Saturday, September 24, 2016

গুলশানের বাড়ির পর রূপগঞ্জে খোকার জমি বাজেয়াপ্ত

ঢাকার সাবেক মেয়র, মন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা সাদেক হোসেন খোকার বাড়ি ও জমি একে একে বাজেয়াপ্ত করছে সরকার। বৃহস্পতিবার সকালে তার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে প্রজেক্টের ৫০ একর ৮৯ শতাংশ জমি বাজেয়াপ্ত করে জমিতে লাল নিশান সাঁটিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তার আগের দিন বুধবার রাজধানীর গুলশানের ছয়তলা ভবনও বাজেয়াপ্ত করে নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। ওই বাড়িতে বেশ কয়েকজন বিদেশী ব্যবসায়ী বসবাস করছেন। নোটিশ দেয়ার পর একটি বায়িং হাউসের পক্ষ থেকে আদালতে রিট আবেদন করা হয়। উচ্চ আদালত এক মাসের মধ্যে তাদের বিরক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছেন। গাজীপুরসহ তার অন্যান্য সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও প্রক্রিয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বিএনপির অভিযোগ, দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার বাড়ি ও সম্পত্তি জব্দে সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছে। দলের পক্ষে একং সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির অপর ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার বাড়ি ও সম্পদ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে বলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। দেশবাসীসহ আমরা লক্ষ্য করছি, বিচার বিভাগকে কীভাবে সরকার প্রভাবিত করছে। হীন স্বার্থচরিতার্থ করতে সরকার এ মামলা করেছে এবং তার অনুপস্থিতিতে একতরফা রায় প্রদান করা হয়েছে। সাদেক হোসেন খোকার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কালিমা লেপনের হীন উদ্দেশ্যেই এটি একটি রাজনৈতিক নগ্নতার বহিঃপ্রকাশ।
খোকার যে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তার পুরো মালিক তিনি নন বলে দাবি করেন তার দলীয় সহকর্মী শামসুজ্জামান। এটি জনাব সাদেক হোসেন খোকাও একটি জাতীয় পত্রিকায় নিজে বলেছেন। তিনি একটি কোম্পানির ৭ জন শেয়ার হোল্ডারের একজন, তিনি একটি ক্ষুদ্র অংশের মালিক মাত্র। রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, ঢাকার সাবেক মেয়র, মন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা সাদেক হোসেন খোকার মালিকানাধীন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে প্রজেক্টের ৫০ একর ৮৯ শতাংশ জমি বাজেয়াপ্ত করেছে প্রশাসন। বৃহস্পতিবার সকালে বাজেয়াপ্ত জমিতে লাল নিশান সাঁটিয়ে দেয় উপজেলা প্রশাসন। বাজেয়াপ্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানা ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, ঢাকার বিজ্ঞ বিশেষ জজ আদালত-৩ এ বিশেষ মামলা নং ০২/২০১৫, ঢাকা মেট্রো বিশেষ মামলা নং ৯২/২০০৮, এসিসি জিআর নং ৪৩/২০০৮, রমনা থানার মামলা নং ০৫ (৪)২০০৮-এর মামলার রায়ের আলোকে রাষ্ট্রের বাজেয়াপ্তকৃত ভূমি দণ্ডিত আসামি সাদেক হোসেন খোকার প্রতিষ্ঠানের নামীয় জোত/খতিয়ান হতে বিভিন্ন মোকদ্দমার মাধ্যমে কর্তন করে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত করণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি আদেশ দেয়া হয়। ওই আদেশ মোতাবেক ও মামলার রায়ের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা মোতাবেক সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ার সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম ১৫ সেপ্টেম্বর মিস কেস রুজুর মাধ্যমে ৫০ একর ৮৯ শতাংশ জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত নির্দেশনা দেন। জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে রূপগঞ্জ উপজেলার তেতলাবো, গোলাকান্দাইল ও কর্ণগোপ মৌজায় বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে প্রায় শতাধিক একর কৃষি জমি কেনেন সাদেক হোসেন খোকা। সেখানে জমি পাহারা দেয়ার জন্য ১৫ থেকে ২০ জন আনসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রজেক্টটির দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে। ওই প্রজেক্টে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিঘা খাস জমি রয়েছে। সরকারি খাস জমি ভুয়া দলিল বানিয়ে বিভিন্নভাবে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন সাদেক হোসেন খোকা। এছাড়া অনেক নিরীহ কৃষকের জমিও জবরদখলসহ জাল দলিল সম্পাদনা করে নেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানা ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশে আমরা ৫০ একর ৮৯ শতাংশ জমি বাজেয়াপ্ত করে লাল পতাকা টানিয়ে দিয়েছি। এখন জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। জানা গেছে, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে সাদেক হোসেন খোকার নামে থাকা মোট ১০০ দশমিক ১৯৪৬ একর জমি বাজেয়াপ্ত করা হবে। এর মধ্যে তার মালিকানাধীন ঢাকার গুলশান ২ নম্বর সেক্টরের ৭২ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ কাঠা জমি এবং তার ওপর নির্মিত ছয়তলা ভবনে বুধবার ঢাকার জেলা প্রশাসক নোটিশ ঝুলিয়ে দেন। ওই বাড়ির দাম আদালত ২ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিলেন। সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার রায়ে ১০ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার ৮৩২ টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মেসার্স বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় ২৭ খণ্ড কৃষিজমি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় ৩৪ খণ্ড কৃষিজমিসহ মোট ৬১টি দলিলে ১৩৩ দশমিক ৫৯৫২ একর জমি রয়েছে। এসব জমির চার মালিকের মধ্যে খোকার অংশ হিসেবে ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা মূল্য ধরা হয়েছে ১৩৩ একর জমির দাম হিসেবে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে হাবিব ব্যাংকে জমা করা টাকা থেকে ২৩ লাখ ১২ হাজার ৯৭৩ টাকা নিয়ে মোট ১০ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার ৮৩২ টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন আদালত।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা গণমাধ্যমকে জানান, এত জমির মালিক তিনি নন। এটা একটা কোম্পানি এবং এতে ছয়-সাতজন শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন। এক-চতুর্থাংশ নয়, তিনি একটি ক্ষুদ্র অংশের মালিক। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মামলা। এ মামলায় তার অনুপস্থিতিতে রায় হয়েছে। এমনকি তাকে মামলা মোকাবিলা করতে আইনজীবী নিয়োগ করতে দেয়া হয়নি। তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ রায়ের ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান। তার দাবি আদালতের অনুমতি নিয়েই তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন। গত বছরের ২০ অক্টোবর গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় সাদেক হোসেন খোকাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। তিনি অবৈধভাবে ১০ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার ৮৩২ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন ঘোষণা করে ওই সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে রায়ে। উল্লেখ্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রমনা থানায় এ মামলা করে। তার স্ত্রী ইসমত আরা এবং ছেলে ইসরাক হোসেন ও মেয়ে সারিকা সাদেককেও মামলায় আসামি করা হয়। ওই বছরের ১ জুলাই দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা তার ছেলে-মেয়ের নাম বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

No comments:

Post a Comment