![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প |
বহু
প্রতীক্ষিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের ভেতর প্রথম বিতর্ক শেষ হলো।
একদিকে ছিলেন ব্যবসায়ী থেকে হঠাৎ করে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ডোনাল্ড
ট্রাম্প এবং অন্যদিকে প্রায় ৩০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ হিলারি
ক্লিনটন। দুজনের মধ্যে হিলারি হচ্ছেন বিতর্কে বেশি অভিজ্ঞ, ২০০৮ সালে তিনি
ওবামার সঙ্গে বিতর্কে নেমেছিলেন তিন-তিনবার। ট্রাম্প এই প্রথমবার। বিতর্কের
বহু আগে থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে নিজেকে এই বিতর্কে উপস্থাপন করবেন
এবং আদৌ তাঁর গত দেড় বছরের ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে পারবেন কি না,
তা নিয়ে গণমাধ্যমে বেশ জল্পনাকল্পনা চলছিল। এর প্রধান কারণ ট্রাম্প যেভাবে
এ পর্যন্ত নিজেকে পরিচালিত করে এসেছিলেন, তাতে কোনটি যে তাঁর আসল
ব্যক্তিত্ব, তা ক্রমেই বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। বিতর্কের আগে, বিশেষ
করে রিপাবলিকান দলের কর্মকর্তাদের যে বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল তা
হচ্ছে, ট্রাম্প বাগাড়ম্বর পরিত্যাগ করে দর্শকদের কাছে তাঁর একটা সুশীল ও
ভাব-নম্র চিত্র তুলে ধরতে পারবেন কি না। দম্ভোক্তি এবং তাঁর স্বভাবসুলভ
তর্জন-গর্জন ছেড়ে নিজেকে একজন যুক্তিশীল ও দায়িত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ হিসেবে
উপস্থাপন করতে পারবেন কি না। এসব উৎকণ্ঠার কারণ ট্রাম্প নিজেই।
ডোনাল্ড
ট্রাম্প এক বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর নাটকীয়তা দিয়ে সারা দেশকে যেমন আমোদ
দিয়েছেন, তেমনি উৎকণ্ঠিতও করেছেন। এক বছর আগে তাঁর মনোনয়ন যেখানে প্রায়
অসম্ভব মনে করা হতো, আজ রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি সারা দেশ চষে
বেড়াচ্ছেন। ট্রাম্প তাঁর বক্তৃতাবাজিতে যেসব উপাদান দিয়ে ভক্তদের এযাবৎ
উল্লসিত ও উৎসাহিত করে এসেছেন, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে অবৈধ অভিবাসীদের
বিরুদ্ধে আন্দোলন ও (বিশেষ করে মেক্সিকানদের বিরুদ্ধে) সন্ত্রাস দমনের নামে
মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ঢালাও আক্রমণ, মুক্তবাণিজ্যের বিরোধিতা, দেশের
ভঙ্গুর অর্থনীতি (তাঁর মতে) এবং তার জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামাকে দায়ী করা,
বিদেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, বিশেষত ইসলামিক স্টেট বা আইএসকে নিশ্চিহ্ন
করার প্রতিশ্রুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন। লক্ষণীয় বিষয়
হলো, ট্রাম্প এক বছর ধরে যা বলে আসছেন, তা এখনো অপরিবর্তিত থাকলেও এক মাস
ধরে তাঁর সুর কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন। কারণ, তাঁর দলের
প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তারা প্রথম দিকে ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে অন্য রক্ষণশীল
প্রার্থীদের সমর্থন করেন। কিন্তু তাঁরা তখন ভাবতেও পারেননি যে
ট্রাম্প-সমর্থকেরা কত শক্তিশালী। ট্রাম্প যখন জুন মাসে মনোনয়নের জন্য
প্রাইমারি নির্বাচনী ভোটে প্রয়োজনীয় প্রতিনিধিসংখ্যা পেয়ে যান, তখন
রিপাবলিকান দলের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তারা আর কোনো উপায় না দেখে পরবর্তী
সম্মেলনে ট্রাম্পকেই তাঁদের দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করতে বাধ্য
হন। তবে রিপাবলিকান কর্তারা প্রথম প্রথম ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রচারে
সহায়তা করতে গড়িমসি করেন। কারণ, তাঁরা ট্রাম্পের কিছু কিছু বক্তব্যের সঙ্গে
একাত্মতা প্রকাশ করতে নারাজ ছিলেন। এসব বক্তব্যের মধ্যে প্রধান ছিল
