনি কতটা সময় ব্যয় করেন! অন্যের লেখার পেছনে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ার কারণে তার নিজের লেখার সময় গেছে কমে। শফিক রেহমান বলেন, এ দেশে কেউ লেখালেখি করেন বললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি কবিতা লেখেন। ভালো গদ্য লেখকের সংখ্যা এ দেশে কম। তাই গদ্য লেখক তৈরিতে তার এই নিরলস চেষ্টা। যারা লিখতে চান, তারা যেন বিদেশের ভালো গল্পের সাথে পরিচিত হতে পারেন, সে জন্য বিদেশী গল্পের অনুবাদ তিনি প্রকাশ করেন। এই অনুবাদের কাজটিও তিনি নিজেই করেন।
তিনি আর দশজনের মতো নন
এমন বর্ণাট্য এবং বৈচিত্র্যময় যার জীবন, যিনি স্বয়ং একটি ইনস্টিটিউশন, এমন একজন ব্যক্তিত্বকে সরকারি বাহিনীর লোকেরা বাসা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গেল, বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সংস্থাই জানে না, শফিক রেহমানকে কারা নিয়ে গেছে। সোয়া ১১টার দিকে ডিবি অফিস থেকে শফিক রেহমানের বাড়ির ল্যান্ড ফোনে জানানো হয় যে, তাকে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে কাউকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ! শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে এমন অবিশ্বাস্য, হাস্যকর এবং উদ্ভট কথা কোনো দিন শুনতে হবে তা আমরা কখনো ভাবিনি। দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই বুঝে গেছেন যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে শফিক রেহমানকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। একই কারণে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, প্রেস কাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ কারাগারে রয়েছেন। উদ্দেশ্য, বিএনপিকে দুর্বল করা। এই সরকার প্রতিহিংসার এবং নিষ্ঠুরতার অনেক নজির স্থাপন করেছেন। শফিক রেহমানের মতো একজন সংস্কৃতিমনা ও রুচিবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার অসভ্যতার সীমা অতিক্রম করেছে। সীমা লঙ্ঘনকারীকে সৃষ্টিকর্তাও ক্ষমা করেন না। এক মাসের বেশি সময় ধরে শফিক রেহমান কারারুদ্ধ। সম্পূর্ণ বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণাদি ছাড়া একজন নাগরিককে বন্দী করে রাখা বাংলাদেশেই সম্ভব। প্রায় ৮২ বছর বয়সী সর্বজন শ্রদ্ধেয় শফিক রেহমান এতদিন বেঁচে আছেন কি এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য? ১৬ এপ্রিল রিমান্ডে নেয়ার জন্য যখন তাকে কোর্টে নিয়ে হাজতখানায় রাখা হয়, তখন শফিক রেহমান কোর্টে উপস্থিত তার সহকর্মীদের একটি লেখার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
তিনটি বিষয়ের একটি ছিল ভালোবাসা
১৯৯২ সালের শেষের দিকে শফিক রেহমান বলেছিলেন, তিনি আগামী বছর অর্থাৎ ১৯৯৩-এ যায়যায়দিন-এ তিনটি বিষয় ছাড়বেন এবং বিষয় তিনটিই এ দেশের পাঠক গ্রহণ করবে। সে সময় তিনি সেই তিনটি বিষয়ের একটিও কাউকে বলেননি। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভালোবাসা বিষয়ে লেখা চেয়ে যায়যায়দিনে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। তখনো পত্রিকায় কর্মরত আমরা কেউ জানি না কী হতে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত যায়যায়দিন-এ পাঠকদের ভালোবাসা বিষয়ক লেখা থেকে নির্বাচিত কয়েকটি লেখা এবং শফিক রেহমানের একটি লেখায় ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস প্রকাশ করা হয়েছিল। এ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে এ দেশে ভালোবাসা দিন হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই শুরু। এর পরেরটা ইতিহাস। ১৯৯৩-এ ভালোবাসাবিষয়ক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের পর সেই বছর মা দিবস, বাবা দিবসকে সামনে রেখে যায়যায়দিন পাঠকদের লেখা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। যায়যায়দিন শুরু করেছিল, এখন এ দেশে মা দিবস এবং বাবা দিবসও বেশ সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে।
সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক
২০০৬ সালের ৬ জুন সাপ্তাহিক যায়যায়দিন বন্ধ করে প্রকাশ করা হয় দৈনিক যায়যায়দিন। ঢাকায় তেজগাঁওয়ে নিজস্ব ভবনে দৈনিক যায়যায়দিন-এর কার্যক্রম শুরু হয়। তেজগাঁওয়ে লাভ রোডের নামকরণ শফিক রেহমানেরই দেয়া। শফিক রেহমানের প্রস্তাবিত এই নাম ঢাকা সিটি করপোরেশন গ্রহণ করেছিল।যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স নির্মাণের জন্য তেজগাঁওয়ে শফিক রেহমানকে ৬৬ কাঠা সরকারি জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। শুধু শফিক রেহমান নন, আরো অনেক পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল তেজগাঁওয়ে জমি পেয়েছিল। শফিক রেহমান নগদ অর্থে এই জমি সরকারের কাছ থেকে কেনেন। সেই জমির ওপর বস্তি ছিল। সেই বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ না করে তাদের বিকল্প জায়গায় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন শফিক রেহমান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তদবির করে সেই জায়গায় বসবাসকারীদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করেই যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স নির্মাণের কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। এ জন্য দৈনিক যায়যায়দিন প্রকাশের সময় বেশ কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। শফিক রেহমানের মানবিক দিক এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে? দৈনিক যায়যায়দিনকে ঘিরে তার ছিল সুদূরপ্রসারী এক মহাপরিকল্পনা। দৈনিক যায়যায়দিন শুধু পত্রিকা হিসেবেই মানুষের চাহিদা পূরণ করবে না, এই পত্রিকার মাধ্যমে কর্মপোযোগী এবং দক্ষ মানবগোষ্ঠী তৈরির চিন্তাভাবনা ছিল। কিন্তু এসব পরিকল্পনাই থমকে দাঁড়ায়, বলা যায়, তছনছ হয়ে যায় ওয়ান-ইলেভেনে মিলিটারি সমর্থিত সরকার আসায়। শফিক রেহমানের দীর্ঘ দিনের লালিত এবং নিজের চিন্তায় গড়া যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্সটাই হাতছাড়া হয়ে যায় এবং তিনি যায়যায়দিন সম্পাদনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
নতুন লেখক তৈরিতে বিপ্লব
শফিক রেহমান বিপ্লব ঘটিয়েছেন লেখক তৈরিতে। তার জীবনের একটি বড় সময় ব্যয় করেন নতুন লেখকদের পরামর্শ দিয়ে এবং তাদের লেখা এডিট করে। কম বয়সী থেকে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত বহু ব্যক্তিকে তিনি লেখক হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। দেশের জনপ্রিয়তম সাপ্তাহিক পত্রিকা যায়যায়দিন-এ এমন অনেক ব্যক্তিকে দিয়ে লিখিয়েছেন যারা অন্য পেশায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত ছিলেন, তবে লেখালেখির জগতের বাইরে ছিলেন, তাদের তিনি লিখতে উৎসাহিত করেছেন এবং তারা নিয়মিত যায়যায়দিন-এ লিখতেন। দেখেছি, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে পাঠানো এক একটি লেখা কী ধৈর্য সহকারে তিনি পড়েন, এডিট করেন, এমনকি কারো কারো লেখার প্রথম বা শেষ অংশ নিজেই লিখে দেন।
১৯৯৩ সাল থেকে যায়যায়দিন-এ এবং এখন মৌচাকে ঢিলে বহু বিষয়ের ওপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। যেমনÑ ভালোবাসা, গৃহবধূর বেতন কত, প্রাইভেট টিউশন, চায়নিজ রেস্টুরেন্ট, বিটিভির খবর, পুলিশ, মোবাইল ফোন, বিয়ে বাড়ি, আংটি, হসপিটাল ইত্যাদি। এসব বিষয়ের ওপর সারা দেশ থেকে হাজার হাজার গল্প, প্রবন্ধ আসে। এসব লেখার প্রত্যেকটি শফিক রেহমান পড়েন এবং প্রয়োজনে এডিট করেন। এ থেকে বোঝা কঠিন নয় যে, নতুন লিখিয়েদের লেখার পেছনে তিনি কতটা সময় ব্যয় করেন! অন্যের লেখার পেছনে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ার কারণে তার নিজের লেখার সময় গেছে কমে। শফিক রেহমান বলেন, এ দেশে কেউ লেখালেখি করেন বললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি কবিতা লেখেন। ভালো গদ্য লেখকের সংখ্যা এ দেশে কম। তাই গদ্য লেখক তৈরিতে তার এই নিরলস চেষ্টা। যারা লিখতে চান, তারা যেন বিদেশের ভালো গল্পের সাথে পরিচিত হতে পারেন, সে জন্য বিদেশী গল্পের অনুবাদ তিনি প্রকাশ করেন। এই অনুবাদের কাজটিও তিনি নিজেই করেন।
