Thursday, June 2, 2016

নারায়ণগঞ্জবাসী ভুল করেননি তো!

শ্যামল কান্তি ভক্ত, একজন শিক্ষক। যত অভিযোগ থাকুক, তার এই পরিচিতিটি শ্রদ্ধা ও সম্মান পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তার পক্ষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটিও ইতিবাচক। এই সরকারের আমলে সিভিল সার্ভেন্টস, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার লোক দলীয় ক্যাডারদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। কোনো কোনো ঘটনা অনেকে বিবেচনায়ও নেননি। শ্যামল কান্তি ভক্ত সে তুলনায় ভাগ্যবান; ব্যতিক্রমী প্রচার পেলেন। সহমর্মিতাও পেয়েছেন প্রচুর। এটা কি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ‘নিগৃহীত’ হওয়ার কারণে! সংখ্যাগুরুদের গ্রাস থেকে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সবার সচেষ্ট থাকা উচিত। অবশ্য বাংলাদেশী পরিচিতির ভেতর গুরু-লঘু ভাবনা না থাকাই উত্তম। কয়েকটি মিডিয়া ও শ্রেণীবিভক্ত সুশীলসমাজের একটা অংশ যুক্তিহীন কিন্তু দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তবে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতিক্রিয়া ছিল শীতল এবং আলাদা ধরনের। অভিযুক্ত সেলিম ওসমান অচেনা মানুষ নন। তিনি যতটা না রাজনীতিবিদ তার চেয়ে ঢের বেশি ব্যবসায়ী।
আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক ঐতিহ্যগত ও কৌশলের। সরকারি দলের কেন্দ্রীয় নেতা এবং কয়েকজন মন্ত্রী সেলিম ওসমানের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তবে কেউ তাকে ‘গড ফাদার’ বলেননি। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগসম্পৃক্ত সব নেতা কেন্দ্রের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন। তারা মন্ত্রীদের সাথে সুর মেলাননি, বরং সেলিম ওসমানকেই জোরালো সমর্থন দিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির ওপর অপ্রতিহত প্রভাব সৃষ্টি করেছেন। শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন নামে ও ব্যানারে সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন চলেছে। এতে সরকারি দলের সব অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদেরও সেলিম ওসমানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। বিএনপিসহ স্থানীয় সব বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা কেউ চুপ থেকেছেন; যারা মুখ খুলেছেন তারা কেউ শ্যামল কান্তি ভক্তকে সমর্থন জোগাননি। বরং নারায়ণগঞ্জবাসীর ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে ভক্ত বাবুর বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে জেলা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ছাড়াও হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা কম-বেশি সেলিমের পক্ষে যায় এমন সব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। নিজ নিজ সংগঠনের পক্ষ থেকেও কর্মসূচি পালন করেছেন। সেলিম ওসমানের দুঃখ প্রকাশের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে এবার যে চরিত্রটি দেখা গেল, তার কারণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ না ওসমান পরিবারের একাধিপত্যের ফসল, সেটা বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশের মানুষের মনমননে শ্যামলবিদ্বেষ স্বাভাবিক নয়। সাধারণ মানুষের ক্ষোভটা একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল ধর্মের ব্যাপারে কটূক্তিকারী একজন মানুষের বিরুদ্ধে। শ্যামল কান্তি হিন্দু হয়ে ইসলামের ব্যাপারে অবজ্ঞা প্রদর্শনের অভিযোগ স্থানীয় মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। তা ছাড়া শ্যামল বাবু শিশুছাত্র পিটিয়ে নিজেকে নিষ্ঠুর ও ভারসাম্যহীন শিক্ষক বলে প্রমাণ করেছেন। তাই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভটা অসঙ্গত ছিল না।
