সানজিদা, মার্জিয়া, মারিয়া, কৃষ্ণা,
মৌসুমী, তহুরাদের প্রসঙ্গ উঠলেই যে কেউ খুব সহজেই বুঝে নিচ্ছেন এগুলো
আমাদের ২৬ গোল করা সোনার মেয়েদের নাম। কলসিন্দুরের কৃতী ফুটবলারদের নাম।
তাদেরকে সবাই এখন বলছেন অনন্যা, অপরাজিতা। তারা এখন একেকজন যেন বাংলাদেশের
কিশোরী রানী ফুটবলার। ছেলেদের কাছ থেকে আশা করে যা পাওয়া যায়নি, তা যেন
পূরণ করল ঢাকায় সম্প্রতি শেষ হওয়া এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা ফুটবল
চ্যাম্পিয়নশিপের ‘সি’ গ্রুপের বাছাই পর্বের খেলোয়াড়রা। অনূর্ধ্ব-১৬ বলা
হলেও অনেক মেয়ের বয়স ১৬ বছরের কম। আসলে ওদের পায়ে যেন জাদু আছে। গত ৫
সেপ্টেম্বরের (সোমবার) খেলায় অপরাজিত থেকে পাঁচ ম্যাচে ২৬ গোল করে বাছাই
পর্ব শেষ করল মৌসুমী, মার্জিয়ারা। খেলা শুরুর আগে অনেকে ভাবতেই পারেনি তারা
এমন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে, ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হবে বিশ্বে। তাদের
খেলার কৌশলে একে একে ধরাশায়ী হয়েছে ইরান, সিঙ্গাপুর, কিরগিজস্তান, চাইনিজ
তাইপে ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানকে ৩-০, সিঙ্গাপুরকে ৫-০, কিরগিজস্তানকে
১০-০, চাইনিজ তাইপে এবং সংযুুক্ত আরব আমিরাতকে যথাক্রমে ৪-২ ও ৪-০ গোলে
হারিয়ে বিজয়ের আসন ছিনিয়ে নেয়। এখন অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ে এশিয়ার শীর্ষ আট
দলের একটি হলো বাংলাদেশ। মূল পর্বের খেলায় বাংলাদেশ দলকে মুখোমুখি হতে হবে
অস্ট্রেলিয়া, জাপান, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের।
মূল পর্বের খেলায় ভালো কিছু করার জন্য এখন অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের
সোনার মেয়েদের। ৫ তারিখের খেলায় দু’টি গোল করেছে দলের অধিনায়ক কৃষ্ণা রানী
সরকার। পাঁচ ম্যাচে সে করেছে আট গোল। অবশ্য হ্যাটট্রিক করার সৌভাগ্য হয়নি
তার। কৃষ্ণা বলে, ‘হ্যাটট্রিক করাই বড় কথা নয়, জেতাটাই আসল।’ আমিরাতের
সিরীয় কোচ বলেছেন, ‘দলটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জাতীয় মহিলা দল হিসেবে
স্বীকৃতি পেল। এটি তাদের কৃতিত্ব। ওরা খেলেছে দুর্দান্ত।’ এরাই এক সময় মাঠ
দাপিয়ে বেড়াবে। সানজিদা, স্বপ্নার মতো অনেকেই গোটা টুর্নামেন্টে যারপরনাই
সুন্দর খেলেছে।’ বাংলাদেশের লক্ষ্যও ছিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছয় দলের
লড়াইয়ে। এ দিকে অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েরা এএফসি টুর্নামেন্টে সবাইকে চমক
দেখিয়েছিল ২০১৪ সালেও। দলটি অনূর্ধ্ব-১৪ ও ১৬ দলের মিশেলে সাজানো। এদের
খেলার কৌশল চোখে পড়ার মতো। শক্তিশালী জর্ডানকে তারা হারিয়েছে। ইরান ও
ভারতের সাথে তুমুল লড়াই করেছে। এর ওপরে আবার তৃতীয় হয় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪
ফুটবলে ২০১৩ সালে। পরের বছর বাংলাদেশ তাজিকিস্তানে গিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।
ওখানে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ভারতকে হারিয়েছে। তহুরা বলে, ‘কেবল প্রথম
ম্যাচে জিতলাম। বেশি আনন্দ উল্লাস করে লাভ কিসের? বাকি চার ম্যাচে জিততে
পারলে অর্থাৎ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে তখন না হয় উৎসব করা যাবে।’ তাদের কথা ও
