নদীকে নিজের কররেখার মতো চেনেন এমন মানুষের তালিকা তৈরি হলে, সেই তালিকার ওপর দিকে থাকবে আইনুন নিশাতের নাম। নদী বিশেষজ্ঞ ও পানিবিজ্ঞানী অনেক আছেন বাংলাদেশে। নদী ও পানির অস্থি-চর্ম-চুল থেকে নখ, সবই জানেন তারা। কিন্তু বাংলাদেশের নদীকে আইনুন নিশাত চেনেন নিজের সন্তানের মতো। রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে যে গড়াই-মধুমতি-হিসনা, চন্দনা-বারাসিয়া নদী দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সারা বছর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব, তা যেমন তিনি জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দেন, তেমন সহজভাবে জানিয়ে দেন ব্রহ্মপুত্র নদ যেখানে এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেই নুন খাওয়ার পরের পয়েন্ট চিলমারী, দেওয়ানগঞ্জ, সারিয়াকান্দি, সিরাজগঞ্জ ও আরিচার চরগুলোতে বন্যা হবে; কিন্তু প্লাবনভূমিতে পানি প্রবেশ করবে না, যদি বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধগুলো টিকে থাকে। বাংলাদেশের কোন নদীতে কোন বাঁধ দুর্বল অবস্থায় আছে, নদী ভাঙন রোধের জন্য কোথায় কোন বাঁধের ব্যবস্থাপনার সংস্কার জরুরি, সেসবের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণও বাংলাদেশ তার কাছ থেকে পায়। এভাবে কোন নদীতে কোন ফিডার ক্যানেল কাটলে প্রবাহ বাড়বে, কোন ব্যারাজ বর্ষা মৌসুমে, কোন ব্যারাজ শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের নদীর জন্য সমস্যা তৈরি করছে, তার সমাধানই বা কী, তার খুঁটিনাটি বর্ণনাও তিনি এমনভাবে দেন যেন ঘরের মেজ ছেলেটি সাংঘাতিক মেধাবী অথচ পড়ায় মন নেই, পিতৃস্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে পড়া আদায় করে নিচ্ছেন।
আইনুন নিশাত বলেছেন, ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খুলে দেয়ার কারণে পদ্মার পানি বিপজ্জনক গতিতে বাড়ছে, এ তথ্য সঠিক নয়, অতএব না মেনে উপায় নেই। এজন্য অবশ্য তিনি ১৯৮৮, ১৯৯৮ বা ২০০৭-এ যেসব বছর বড় বন্যা হয়েছিল, সেসব বছরের হাইড্রোগ্রাফ এবং ২০১৬ সালের বর্তমান পানির অবস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখার কথা বলেছেন। তুলনামূলক হাইড্রোগ্রাফের পর্যালোচনা দেখলে যে সেটা বোঝা যাবে তাও জানিয়েছেন। তবে এটা ঠিক যে, বর্ষা মৌসুমের এ সাময়িক বন্যার জন্য ফারাক্কা দায়ী না হলেও শুকনো মৌসুমে ভাটি অঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশের বিশেষ বিশেষ অঞ্চল খরাপ্রবণ বা মরুপ্রবণ হয়ে যাওয়ার জন্য ফারাক্কা দায়ী। এ নিয়ে বাংলাদেশের কোনো পানিবিজ্ঞানীরই ভিন্নমত নেই। ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে গঙ্গার দুটি শাখা নদী যা বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল, সেই ভাগীরথী ও জলাঙ্গীর কোনো প্রবাহ এখন আর বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশে এ দুটি নদী দিয়ে কতটুকু পানি ঢুকবে ভারত ভাগীরথী ও জলাঙ্গীর মুখে দুটি অবকাঠামো নির্মাণ করে তা নিয়ন্ত্রণ করছে। ভাগীরথী ও জলাঙ্গী চালু রাখা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল ভারত। কথা রাখেনি। শুকনো মৌসুমে পদ্মা নদীর বাম তীর ঘেঁষে কোনো প্রবাহ না থাকার কারণে ওই নদীর তীর ঘেঁষে যে বিরাট আকৃতির চর পড়ছে সেই চরের মালিকানার দাবিদারও হচ্ছে ভারত। ফারাক্কা নিয়ে যে বিরোধ বা আপত্তি সেটার আপাতত কারণ পদ্মায় পানি বেড়ে যাওয়া নয়।
