সেদিন ছিল রোববার। সবার জন্য দিনটি আয়েশি
আমেজের। অথচ সেই আয়েশ ঘুম ভাঙল মায়ের দীর্ঘ দিনের কাজের ঝি গেদির মায়ের
আর্তচিৎকারে। তখন কতটুকুইবা আমি! ৯-১০ বছরের হবো হয়তো। মায়ের পিছু পিছু সদর
দরজা পর্যন্ত গেলাম। দরজা খোলামাত্রই মাকে গেদির মা জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে
কাঁদতে বলল, আম্মা আমার সব শেষ, গেদিরে বুঝি আর বাঁচাতে পারব না। কারা যেন
ওর ইজ্জতের সাথে জীবনটারেও শেষ করতে চাইছিল। এখন জানটা শুধু আছে। আম্মা
কিছু একটা করেন। পরোপকারী মা আমার, সেদিন গেদিকে বাঁচাতে সাধ্যমতো
লড়েছিলেন। গেদি পরানে বেঁচে গেল। আমার মামা হাসপাতালে ওর একটা চাকরিরও
ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। পরে এক বাকপ্রতিবন্ধীর সাথে ওর বিয়েও হয়েছিল। এর
পরের জীবন সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। তবু শুনেছি, গেদি ওর ধর্ষকদের চিনতে
পেরেছিল। এদের নাম পরিচয় না জানানোর অঙ্গীকারে ও সে যাত্রা প্রাণে বাঁচতে
পেরেছিল। আনুশা আক্তার। আমার বোনের গ্রামের এক প্রতিবেশী। আনুশা বয়সে আমার
চেয়ে বড়জোর ৮-৯ বছরের বড়। ছোটখাটো গড়নের আনুশাকে দেখলে অতটা বড় বলে মনে হতো
না। যখনই বোনের বাড়ি বেড়াতে যেতাম, তখনই ফুটফুটে আনুশা চলে আসত। আমাকে
নিয়ে বনবাদারে ঘুরে বেড়াত। দু’জনে ফ্রকের কোচর ভরে কাঠবাদাম কুড়াতাম। আখ
ক্ষেতে গিয়ে আখ ভেঙে খেতাম।
ঘন পাট ক্ষেতে লুকোচুরি খেলতাম। তিন-চার দিনের
ছুটি কাটিয়ে ফেরার পথে আনুশা শিশুর মতো কাঁদত। যতদূর আমার বাস যেত, ততদূর
পর্যন্ত তাকিয়ে থাকত। আমার জন্য আনুশার এই আকুতি আজো এ হৃদয়ে অম্লান। কেউ
কখনো কারো জন্য অমন করে কাঁদতে পারে এর প্রমাণ আর পাইনি। হয়তো ও হারিয়ে
যাবে বলেই অমন করে ভালোবেসেছিল। শুনেছি, প্রতিদিনকার মতো কোনো এক নীরব
সকালে বাদাম কুড়াতে গিয়ে ও ধর্ষিত হয়। মাকে সব কথা জানায়। মা বিষয়টি চেপে
যেতে বলেন। বাড়িতে চলে ১৪ বছরের আনুশার বিয়ের তোড়জোড়। সময় গড়ায়। আনুশার পেট
ভারী হতে থাকে, যা ওর মায়ের চোখ এড়ায় না। মা গ্রাম্য এক কবিরাজের সাথে কথা
বলেন। তিনি তাকে একটা গাছের শিকড় ধরিয়ে দেন। অসহায় মা কবিরাজের কথামতো কাজ
করেন। একপর্যায়ে আনুশার এতটাই রক্তক্ষরণ হয় যে, রাত ফুরাতে না ফুরাতেই ওর
জীবন প্রদীপ ফুরিয়ে যায়। ওর পরিবার সমাজ সংসারের ভয়ে হাসপাতাল কিংবা একজন
চিকিৎসকের কথা মাথায়ই আনেনি। পরিণামে ধর্ষকের পরিত্রাণ হলো। আনুশার হলো
পরিসমাপ্তি। শাহীনা জলি (ছদ্মনাম) বর্তমানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বয়স ৫০ ঊর্ধ্বে। জলি চিরকাল অবিবাহিত থাকবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেন,
উত্তরও জানান স্বউদ্যোগে। তার এক কথায় উত্তর, ভালোবাসার মানুষটিকে যখন
ধর্ষকের পরিচয় পাই।
তখন কাকে আর বিশ্বাস করি! বিশ্বাস যেন বারবারই
অবিশ্বাসের কাছে হার মানে। ব্যস্ততার নিত্য মলমে যেন সেই ক্ষত ঢাকতে হয়।
তাই নতুন করে কাউকে বিশ্বাস করে বাসর গড়া হয়নি। হয়নি ব্যক্তি অপমানকে ভুলে
সামাজিক স্বাভাবিক চিন্তাধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এ বিষয়ে কথা হয়
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লায়লা আজাদের সাথে। তিনি বলেন, ধর্ষণের এ অধ্যায়
বহুকাল থেকে চলছেই। তবে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, নারীকে ধর্ষণ করেই ধর্ষক রেহাই
দিচ্ছে না। ধর্ষণ করার পর তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে। হত্যার কারণ
হিসেবে জানা যায়, ধর্ষণের শিকার নারীর একনিষ্ঠ প্রতিবাদ, যা করতে তারা
বিন্দুমাত্র পিছপা হচ্ছে না। যে কারণে ২০০৮ থেকে ২০১৫ হিসাব মতে, এক
পরিসংখ্যানে আমরা জানতে পারি, ধর্ষণের শিকার হয় চার হাজার ৩০৪ জন। এদের
মধ্যে ৭৪০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। যা সত্যিই উদ্বিগ্ন ও দুঃখিত
হওয়ার বিষয়। বুঝা যাচ্ছে, ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারীরা নিরাপত্তাহীনতায়
ভুগছেন।
ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহত্যাও করছেন। আত্মহত্যার
ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত চার হাজার ৪২৭ জন, যাদের
অনেকেরই পরিবার আইনের আশ্রয় নেননি। কারণ হিসেবে আসামিপক্ষ প্রভাবশালী,
পরিবারের অন্য সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি। আর যদি মামলা হয়ও তাহলে ভয় বা
টাকার বিনিময়ে আসামিপক্ষের সাথে আপস করার ঘটনাও থাকে। যার দরুণ বেশির ভাগ
নারী বিচার পাচ্ছেন না। তবে আশার কথা হচ্ছে, এখন শুধু ভুক্তভোগীর পরিবার
নয়, বিভিন্ন মিডিয়ার পাশাপাশি ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
সম্মিলিতভাবে বিক্ষোভ প্রতিবাদ করছেন, যা একজন গৃহিণীকেও উজ্জীবিত করছে।
কেউই আর নির্বিকার থাকতে চাইছেন না। কারণ মানুষমাত্রই মা, বোন, কন্যা, বধূ
কোনো না কোনো একটি নারীর সম্পর্কের আওতায় বন্দী। সে সম্পর্ককে তো কোনোভাবেই
যায় না অস্বীকার করা। যায় না সম্পর্কিত মানুষটিকেও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের
দিকে ছুড়ে ফেলা। তাইতো যে যেভাবে পারছেন; প্রতিবাদ করছেন। বুঝে নিয়ে সবাই
সবার সম্পূরণ। হোক দুঃখের কিংবা সুখের। প্রতিবাদের বা পরিত্রাণের।

No comments:
Post a Comment