পৃথিবীতে
জন্ম নেয়া প্রতিটি নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে এই একই ভাষায় একইভাবে
তার আগমনী জানান দেয়। পৃথিবীর কোথাও এ ভাষায়, এ প্রকাশে কোনো ভিন্নতা নেই।
যেন জন্ম নিয়েই বজ্রনিনাদে সে ঘোষণা করছে-‘আমি এসেছি অপ্রশস্ত অথচ নিরাপদ
মাতৃগর্ভ থেকে বিস্তৃত এ পৃথিবীতে। এসেছি মুক্ত বায়ুতে নির্বিঘ্ন
নিঃশ্বাসের আশায়, নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায়।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো নিষ্পাপ
নবজাতকের এ প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়? স্রষ্টা এ বিশ্ব সৃষ্টি করে তাঁর
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের হাতেই এর শাসন-নিয়ন্ত্রণ সব সঁপে দিয়েছেন
পর্যাপ্ত বুদ্ধি আর সহায়ক সব উপকরণ দিয়েই। আমরা স্রষ্টার সে আস্থা কতটুকু
রাখতে পারছি?
চারদিক সন্ত্রাস আর হানাহানির বিষবাষ্পে ছেয়ে গেছে। জনপদে জনপদে চলছে রক্তের হোলিখেলা, রক্তাক্ত লাশের মিছিল। কোথাও ব্যস্ত জনপদে বোমা হামলা, আবার কোথাও বন্দুকধারীর গুলিতে বা গুপ্ত ঘাতকের অস্ত্রের আঘাতে, কোথাও বিমান ও মারণাস্ত্রের আক্রমণে আবার কোনো স্থানে সামরিক জান্তা বা স্বৈরশাসকের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র জনগণ প্রাণ হারাচ্ছে, হারাচ্ছে বাস্তুভিটা ও সম্পদ। যারা এসব করছেন তারা একবারও কি ভেবে দেখেছেন, এ পৃথিবীর জীবন উপভোগের জন্য স্রষ্টা যে জীবন সৃষ্টি করেছেন তারা প্রতিনিয়ত অবলীলাক্রমে তা সংহার করে চলছেন? অথচ কেউ কি একটি জীবনও সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন ? যদি না-ই রাখেন তাহলে সে জীবন ধ্বংস করার অধিকার তাকে কে দিলো?
চারদিকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় আর আন্তর্জাতিক পরাশক্তির সন্ত্রাসে আমাদের এ বিশ্বটি আজ ক্ষত-বিক্ষত। ঘুরে ফিরে আসছে কতগুলো নাম : আইএস, আল কায়েদা, তালেবান, বোকোহারাম, হিজবুল্লাহ প্রভৃতি। আবার বিপরীতে অভিযোগের পাহাড় জমছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে, সামরিক একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধেও। এক পক্ষকে সন্ত্রাসের জন্য অভিযুক্ত করে তার প্রতিকারে আরেক পক্ষ যা করছে, তা আরো বড় সন্ত্রাস। পশ্চিমা পরাশক্তিকে দুষে সবচেয়ে সোচ্চার ও সক্রিয় গোষ্ঠী হলো আল কায়েদা ও আইএস (ইসলামিক স্টেট)। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল কায়েদার ৯/১১ খ্যাত নৃশংস আক্রমণে যেদিন নিউ ইয়র্কে আকাশচুম্বী টুইনটাওয়ার মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, সেদিন যে শুধু অসংখ্য মানুষই প্রাণ হারাল তাতো নয়, সেদিন আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে যেন বিশ্ব মুসলিমের ভাবমর্যাদা আছড়ে পড়ে খানখান হয়ে গেল। কী অপরাধ করেছিল এরা, যারা এ আক্রমণের বলি হলো ? একইভাবে লস্কর-ই-তৈয়বার নামে ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাই নগরে আরব সাগরের উচ্ছ্বল ঢেউ বিধৌত মেরিন ড্রাইভের কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো তাজ হোটেলে এক হামলায় যে ১৬৬টি প্রাণ ঝরে গেল, সাথে আরো পাঁচ শতাধিক গুরুতর আহত হলো, এর কী উত্তর আছে? আসল টার্গেট বাদ দিয়ে নিরপরাধ হোটেলবাসী কেন টার্গেট হলো? একই কায়দায় হঠাৎ করে গত নভেম্বরে (২০১৫) এক আলো ঝলমল সন্ধ্যায় রক্তের ফিনকিতে আইফেল