খেলা বিচার করলে এটাই বলতে হবে, আধুনিক ফুটবলের ব্যাপারস্যাপারগুলো তারা
রপ্ত করে ফেলেছে ভালোভাবেইÑ বলেছেন খেলাবিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশই এ ম্যাচে
ফেবারিট ইরানের বিপক্ষে দারুণ বা সুন্দর পারফরম্যান্সের পর। এ মন্তব্যের
সাথে একমত সিঙ্গাপুরের কোচ চেন কাই ইং।
তিনি আরো বলেন, ‘আমি মাঠে বসে
দেখেছি বাংলাদেশের খেলা। তারা বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ আমাদের জন্য। এ ম্যাচে
ড্র করতে পারলেও ভালো বলতে হবে।’ এ দিকে জয় ছাড়া কোনো আলোচনা নেই
বাংলাদেশের ক্যাম্পে। কোচ বা প্রশিক্ষক গোলাম রব্বানীর প্রতিধ্বনি যেন বেশি
গোলদাতা তহুরা আক্তারের মধ্যে। তহুরা বলে, ‘স্ট্রাইকার হিসেবে গোল করার
জন্য আমি মুখিয়ে বা মরিয়া ছিলাম। মাঠে নামলে প্রতিপক্ষকে আমার খেয়াল থাকে
না। কারণ গোল করতে হবে বুদ্ধি ও কৌশলে। আবার এটাও ঠিক, কাউকে বা কোনো দলকে
দুর্বল প্রতিপক্ষ মনে করা হচ্ছে না আমার পক্ষ থেকে। আমাদের গোল উৎসব করার
সময় এসেছে। প্রথম খেলায় জিতে ভালো পারফরম্যান্স করার জন্য মনোবলও বেড়ে গেছে
আমাদের। সেই হিসেবে কিরগিজস্তান ছিল আমাদের বেশ সহজ প্রতিপক্ষ।’ একটা সময়
পর্যন্ত ‘সি’ গ্রুপে দু’টি দল চাইনিজ তাইপে ও বাংলাদেশ ছিল অপরাজিত। তারা
শক্তিতেও প্রায় কাছাকাছি। তহুরা, মৌসুমী ও মার্জিয়া তিন গোল করেছেন প্রথম
ম্যাচে ইরানের জালে। তবে গোল করার সুযোগও কিছুটা নষ্ট হয়। কৃষ্ণা দ্বিতীয়
ম্যাচে জোড়া গোল করেছে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে। দুই গোল দিয়েছে আনু চিং মারমা।
তার পরও তারা ভালো খেলেছে। যে কারণে তারা অপরাজিতা। অর্থাৎ ভাসিয়েছে
গোলবন্যায়। কোচ বলেন, আমাদের গোলরক্ষককে (মাহমুদা) কঠিন পরীক্ষায় নামতে
হয়নি প্রথম তিন ম্যাচে। তবে বাড়তি প্র্যাকটিস করানো হয়েছে গোলরক্ষককে।
তাদের পরিকল্পনা রক্ষণভাগে কেমন হওয়া উচিত তাও বুঝিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ
দলটির ভালো করার পেছনে ব্যাপক অবদান রয়েছে কোচেরও।
এর একটা উদাহরণ হলো
একপর্যায়ে লাল-সবুজ আর গোল করার কোনো সুযোগ হারায়নি। যে কারণে গোলের
ঝাঁপিতে জমা হয় ২৬টি গোল। তাতে পাল্টে যাচ্ছে দেশের মেয়েদের ফুটবলের
চেহারা। দলের অধিনায়ক বলে, বছর দুই আগেও তেমন ভালো অভিজ্ঞতা ছিল না আমাদের
টিমের। সেই তুলনায় অনূর্ধ্ব-১৪ দলের অনেক খেলোয়াড়ও আছে এবারের দলে। তাদের
আছে তাজিকিস্তান জয়ের অভিজ্ঞতা। জাতীয় দলের সাথে খেলা হয়েছে তিনটি
প্র্যাকটিস ম্যাচ। তিনটিতেই জিতেছি ব্যাপক ব্যবধানে। সেই নিরিখে বলা যায়,
এই দলের ভালোই সামর্থ্য হয়েছে, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। খেলার সময়
প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে বজায় রাখে, তবে অবশ্যই ভালো ফল আশা
করা যায়। সবচেয়ে আগে থাকতে হবে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। তাদের (মেয়েদের) ফুটবল
স্বপ্নের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল কমলাপুর স্টেডিয়ামে ২০০৪ সালে। ৪ অক্টোবর
ঢাকা ও আনসারের ফুটবল ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল মহিলা ফুটবলের প্রথম
টুর্নামেন্ট। তখন এ খেলাসংক্রান্ত অনেক কিছুই যেন কিছুটা এলোমেলো ছিল। আর
তারাই খেলবে এশিয়ার বড় দেশগুলোর সাথে। সাফ গেমসের প্র্যাকটিসও শুরু হয়ে
গেছে।

No comments:
Post a Comment