হিস্পানিক সম্প্রদায়ের অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়নের (যাঁরা সংখ্যায় এক কোটির
বেশি) হুমকি, মুসলিম আগন্তুকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা,
মুক্তবাণিজ্য
সম্পর্কে নতুন চিন্তাভাবনা, ন্যাটোর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে উক্তি এবং
সাধারণভাবে বর্ণবাদীদের উসকানি দেওয়া বিভিন্ন মন্তব্য। রিপাবলিকান
কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে তাঁর এ ধরনের উক্তি শুধু
তাঁকেই আগামী নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, সমগ্র রিপাবলিকান দলকেই
কংগ্রেস নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাঁরা বিশেষভাবে জোর দেন যেন ট্রাম্প
তাঁর সুর নরম করেন হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি। কারণ, প্রেসিডেন্ট এবং
কংগ্রেস নির্বাচনে এ দুই সম্প্রদায়কে বিগড়ে দেওয়া উচিত হবে না। একই সঙ্গে
তাঁরা দেশের ও বিদেশের মুসলমানদেরও হেয় না করার পরামর্শ দেন তাঁকে। এরপর
ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারাভিযানকে কিছুটা অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায়
তাঁর প্রচারণা–কর্মীদের পরিবর্তন করেন, নিয়ে আসেন এমন নতুন কয়েকজন কর্মীকে,
যাঁরা নির্বাচনী প্রচারকাজে সিদ্ধহস্ত। কিছুটা নতুন কর্মীদের উপদেশে,
কিছুটা নিজের নির্বাচনী পরিস্থিতি আঁচ করে (অভিমত যাচাইয়ের ফলাফল থেকে)
ট্রাম্প তাঁর বক্তৃতায় সুর ও বাণীতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা আরম্ভ করেন
গত মাসের শেষের দিক থেকে। ওই সময় তিনি মেক্সিকোতে ঝটিকা সফর করে নাটকীয়ভাবে
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, সে
সাক্ষাতে তিনি তাঁর বহুল আলোচিত সীমান্তদেয়াল নির্মাণে মেক্সিকোকে খরচ বহন
করতে দেশটির প্রেসিডেন্টকে বলেন (অথচ সে আলোচনায় মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট
দেয়ালের কোনো উল্লেখ হয়েছে বলে অস্বীকার করেন)। কিন্তু নাটক শুরু হয়
ট্রাম্পের মেক্সিকো সফরের পরপর। সফরের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি
করেন, তিনি তাঁর অবৈধ অভিবাসীদের উৎপাটন–নীতিতে অনড় এবং মেক্সিকো
সীমান্তদেয়াল অবশ্যই হবে আর তার খরচ দেবে মেক্সিকো। এক কোটির বেশি অবৈধ
অভিবাসী অবশ্যই বিতাড়িত হবে। একসঙ্গে এক কোটির বেশি লোককে কীভাবে বিতাড়ন
করা হবে, জানতে চাইলে তিনি তাঁর আগের সুর পাল্টে বলেন, একসঙ্গে সবাইকে
বিতাড়ন করা হবে না, ধীরে ধীরে হবে। প্রথম কিস্তিতে যাঁরা গুরুতর অপরাধের
সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিতাড়ন করা হবে। এটা ছিল ট্রাম্পের প্রথম ডিগবাজি। তাঁর
দ্বিতীয় ডিগবাজি হলো,
মুসলমানদের
যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর ঢালাও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। মুসলমান নিষেধাজ্ঞা নিয়ে
ট্রাম্প তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য করেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস এবং
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সন্ত্রাসী ঘটনার পরপর। তিনি তখন ঘোষণা দেন,
অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের আগমনের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা
হোক, যত দিন না মুসলমান দেশ থেকে ভ্রমণ-ইচ্ছুকদের পূর্ণ পরীক্ষণের ব্যাপারে
একটা নিরাপদ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বেশ কিছুদিন ধরে ট্রাম্প এ ঘোষণা দিতে
থাকেন প্রতিটি সভায়, যা তাঁর সমর্থকেরা বিপুলভাবে গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর এ
ঘোষণার কিছু পরিবর্তন করতে থাকেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন
পাওয়ার পর। তিনি প্রথমে বলেন, মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার ওপর
নিষেধাজ্ঞা ঠিক ঢালাও নয়, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং যারা
পরীক্ষিত, তাদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে না। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও
মার্জিত করে বলেন, মুসলমানদের আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু সেসব জায়গার ওপর
আরোপিত হবে, যেখানে সন্ত্রাসীদের কার্যকলাপ চলছে। জানি না ভবিষ্যতে তিনি এ
নিয়ে তাঁর মন্তব্য আরও কত পরিবর্তন করবেন।
ট্রাম্পের
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ডিগবাজি হলো গত সপ্তাহে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে
নিয়ে। সাত বছর ধরে ট্রাম্প বলে আসছিলেন যে ওবামা জন্মসূত্রে মার্কিন নন,
তিনি মূলত কেনিয়ান। ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প এ মিথ্যা দাবি
করে আসছিলেন এবং এটা চালিয়ে যেতে থাকেন, এমনকি ওবামা তাঁর জন্মসনদ (তিনি
হাওয়াই রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন) পত্রিকায় প্রকাশ করার পরও। ট্রাম্প এ-ও বলেন
যে ওবামার জন্মসনদ নাকি ভুয়া। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভুয়া তথ্য ট্রাম্প
অনবরত চালিয়ে যেতে থাকেন। কারণ, তাঁর সমর্থকদের এক বিরাট অংশ বিশ্বাস করে
যে ওবামা জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক নন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প অবশেষে স্বীকার
করলেন যে ওবামা জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক। কেন সাত বছর পর এ সত্যকে
স্বীকার করলেন, যা তাঁর সমর্থকেরা অসত্য মনে করত? উত্তর একই, রিপাবলিকান
কর্মকর্তারা মনে করলেন যে এ অসত্যকে পিছে ফেললে ট্রাম্প হয়তো কৃষ্ণাঙ্গদের
কিছু ভোট পাবেন। তবে এর ফলাফল আসলে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বোঝা
যাবে না। সোমবারের বিতর্কে ট্রাম্প নিজেকে একজন বিনম্র ও পাকা রাজনীতিক
হিসেবে প্রথম দিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, কিন্তু পরে হিলারির কথার চাপে
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি।
ট্রাম্পের
তথ্যবিহীন অগোছালো মন্তব্যে তাঁর অসহিষ্ণু ও দাম্ভিক চরিত্র ক্রমেই বেরিয়ে
আসে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ডিগবাজি ও বিতর্কে জোরপূর্বক নম্রতা আনার চেষ্টা
হয়তো তাঁর নির্বাচনী কৌশলের একটি অঙ্গ। তবে এটা বলা যেতে পারে, এযাবৎ
ট্রাম্প তাঁর অভিভাষণ নিয়ে কট্টর মনোভাব, মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে কঠোর
উক্তি, আত্মকেন্দ্রিক বৈদেশিক নীতি, মুক্তবাণিজ্যের বিরোধিতা এবং
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে উগ্র মতাদর্শ প্রকাশ করে যে ভাবমূর্তি জনসমক্ষে
তুলে ধরেছেন, তা পরিবর্তন করতে তাঁর আগামী কয়েক সপ্তাহ যথেষ্ট নয়। তিনি
বিতর্কের সাহায্য নিয়ে তাঁর ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা হয়তো করবেন,
কিন্তু এতে তাঁর গুণগ্রাহী এবং তাঁর দলের কট্টরবাদী সমর্থকদের ছাড়া
নিরপেক্ষদের মত পরিবর্তন করতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। প্রেসিডেন্ট
পদপ্রার্থীদের বিতর্ক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে না, তবে বিতর্কগুলো
নির্বাচকদের সাহায্য করে প্রার্থীদের যাচাই করতে। সবাই আশা করছেন যে
ট্রাম্প আর ডিগবাজি না দিয়ে তাঁর প্রকৃত রূপ প্রকাশ করবেন আগামী
বিতর্কগুলোতে।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: রাজনৈতিক ভাষ্যকার।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: রাজনৈতিক ভাষ্যকার।

No comments:
Post a Comment