টাওয়ার রঞ্জিত হয়ে গেল। এক নিমিষে সৌন্দর্যের রানী প্যারিসের বুকে শত প্রাণ ঝরে গেল আইএসের সিরিজ আক্রমণে। রক্তের এ দাগ না শুকাতেই মার্চ ২০১৬ আবারো এক অতর্কিত বিস্ফোরক হামলায় প্রাণ দিতে হলো শান্তিপ্রিয় বেলজিয়ামের ব্রাসেল্স্ নগরীর বহু নিরপরাধ মানুষকে। এমন অসংখ্য প্রকাশ্য হামলা বা গুপ্তহত্যা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে, যাতে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এ প্রতিটি আক্রমণই রীতিমতো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
চারদিক সন্ত্রাস আর হানাহানির বিষবাষ্পে ছেয়ে গেছে। জনপদে জনপদে চলছে রক্তের হোলিখেলা, রক্তাক্ত লাশের মিছিল। কোথাও ব্যস্ত জনপদে বোমা হামলা, আবার কোথাও বন্দুকধারীর গুলিতে বা গুপ্ত ঘাতকের অস্ত্রের আঘাতে, কোথাও বিমান ও মারণাস্ত্রের আক্রমণে আবার কোনো স্থানে সামরিক জান্তা বা স্বৈরশাসকের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র জনগণ প্রাণ হারাচ্ছে, হারাচ্ছে বাস্তুভিটা ও সম্পদ। যারা এসব করছেন তারা একবারও কি ভেবে দেখেছেন, এ পৃথিবীর জীবন উপভোগের জন্য স্রষ্টা যে জীবন সৃষ্টি করেছেন তারা প্রতিনিয়ত অবলীলাক্রমে তা সংহার করে চলছেন? অথচ কেউ কি একটি জীবনও সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন ? যদি না-ই রাখেন তাহলে সে জীবন ধ্বংস করার অধিকার তাকে কে দিলো?
চারদিকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় আর আন্তর্জাতিক পরাশক্তির সন্ত্রাসে আমাদের এ বিশ্বটি আজ ক্ষত-বিক্ষত। ঘুরে ফিরে আসছে কতগুলো নাম : আইএস, আল কায়েদা, তালেবান, বোকোহারাম, হিজবুল্লাহ প্রভৃতি। আবার বিপরীতে অভিযোগের পাহাড় জমছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে, সামরিক একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধেও। এক পক্ষকে সন্ত্রাসের জন্য অভিযুক্ত করে তার প্রতিকারে আরেক পক্ষ যা করছে, তা আরো বড় সন্ত্রাস। পশ্চিমা পরাশক্তিকে দুষে সবচেয়ে সোচ্চার ও সক্রিয় গোষ্ঠী হলো আল কায়েদা ও আইএস (ইসলামিক স্টেট)। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল কায়েদার ৯/১১ খ্যাত নৃশংস আক্রমণে যেদিন নিউ ইয়র্কে আকাশচুম্বী টুইনটাওয়ার মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, সেদিন যে শুধু অসংখ্য মানুষই প্রাণ হারাল তাতো নয়, সেদিন আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে যেন বিশ্ব মুসলিমের ভাবমর্যাদা আছড়ে পড়ে খানখান হয়ে গেল। কী অপরাধ করেছিল এরা, যারা এ আক্রমণের বলি হলো ? একইভাবে লস্কর-ই-তৈয়বার নামে ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাই নগরে আরব সাগরের উচ্ছ্বল ঢেউ বিধৌত মেরিন ড্রাইভের কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো তাজ হোটেলে এক হামলায় যে ১৬৬টি প্রাণ ঝরে গেল, সাথে আরো পাঁচ শতাধিক গুরুতর আহত হলো, এর কী উত্তর আছে? আসল টার্গেট বাদ দিয়ে নিরপরাধ হোটেলবাসী কেন টার্গেট হলো? একই কায়দায় হঠাৎ করে গত নভেম্বরে (২০১৫) এক আলো ঝলমল সন্ধ্যায় রক্তের ফিনকিতে আইফেল টাওয়ার রঞ্জিত হয়ে গেল। এক নিমিষে সৌন্দর্যের রানী প্যারিসের বুকে শত প্রাণ ঝরে গেল আইএসের সিরিজ আক্রমণে। রক্তের এ দাগ না শুকাতেই মার্চ ২০১৬ আবারো এক অতর্কিত বিস্ফোরক হামলায় প্রাণ দিতে হলো শান্তিপ্রিয় বেলজিয়ামের ব্রাসেল্স্ নগরীর বহু নিরপরাধ মানুষকে। এমন অসংখ্য প্রকাশ্য হামলা বা গুপ্তহত্যা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে, যাতে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এ প্রতিটি আক্রমণই রীতিমতো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