আপত্তিটা পানি ও পানির ব্যবস্থাপনায় ভারতের আধিপত্য নিয়ে। যে কোনো ব্যারাজ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই থাকে নদীর পানির উচ্চতাকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা এবং নদীর উজান অংশের প্রবাহের ভারসাম্য ঠিক রাখা বা ভরন্ত রাখা। সেই নিয়ন্ত্রণ ভারত ভালো মতোই করছে। উজানে অবস্থানের ভৌগোলিক সুুবিধা নিয়ে তা করার অধিকার ভারতের আছে? না, নেই। আন্তর্জাতিক নদী আইনে নেই। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গঙ্গা চুক্তিতে নেই। এমনকি দুই দেশের মধ্যে ‘প্রাণের বন্ধুত্বের’ যে ফর্মুলা তার মধ্যেও নেই। অথচ ‘প্রাণের বন্ধু’ ভারত শুকনো মৌসুমে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে (শুকনো মৌসুমে পদ্মায় প্রবাহ যখন কম থাকে), ব্যারাজের উজান থেকে সেই পানি উত্তর ও মধ্য প্রদেশের খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ব্যবহার করে। শুকনো মৌসুমে সেচের জন্য কতটুকু পানি বাংলাদেশের দরকার তা একবার জানতে চেয়ে ভারত বলেছিল, সেটুকু পানি তারা দিতে রাজি। বাহ্, যেন বাংলাদেশের কেবল সেচের জন্যই পানি দরকার। আর ভারত বাংলাদেশের প্রাপ্য ন্যায্য পানি দিতে বাধ্য, অথচ তাদের ভাবটা এমন যেন তারা দয়ার পানি দান করছে। পানি কেবল সেচ বা কৃষি কাজের জন্য নয়, প্রকৃতির প্রাণই হল পানি। সেই পানি থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার পরও ভারত বাংলাদেশের বন্ধু! নদীর প্রাকৃতিক ধারাকে একতরফা বন্ধ করে দেয়া মারাত্মক অপরাধ।
সেই অপরাধে দীর্ঘদিনের অপরাধী ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজ একতরফা নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণের কারণে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের বিশাল এলাকা মরুপ্রবণ হয়ে ওঠে। শুধু পানি থেকেই বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে না, বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি ন্যায্য বণ্টন না হওয়ার কারণে ওই অঞ্চলের ভূ-স্তরের পানির ওপর গাছপালা, জীব, অনুজীবের অধিকারও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে নদী ও পানি রক্তের মতোই জরুরি। প্রাণ রক্ষার সঙ্গে পানির সম্পর্ক গভীর বলে এবং নদীর প্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার মুখ্য সম্পর্কের কারণে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলাটা জরুরি। প্রাণ, পরিবেশ, খাদ্য- সবকিছুর সঙ্গে পানি এবং পানির রাজনীতি জড়িত। কিন্তু বাংলাদেশ যখনই ভারতের সঙ্গে পানিরাজনীতির কথা বলতে গেছে তখন সেই পানিরাজনীতি হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী রাজনীতি। ফারাক্কা বলে কথা নয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও যে ৫৪টি নদীর ভাগবাটোয়ারার সম্পর্ক রয়েছে, ইতিমধ্যে তার ৪৮টি পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ ভারত এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রাকৃতিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে নিজেদের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। একটুখানি বলে রাখা দরকার, উজানের যে কোনো জায়গায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হলে ভাটি অঞ্চলে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করায় বাংলাদেশের ৫৪টি নদীই এখন এ ক্ষতির শিকার। বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ভাগের পানি থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। জ্বালানি ক্ষুধা মেটানোর জন্য এক তিস্তাতেই ২৯টি বাঁধ দিয়ে ২৯ জল বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করেছে ভারত।
