Saturday, June 4, 2016

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ময়কর বিজয় by এবনে গোলাম সামাদ

আমাদের দেশের পত্রপত্রিকাগুলো পড়ে মনে হচ্ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতে যাচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল হলো তা থেকে অনেক ভিন্ন। এতই ভিন্ন যে, তা ছিল অনেকের ধারণার বাইরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় লাভ করেছে দুই-তৃতীয়াংশ আসন। কী করে এটা সম্ভবপর হলো তা নিয়ে চলেছে হিসাবনিকাশ। মনে হয় এটা হতে পেরেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একচেটিয়াভাবে মুসলিম ভোট পাওয়ার জন্য। হিন্দু ভোট ভাগ হয়েছে কিন্তু মুসলমান ভোট সেভাবে ভাগ হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে। কিন্তু তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেছেন ইসলামের ইতিহাসে। মনে হয় মুসলমানদের প্রতি তার ছিল একটি বিশেষ দুর্বলতা। কেন কী কারণে এটা সৃষ্টি হতে পেরেছিল তা বিশ্লেষণ করা কঠিন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের হজযাত্রীদের দিয়েছেন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা। এসব কারণে তিনি পেয়েছেন মুসলিম ভোট।
যেটা আগে অনেক পরিমাণে পেতে পারত সিপিআই (এম)। কারণ সিপিআই (এম) বলত যে, তারা যদি ক্ষমতায় না থাকে তবে পশ্চিমবঙ্গে আইন হবে গরু জবাই বন্ধের। কিন্তু এখন এই যুক্তি আর কাজে আসেনি। গত পাঁচ বছর মমতার শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গে কোনো হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা বাধেনি। পরিস্থিতি থেকেছে শান্ত। অন্য দিকে সিপিআই (এম) নীতিহীনভাবে কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়েছিল। যেটাকে পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। মমতার চালচলন খুব সাদাসিধে। তিনি সুতির শাড়ি পরেন ও কোনো প্রসাধন ব্যবহার করেন না। গ্রামে গ্রামে ঘুরেন সাধারণ চটি পায়ে দিয়ে। তার এই সহজ অনাড়ম্বর জীবনরীতি তাকে সাধারণ মানুষের কাছে ঘরোয়া করে তুলেছে। যেটাও তার অধিক ভোট পাওয়ার কারণ। তিনি গ্রামের গরিবদের দুই টাকা কেজি চাল খাইয়েছেন। গরিব তরুণদের সুলভমূল্যে দিয়েছেন সাইকেল কেনার সুযোগ। যা তাকে পশ্চিম বাংলার গ্রামে দিয়েছে লোকপ্রিয়তা।
তার শাসনামলে পশ্চিম বাংলার গ্রামেগঞ্জে পথঘাট হয়েছে অনেক উন্নত। তিনি কেবলই প্রতিবাদের রাজনীতি করেননি; করেছেন জনকল্যাণের রাজনীতি। যা তাকে দিয়েছে বিশেষ জনপ্রিয়তা। কিন্তু আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছিল যে, তিনি আর ক্ষমতায় আসছেন না। অথচ সেই সব পত্রিকায় পরে খবরে লেখা হলো, মমতার বিজয় অবিস্মরণীয়। তবে মমতার বিজয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যে খুশি হয়নি সেটা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। যদিও শেখ হাসিনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পঠিয়েছেন ২২ কেজি ইলিশ মাছ। আর টাঙ্গাইলের তাঁতে বোনা সুতির শাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিঃসন্দেহে ১৪ দলের জোটকে দুর্বল করবে। কেননা, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের পরাজয় বাংলাদেশের ১৪ দলের অন্যতম শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টিকে দুর্বল করবে। সাধারণভাবেই দুর্বল করবে তথাকথিত প্রগতিশীল বাম চিন্তা-চেতনাকে। অন্য দিকে যেহেতু আসামে বিজেপি জিতল, তাই অনুপ্রবেশের নামে বাংলাদেশে আসাম থেকে অনেক অহমিয়া মুসলমানকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হতে পারে বাংলাদেশে। হাসিনা সরকার আসামের উলফাকে অনাবশ্যকভাবে বৈরী করেছেন।
যারও একটা প্রভাব পড়তে পারে এই মুসলিম বিতাড়নের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই চেয়েছে ভারতে কংগ্রেস সরকারের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে। কিন্তু ভারতে এখন আর কংগ্রেস সরকার নেই। যদিও নরেন্দ্র মোদির সরকার যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে যাচ্ছে, তা কংগ্রেস থেকে খুব একটা পৃথক হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু যেহেতু আসামে বিজেপি ক্ষমতায় এলো তাই আওয়ামী লীগ সরকারকে পড়তে হতে পারে বিশেষ সমস্যারই মধ্যে। আসামে কংগ্রেস চেয়েছিল বদরউদ্দিন আজমলের সাথে জোটবদ্ধ হতে। কিন্তু রাহুল গান্ধীর বিরোধিতার কারণে সেটা হতে পারেনি। রাহুল গান্ধীর ভুল নেতৃত্বের কারণে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস জোট বেধেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্য সিপিআই(এম)-এর সাথে।