কোনো পক্ষের দোষ বা অপরাধের বলি কেন হবে নিরীহ মানুষ? এ সব ঘটনার
জন্য আইএস বা আল কায়েদার নামই প্রচারে আসছে। ইসলাম ধর্মের নামেই এগুলো করা
হচ্ছে বলে বলা হয়। অথচ ইসলাম ধর্মের প্রাণপুরুষ হজরত মোহাম্মদ সা: আইয়ামে
জাহেলিয়ার যুগে শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হয়েও এবং অকথ্য নির্যাতনের মুখে
নিজের প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পরও কি এতটুকু সহিংসতার পথে
গিয়েছিলেন? তাঁর অসীম ধৈর্য, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি আর মমত্বমাখা একত্ববাদের
অমিয় বাণীর প্রচারে আকৃষ্ট হয়েইতো আজ বিশ্বের সোয়া দুই শ’ কোটি মানুষ
ইসলামের পতাকাতলে। অত্যন্ত শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম
ধর্ম। অথচ এসব আক্রমণের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আজ মুসলমানেরা
কাঠগড়ায়। ফ্রান্সে দ্রুত প্রসারমাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অনেক স্থানে
মসজিদে প্রবেশ আজ নিষিদ্ধপ্রায়। এ সবের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের মতো একজন উগ্র আবাসন ব্যবসায়ীর
ঔদ্ধত্যপূর্ণ বাক্যবাণে আমেরিকার উন্নয়নের কারিগর অভিবাসীগণ কোণঠাসা।
পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চলছে। কোনো
হিংসাত্মক ঘটনা ঘটলেই মুসলমানদের জড়িয়ে অপপ্রচার করা ঠিক নয়। এসব অপপ্রচারে
মানুষ যে বিভ্রান্ত হয় না তার প্রমাণতো হাতেনাতেই পাওয়া যাচ্ছে। যারা
ইসলামের নামে সন্ত্রাস করে তাদের সে সন্ত্রাস দমাতে গিয়ে পশ্চিমা পরাশক্তি
দেশে দেশে আবার যা করছে তা রীতিমতো আর এক তাণ্ডব।
যেমন তালেবান দুঃশাসন বা
নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নামে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র রীতিমতো
আফগান জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো যেমন পড়েছিল তালেবানেরাও। একবারও চিন্তা করল
না হিন্দুকুশ উপত্যকার এ ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতিটি কত অসহায়। রীতিমতো একটি
শাটল কক-এর মতো তাদের অবস্থা। একবার এ খেলছে তো আর একবার ও খেলছে। দীর্ঘ
আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে এ দেশের মানুষ একটি দিনের জন্যও কি নিজের শাসন
কেমন তার স্বাদ লাভ করতে পেরেছিল? না পারেনি। শত শত বছরের গোত্র শাসন আর
রাজতান্ত্রিক নির্যাতনের পর হঠাৎ ১৯৭৩ সালে বাদশাহ জহীর শাহকে উৎখাত করে
সামরিক জান্তা দাউদ খান, এরপর রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে একে একে হাফিজুল্লাহ
আমিন বাবরাক কারমাল এবং নজিবুল্লাহর ১০ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের যাঁতাকল শেষ
না হতেই নব্বই-এর দশকে মোল্লা ওমরদের তালেবান শাসনের নির্যাতন কোনটাই
আফগানদের ওপর থেকে বাদ যায়নি। সর্বশেষ ২০০১ সালে আমেরিকা-ব্রিটেনের যৌথ
সামরিক অভিযানে দেশটি এ পরাশক্তির অধিকারে চলে যায়। সাক্ষী গোপাল
প্রেসিডেন্ট হিসেবে আব্দুল হামিদ কারজাই বা আশরাফ গানি মসনদে বসলেও বিগত ১৫
