Saturday, June 4, 2016

সরকার দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? by সালাহউদ্দিন বাবর

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ না থাকলে কোনোখানেই স্বাভাবিক অবস্থা আর বিরাজ করতে পারে না। বাংলাদেশেরও এখন রাজনৈতিক পরিবেশ উদ্বেগজনক। সর্বত্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের শুরু থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে সুষ্ঠু ধারা সৃষ্টি হতে পারেনি। স্বাধীনতার পর সবার এই প্রত্যাশাই ছিল। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, যে নেতৃত্ব স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল তাদের মাধ্যমে দেশ একটা নতুন ও কাক্সিত পথে অগ্রসর হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। সে সময় পৃথিবীতে দু’টি ধারার শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল। একটি গণতান্ত্রিক, অন্যটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশের জন্মের সময় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভুলত্রুটিগুলো বেরিয়ে আসতে থাকে। এই শাসনব্যবস্থা নিয়ে যে মোহ ছিল, তা কাটতে শুরু করে একপর্যায়ে। পৃথিবীতে যেসব দেশে সমাজতান্ত্রিক শাসন ছিল, সেখানে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। সে সময় বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনেরা কোনো বিচার-বিবেচনা না করেই সমাজতন্ত্র নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করার প্রস্তুতি বা অভিজ্ঞতা কিছুই নেতাকর্মীদের ছিল না। এর ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সব আয়োজন পণ্ড হয়ে যায়।
জাতি এক মহাসঙ্কটে পড়ে এবং সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। সে এক করুণ অবস্থা। সমাজতন্ত্র মানে প্রধানত একদলীয় শাসনব্যবস্থাকেই মনে করেছিলেন তৎকালীন শাসকেরা। তাই সব দল ও মতকে রুদ্ধ করা হয়। কৌশলে শুধু আওয়ামী লীগকেই বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের মতোই এ দেশের মানুষের মানবাধিকার ুণœ করা হয়েছিল। কয়েকটি সংবাদপত্র রেখে আর সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হলো। এরপর অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে পুনরায় নতুন ধারা তথা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথ ধরে এ দেশ ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকে। এক তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় জনগণ আওয়ামী লীগের প্রতি আর মুখ তুলে তাকায়নি। দলটি বিরাট সঙ্কটের মধ্যে পড়ে যায়। আওয়ামী লীগের বিদায় হওয়ার পর্বটি স্বাভাবিক ছিল না। ’৭৫-এ বিদায়ের বহু পরে জনগণ আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা দেখালে তারা দীর্ঘ দিন পর ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরে আসে। কিন্তু সে মেয়াদেও তারা ভালো কোনো ফল দেখাতে না পারায় পরবর্তী নির্বাচনে তাদের ক্ষমতা হারাতে হয়। বিএনপি মিত্রদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার পরিচালনার সুযোগ পায়। বিএনপির পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগ পদে পদে বিএনপি ও তার সহযোগীদের সরকার চালাতে বাধা সৃষ্টি করেছিল। সে মেয়াদ শেষ হলে, ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় ফিরে এসে এবারো সেই সাবেকি কায়দায় দেশ চালাতে থাকে। অন্যান্য দলকে একেবারেই কোণঠাসা করে ফেলে। পত্রপত্রিকার ব্যাপারেও তারা দ্বিমুখী নীতি নিয়ে চলছে। সরকারের সমর্থক পত্রিকার প্রতি সরকার সহানুভূতিশীল; কিন্তু ভিন্ন মতের সংবাদপত্রের প্রতি নেতিবাচক আচরণ চলছে। এর বহু উদাহরণ রয়েছে। ক্ষমতাসীনেরা একটি পত্রিকার প্রকাশনা এবং দু’টি টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে তছনছ করে ফেলে। এখানেই শেষ নয়। তারা নিজেদের দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে সংরক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়, সংবিধান পর্যন্ত সংশোধন করেছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য সংবিধানে যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সন্নিবেশিত করা হয়েছিল, তা বাতিল করে দিয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্য আওয়ামী লীগও আন্দোলন করেছিল জোরালোভাবে। আওয়ামী লীগ শুধু সংবিধান নয়, সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক পরিবেশকেও বিনষ্ট করেছে। নির্বাচনকে পরিণত করেছে প্রহসনে। দেশে এখন এমন এক মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে যার ফলে দেশ মারাত্মক শূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কোথায়ও কোনো আশার আলো নেই। জনগণ ভীতিকর অবস্থায় পড়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান সব কিছুকে নিজেদের মতো করে কাজে লাগাচ্ছে এই সরকার। আওয়ামী লীগ উপলব্ধি করে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন করে তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না। সে জন্য তারা ভোটারবিহীন নির্বাচন করার পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে। সব বিধিবিধান আইনকানুনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গণতন্ত্রের প্রাণতুল্য সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থাকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দেয়া হয়েছে।
দেশে যত নির্বাচন হয়েছে বা হচ্ছে তার কোনোটিই সুষ্ঠু নয়। আওয়ামী লীগ জনমতের তোয়াক্কা না করে পেশিশক্তির মাধ্যমে নির্বাচনে কথিত বিজয়কে ছিনিয়ে নিচ্ছে। এবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সেই মহড়া লক্ষ করা গেছে চরমভাবে। ক্ষমতায় যেতে হলে ভোট দিয়ে কিছু হবে না এবং পেশিশক্তি দিয়ে তা অর্জন করতে হবে। এমন মনোভাব দৃঢ়মূল হওয়ায় চর দখলের মতো তাণ্ডব সৃষ্টি করেই সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ দখল করা হয়েছে। 
এবার ভোটে গোলযোগে শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছে, যা নজিরবিহীন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দেশ এক শূন্যতার দিকে চলছে। এই শূন্যতা জাতির অমঙ্গল ছাড়া আর কিছুই আনবে না। লক্ষ করা গেছে, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে জনগণের মতামতের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়নের কথাই কেবল প্রচার করা হতো। এখন একই কায়দায় আমাদের সরকার দেশের উন্নয়নের ঢালাও প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু দেশের মানুষ সেই পুরনো ব্যবস্থা আমদানির বিপক্ষে। সরকার উন্নয়নের কথা বলছে; কিন্তু জনগণের ভোগান্তি কমছে না। বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান নেই। লাখ লাখ মানুষ বেকারত্বের জ্বালা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। শিল্পে মন্দা শুরু হয়েছে। শত শত পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব শিল্পে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলে দেশে এক চরম অবস্থার সৃষ্টি হবে। পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে লাখ লাখ বেকার কর্মী কোথায় যাবে। বেকার লাখ লাখ কর্মী চাকরিচ্যুত হবে; শুধু তা-ই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাতেও মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব গোটা অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। দেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো বাংলাদেশের ব্যাপারে এখন আগের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে না। বাংলাদেশে এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে তারা সাহায্য-সহযোগিতা করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করেছে। অথচ দাতাগোষ্ঠীর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সরকার গণতন্ত্রের কাঠামো ভেঙেই চলছে। বাংলাদেশ সরকার সঠিক পথে চলছে কি না তা পরখ করার জন্য কোনো বিরোধী শক্তি নেই। সরকারের ভুলত্রুটিগুলো ধরে তাদের সতর্ক করার কাজটি পোষা বিরোধী দল করছে না। বিরোধী শক্তি তথা বিরোধী রাজনৈতিক দল নিয়ে যে ধারণা গণতান্ত্রিক, এর বাইরে গিয়ে ক্ষমতাসীনেরা এক নতুন পথে চলা শুরু করেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর। তারা নিজেরা একটি বিরোধী দল বানিয়েছে। সেই বিরোধী দল সরকারের সুরে কথা বলে। তাই সরকারের প্রতিপক্ষ তারা নয়। সরকারের পোষা বিরোধী দল মন্ত্রিসভায়ও রয়েছে; সরকারের পরামর্শেই তারা চলে। এই অদ্ভুত বিরোধী দল দেশে বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সরকারের দেশ পরিচালনা নিয়ে এখন ভিন্ন ধারণা সৃষ্টি হতে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা ও ব্যাংকব্যবস্থাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যে ‘যোগ্যতা’ দেখাচ্ছে তা নিয়ে কেউ সন্তুষ্ট নয়। তাদের কার্যকলাপ নিয়ে সবাই চিন্তিত। দেশে প্রতিনিয়ত হামলা, হত্যা, গুম চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। সরকার কিছুই করতে পারছে না। উল্টো, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে এ জন্য দায়ী করছে। এতে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব সরকারের। অথচ সে দিকে নজর রয়েছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে এখন নারী ও শিশুরা নানাভাবে বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যাদের এ দায়িত্ব, সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন তাদের এ দায়িত্ব পালনের চেয়ে ক্ষমতাসীনদের দেখভাল করাই বড় কাজ বলে মনে হয়। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করাই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বে সর্বত্র এখন বাংলাদেশে বিরাজমান অবস্থা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলারও উন্নত করার ব্যাপারে আহ্বান জানানো হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘ ছাড়াও বিভিন্ন দেশ থেকেই এ আহ্বান এসেছে। সরকারকে বিরোধী দলের সাথে সংলাপ করে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বলা হচ্ছে। মার্কিন সরকার তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে একাধিকবার সরকারকে এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে যে সংসদ নির্বাচন সরকার করেছে, তা এতটা খারাপ যে, এ নিয়ে দেশের জনগণ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। অথচ সরকারের তরফ থেকে এ নির্বাচন নিয়ে মাথাব্যথা নেই, তারা বলছেন, এ সংসদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হলে তবেই নতুন নির্বাচন হবে।
এ দিকে সরকারের একা চলার বিষয়টি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সাসভিত্তিক প্রকাশনা এবং বৈশ্বিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে এ মর্মে সতর্ক করে যে, একদল ও একনায়কতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। আর এই পথ ধরেই দেশে চরমপন্থীদের উৎপাত দিন দিন বাড়বে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে এমন ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছে। গত মঙ্গলবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এক প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হয়।

No comments:

Post a Comment