বাংলাদেশের দিক থেকে বিষয়টি কেবল তিস্তা নদীর ওপর বাঁধ বা জলাধার বা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের মামলা নয়। মামলা আরও অনেক গভীর, অনেক বড় রাজনীতির। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, যারা পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে দরকষাকষি করবেন তারা বাংলাদেশের কষ্ট বেনিফিটের হিসাব কতটা রাখেন? ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে একমাত্র গঙ্গার পানি নিয়ে চুক্তি হয়েছে, সেই একটি নদীর চুক্তির শর্তও পদে পদে লংঘিত হচ্ছে। তবুও বলে যেতে হবে ভারতের কাছ থেকে দাবি আদায়ের কূটনীতিতে বাংলাদেশ সফল! কোনো একটি দেশের সঙ্গে আরও একটি দেশের রাজনীতি ও কূটনীতি যুগ যুগ ধরে একই জায়গায় থাকে না। মাত্র এক যুগ আগে যে যুক্তরাষ্ট্র নরেন্দ্র মোদির ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রকে এখন লজিস্টিক মেমোরেন্ডাম এক্সচেঞ্জ চুক্তিটি করতে হল। ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সামরিক সহযোগিতার চুক্তিকে স্মরণ করে বলা যেতে পারে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবস্থান সেই সময়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। অথচ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতি, আরও নির্দিষ্ট করে বললে কূটনীতিকে প্রয়োগ করে দাবি আদায়ে বাংলাদেশের অবস্থান দশকের পর দশক একই জায়গায় রয়ে গেছে। ভারত সফরে গিয়ে খালেদা জিয়া তার সরকারের প্রথম টার্মে গঙ্গার পানি চুক্তির কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন,
আর কত বছর ধরে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের মিটিং হয় না, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখালেও ভারত তাতে সাড়া দেয় না, আবার কখনও যদি একটু-আধটু তাদের সঙ্গে বসার সুযোগ হয়, তখন শুকনো মৌসুমে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ মরুভূমিতে পরিণত হয়- ওই এক কথা বলে বা এক কুমিরের ছানা দেখিয়ে বাংলাদেশকে বিদায় দেয়। বাংলাদেশ তো ভারতের রাজ্য নয়, ভারতের কোন রাজ্যে পানি না পাওয়া আর বাংলাদেশে পানি না পাওয়া দুটি এক বিষয় নয়। প্রাণ, পরিবেশ এবং পানির প্রাপ্য অধিকার প্রসঙ্গগুলো কিন্তু সার্ক পিপলস ফোরামের মতো জায়গায় বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। বিশ্ব কূটনীতি যদি নানান উত্থান-পতন এবং নানান মাত্রার পালাবদলে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে চলে যেতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ের কূটনীতিটি কেন দশকের পর দশক একই জায়গায় থাকে? বাংলাদেশের ভূমি,পানি, নদীর সর্বোচ্চ সুবিধা ভারত নিচ্ছে। সুজন সখী চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ে। যেখানে সুজন নামের এক প্রেমের ঘাটের মাঝির দেখা পাই, যে নাকি সব সখীকে পার করতে কড়ি-আনা আদায় করলেও প্রাণের সখীকে পার করতে কিছুতেই কড়ি না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেই সুজনেরও অন্তত কড়ির বদলে প্রাণের সখীর কাছ থেকে কানের সোনা নেয়ার লক্ষ্য ছিল। বাংলাদেশ নামের প্রেমের ঘাটের মাঝির তো ভারত নামক প্রাণের সখার কাছ থেকে সে ধরনের কানের সোনা নেয়ারও কোনো আভাস-ইঙ্গিত দেখতে পাই না।
জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
No comments:
Post a Comment