বছর ধরে এক আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধে দেশটি প্রায় ধংসস্তূপ। রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট
১০ বছরের কমিউনিস্ট শাসনে ১৫ লাখ লোক এবং তালেবান শাসনেও হাজার হাজার
মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। আর এ যাত্রায় পরাশক্তির হিংস্রতায় এবং বিধ্বংসী
গৃহযুদ্ধে সে সংখ্যাকেও হয়তো ছাড়িয়ে যাবে-কে জানে? কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো
এত মৃত্যুর পরও দেশটির মানুষগুলো আবার হাসে, বিশ্ব ক্রিকেট আর ফুটবলের
আসরে খেলতে আসে, কখনো কখনো আবার দাপটও দেখায়। এ দিকে প্রমাণহীন
পরমাণু-অস্ত্রের অজুহাতে ২০০৩ সালে জর্জ বুশের আমেরিকা রীতিমত উন্মত্ততা
নিয়ে ইরাকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
ইরাকে যে নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ চালালো তার কী
ব্যাখ্যা দেবে তারা? সাদ্দাম হোসেনের দোষ থাকতে পারে; কিন্তু কী অপরাধ ছিল
নিরীহ ইরাকবাসীর? সে আক্রমণের পর একটি শান্ত অথচ উন্নত জনপদ আজ গৃহযুদ্ধে
ক্ষতবিক্ষত। একদিকে পরাশক্তি সমর্থিত সরকার অপরদিকে আল কায়েদা-আইএসসহ সব
প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হিংস্রতায় একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ জনপদ আজ
প্রায় ধংসস্তূপ। আগুন জ্বলছে তারই পাশে সিরিয়াতেও। ধ্বংসের
দ্বারপ্রান্তে প্রাচীন ইতিহাসখ্যাত শ্যাম দেশটি। হাফিজ আল আসাদ আর বাশার আল
আসাদ অর্থাৎ পিতা-পুত্রের দীর্ঘ ৪৫ বছরের নিপীড়নমূলক শাসনের পর ইদানীং
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা এর মতো নেমে এসেছে এক ত্রিমুখী অন্তর্ঘাতমূলক গৃহযুদ্ধ।
একদিকে সরকারি বাহিনী অপর দিকে আইএস, আবার অবিরাম আকাশ পথে ছুটন্ত
উলকাপিণ্ডের মতো রাশিয়া বা আরব যৌথবাহিনীর ছোড়া গোলা ছুটে এসে আঘাত হানছে
কখনো হাসপাতালে, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা আবার কখনো মুখর জনপদে।
প্রতিদিন এ ধ্বংসলীলা চলছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে
চার লাখেরও বেশি লোক সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু কি তাই? এখন আবার খবর
বেরিয়েছে পাইপলাইন বসিয়ে আইএস সেখান থেকে তেল পাচার করছে। কার তেল কার
সম্পদ কে বিক্রি করে? কী অদ্ভুত? এদিকে হত্যা আর ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে শুধু
প্রাণটুকু নিয়ে হাজার হাজার সিরিয়াবাসী আজ স্বদেশ ত্যাগ করে নানা লাঞ্ছনা
গঞ্জনা সয়ে ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হয়ে আশ্রয় ভিক্ষা করে
বেড়াচ্ছে। কী অ™ু¢ত ! যারা একসময় অন্যদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষমতা রাখতো তারাই
আজ দুয়ারে দুয়ারে আশ্রয়প্রার্থী। সমুদ্রবিধৌত পারস্য উপসাগরীয় দেশ
ইয়েমেন। একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যে, অর্থ-সম্পদে কী সমৃদ্ধইনা ছিল দেশটি। অথচ
আজ অনাকাক্সিক্ষত গৃহযুদ্ধে তা ধ্বংস হওয়ার পথে। ঘরে ঘরে মানুষের শুধু
অশান্তি আর নিরাপত্তাহীনতা। দেশটিকে কার্যত দু’ভাগ করে নিয়ে একদিকে এক
সময়ের নির্বাচিত ও আরব যৌথবাহিনী সমর্থিত প্রেসিডেন্ট হাদি আর অপর দিকে
ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী। তাদের ক্ষমতা দখল আর ক্ষমতা রাখার যুদ্ধের বলি
হচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। পাশাপাশি সুযোগ বুঝে যুদ্ধে ঢুকে পড়েছে আইএস এবং আল
কায়দাও। কেন ?
