Wednesday, September 28, 2016

‘জাগো বাহে’ ডাক দিয়ে ঘুমুতে গেলেন ‘বাহের’ জনপদে

সস্ত্রীক সৈয়দ শামসুল হক l ফাইল ছবি
বাড়ি নম্বর ৮, সড়ক নম্বর... আমার আজও বাড়ির ঠিকানা স্পষ্ট মনে আছে। প্রায় ৩২ বছর আগে, রংপুর সার্কিট হাউসে তিনি বলেছিলেন নিজ মুখে, তাঁর বাড়ির ঠিকানাটা! গতকাল সন্ধ্যায় সৈয়দ শামসুল হকের চলে যাওয়ার খবর ফরিদুর রেজা সাগরের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার পর আমার শকট-চালককে আমি নির্ভুলভাবে বলতে পারলাম, যাও, গুলশান, বাড়ি নম্বর ৮... বাড়ির নাম মঞ্জুবাড়ি। হাসপাতাল থেকে তিনি এই বাড়িতে আসতে চেয়েছিলেন, তাই ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে খানিকক্ষণের জন্য বৃক্ষে বাগানে তৈলচিত্রে আলোকচিত্রে শোভিত এই উঠোনভরা বাড়িতে আনা। সেখান থেকে আজ বুধবার তিনি যাবেন চ্যানেল আইতে, বাংলা একাডেমিতে, শহীদ মিনারে এবং তারপর কুড়িগ্রামে। কুড়িগ্রামে, নাকি জলেশ্বরীতে?
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের আছে মাকোন্দো, এক কল্পিত জনপদ, আমাদের সৈয়দ শামসুল হকেরও আছে একটা জনপদ, জলেশ্বরী। আমাদেরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোয় তিনি বলেছেন, রংপুরের কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী নাম থেকে প্রাণিত হয়ে তিনি বাস্তবের কুড়িগ্রামের এই নামকরণ করেছিলেন, জলেশ্বরী। ‘বৃষ্টি এসে ভাসিয়ে দেবে নাগেশ্বরীর মাঠ’, তাঁর একেবারে প্রথম দিকের কবিতার বইয়ের প্রথম কবিতাই তো এটি। জলেশ্বরীর গল্প তিনি বহুবার লিখেছেন, এই জনপদ একই সঙ্গে বাস্তবের কুড়িগ্রাম এবং একই সঙ্গে তাঁর সৃজিত কল্পিত এক জনপদ। রংপুর অঞ্চলের ভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন সংলাপে, বহুবার, সবচেয়ে জনপ্রিয় করেছেন নূরলদীনের সারাজীবন-এর সংলাপটিকে—‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’। তাঁর প্রথম দিককার উপন্যাস, সেই ষাটের দশকে লেখা রক্তগোলাপ, যাতে তিনি ব্যবহার করেছেন জাদুবাস্তবতা, তারও পটভূমি কুড়িগ্রাম। লেখককে তো তাঁর উৎসের কাছেই ফিরে আসতে হয়। যে কুড়িগ্রামের গল্প তিনি আমাদের বারবার শুনিয়েছেন তাঁর স্মৃতিকথাগুলোতে, সেই কুড়িগ্রামেই ফিরে যাচ্ছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।
আহা! কুড়িগ্রাম অঞ্চলে মৃতদেহ ফিরে যাচ্ছে, আশির দশকের ছাত্র আন্দোলনের শহীদ রাউফুন বসুনিয়ার ফিরে যাওয়ার বর্ণনা লিখেছিলেন তিনি, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত এক গল্প–প্রবন্ধে। ক্রমাগত পরীক্ষণশীল সৈয়দ শামসুল হক কাব্যে উপন্যাস লিখেছেন, নাম দিয়েছেন কথাকাব্য, প্রবন্ধের আকারে গল্পও তাঁর তেমনি সৃষ্টি। আজ তাঁর ফিরে যাওয়া নিয়ে তাঁরই এক অকৃতী অনুরাগী লিখছেন আরেক সংবাদগল্প। মাত্র সেদিন, ১২ সেপ্টেম্বর, হাসপাতালে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম নিজ হাতে আঁকা তাঁর মুখচ্ছবি, আনোয়ারা সৈয়দ হক তাঁর ফটো তুলে রেখে বললেন, ‘এই ছবি ফেসবুকে দিয়ো না। তাঁর রোগাক্রান্ত চেহারা তিনি প্রকাশ করতে চান না। তিনি যখন থাকবেন না, তখন দিতে পারো।’ আমি বললাম, হক ভাই থাকবেন না, এ তো হয় না। বরং আমরাই হয়তো আগে চলে যাব, কে বলতে পারে!
আনোয়ারা সৈয়দ হক বললেন, তা তিনি চান না। তিনি চান, তাঁর অনুজেরা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন। তাঁর চলে যাওয়ার দিনটার গল্প যে এত তাড়াড়াড়ি লিখতে বসব, তা তো ভাবিনি। হাত ধরে বসেছিলেন, ছাড়তে চাইছিলেন না। আজ সৈয়দ শামসুল হক কুড়িগ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। আমাদের মনে পড়বে, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ আর আমি—আমরা তাঁর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হয়েছিলাম। তখনই জানতে পারি তাঁর অভিপ্রায় যে তিনি সমাহিত হতে চান কুড়িগ্রামে, আর সে জায়গা তিনি ঠিকও করে রেখেছেন। ২০১১ সালে কুড়িগ্রামবাসীর দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি জানান, তিনি ঘুমুতে চান কুড়িগ্রামের মাটিতে, ধরলা নদীর পারে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কুড়িগ্রাম সফরে গিয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের প্রাঙ্গণকেই তিনি স্থির করে আসেন তাঁর শেষ শয্যা হিসেবে। কুড়িগ্রামের কীর্তিমান মানুষটি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সব কটি শাখায় যাঁর হাত সোনা ফলিয়েছে, দেশের মানুষকে ‘জাগো বাহে’ বলে ডাক দিয়ে ‘বাহে’র দেশে ঘুমুবেন, বিরামহীন, অন্তহীন ঘুম। কিন্তু তাঁর কাজ—কবিতা, কথাকাব্য, কথাসাহিত্য, কাব্যনাট্য, গীতিকবিতা, অনুবাদ, প্রবন্ধ, কলাম, স্মৃতিকথা, চলচ্চিত্র—আমাদের জাগিয়ে রাখবে। তিনি লিখেছিলেন, ‘জন্মে জন্মে বার বার কবি হয়ে ফিরে আসব এই বাংলায়।’ তিনি আমাদের কাছে বারবার ফিরে আসবেন, আমাদের পরানের গহিন ভিতরে নাড়তে থাকবেন তাঁর আশ্চর্য জাদুকরি রুমালটি, তাঁর অবিনশ্বর কাজের মাধ্যমে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments:

Post a Comment