Wednesday, September 28, 2016

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী আরও দৃঢ় হোক

ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বাংলাদেশি নাগরিকেরা পর্যটক শ্রেণিতে ভারত ভ্রমণের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা পাবেন। এর আবেদন করতে ই-টোকেন বা নির্ধারিত তারিখও লাগবে না। ঘোষণাটির কিছু অপূর্ণতা সত্ত্বেও একে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার বয়স ৫৯ বছর। তারপর অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কিছুকাল ঘোরাফেরা করতে পারেন। সাধের সঙ্গে সাধ্যের মিল ঘটাতে তাঁরা সাধারণত বেড়াতে যাওয়ার জন্য বেছে নেন পার্শ্ববর্তী দেশগুলো। সেসব দেশের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য ভারত। কারণ, দেশটির ব্যাপক বৈচিত্র্য, স্বল্প ব্যয়, সাংস্কৃতিক নৈকট্য ও বিভিন্ন ধরনের নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা। বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে ক্রমান্বয়ে চলাফেরার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। বিদেশ কেন, দেশে ভ্রমণ করাও কষ্টসাধ্য হয়। সঙ্গী কিংবা সঙ্গিনীকে সঙ্গে না নিলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়ে। তাই অন্তত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কারও বয়স ৬৫ হলেই অন্যজনকেও এ সুবিধার আওতায় আনা সংগত হবে। ভারতীয় হাইকমিশনের সাম্প্রতিক ঘোষণায় যেটুকু সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তাতে এই সংযোজনী আবশ্যক। তাহলে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ভ্রমণে যেতে পারবেন।
ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায় বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসাব্যবস্থা আরও অনেক সহজ করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণের আগে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন। সুতরাং তিনি তাঁর দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কাতারেই পড়েন। এটা তাঁর উপলব্ধিতে এসেছে, এ জন্য সাধুবাদ জানাই। বন্ধুপ্রতিম দুটি দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় থেকে নিবিড়তর হলে সরকারে যখন যাঁরা আসবেন, তাঁদেরও সে বিবেচনাতেই নীতি নির্ধারণ করতে হবে। ত্রিপুরার রাজ্যপাল এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি মূল্যবান কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ভারতের ‘বৈরী রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের সঙ্গে স্থায়ী পানি চুক্তি করে তার শর্ত পালন করা হচ্ছে। আর বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়গুলো অমীমাংসিত রেখে ভারত সুবিবেচনার পরিচয় দিচ্ছে না। বহুদর্শী রাজনীতিক তথাগত রায় বিষয়টির গোড়ায় হাত দিলেন। বাংলাদেশ ভারতের জন্য ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশের কিছু অপরিণামদর্শী শাসকের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিল। তবে গত আট বছরে তো পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের নেতাদের হস্তান্তর করা হয়েছে ভারতের কাছে। এ ধরনের কার্যক্রম যাতে নতুনভাবে চলতে না পারে,
তার জন্য নিবিড় তদারকি রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারের সদিচ্ছায় অকারণে ফেলে রাখা স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে পণ্য চলাচলে বাংলাদেশ তার বন্দর, সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করতে দিচ্ছে উদারভাবে। এ ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস করিডর করারও ভারতীয় পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছে। এ ধরনের সুবিধায় ভারত একতরফাভাবে লাভবান হচ্ছে বলে বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে। পক্ষান্তরে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো নাজুক ও অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে মীমাংসা হচ্ছে না যুগ যুগ ধরে। অবশ্য ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সে বছরই ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করে। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দেব গৌড়া। আই কে গুজরাল ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে গুজরালও স্বল্প সময়ের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ নিয়ে তাঁর একটি সুচিন্তিত মতবাদ সুধী মহলে সমাদৃত।