দেশটিতো আপনাদের নয়, ইয়েমেনি জনগণের। তাদেরই বেছে নিতে দিন
না তাদের শাসক কে হবে? আরো পুরনো অথচ ভয়াবহ চিত্র অদূরে ফিলিস্তিনে।
ভাগ্যাহত ফিলিস্তিনিদের অপরাধ কী তা কেউ জানে না। সেই ১৯৪৮ সালে অতর্কিত
আক্রমণে তাদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর একটি
বিশাল জনগোষ্ঠী আশপাশের বিভিন্ন দেশ জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, গাজাসহ
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জীবনযাপন করছে। প্রতিনিয়ত
ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েল জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে নতুন নতুন বসতি
গড়ছে। একটি পাখিরও বাসা আছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের কোনো আবাসভূমি নেই।
পশ্চিমা পরাশক্তির প্রশ্রয়ে জর্ডান নদীর দুই তীরে মানবাধিকার কিভাবে
ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এর চেয়ে বড় নজির এ শতাব্দীর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
জেরুজালেম-বেথেলহাম ঝড়ে ইসলামের প্রথম কেবলা মসজিদ-আল আকসা হারিয়ে
মুসলমানদের অন্তরে যে তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা তারা নীরবেই সয়ে চলেছে।
এরপরও অপবাদ-‘মুসলমানগণ সন্ত্রাসী,’ কেন? যারা সন্ত্রাস করে ফিলিস্তিনিদের
মাতৃভূমি আর ইসলামের প্রথম কেবলা কেড়ে নিল তারা সন্ত্রাসী নয়, সন্ত্রাসী
হলো যারা সব হারালো তারা? এ প্রশ্ন কি বিশ্ববিবেকের কাছে সঙ্গতভাবেই রাখা
যায় না? লেবানন আর একটি বিধ্বস্ত জনপদ। বহুবছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে লেবানন
ক্ষতবিক্ষত। নিজ দেশে লেবানীজ জনগণের ভূমিকা যেন গৌণ হয়ে পড়েছিল। অসহায়
হয়ে পড়েছিল লেবানন সরকারও। এমনই ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছিল যে, একসময় বলা হতো
বৈরুতের বাসিন্দাদের সকালে ঘুম ভাঙে গুলির শব্দে, আর রাতে ঘুমোতে যেত
বোমার বিকট শব্দ শুনে। এদিকে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়াকে তো আজ ভিনগ্রহের
দেশ বলেই মনে হয়।
সেখানে শাসনব্যবস্থা বলে কিছুই নেই। আমেরিকার চিরশত্রু
বলে পরিচিত লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনের অবসান
ঘটানোর জন্য আরব বসন্তের সুযোগ নিয়ে আমেরিকা সে দেশে আক্রমণ চালাল।
গাদ্দাফির পতন প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা পরাশক্তির এ হস্তক্ষেপের কারণে যে
জটিলতার সৃষ্টি হয় তাতে লিবিয়ার জনগণের ভোগান্তি আরো বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
সম্ভাবনাময় এ দেশটি আজ বাস্তবেই দ্বিখণ্ডিত। একদেশ অথচ দু’টি সরকার, দু’টি
পাার্লামেন্ট। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে দুই বিপরীতমুখী শক্তি- পবহঃৎরভঁমধষ
ও পবহঃৎরঢ়বঃধষ ভড়ৎপব. সুতরাং কার্যক্ষেত্রে নিট ফলাফল শূন্য, অচল দেশ।
আফ্রিকার আর এক দেশ উগান্ডায় দীর্ঘ দিনের হানাহানির পর সম্প্রতি
স্থিতিশীলতা এলেও নাইজেরিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ায় গোত্রে গোত্রে
সংঘর্ষ এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। যে নাইজেরিয়া তাদের অবিসংবাদিত নেতা স্যার
আবুবকর তাফেওয়া বালেওয়ার নেতৃত্বে ষাট-সত্তরের দশকে তেল সমৃদ্ধ এক সচ্ছল
দেশ ছিল নেতৃত্বের দুর্নীতি আর কলহের কারণে সে দেশই আজ আর্থিক সঙ্কটে
হাবুডুবু খাচ্ছে। অধুনা যুক্ত হয়েছে বোকোহারাম গ্রুপের জঙ্গি তৎপরতা। মানুষ
প্রতিনিয়ত অপহরণ আর হত্যার শিকার হচ্ছে। আর এক ভাগ্যপীড়িত জনগোষ্ঠী হলো
দক্ষিণ এশিয়ার মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। স্থানীয়