যেটাকে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনমণ্ডলী ভেবেছেন একটা চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বলে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে বাংলাদেশের বিরোধ ছিল এবং আছে তিস্তার পানি নিয়ে। সেটার সমাধান হবে কি না আমরা জানি না। কিন্তু পশ্চিম বাংলায় যদি শান্তি থাকে এবং হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা না হয়, সেটা হবে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ কল্যাণপ্রদ। কেননা বাংলাদেশের বহু মানুষের আত্মীয়স্বজন এখনো বাস করছেন পশ্চিমবঙ্গে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ করেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পদে এসে যাননি। তিনি একসময় ছিলেন কংগ্রেসে। হয়েছিলেন রেলমন্ত্রী। রেল ভারতের একটা খুবই বড় সরকারি বিভাগ। এর জন্য হয় আলাদা বাজেট। তিনি রাখেন সর্বভারতীয়পর্যায়ে নেত্রী হওয়ার যোগ্যতা। পশ্চিমবঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন একচ্ছত্র নেত্রী। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেউ যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, তবে সম্ভবত তা হবেন তিনি। এই রকমই ধারণা করা যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিলেন রাজপথে এসে।
শপথ নিলেন ঈশ্বর ও আল্লাহর নামে। এর আগে ভারতের কোনো প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আল্লাহর নামে শপথ নেয়ার কথা ভাবতে পারেননি। ভারতে কংগ্রেস হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি বিশেষ পরিবারের দল। সাধারণ মানুষের সাথে তার যোগাযোগ হয়ে পড়েছে ক্ষীণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গড়তে চেয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস। তার লক্ষ্য হয়েছে কংগ্রেসকে আবার সর্বসাধারণের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার। তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যকলাপ আপাতত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমিত হলেও তা পেতে পারে একটা সর্বভারতীয় রূপ। তৃণমূল কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হলে ঘটাতে হবে গ্রামেগঞ্জে কর্মসংস্থান। মানুষকে করে তুলতে হবে আত্মনির্ভরশীল। এটা করতে হলে ঘটাতে হবে ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ। বড় বড় কলকারখানা করে খুব বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করা যাবে না। কেননা, বড় বড় কলকারখানা এখন চলেছে অটোমেশিনে। জাপান কেবল বৃহৎ শিল্পসংগঠন গড়ে তোলেনি, জাপানিরা যাকে বলে কুটির শিল্প তার বিকাশেও নিয়েছেন বিশেষ উদ্যোগ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করবেন, আমরা জানি না। কিন্তু অতীতে তিনি বলেছেন, শিল্পকলকারখানা গড়বার নামে চাষের জমির ক্ষতি করা যাবে না। মনে হয় তিনি তার এই নীতি থেকে বিচ্যুত হবেন না। কেননা, পশ্চিমবঙ্গ এখনো হয়ে আছে মূলত কৃষিজীবী মানুষের দেশে। পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে অনেক কলকারখানা। কিন্তু এখানে যারা কাজ করেন সেই সব শ্রমিকেরা বেশির ভাগই হলেন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থেকে আগত। আর তাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতি বছর ভারতের উন্নত প্রদেশে চলে যাচ্ছে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থসম্পদ, পশ্চিমবঙ্গের বাইরের মজুরদের মজুরির মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গের কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই বাস্তবতাকেও নিতে হবে বিশেষ বিবেচনায়। সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এ ঘটনাকে রাখবেন বিশেষ বিবেচনায়। ভারতের অন্য কোনো প্রদেশ থেকে এত টাকা প্রতি বছর অন্য প্রদেশে চলে যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিজয় আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হলেও তাকে ঠিক বিস্ময়কর বলা চলে না। কেননা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধরতে পেরেছেন সে দেশের তৃণমূল মানুষের মনমানসিকতাকে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

No comments:

Post a Comment