তিনি আর দশজনের মতো নন
এমন বর্ণাট্য এবং বৈচিত্র্যময় যার জীবন, যিনি স্বয়ং একটি ইনস্টিটিউশন, এমন একজন ব্যক্তিত্বকে সরকারি বাহিনীর লোকেরা বাসা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গেল, বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সংস্থাই জানে না, শফিক রেহমানকে কারা নিয়ে গেছে। সোয়া ১১টার দিকে ডিবি অফিস থেকে শফিক রেহমানের বাড়ির ল্যান্ড ফোনে জানানো হয় যে, তাকে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে কাউকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ! শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে এমন অবিশ্বাস্য, হাস্যকর এবং উদ্ভট কথা কোনো দিন শুনতে হবে তা আমরা কখনো ভাবিনি। দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই বুঝে গেছেন যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে শফিক রেহমানকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। একই কারণে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, প্রেস কাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ কারাগারে রয়েছেন। উদ্দেশ্য, বিএনপিকে দুর্বল করা। এই সরকার প্রতিহিংসার এবং নিষ্ঠুরতার অনেক নজির স্থাপন করেছেন। শফিক রেহমানের মতো একজন সংস্কৃতিমনা ও রুচিবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার অসভ্যতার সীমা অতিক্রম করেছে। সীমা লঙ্ঘনকারীকে সৃষ্টিকর্তাও ক্ষমা করেন না। এক মাসের বেশি সময় ধরে শফিক রেহমান কারারুদ্ধ। সম্পূর্ণ বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণাদি ছাড়া একজন নাগরিককে বন্দী করে রাখা বাংলাদেশেই সম্ভব। প্রায় ৮২ বছর বয়সী সর্বজন শ্রদ্ধেয় শফিক রেহমান এতদিন বেঁচে আছেন কি এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য? ১৬ এপ্রিল রিমান্ডে নেয়ার জন্য যখন তাকে কোর্টে নিয়ে হাজতখানায় রাখা হয়, তখন শফিক রেহমান কোর্টে উপস্থিত তার সহকর্মীদের একটি লেখার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
লেখাটি হচ্ছে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির মধুর ক্যান্টিনের
প্রতিষ্ঠাতা মধুদাকে নিয়ে লেখা। ১৯ এপ্রিল মধুদার জন্মদিন উপলে কয়েক দিন
আগে শফিক রেহমান একটি স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ লেখেন। লেখাটি যেন ১৯ এপ্রিলের
আগেই নয়া দিগন্তে পৌঁছে দেয়া হয়। তাই তিনি মনে করিয়ে দেন তার সহকর্মীদের।
এই হচ্ছে শফিক রেহমান। ১৯ এপ্রিল লেখাটি ছাপা হয়েছে, কিন্তু তিনি নিজে
সেটা দেখতে পারেননি। এই মানুষটি ছোটবেলা থেকেই লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড়
হয়েছেন, এই মানুষটি সারাজীবন গণতন্ত্রের প,ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পে কথা
বলেছেন, মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার থেকেছেন, তাকে আজ কারো হত্যা
প্রচেষ্টার মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মানুষটি এ দেশে ভালোবাসা দিবস
প্রবর্তন করেছেন, নিরন্তর ভালোবাসা বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন। যিনি
মৃত্যুদণ্ডের মতো একটি অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে লেখালেখি করে
যাচ্ছেন, তিনি কাউকে হত্যার ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত হতে পারেন তা সুস্থ
মস্তিষ্কের কোনো মানুষ বিশ্বাস করবে না। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, বিবেক,
চক্ষুলজ্জা, নিয়মনীতি কোনো কিছুর তোয়াক্কা বা পরোয়া এই সরকার যে করে না তার
অন্যতম উদাহরণ হয়ে থাকবে শফিক রেহমানকে গ্রেফতার ও রিমান্ডের ঘটনা। বিশ্বে
ভালোবাসা দিবসের প্রবক্তা সেইন্ট ভ্যালেনটাইনসকে যেমন অন্যায়ভাবে দণ্ড
দেয়া হয়েছিল, তেমনি এ দেশে ভালোবাসা দিবসের প্রবর্তক শফিক রেহমান আজ
শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে নির্জন কারাগারে বন্দী আছেন। আমরা বিশ্বাস করি,
মিথ্যা পরাস্ত হবে এবং শফিক রেহমান মুক্ত হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।
No comments:
Post a Comment