সন্ত্রাসী, বৌদ্ধভিক্ষু এমনকি মিয়ানমার সরকার তাদের ওপর যে অকথ্য নির্যাতন
চালাচ্ছে তা এক কথায় বর্বর। শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু হতাহত হওয়ার
পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশের উদ্বাস্তু শিবিরে
আশ্রয় নিয়েছে।
গত এক-দেড় যুগধরে বাংলাদেশের জন্য এটি বিরাট বোঝা হয়ে
দাঁড়িয়েছে। আর যারা শত গঞ্জনা সয়েও নিজ বাড়িঘরে রয়ে গেছেন তারা এক মানবেতর
জীবনযাপন করছেন। তাদের ওপর নির্যাতনতো চলছেই এমনকি তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত
কেড়ে নেয়া হয়েছে। কে কম যায় ? এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলো এত কিছু করছে
ইউরোপ কিছু করবে না তা কি হয়? সত্তর-আশির দশকের ইউরোপে যে ওলটপালট হয় তাতে
জোট নিরপেক্ষ জগতের নেতা মার্শাল টিটোর যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে
গেল। সৃষ্টি হলো সার্বিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া,
মন্টিনিগ্রো প্রভৃতি দেশ। সার্বিয়ার অত্যাচারী শাসক রাদোভান কারাদসিজ
বসনিয়া হার্জেগোভিনার মুসলিম জনগণের ওপর যে নরহত্যা চালিয়েছে, যে পাশবিক
আচরণ করেছে তা বিশ্ব ইতিহাসে রীতিমতো একটি কালো অধ্যায়। ফলে দীর্ঘ বিচারে
বিশ্ব আদালত তাকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে
সম্প্রতি কারাদণ্ড দিয়েছে। অথচ প্রায় একই সময়ে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক
প্রজাতন্ত্র ভেঙে সৃষ্ট মুসলিম অধ্যুষিত ক্ষুদ্র চেচনিয়া প্রজাতন্ত্রের ওপর
বার বার সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে তার স্বাধীনতা হরণ করে রাশিয়া দেশটিকে দখল
করে নিয়েছে। চেচনিয়ার জাতীয়তাবাদী জনপ্রিয় নেতা জোখার দুদায়েভসহ হাজার
হাজার চেচনিয়াবাসীকে হত্যা করে রাশিয়া মানবাধিকারের বিরুদ্ধে যে জঘন্য
অপরাধ সংঘটিত করেছে তার বিচার কখন হবে বা সে দেশের জনগণ এ সন্ত্রাস থেকে
কবে মুক্তি পাবে তা কেবল ভবিতব্যই জানেন। পৃথিবীতে আজ পরিষ্কার দু’টি
ধারা।
একদিকে সন্ত্রাস, যুদ্ধ আর দেশে দেশে অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের
শোষণ-নির্যাতন ও অধিকার হরণ আর অন্য দিকে মুক্তি, নিরাপত্তা আর অধিকারকামী
জনগোষ্ঠীর শান্তির মিছিল। দু’টি ভিন্ন মতে ভিন্ন পথে চলছে বিভক্ত পৃথিবী। এ
দু’টি পথ কি এক করে দেয়া যায় না? অবশ্যই করা যায় এবং তা করতে হবেও। তা না
হলে যে আমাদের এ প্রিয় বিশ্বটি শঙ্কার উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খেতে খেতে
এমনকি একদিন তলিয়েও যেতে পারে। আর সেই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে
আমাদের এক মতে এক পথে আসতে হবে। আসুন না আমরা সবাই নেলসন ম্যান্ডেলার মতো
একটুখানি মহানুভবতার পরিচয় দেই, একটু সহনশীল হই। অতীতের ভুল স্বীকার করে
বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেই অপর পক্ষের দিকে।
বিশ্বমানবতার স্বার্থে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ‘এক বিশ্ববাসী’ হয়ে যাই।
সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ যুদ্ধ আর সন্ত্রাসের সব দৃশ্য বিলীন হয়ে যাক,
উপড়ে পড়–ক স্বাধীনতা হরণকারী ও স্বৈরাচারী শাসকদের সব বিষ দাঁত। মুক্তির
বাঁধভাঙা আনন্দে মানুষ উপভোগ করুক স্রষ্টার সব নেয়ামত। সন্ত্রাস আর
সঙ্ঘাতমুক্ত অমিত শান্তির নিরাপদ বিস্তৃত বিশ্ব নিশ্চিত হউক।
লেখক : প্রফেসর, রসায়ন বিভাগ ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড
লেখক : প্রফেসর, রসায়ন বিভাগ ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

No comments:
Post a Comment