Saturday, September 10, 2016

দক্ষিণখানের সেই ভয়ংকর ‘সিরিয়াল কিলার’ শনাক্ত

ভাড়াটিয়া সেজে একের পর এক মধ্য বয়সী নারীকে কুপিয়ে হত্যার নেপথ্যে থাকা ঢাকার দক্ষিণখানের সেই ভয়ংকর ‘সিরিয়াল কিলার’কে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে তিনজনকে শনাক্ত করার পর ওই ফুটেজ অধিকতর বিশ্লেষণ করে খুনির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাকে ধরতে এখন বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দক্ষিণখানে সর্বশেষ খুনের ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফুটেজে সন্দেহভাজন খুনিকে দেখা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিতভাবে মধ্য বয়সী নারীদের টার্গেট করে হত্যা করছে ওই যুবক। হত্যার ধরন দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, খুনি চাপাতি চালনায় পারদর্শী। দ্রুততম সময়ে পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সে নারীদের খুন করে। খুনের পর কোনো প্রমাণ রাখে না সে। সে খুবই সচেতন এবং সতর্কভাবে খুন করছে। অনেকটা বহুল আলোচিত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মতো। রসু খাঁও সুপরিকল্পিতভাবে এবং সচেতনভাবে ১১ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল। সেও এসব ঘটনার কোনো প্রমাণ রাখেনি। ২০০৯ সালে গ্রেফতারের পর রসু খাঁ এখন কারাগারে। গত বছর একটি খুনের ঘটনায় তার ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। মনোবিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মনস্তাত্ত্বিক বিষয় এবং খুনের নেপথ্যের কারণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সিরিয়াল কিলার সমাজে স্বাভাবিকভাবেই অবস্থান করে।
তাদের বন্ধু থাকে, প্রেমিকা থাকে। এমনকি স্ত্রীও থাকে। রসু খাঁর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে তার স্ত্রী ছিল। কিন্তু খুনির ঘনিষ্ঠরা বুঝতে পারে না সে ভয়ংকর কিলার হয়ে উঠেছে। রসু খাঁর স্ত্রী বলেছিল, ‘তুমি এতো কিছু ক্যানো করলা। ক্যামনে তুমি এতো কিছু করল্যা। আমরা একদিনের জন্যও কিছু বুঝতে পারলাম না।’ সিরিয়াল কিলার নৃশংসভাবে খুন করে আরাম বা স্বস্তি পায়। এ কারণেও সে ভয়ংকর খুনি হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, দক্ষিণখানের যুবক যদি সিরিয়াল কিলার হয়ে থাকে তবে সাবধান, তাকে কোনোভাবেই মানসিক রোগী বলা যাবে না। তাকে মানসিক রোগী বললে আইনগতভাবে সে পার পেয়ে যেতে পারে। বড় মানসিক রোগীরা এমন নিখুঁত পরিকল্পনায় সুসংগঠিত বা অর্গানাইজডভাবে খুন করতে পারে না। মানসিক রোগীদের বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি থাকে। তাদের আইকিউ ৯০-এর নিচে। তারা সাধারণত আচমকা খুন করে বসে। খুনের সময় বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকে না। আর সিরিয়াল কিলারের গড় আইকিও ১০৩, যা সাধারণ মানুষের চেয়েও বেশি। তার পরিকল্পনাও নিখুঁত থাকে। দক্ষিণখানে একই ধরনের চারটি ঘটনার ছায়া তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থা বলছে, সাধারণভাবে দেখা যায়, খুনি হত্যার পর স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। স্বণালংকার লুট করে সে এই বার্তা দিতে চায় নিছক অলংকার লুট করার জন্যই খুন করেছে। কিন্তু খুনি বিশেষ মিশন নিয়ে ধনাঢ্য পরিবারের মধ্য বয়সী নারীদের খুন করছে। খুনের ধরন দেখে এটা নিশ্চিত, সে প্রশিক্ষিত। তার স্টাইল পেছন থেকে মাথা এবং ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা। হত্যার পর সে নির্বিঘ্নে পালিয়েও যাচ্ছে। বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর বাড়ি ভাড়ার কথা বলে বাসায় প্রবেশ করে সে। এই খুনিকে ধরা না গেলে সে একইভাবে আরও নারীকে হত্যার টার্গেট করবে।
দক্ষিণখান থানার ওসি সৈয়দ লুৎফর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এখনও খুনিকে ধরা সম্ভব হয়নি। তাকে ধরার চেষ্টা চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় সেই যুবক : দেড় মাস আগে তিন মধ্য বয়সী নারীকে হত্যা এবং একজনকে হত্যাচেষ্টা করে সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণে চিহ্নিত হওয়া যুবক। তাকে দেখেছে এমন দু’জনের বর্ণনায় তার শারীরিক গঠন এবং ব্যবহার সম্পর্কে জানা গেছে। সর্বশেষ বুধবার বিকালে গাওয়াইরের দক্ষিণপাড়ার ৭১৫ নম্বর বাড়িতে খুন হন গৃহকর্ত্রী ওয়াহিদা আক্তার (৪৮)। তার মেয়ে শোভা হোসেন ওই যুবককে দেখেছেন। তিনি বলেন, ওই যুবকের আচরণ ছিল স্বাভাবিক এবং স্মার্ট। সে ফরমাল পোশাক পরে এসেছিল। তার বয়স হবে ২৩ থেকে ২৬ বছর। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা। মুখে দাড়ি ছিল না। মাথার চুল ছোট ছোট। কাঁধে একটি ব্যাগ ঝোলানো ছিল। এর আগে ১ আগস্ট দক্ষিণ আজমপুরের এ ব্লকের ৩/এ রোডের ৮১/৩৯ নম্বর বাড়িতে জেবুন্নিসা চৌধুরী (৫৫) নামে এক নারীকে একইভাবে কুপিয়ে আহত করে ওই যুবক। ওই বাড়ির গৃহকর্মী চামেলি খাতুন খুনিকে দেখেছেন। তিনি বলেন, ওই দিন দুপুরে বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ ছিল না। এক যুবক বাড়ি ভাড়ার কথা বলে বাসায় আসে। তার পরনে শার্ট ও প্যান্ট ছিল। তাকে দেখতে খুব পরিপাটি মনে হয়েছে। সে যে খুন করতে পারে এটা ধারণাই করা যায় না। খালাম্মা (জেবুন্নিসা) চাবি নিয়ে দোতলা থেকে চার তলায় চলে যান। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি খালাম্মাকে কুপিয়ে পালিয়ে গেছে সে।

No comments:

Post a Comment