Sunday, September 25, 2016

আগামী নির্বাচন কমিশনের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ

আমাদের দেশের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিধান রয়েছে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা আসে যখন ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে পূর্ণাঙ্গভাবে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে ন্যস্ত করে। বর্তমানে সংবিধান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ বা পিপলস্ রিপ্রেজেন্টেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৭২ এবং ২০০৯ সালের নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সচিবালয় আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তবে আর্থিকভাবে স্বাধীন না হলেও কার্যকারিতায় তেমন সমস্যা হয়নি। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে এবং নির্বাচনকালীন সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯-এর মাধ্যমে। উল্লেখ্য, উপমহাদেশের তথা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৪ দ্বারা স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে এবং ওই অনুচ্ছেদের ৩২৪(১)-এ ভারতের নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতায়নের কথাও বলা রয়েছে। প্রায় অনুরূপ ভাষায় বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯-এও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার বিষয়টির উল্লেখ আছে। অনুচ্ছেদ ১১৯-এ দেয়া রয়েছে প্রচুর ক্ষমতা, যাতে নির্বাচন কমিশন জাতিকে একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে, যা একটি উদার গণতন্ত্রের ভিত তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আমাদের সংবিধানের উল্লিখিত অনুচ্ছেদ ১১৮-তে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ার জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের বিধানও রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ দেয়ার সার্বিক বিধান থাকার কারণে আজ পর্যন্ত কোনো আলাদা আইন যেমন করা হয়নি, তেমনি ২০১২ সালে বিদায়ী নির্বাচন কমিশন একটি আইনের খসড়া সরকারকে দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধু বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতাবলে একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন, যার প্রক্রিয়া খুব স্বচ্ছ ছিল বলে অনেকেই মনে করেন না, বিশেষ করে তৎকালীন বিরোধী দল এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে হয়নি। যা হোক, দশম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে একাধিক কমিশনারের সমন্বয়ে ১১টি কমিশন গঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে চারটি কমিশন গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। ১৯৯০ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সময় গঠিত নির্বাচন কমিশনও এর অন্তর্ভুক্ত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যেসব নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল, তাদের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে তেমন বিতর্ক হয়নি। যদিও প্রত্যেক নির্বাচনে পরাজিত দল কারচুপির অভিযোগ এনেছিল, কিন্তু তা খুব একটা ধোপে টেকেনি। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পেরেছিল। ওই চার কমিশনের একটি পরবর্তীকালে দলীয় সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালনে বিচ্যুত হয়েছিল, যার ফলস্বরূপ মাগুরার মতো ঘটনা ঘটেছিল।
বাকি কমিশনগুলো গঠিত হয়েছিল দলীয় সরকারের অধীনে- রাষ্ট্রপতিশাসিত এবং সংসদীয় সরকারের অধীনে, যাদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের কাহিনী যত কম বলা যায় ততই ভালো, নইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনই বা হবে কেন? দলীয় সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন কত অগ্রহণযোগ্য হতে পারে তার উদাহরণ ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনসহ পরবর্তী সব নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক করারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। নির্বাচনী ব্যবস্থা উন্নতির পরিবর্তে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে, যা মেরামত করতে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনকে, যদি গ্রহণযোগ্য হয়, বহু কাঠখড় পোড়াতে হবে। আঁধার রাতে বহু মোমের বাতি খরচ করতে হবে। আমাদের দেশে হাতেগোনা কয়েকটি নির্বাচন ছাড়া (অন্তত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন) বাকি নির্বাচনগুলো নিয়ে মানুষের মনে হতাশার জন্ম হয়েছে, বিশেষ করে চরম হতাশার জন্ম হয়েছে সর্বশেষ নির্বাচন ও পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নিয়ে। এমনিতে আমাদের দেশের দু-একটি বাদে অতীত নির্বাচন কমিশনগুলোর ওপর ভোটার এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার শরিকদের ভীষণ আস্থার ঘাটতি ছিল, যা চরমে ওঠে ২০১৪ সালের পর। বিচারপতি আজিজ কমিশনের পর হুদা কমিশনকে প্রচুর শ্রম দিতে হয়েছে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে। কিন্তু সে জায়গাটিও অটুট থাকেনি। হুদা কমিশনের বহু কর্মকাণ্ড অত্যন্ত ইতিবাচক। এ সময় ধারাবাহিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা থাকায় নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যা পরে আর অটুট থাকেনি।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বর্তমান পদ্ধতির অনুরূপ, যদিও এখন নিয়োগ পদ্ধতির জন্য একটি আইন তৈরি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের গঠন প্রক্রিয়া যাই থাকুক না কেন, সে দেশের অন্যান্য গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থা বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, বিশেষ করে সেসব প্রতিষ্ঠান যেগুলো নির্বাচন কমিশন ও গণতন্ত্রবান্ধব। এর মধ্যে অন্যতম হল বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক দল, বিশাল আকারের সিভিল সোসাইটি এবং অত্যন্ত স্বাধীন মিডিয়া। এ ছাড়া জনসংখ্যা, দেশের বিশালতা এবং প্রশাসনিক বিন্যাস এমন যে, সে দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে, বিশেষ করে বিচার বিভাগ, যা দারুণভাবে নির্বাচন কমিশন সহায়ক। যা হোক, ভারতে কমিশনার পদে নভিন চাওলার নিয়োগ নিয়ে বিজেপি বিতর্ক করলেও আদালতের রায় মেনে নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নভিন চাওলা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর তার তত্ত্বাবধানে নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলেও নির্বাচন কমিশন অথবা ফলাফল নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। ভারতে নির্বাচন যে একেবারে বিশুদ্ধ হয় তেমন নয়, তবে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর সব শরিক ও জনগণের ব্যাপক আস্থা রয়েছে।
