দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২১ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। ফলে এবার প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গতকাল রাজধানীর হোটেল লেকশোরে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ড. আবদুর রাজ্জাক। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়া দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক নেতা, শিল্প উদ্যোক্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকাররা সংলাপে অংশ নেন। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেন, যারা অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের কথা বলছেন, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক স্থিতিশীল ও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সিপিডির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংগঠনটি বিপরীতমুখী কথা বলছে। একবার তারা বলছে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায় কম। আবার রাজস্ব আদায়ের জন্য ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে চাইলে তারা এর বিরোধিতা করছে। এ অবস্থায় সরকার কীভাবে রাজস্ব আদায় বাড়াবে। তিনি বলেন, ভ্যাট আইন তৈরির সময় সবার অংশগ্রহণ ছিল। সিপিডিসহ সবাই বলছে, এটি অত্যন্ত সুন্দর এবং কার্যকর আইন। কিন্তু আইনটি বাস্তবায়নের সময় বিরোধিতা আসছে। মুস্তাফা কামাল বলেন, দেশে বিনিয়োগ কমছে, এটা সঠিক নয়। কারণ, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৯.৬২ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে তা ২৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ২৫.৬ শতাংশ। ফলে প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বিনিয়োগে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, প্রতিবছরই জিডিপির আকার বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগও বাড়ছে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থানও আনুপাতিক হারে বাড়ছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। তিনি বলেন, আমাদের অর্জনের অন্যতম হলো মূল্যস্ফীতি। সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশ। সর্বশেষ রিপোর্টে তা ৫.৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী অর্থবছরে তা ৫.৮ শতাংশে রাখার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা কর বাড়ানো নিয়ে আলোচনা করছি। এর আগে মৌলিক কথা রয়েছে। তা হলো প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর আদায় যৌক্তিক কিনা। তিনি বলেন, দেশে নাগরিকদের জন্য কয়েকটি মৌলিক উপাদান জরুরি। এগুলো হলো গণতন্ত্র, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, কথা বলার অধিকার, নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন। বর্তমানে এর কোনোটিই নেই। আর এই জিনিসগুলো না থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগ হবে না। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা না থাকলে কেউ বিনিয়োগ করবে না। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পরিকল্পনামন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা শুনলে মনে হয়, ২০৪১ সালের আগে আর দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। যারা দেশ চালায়, এই যখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তখন বিনিয়োগ আসবে কীভাবে- প্রশ্ন রাখেন তিনি। সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কেউ কোথাও কোথাও বলে থাকেন, আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়নে কোনো জবাবদিহি থাকে না। যেমন বর্তমানে দেশে চার লেনের ১ কিলোমিটার রাস্তা তৈরিতে ৫৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। চীনে এই ব্যয় ১৩ কোটি টাকা এবং ভারতে ১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাস্তা নির্মাণে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় বাংলাদেশে। কোথাও এর জবাবদিহি নেই। বিএনপির এই নেতা বলেন, দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু থেকে সরে গেছে বিশ্বব্যাংক। ওই সময়ে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আমাদের ধারণা, এই ব্যয় ৯ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। আর এভাবেই সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার প্রবৃদ্ধির কথা বলছে। কিন্তু কোথায় এই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি রচনা হলো, তা একবারও বলছে না। তার মতে, বিএনপির সময় প্রথম প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে উন্নীত হয়। ওই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে প্রবৃদ্ধি এখন ডাবল ডিজিটে (দুই অংকে) যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে যতগুলো সংস্কার হয়েছে, সব বিএনপির আমলে। আওয়ামী লীগের আমলে সময় উপযোগী কোনো সংস্কার হয়নি। যে কারণে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে। বিএনপির এই নেতা বলেন, এবারের বাজেটে নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ ২০০ কোটি টাকা কমিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে হয়, নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ একেবারে বাদ দেয়া উচিত। যেহেতু দেশে কোনো নির্বাচন অদূর ভবিষ্যতেও আর হওয়ার সম্ভাবনা নেই, ফলে নির্বাচন কমিশনের দরকার কী। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেন, বিএনপি নেতা যা বলেছেন, এ ব্যাপারে আমার তেমন কোনো বক্তব্য নেই। কারণ, বর্তমান সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় বিএনপির কোনো অবস্থান নেই। এককথায় বিএনপি কোনো দলই না। তিনি বলেন, নির্বাচনের বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এর যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ, নির্বাচন কমিশনই টাকা বরাদ্দ চায়। সেক্ষেত্রে আগামী এক বছরে যেহেতু তাদের কোনো নির্বাচন নেই, ফলে বরাদ্দ কমবেই। মন্ত্রী বলেন, রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়। তা হলো আমাদের দেশে রাস্তা নির্মাণ করতে হলে জমি অধিগ্রহণ করতে হয়। কিন্তু চীন ও ভারতে ফ্রি জমি পাওয়া যায়। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, বাজেটে কয়েকটি বিষয় সংস্কার করা জরুরি। এর মধ্যে বাজেট তৈরিতে সংসদীয় কমিটির আরো সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। পাশাপাশি বাজেট নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে আরো সময় দিতে হবে। না হলে বাজেটের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো যাবে না। মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন বলেন, ব্যাংকে প্রচুর পরিমাণ অলস অর্থ পড়ে আছে। সরকারও ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় না। ফলে সুদের হারও ৯ থেকে ১১ শতাংশে মধ্যে চলে এসেছে। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বন্ধ করা উচিত। তিনি বলেন, বিদেশি ঋণ ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দেশের ব্যাংকও ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনীতিতে বেশ কিছু দুর্বল দিক রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম হলো, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নেই। এছাড়া উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান নিম্নমুখী, রাজস্ব পরিকল্পনায় দুর্বলতা, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি, লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন একেবারেই কম এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের বড় ধরনের ঘাটতি। এসবই সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ। আর এই বাস্তবতা সামনে নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে ৭.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এই পরিমাণ প্রবৃদ্ধির জন্য সরকারের আয় আরো ৬৫ হাজার কোটি টাকা বাড়াতে হবে। সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে আরো ৭৫ হাজার কোটি টাকা। আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে আরো ৮০ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে জিডিপির ২১.৮ শতাংশ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ২৩.৩ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাজেটে স্পষ্ট করে বলা হয়নি বিনিয়োগের টাকা কোথা থেকে আসবে। যে কারণে এ বছরও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, কালো টাকা বিনিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন কথা আসছে। তবে এই টাকাকে অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসা দরকার। তার মতে, একটি আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বেনামি সম্পদকে মূলধারায় আনতে না পারলে টাকা পাচার হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে নিয়মিত করের সঙ্গে জরিমানার বিধান অব্যশই থাকতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এডিপি বাস্তবায়ন ও কর আহরণের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়ে গেছে। এডিপি নিয়ে নতুন কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই। সিপিডি বিশ্লেষণে বলা হয়, আগামী বছরে ঘাটতি অর্থায়নেও বড় দুর্বলতা রয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের অনুন্নয়ন বাজেট বেড়েছে। এছাড়া বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাড়ছে না করের আওতাও। ফলে যারা কর দিচ্ছেন তাদের ওপর চাপ আরো বেড়েছে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment