সুষ্ঠু ও সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থাপনার ওপর
শিক্ষার সার্বিক সফলতা ব্যর্থতা নির্ভর করে। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে
দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীতে শিক্ষাব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যতই দিন যাচ্ছে শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনা
মানের ক্রমাবনতি ঘটেছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ রাজনৈতিক দল দিয়ে পরিচালিত।
সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে রাখা হয়। সেটা এ জন্য করা
হয় যে, রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য, বিভেদ এবং দলাদলির মাধ্যমে যাতে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত না হয়। আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো
রাজনৈতিক দলাদলির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে রাজনৈতিক দলই
ক্ষমতাসীন হোক না কেন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা, সৌকর্য এবং
সম্মান রক্ষার পরিবর্তে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়।
এর মূল কারণ হলোÑ
ক. শিক্ষা সম্পর্কে রাজনৈতিক বলয়ের উপলব্ধির অভাব। খ. অশিক্ষিত,
অর্ধশিক্ষিত এবং কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদায়ন। গ.
নিয়োগবাণিজ্যের সুবিধা। সামগ্রিকভাবে রাজনীতি যেহেতু সম্পদ আহরণ ও বিতরণের
কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, সেহেতু রাজনৈতিক ব্যক্তিরা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ঘ. এরা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাহন হিসেবে ব্যবহার করে। ঙ.
শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রভাবে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বৃত্তায়নের দুর্গে পরিণত করে। ‘লেটার
বেটার দেন নেভার’ অনেক অনেক বছর পরে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা
সম্পর্কে হাইকোর্টের গত বুধবারের (১ জুন, ২০১৬) রায়টি আশার সঞ্চয় করেছে।
উপলক্ষ ছিল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনাসংক্রান্ত একটি
রিট। সব কিছু দলীয় দখলে নেয়ার প্রবণতা থেকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড
কলেজ দখল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্থানীয় এমপি রাশেদ খান মেনন।
সব আইন
অগ্রাহ্য করে বিশেষ আদেশে গঠিত হয় বিশেষ কমিটি। প্রতিপক্ষ হাইকোর্টে রিট
আবেদন জানালে ওই বিশেষ কমিটি বাতিল ঘোষিত হয়। সেই সাথে হাইকোর্ট
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু সংশোধনী দেয়। বেসরকারি
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি
প্রবিধানমালা ২০০৯-এর ৫(২) ও ৫০ বিধি বাতিল করে হাইকোর্ট। এর ফলে সংসদ
সদস্যরা ইচ্ছা করলেই পদাধিকার বলে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির
সভাপতি হতে পারবেন না। তবে চাইলে সংসদ সদস্যরা নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি
হতে পারবেন। বিএনপি আমলে প্রণীত বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা যত খুশি তত
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারতেন। ২০০৯ সালে আইন করে চারটি
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তাদের সীমাবদ্ধ রাখা হয়। তবে সংসদ সদস্যদের খয়ের খা
লোকদের যথারীতি সব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়ার রেওয়াজ বহাল থেকে যায়। আদালতের
আদেশের পর এখন চারটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন সংসদ সদস্যরা, তবে
সংসদ সদস্যরা নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সভাপতি হতে পারবেন।
পরিচালনা
কমিটির অন্য সদস্যদের ভোটে তাকে সভাপতি নির্বাচিত হতে হবে। সব ক্ষেত্রে
যেমন আইনের ফাঁক থাকে, এ ক্ষেত্রেও তেমন থেকে গেল। কালচারই এ রকম যে,
কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন করতে আমরা অভ্যস্ত। সংসদ সদস্য যদি খায়েশ প্রকাশ করেন
তাহলে স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্যদের কার এমন বুকের পাটা আছে যে, তাকে
সভাপতি বানাতে অস্বীকার করে? আইন ও বাস্তবতার ফারাক সত্ত্বেও হাইকোর্টের
আদেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে
শিক্ষাবিদেরা মনে করেন। হাইকোর্টের নির্দেশনার ফলে দুটো ফল আসতে পারে।
প্রথমত, একজন সংসদ সদস্য ইচ্ছা প্রকাশ করলেই সরাসরি পরিচালনা কমিটির সভাপতি
হতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাবোর্ড চাইলেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
বিশেষ কমিটি গঠন করতে পারবেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে
করেন, ওই আদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের কর্তৃত্বে কিছুটা
ভাটা পড়তে পারে। সর্বশেষ আশঙ্কা হলো, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যদি এটা
না চান তাহলে বাস্তবায়ন দীর্ঘ এবং দুঃসাধ্য হবে। আইনের বাস্তবায়ন নির্ভর
করে প্রায়োগিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর। অনেক সময় রাজনৈতিক
সদিচ্ছা থাকলেও স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব ও প্ররোচনায় আইনের বাস্তবায়ন
সম্ভব হয় না। যেমনÑ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কয়েক মাস আগে পরিচালনা কমিটির ক্ষমতা
খর্ব করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ কেন্দ্রীয় পরীক্ষার
মাধ্যমে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়।
