রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বারিধারা, উত্তরা প্রভৃতি স্থানকে এখন
অভিজাত এলাকা বলে মনে করা হয়। তেমনি ওয়ারী থানা এলাকার ওয়ারী ও এর আশপাশের
স্থানকেও একসময় মানুষ অভিজাত এলাকা বলত। এ অভিজাত এলাকার আভিজাত্য আরো
বাড়িয়ে দেয় ওয়ারীতে গড়ে তোলা ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো মনোমুগ্ধকর বলধা
গার্ডেন। এ গার্ডেনকে বোটানিক্যাল গার্ডেনও বলা হয়ে থাকে। ৩.১৫ একর জমির
ওপর গড়ে তোলা এ গার্ডেন বা বাগানে রয়েছে দেশী-বিদেশী, নতুন-পুরনো বাহারি
নানা ধরনের উদ্ভিদ। বলধা গার্ডেনকে উদ্ভিদের জাদুঘরও বলা হয়ে থাকে।
রাজধানীতে গর্ব করার মতো যতগুলো গার্ডেন বা দর্শনীয় স্থান রয়েছে, বলা যেতে
পারে, এ গার্ডেন সেগুলোর একটি। এটি প্রায় ১০৬ বছরের পুরনো। রয়েছে
দেশী-বিদেশী দুর্লভ নানা বৃক্ষ-গুল্মও। একসময় সেখানে প্রবেশ করলে চোখে
পড়ত ৮০০ প্রজাতির ১৮ হাজারের মতো গাছ। সাইকি বলধারই অপর একটি অংশ বা ইউনিট।
সেখানেও রয়েছে দুর্লভ ও সাধারণ (নানা ধরনের) গাছ। তবে এ ইউনিটটি বর্তমানে
বলধার খোলা অংশটির তুলনায় বেশ ছোট। সাইকি অংশটি বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ রাখা
হয়েছে। ফলে বৃক্ষ বা প্রকৃতিপ্রেমিকরা খোলা অংশেই প্রবেশ করেন।
দর্শনার্থী
ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘যখন বলধা গার্ডেনের দু’টি অংশ বা ইউনিট দর্শনার্থীদের
জন্য খোলা থাকত তখন বেশি ভালো লাগত। শিশুরাও বেশ আনন্দ পেত। সাইকি অংশ
বন্ধ রাখার কারণে এ অংশ বা ইউনিটের প্রতি দর্শনার্থীদের যেন কৌতূহল বেড়েছে।
অনেকে মনে করেন, এর ভেতরটা না জানি কেমন, কেমন ধরনের উদ্ভিদই না আছে।
অনেকে তাই বলেন, ফের বর্ধিত বা সাইকি অংশটিও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত
করে দিলে আরো ভালো হয়। তাতে তাদের আনাগোনাও বাড়বে। তবে উদ্ভিদবিদ্যার
শিক্ষার্থীদের জন্য সাইকি অংশ বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে অল্প সময়ের জন্য খুলে
দেয়া হয়। সেখানেও এ সংক্রান্ত অনেক শর্তারোপ করেছে বাগান কর্তৃপক্ষ। নানা
রঙের শাপলা, দেশী-বিদেশী ক্যাকটাস (বিরল প্রজাতির), অ্যানথুরিয়াম, অর্কিড,
বকুল, ভূর্জপত্র প্রভৃতি ছিল সাইকি অংশের প্রধান বা বিশেষ আকর্ষণ। ছিল
মিসরীয় প্যাপিরাসও। আকর্ষণীয় নানা উদ্ভিদের ভাণ্ডার ছিল বলেই একসময় বলধা
গার্ডেনকে বলা হতো ‘উদ্ভিদের জাদুঘর’। ওই সময়ে নিসর্গবিদরা বলতেন, বলধাকে
জাদুঘর বলাই ঠিক হয়েছে। সাইকি অংশের প্যাপিরাস গাছটি দেখতে অনেক দূর থেকেও
আসত দর্শনার্থীরা। এর কারণ আছে। জানা গেছে, এ বিরল প্রজাতির গাছ এ দেশে
একটিই ছিল। যদিও কালের বিবর্তনে এ পর্যন্ত অনেক গাছ মরে গেছে। তার পরও
বলধা গার্ডেনকে কেবলই বাগান বা উদ্যান ভাবা যাবে না। আগেই বলা হয়েছে, এটি
উদ্ভিদ জাদুঘর। এ গার্ডেন গড়ে তোলা হয়েছিল ১৯০৯ সালে মানুষের অবকাশ যাপনের
জন্য। এ বাগানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল একটি জাদুঘর ও একটি গ্রন্থাগার। ১৯৪৩
সালের দিকে বলধা গার্ডেন পরিচালিত হতো কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে একটি
ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে। পরে এর দেখভালের ভার যায় কোর্ট অব ওয়ার্ডসের
ওপর।