এ ধরনের ক্ষোভ কোনো রাজনীতিবিদ সহজে ব্যবহার করার সুযোগ নিলে আলাদা কথা। নারায়ণগঞ্জবাসী কোনো ভুল করেছেন বলে মনে হয় না। এখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সংখ্যালঘুদের একটি অংশের অতি উৎসাহ, সংখ্যাগুরুদের ওপর খবরদারি করার প্রবণতা এবং আপার হ্যান্ডে থাকার অবস্থাটাকে স্বাভাবিক মনে করছেন না। এটাকে সংখ্যানুপাত ও ডেমোগ্রাফির ব্যত্যয় ভাবছেন। এ জন্য ভারতের ও বাংলাদেশের শাসকদের নীতিগত অবস্থান ও ভোট ব্যাংকের রাজনীতি দায়ী কিনা সেটাও মূল্যায়নের দাবি রাখে। তবে এ জন্য দু’দেশেরই জনগণ দায়মুক্ত। উল্লেখ্য, ১৩ মে শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠবস করান সেলিম ওসমান। ওই শিকের বিরুদ্ধে ইসলামধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ তোলা হয়। অমানবিকভাবে ছাত্র পেটানোর জন্যও এই শিক্ষক অভিযুক্ত। কয়েকজন ছাত্র ভক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে। অবশ্য শিা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ভিন্ন বক্তব্য মেলে। চাকরিচ্যুত শ্যামল কান্তি ভক্তকে পুনর্বহাল করেছে মন্ত্রণালয়। স্কুল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করার দায়ও নিলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় ন্যায়সঙ্গত বিচারেও গেল না, নারায়ণগঞ্জবাসীর সংবেদনশীল মনের তোয়াক্কাও করল না। মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী এতটা ক্ষিপ্রতার সাথে সিদ্ধান্ত চাপালেনÑ যা রীতিমতো বিস্ময়কর এবং অতি উৎসাহ দেখানোর দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। আদালত স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাকে দায়সারা বলেছেন। অথচ প্রশাসন জনগণের স্বার্থে স্বচ্ছ হতে পারত। বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক ভাবনাতাড়িত নন, তবে সম্প্রদায়সচেতন। বিশেষত নিজে ধর্ম পালন না করলেও ধর্মবিদ্বেষ মানুষ পছন্দ করে না। নারায়ণগঞ্জ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু কেউ ক্ষমতার আনুকূল্য ও আশকারা পেয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেললে তাকে সহ্য করার তেমন কোনো কারণ নেই। তার পরও ভোট ব্যাংকের রাজনীতি আওয়ামী লীগের মজ্জাগত।
এ রাজনীতি জাতির মনস্তাত্ত্বিক ভাবনাকে আহত করে; দেশের ভাবমর্যাদা ুণœ করে, গরিষ্ঠ মানুষকে বিব্রত করে। ১৪ দলের সমন্বয়কারী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম একটি দৈনিককে বলেছেন, তার বক্তব্য দলের কেন্দ্রের। স্থানীয় রাজনীতি ও জনমত মোহাম্মদ নাসিম উপেক্ষা করেছেন। তিনি হয়তোবা একমুখো পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি মাথায় রেখেছেন। ভারতের প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করেছেন। ভোট ব্যাংকের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই সুর মিলিয়েছেন। শিামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীসহ আরো কয়েকজন সরকারদলীয় নেতা সেলিম ওসমানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। এদের মধ্যে কয়েকজনের বক্তব্য প্রান্তিক ও তাৎক্ষণিক। অনেকের বক্তব্য নারায়ণগঞ্জবাসীর অনুভূতিকে বিদ্রƒপের কাছাকাছি নিয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের চিরায়ত ভাবনাচিন্তা ও বিশ্বাসের সমান্তরাল নয়। যদি সমান্তরাল হতো, তাহলে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা সেলিম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনের সময় তার সাথে উপস্থিত থাকার কথা ছিল না। খোকন সাহা স্থানীয় রাজনীতির জটাজালে আটকে গেছেন, নাকি সংুব্ধ মানুষের হৃদস্পন্দন বুঝে ভূমিকা রেখেছেন, যা যথার্থ ভাবা যেতে পারে। এমনও ভাবার সুযোগ থাকে, ওসমান পরিবারের বাইরে অবস্থান নিয়ে তার টিকে থাকার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। এসব বিষয়-আশয় দলীয় নীতিনির্ধারকেরাই ভালো বুঝবেন। স্থানীয় অপরাপর প্রায় সব দলের নেতার অবস্থান ওসমান পরিবারের পক্ষে না হলেও শ্যামল কান্তি ভক্তের পক্ষে ছিল না। অনেক স্থানীয় নেতাই নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতা, ভক্তের ‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি’, ছাত্র পেটানো এবং ভারসাম্যহীন আচরণকে বিবেচনায় নেয়ার পক্ষে ছিলেন। তাদের চোখের ও মুখের ভাষা ছিল এমনÑ ইসলামধর্ম ওসমান পরিবারের পারিবারিক বিষয় নয়; সব মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে আক্রান্ত করার শামিল। তা ছাড়া শাস্তি দেয়া আর নির্মম আচরণ করা এক কথা নয়। তাই তারা নিজ নিজ দলের কেন্দ্রের অবস্থানকে, কিছু ‘সুশীল’ ও মিডিয়ার সমান্তরাল ভাবনা আমলে নেননি। প্রতিবাদ করাকে ন্যায়সঙ্গত ভেবেছেন। তারা এটাও মনে করেছেন, মন্ত্রণালয়ের তদন্তে যাই বলা হোক, শ্যামল কান্তির কটূক্তির বিষয়টি অচিরেই স্পষ্ট হবে। তাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের ভুলও ভাঙবে।
তখন রাজনীতি যা হওয়ার তা হয়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জের পরিচিত মুখ মেয়র আইভি চুপ ছিলেন। আরেক পরিচিত মুখ বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার অবশ্য ভিন্ন সুরে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ও তার দল দু’টি বিষয়কে সমানভাবে নিন্দা করেন। তার বক্তব্য ঋজু, ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে শ্যামল বাবু যেমন অন্যায় করেছেন, তেমনি তাকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে অন্যায় করেছেন সেলিম ওসমান। এ ছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, হেফাজতে ইসলাম এবং বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন সেলিম ওসমানের পে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে বিকেএমইএ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার ও অন্যান্য সংগঠন সেলিম ওসমানের পে মাঠে নেমেছে। স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির স্থানীয় নেতাদেরও সেলিম ওসমানের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। বাস্তবে সেলিম ওসমানের বিপে নারায়ণগঞ্জে কোনো কথিত প্রগতিশীল নেতাকর্মী দাঁড়াননি কিংবা দাঁড়াতে পারেননি। সে তুলনায় ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ধর্মের ব্যাপারে কটাক্ষের অভিযোগে শ্যামল কান্তিবিরোধী প্রতিবাদী অবস্থান জনগণকে অধিকতর সম্পৃক্ত করেছে। সেলিম ওসমান বিলম্বিত বোধোদয় এবং দুঃখ প্রকাশের সাথে তার বিরুদ্ধে নিন্দাকারীদের স্বরূপ চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। এটা তার নৈতিক সাহস নাকি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, সেটা আলাদা মূল্যায়নের বিষয়। তবে তার দু’টি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। মোহাম্মদ নাসিমকে তিনি শুধু কিছু অনিয়মের খোঁটা দেননি, ‘উপরের দিকে থুথু ছিটালে নিজের গায় মাখতে হয়’ এই প্রবচনটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া তার ‘কোনো হিন্দুকে উঠবস করাননি; একজন নাস্তিককে প্রাপ্য শাস্তি দিয়েছেন’Ñ এ বক্তব্যটিও বিবেচনার দাবি রাখে। শ্যামল কান্তি ভক্তকে নিয়ে একটি কেসস্টাডি হতে পারে। অবশ্য ৭ খুন, ত্বকী হত্যা এবং আইভি-শামীম নিয়েও কেসস্টাডি হতে পারত।
এখন ভেবে দেখার বিষয় হচ্ছে, একজন শিক্ষক হয়ে শ্যামল বাবু ধর্মবিদ্বেষ ছড়াতে গেলেন কেন। পঞ্চম শ্রেণীর একজন ছাত্রের ওপর এতটা নিষ্ঠুর আচরণের কারণ কী। তার রাজনৈতিক রঙ কী। শ্যামল বাবু কেন কমিটির বিরাগভাজন হলেন। তিনি ভারসাম্যহীন (সেলিম ওসমানের ভাষায় তার ছেড়া) মানুষÑ এটা কতটা সত্য। নারায়ণগঞ্জে বসবাস করে তিনি ওসমান পরিবারের প্রভাব ও ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করতে গেলেন কেন। মনে হয়, শ্যামল বাবু ভালো হিন্দুও নন। কখনো সেলিম ওসমান তার ‘দেবতা’, কখনো মন্ত্রী নাসিম তার ‘ভগবান’। একজন শিক্ষক কি করে এতটা মেরুদণ্ডহীন হতে পারেন। ভালো ঈশ্বরবাদীরও এমনটি করার কথা নয়। ধর্মপ্রাণ হিন্দু অন্য ধর্মকে মৌলিক ভাবেন না, আদি অকৃত্রিমও মনে করেন না, কিন্তু অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষও ছড়ান