আইনটি কার্যকালিতার কোন পর্যায় আছে
সেটি জানা যায়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই সুন্দর উদ্যোগকে অসুন্দর করে
দেখেছেন সংসদ সদস্যসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক ব্যক্তি। এই আইনটি কার্যকর হলে
নিয়োগ বাণিজ্য কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। এ মুহূর্তের বাস্তবতা
ভয়ানক। দেশে প্রায় ৩৭ হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রিত হয়
রাজনৈতিকভাবে। আগের আইনের সুযোগ মতো আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক-মোক্তার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি প্রশাসন এবং
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সব কিছুরই মালিক-মোক্তার তারা। অভিযোগ রয়েছে, নামী
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা কামাই বাণিজ্য করেন।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যাপারে যখন তখন যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করেন। কোনো
প্রকল্প বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শতকরা ১০০ ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের হাতে
থাকতে হবে।
এসব হস্তক্ষেপের ফলে সচ্ছল প্রতিষ্ঠানগুলোও অসচ্ছল হয়ে পড়ছে। আর
অসচ্ছলগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন গণমাধ্যমে এদের অন্যায়, অনিয়ম ও
দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
কতটা অসহায় যে, তারা তার প্রমাণ দিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের সেই শিক্ষক যাকে
স্থানীয় সংসদ সদস্য কান ধরে উঠবোস করালেন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি
কিভাবে কাজ করে ওই শিক্ষকের পদচ্যুতি তার প্রমাণ। রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা
ওই সব মর্যাদাবান প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের সাথে অমর্যাদাকর ব্যবহার
করেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অসংখ্য শিক্ষক এসব রাজনৈতিক
কর্তাব্যক্তিদের হাতে শারীরিকভারে লাঞ্ছিত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের জন্য গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দেয়া হয়েছে।
মামলা-মোকদ্দমা এবং চাঁদাবাজিতে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়রান হয়ে
পড়েছে।
অভিযোগ এসেছে, শিক্ষকদের সঙ্গে পিয়ন-চাপরাশির মতো ব্যবহার করা হয়।
তুচ্ছতাচ্ছিল্য অপমান অবহেলা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এসব কারণে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা যখন
তখন যত্রতত্র মনীষী সক্রেটিসের এই বাণীটি উদ্ধৃতি করি যে, ‘নলেজ ইজ
পাওয়ার’ বা জ্ঞানই শক্তি। কিন্তু বাস্তবে শক্তি দিয়ে জ্ঞানকে প্রতিহত করি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানই যেখানে উদ্দেশ্য ও বিধেয়, সেখানে জ্ঞানই একমাত্র
বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিষ্ঠান প্রশাসন এবং প্রতিষ্ঠান
ব্যবস্থাপনাÑ সব কিছুই ‘জ্ঞানের জন্য, জ্ঞানের মাধ্যমে এবং জ্ঞানের
লক্ষ্যে’ পরিচালিত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের প্রস্তাবÑ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
প্রশাসনিক প্রধানেরা হতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা ধরনের কিছু।
আর স্থানীয়
আলোকিত, শিক্ষানুরাগী এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে হতে পারে
ব্যবস্থাপনা কমিটি। দেশজুড়ে থাকা শিক্ষাপ্রশাসন তথা অধিদফতরগুলোকে অধিকতর
ক্ষমতায়ন করা যায়। মন্ত্রণালয়ে যাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়ে পড়ে এবং
উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয়পর্যায়ে যাতে শিক্ষাপ্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে সে
বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সর্বস্তরের শিক্ষা সমিতিগুলো সুপারিশ
ও আন্দোলন করতে পারে। সামগ্রিক সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠন করা যেতে
পারে, যারা প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পেশ করবেন।
তাৎক্ষণিকভাবে এটা বলা যেতে পারেÑ ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক
বলয়ের বাইরে নিয়ে আসতে হবে।
২. অবিলম্বে স্থায়ীভাবে সংসদ সদস্যদের
প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার রেওয়াজ বন্ধ করতে হবে। ৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
স্বাতন্ত্র্য এবং স্বকীয়তা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হতে
হবে। ৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ৫. সর্বত্র শিক্ষা ও
শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত করতে হবে। শিক্ষা নামক জাতির মেরুদণ্ড এখন
ভঙ্গুর প্রায়। যদি জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে হয় তাহলে ভীতি ও রাজনৈতিক
প্রভাবকে অগ্রাহ্য করে নাগরিক সাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু
শিক্ষক নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দায়দায়িত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যদি
আমরা ব্যর্থ হই তাহলে গোটা জাতিকে অন্ধকার সমুদ্রে নিমজ্জিত হতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও অধ্যাপক
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
mal55ju@gmail.com
লেখক : কলামিস্ট ও অধ্যাপক
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
mal55ju@gmail.com
No comments:
Post a Comment