এটি গুজরাল ডকট্রিন নামে পরিচিত। পাঁচ দফাসংবলিত ওই মতবাদের ভূমিকায় বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর ও পশ্চিম দিকের দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বস্তির সম্পর্ক স্থাপন করা জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দ্রুত চমৎকার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ মতবাদের প্রথমটি হচ্ছে, এসব প্রতিবেশী দেশের যেকোনো দাবি ভারত তার সামর্থ্যের মধ্যে থাকলে কোনো রকম বিনিময়ের প্রত্যাশা না করেই পূরণ করবে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সম্ভবত সেই চেতনাপ্রসূত। তবে এই নদীর পানির ওপর আমাদের অধিকার আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা স্বীকৃত। ভারত বরং একতরফাভাবে ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করছিল। সে চুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু অভিন্ন অন্য নদীগুলোর পানি ভাগাভাগির বিষয় অনিষ্পন্নই রয়ে গেছে। ত্রিপুরার রাজ্যপালের কথা অনুসারে, ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সামগ্রিক পানিবণ্টন চুক্তি করেছে এবং তা কার্যকর আছে। ১৯৬০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান করাচিতে ওই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মধ্যস্থতা করে বিশ্বব্যাংক। ওই চুক্তিতে সিন্ধু, চেনাব ও ঝিলম নদীর ওপর পূর্ণ অধিকার পায় পাকিস্তান। ঠিক অপর তিনটির পরিপূর্ণ অধিকার ভারতের। পাকিস্তানের ভাগে পড়া নদীগুলোর ভারত থেকে প্রবাহিত হয়েছে বলে এর সর্বাধিক ২০ শতাংশ পানি ব্যবহারের সুযোগও থাকে ভারতের। সুযোগ থাকে কিছু সেচসুবিধা, নৌপরিবহন ও বিদ্যুৎ উত্পাদনেরও। পর্যবেক্ষকদের মতে, চুক্তিটি পৃথিবীর সবচেয়ে সফল পানিবণ্টন চুক্তিগুলোর অন্যতম। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু পানির ভাগাভাগি নিয়ে এ পর্যন্ত চুক্তির পর বড় কোনো বিরোধই হয়নি। ভারতের উরিতে সন্ত্রাসী হামলার পর অবশ্য মি. মোদি এই চুক্তির বিষয়ে অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ছোটখাটো কারিগরি বিষয় কর্মকর্তা পর্যায়েই নিষ্পত্তি হচ্ছে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্বাংশের বিষয়টি একসঙ্গে নিলে হয়তো-বা মিটে যেত। কিন্তু পূর্ব বাংলা তো তাদের হিসাবের খাতাতেই ছিল না। দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেক চেষ্টা চলছে। কোনো কোনো চুক্তি হতে হতেও ভেস্তে যায়। তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ প্রধান নদী। আমাদের ছয়টি জেলা, মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আবাদি জমির ১৪ শতাংশ তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নদীটিতে একতরফাভাবে বাঁধ দিয়ে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচসুবিধা সম্প্রসারণ করে চলেছে। বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডালিয়া পয়েন্টে ইতিপূর্বে নদীটির সর্বনিম্ন প্রবাহ ছিল ১০ হাজার কিউসেক। এখন তা হাজার থেকে পাঁচ শতে নেমে এসেছে। আমাদের বিশাল সেচ প্রকল্প ধুঁকছে পানির অভাবে। মূল নদী শুষ্ক মৌসুমে শুষ্কই থাকছে। ব্রহ্মপুত্র নিয়ে তেমন কোনো সংশয় ছিল না। এখন দুই দিক থেকে সংশয় আসতে শুরু করেছে। জানা যায়, চীন এ নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। ভারত এতে আপত্তি জানিয়েছে।
আমাদেরও আপত্তি জানানো প্রয়োজন। অন্যদিকে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প নামে ভারত একটি মহা প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এতে ব্রহ্মপুত্রের পানিও চলে যাওয়ার কথা ভারতের অন্য নদীতে। এমন কিছু করতে দুই দেশের মধ্যে পানির ভাগাভাগি হওয়া উচিত। মেঘনা নিয়ে আমরা নিশ্চিন্তই ছিলাম। ভারতের মণিপুর রাজ্য হয়ে প্রবহমান বরাক নদ মেঘনার পানির প্রধান উৎস। সে নদে টিপাইমুখ নামক একটি স্থানে পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাঁধ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ভারত। অনেক দেনদরবার এমনকি ভারতের পরিবেশবাদীদের প্রবল আপত্তিতে আপাতত বিষয়টি স্তিমিত আছে। অনেকের মতে, এমন কিছু করা হলে শুষ্ক মৌসুমে বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরগুলো পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। অথচ এ সময়ে উৎপাদিত একমাত্র বোরো ধানই তাদের সারা বছরের জীবিকার উৎস। এই অঞ্চলটি মিঠা পানির মাছের জন্যও সমৃদ্ধ। এগুলো বিলীন হয়ে যেতে পারে। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের সৈনিকেরা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি রক্ত দিয়েছেন। ভারত এক কোটি বাঙালিকে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়েছে। বাংলাদেশের সচেতন জনগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ভারতের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে সম্প্রীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও সম্ভাবনা আছে। তবে একে অপরের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সচেতন থাকা প্রয়োজন। সেবার জন্য দেওয়া দরকার উপযুক্ত মাশুল। তবেই দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক দৃঢ়তর হবে। ভারতীয় ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে শুভ প্রচেষ্টা। কিন্তু ফুলের ওপর কাঁটা হয়ে আছে নদীর পানিবণ্টনের বিষয়গুলো। এ সম্পর্কে বাংলাদেশের দাবিগুলোতে ভারতের একটি প্রভাবশালী মহলের অনীহা রয়েছে। তবে ত্রিপুরার রাজ্যপালের বক্তব্য সে প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরাতে পারে। আশা করব তা-ই হোক, দ্রুত হোক।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

No comments:

Post a Comment