না। প্রকৃত ধর্মের চর্চা যারা করেন তারা সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদ লালন করেন না। ধর্মীয় অন্ধত্ব বা উন্মাদনা প্রকৃত ধার্মিকের মনে ঠাঁই পায় না। তাহলে কি ধরে নেয়া যায়, শ্যামল বাবু বাস্তবে ধর্মবিশ্বাসী মানুষই নন। পৃথিবীর কোনো কুলাঙ্গার ছাড়া, কোনো ধর্মের মানুষই ঈশ্বর গড ইলাহ ও আল্লাহ নামের সাথে অশালীন ও ধৃষ্ঠতাপূর্ণ মন্তব্য যোগ করে না। সবাই ভাবেন এটা মহান সৃষ্টিকর্তার নামÑ যা বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসের অংশ এবং সব ধর্মের বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক ও পাক পবিত্রও। তাহলে শ্যামল বাবু কি সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কারো অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলেন! ওলামা লীগসহ কিছু সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেÑ বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পড়শি দেশের আনুকূল্যে, সরকারের ভোটব্যাংক রাজনীতির সুযোগে অনভিপ্রেত প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ নিচ্ছেন। আনুপাতিক সুবিধার চেয়ে কম যোগ্যতা নিয়েও বেশি সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তাদের অনেক অতিরিক্ত ঠাটবাটও কারো কারো চোখ টাটাবার কারণ হয়ে যাচ্ছে। এ মূল্যায়ন কতটুকু বাস্তব সেটা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সরকারের। তবে ডিইসলামাইজেশনের একটা প্রবাহ সৃষ্টির পশ্চিমা প্রেতের ছায়া পড়শি দেশ হয়ে বাংলাদেশেও প্রবেশ করেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের অজ্ঞাতেই হয়তো পাঠ্যসূচিতে মৌলিক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারছে। এটা যদি কারো প্রেরণার উৎস হয়Ñ তাহলে সেলিম ওসমানদের বক্তব্য অবশ্যই হালে পানি পাবে। এ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না।
যে দু’চারবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো ইমাম-মোয়াজ্জিন, আলেম-ওলামা কিংবা ধর্মপ্রাণ মানুষ সৃষ্টি করেননি। ধর্মীয় কোনো দলও এ ধরনের অপকর্ম করেনি। করেছে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় যারা ভোট ব্যাংকের ফায়দা তোলে, তারা। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জমিজিরাত বেহাত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটলে সেটার দায় কাদের ওপর বর্তায় সেটা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের বক্তব্যে স্পষ্ট। সেলিম ওসমান শ্যামল বাবুর বিরুদ্ধে কিছু আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার দাবি তুলে ধরেছেন। ভারতের ভেলোরে চিকিৎসা ও মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে তার আবদার বা আপস রফার দাবি সত্যি হলে চোখ ছানাবড়া হওয়ার মতো বিষয়। কোনো শিক্ষক কি তার আত্মমর্যাদা এভাবে বিকাবার কথা ভাবেন? এসব উপেক্ষা করলেও শ্যামল বাবুর ধর্ম অবমাননার অভিযোগের আইনি বিচার হতে পারত। কান ধরে ওঠবস করানো আইন প্রণেতা দাবিদারদের জন্য অশোভন এবং আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। সে ব্যাপারেও রাজনৈতিক ‘মালিশ’ দৃষ্টি এড়ায় না। এই দেশের নাম বাংলাদেশ। এটা পূর্ব বাংলার বনেদি ভূমির সাংবিধানিক নাম, রাষ্ট্রিক পরিচিতি। এখানে অসম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বাস করেন। এখানকার মানুষের রঙ, বর্ণ, ধরন ও পরিচিতি অন্য কোনো অঞ্চলের মতো নয়। এই রূপ, রঙ ও পরিচিতিটি বুঝতে হলে স্বাধীনতার অন্যতম রূপকার মরহুম আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ পড়ার তাগিদ দেবো। সেখানে শুধু বাঙালি মুসলমানের মন খুঁজে পাওয়া যাবে নাÑ এই জাতিরাষ্ট্রের আসল পরিচিতিও খুঁজে পাওয়া যাবে। আবিষ্কার করা যাবে এই জাতির আত্মাটিও। সম্ভবত এ কারণেই এখন শিক্ষাঙ্গনে সিলেবাসে আবুল মনসুরও জায়গা পান না; জানি না এর শেষ কোথায়, সেটা শাসকেরা আদৌ ভাবছেন কিনা।
masud2151@gmail.com

No comments:

Post a Comment