এরই ধারাবাহিকতায় বাগানটির দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তান সরকারের বন
বিভাগের ওপর ১৯৬২ সালে। আর এখন জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি স্যাটেলাইট
ইউনিট এটি। এর প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন
জমিদার বা ল্যান্ডলর্ড। তার মৃত্যুর পর তার বড় পুত্র এ বাগান সরকারের হাতে
তুলে দেন। সরকারও মনে করে, তা তাদের নিয়ন্ত্রণে এলে এই দর্শনীয় স্থান থেকে
রাজস্ব আয় হবে, যা দেশের অর্থনীতির একটি ভালো দিক বলা যায়। এটি একটি
ঐতিহাসিক নিদর্শনও। এখানে রয়েছে ক্লাইম্বিং আইভি, নস, প্রায় চার ক্রিপারস
(লতা-জাতীয়), প্রায় দুই হাজার অর্কিড, জলচর নানা বৃক্ষ, ক্যাকটিও এখানকার
বিশেষ আকর্ষণ। কিছু গাছের চারা আমদানি করা হয় শ্রীলঙ্কা, জাপান, ট্রপিক্যাল
আইসল্যান্ডস, আফ্রিকার কিছু দেশ, অস্ট্রেলিয়া, জাভা ইত্যাদি থেকে। গর্ব
করার মতোও নিদর্শন ছিল এটি। তবে নানা অব্যবস্থাপনার কারণে ক্রমেই
অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে বলধা গার্ডেন। নানা কারণে রুচিশীল দর্শনার্থীরাও খুব
একটা আসতে চান না এখানে। বলধার চার পাশে (বাইরে) প্রচুর হাইরাইজ বিল্ডিং
গড়ে উঠেছে। তাতে দুপুরেও খুব একটা আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে না এর ভেতরে।
অনেক সময় বাইরে থেকে বর্জ্য পড়ে বাগানের ভেতর। গাছ গাছালির প্রয়োজনীয়
পরিচর্যাও হয় না বলা যায়। বৃষ্টি হলে এর ভেতর পানি জমে থাকে। এসব কারণে
দুর্লভ পুরনো অনেক গাছ মরে গেছে। মরে যাওয়া অনেক ধরনের গাছ ফের পাওয়া কঠিন
বলে জানিয়েছেন বাগান পরিচর্যাকারীরা।
তবে উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যথাযথ
উদ্যোগ নিয়ে ভবিষ্যতে মরে যেতে পারে, এমন গাছ বাঁচানো সম্ভব। এসব প্রজাতির
গাছের চারা বা কলম অন্যত্র নিয়ে লাগাতে হবে। তবে খুশির খবরও আছে। জানা
গেছে, ঢাকার কাছাকাছি জমি খোঁজা হচ্ছে দ্বিতীয় বলধা গার্ডেন গড়ে তোলার
জন্য। আর তা করা হবে বিদেশী ভালো মানের বাগানের আদলে। একসময়ে দুষ্প্রাপ্য
সুপারপাইন ছিল দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণীয় গাছ। সেটি এখন নেই। এটি ফের
লাগানোর চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। হারিয়ে যাচ্ছে চন্দন গাছ। সেটি
বাঁচানোর পরিচর্যা চলছে। তবে সাইকির তুলনায় সাইবেলি (খোলা অংশ) বেশি ক্ষতির
শিকার হচ্ছে। সাইকি অংশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে এর কিছু জমি বেহাত হয়েছে বলে
জানা গেছে। এর পেছনে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে। বিষয়টি দেখা দরকার
বাগান কর্তৃপক্ষকে। একসময় গার্ডেনটির উভয় অংশের মাঝে কোনো রাস্তা বা
বিভাজন ছিল না। অর্থাৎ উভয় অংশ ছিল অখণ্ড উদ্যান। তবুও উদ্ভিদ বিজ্ঞানের
শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে ঐতিহ্যের এ বলধা গার্ডেন এক জীবন্ত অভিধান। প্রতিদিন
সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ গার্ডেন শরণার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য (টিকেট) ২০ টাকা। কয়েক মাস আগেও প্রবেশ টিকিট মূল্য
ছিল ১০ টাকা। দর্শণার্থীরা বলেন, প্রবেশ মূল্য বেশি। তাই এর মান আরো ভালো
হওয়া দরকার।

No comments:
Post a Comment