ভারতে নির্বাচন কমিশনের যে সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, তার পূর্ণ ব্যবহারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে প্রতিটি নির্বাচন কমিশন। এ কারণেই ভারতের নির্বাচন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও এর ত্রুটি-বিচ্যুতির পূর্ণ দেখভালের নিয়ন্ত্রণ থাকে নির্বাচন কমিশনের। বস্তুতপক্ষে নির্বাচনকালীন পূর্ণ সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বহু ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় থাকে নির্বাচন কমিশন। এখানে হালের একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। গত নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করা হয়, তার মেয়াদ শেষ হয় ১২ মে ২০১৪ সালে। নির্বাচনী সময়কালের মধ্যেই বর্তমান সেনাপ্রধানের নিয়োগ ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন না পাওয়ায় ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনের শেষ ধাপ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ১২ মে ২০১৪ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। উল্লেখ্য, ভারতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর কোনোই ভূমিকা থাকে না। শুধু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ই নয়, ওই সময় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়। যেসব দেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সেসব দেশে নির্বাচনে ছোটখাটো অনিয়ম সামগ্রিক নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না, জনগণের আস্থাও নষ্ট হয় না। নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা না থাকলে ওই নির্বাচনের ফলাফলও জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
নির্বাচনী সততা বা বিশুদ্ধতা এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ও জাতিসংঘের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনে বিশুদ্ধতা অর্জন তখনই হয় যখন ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে- সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ভোট প্রদান, নির্বাচনে অবাধ অংশগ্রহণ, অবাধ প্রচারণা এবং সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ ও ভোট গণনা- এ সবই ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ সনদের অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ ও গবেষক পিপ্পা নরিস তার ‘হোয়াই ইলেকটোরাল ইনটেগ্রিটি ম্যাটারস’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অপরদিকে কফি আনান ফাউন্ডেশনের গবেষণাপত্র ‘ডিপেনিং ডেমোক্রেসি’ এ বিষয়ে একমত যে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল নির্বাচন কমিশনের সততা, স্বচ্ছতা, কর্মদক্ষতা আর নির্বাচনী আইনের সমপ্রয়োগ। কারণ এর প্রধান দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। একই সঙ্গে রয়েছে নির্বাচনী বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, কার্যকর নির্বাচনী আইন প্রণয়ন, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিধানগুলোর সমন্বয় করতে হয়। নির্বাচনী আইন প্রণয়নকালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিষয়গুলোর প্রতিফলন থাকা একটি বিশ্বজনীন দাবি। যা হোক, আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের আস্থা অর্জন করা। একই সঙ্গে বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা অর্জনের বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। উল্লেখ্য,
অনেক উন্নয়ন সহযোগী যেমন ইউএনডিপি ‘নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। একজন কর্মকর্তাও এমনটি নিশ্চিত করেছেন। জনগণের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি শরিকদের (Stakeholder) আস্থা অর্জনের জন্য ধৈর্য ধরতে হবে। প্রয়োজন হবে নির্বাচনী আইন আরপিওতে বেশ কিছু সংশোধনীর, যাতে নির্বাচনকালীন সরকারের ওপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বর্তমান সংবিধানের আওতায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং এতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো অবস্থার পুনরাবৃত্তি হলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বলতে কিছু আর থাকবে না, যার দায়িত্ব বহন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। জাতীয় নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য হলে ওই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয় তার যেমন গণ-গ্রহণযোগ্যতা থাকে না তেমনি জনগণও তাতে সম্পৃক্ত হয় না। পিপ্পা নরিস এ ধরনের সরকারকে আখ্যায়িত করেছেন ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ (Electoral Autocracies) হিসেবে। আর ডায়মন্ড আখ্যায়িত করেছেন ‘হাইব্রিড রিজম’ এবং লেভিস্কিয়ান্ড ও ওয়ে আখ্যায়িত করেছেন ‘কম্পেটেটিভ অথরেটারিয়ান’ এবং ‘ইলেকটোরাল অথরেটারিয়ান’ রিজিম হিসেবে। তারা সবাই একমত যে, নির্বাচনী সততার অভাবে নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে তা দেশের ও গণতন্ত্রের জন্য যে ক্ষতি বয়ে আনবে তা অপূরণীয়। কাজেই আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন হবে সরকার ও দেশের রাজনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এম সাখাওয়াত হোসেন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার, নিরাপত্তা বিশ্লেষকআ

No comments:

Post a Comment