Sunday, September 25, 2016

শান্তির একমাত্র পথ সংযত আচরণ

সম্প্রতি ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের উরিতে ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় দেশের সাধারণ মানুষ, সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে বক্তব্য ও বিবৃতি দিচ্ছেন। এ অবস্থায় চিরবৈরী এ প্রতিবেশী দেশ দুটি যদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায়ও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। ভারত ও পাকিস্তান প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুতে এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাব ব্যক্ত করে থাকে। ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে আক্রমণ, পাঠানকোট ও মুম্বাইয়ে হামলা- এ ঘটনাগুলোর পরপর দেশ দুটি এমন মনোভাব দেখিয়েছে। দেশ দুটির সাম্প্রতিক উত্তেজনার নেপথ্যে রয়েছে কাশ্মীর ইস্যু। একবার পেছনে তাকাই। ৭০ বছর আগে কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং ভারতে যোগ দিলেও তখন থেকে এ অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে থাকে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর গণভোট অনুষ্ঠানের প্রতিশ্র“তি কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। ইতিমধ্যে ১৯৫৩ সালে শেখ আবদুল্লাহ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেন। ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের যুক্ত হওয়ার শর্ত ছিল পররাষ্ট্র,
প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ- এ তিনটি বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে কাশ্মীর স্বাধীন থাকবে। কিন্তু দুঃখজনক হল, কাশ্মীরের গভর্নর জগমোহন, এনএন ভোরাসহ কাশ্মীরের অন্য গভর্নররা জনগণের ওপর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বাত্মক কর্তৃত্ব চাপিয়ে আসছেন এবং তাদের শোষণ-নিপীড়ন, দলন-দমনে জর্জরিত করে চলেছেন। কাশ্মীরের জনগণ এ শোষণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন। তারা ১৯৫৩ সালের ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চেয়েছেন। কিন্তু তা না করে ভারত সরকার সব সময় তাদের ওপর ঔপনিবেশিক কায়দায় অত্যাচার চালিয়ে আসছে। বর্তমান কারারুদ্ধ ইয়াসিন মালিক ও সাব্বির শাহসহ অন্যান্য কাশ্মীরী নেতা ১৯৫৩ সালের চুক্তির বিরোধী ছিলেন না। তাদের গ্রেফতারে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। এ ছাড়া গত জুলাই মাসে হিজবুল মুজাহেদিন নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যু এবং এরপর ৭৩ জন কাশ্মীরী নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ পটভূমিতে হুরিয়াত বা স্বাধীনতাপ্রত্যাশী সাধারণ কাশ্মীরীরা এখন কাশ্মীরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের একদফা দাবিতে সংগ্রামে নেমেছে। এমনকি হুরিয়াত নেতারা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বানও প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ ভারতীয় সেনার প্রাণহানিতে দেশ দুটির সম্পর্ক এতটাই তিক্ততার পর্যায়ে গিয়েছে যে, কোনো কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষক দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের আশংকা পর্যন্ত করছেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কাশ্মীর পরিস্থিতি অশান্ত হলেই ভারত ও পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
এতে ভারতের লাভ হল- কাশ্মীর ইস্যুকে তারা বিশ্ববাসীর দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যেতে পারে। আর পাকিস্তানের লাভ হল- দেশটি তখন ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জনগণ এ দুই বৃহৎ শক্তির রণহুংকারে তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এ অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের সংযত আচরণই দক্ষিণ এশিয়াকে নিরাপদ রাখতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনায় ভারতের দাবি হল, কাশ্মীরী সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানে নির্মিত অস্ত্রশস্ত্র এবং পাকিস্তানের উসকানিতেই এ হামলা চালিয়ে ভারতীয় সৈন্য হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। পাকিস্তান ভারতের এ দাবিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করছে। পাকিস্তান মনে করে, কাশ্মীর আন্দোলনকারীরা ভারতীয় সৈন্যদের হত্যা করেছে তাদের আন্দোলনের কৌশল হিসেবে। কাশ্মীর সমস্যা নিরসনে ভারত ও পাকিস্তানকে রণহুংকারের পথ পরিহার করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারত ও পাকিস্তানকে কাশ্মীর ইস্যুতে কাশ্মীরী জনগণের দাবিকে বিবেচনায় রেখেই সমাধানে পৌঁছাতে হবে। পাকিস্তানের কর্তব্য হল ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি না দেয়া। উরির ঘটনায় পাকিস্তানের কোনো গোষ্ঠী জড়িত আছে কিনা- পাকিস্তানের তা তদন্ত করে দেখা উচিত। এ ঘটনায় ভারত কর্তৃক উত্থাপিত প্রমাণগুলো পাকিস্তানের খতিয়ে দেখা উচিত। ভারতের কর্তব্য হল কাশ্মীর ইস্যুতে শান্তিপূর্ণ সমাধানে কাজ করে যাওয়া। কাশ্মীরকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবে ১৯৫৩ সালের চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করে কাশ্মীরীদের আপাতত আস্থায় আনা যায়। এ ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ কাজে আসবে বলে মনে হয় না। কাশ্মীর সমস্যার টেকসই সমাধানে ভারত, পাকিস্তান ও কাশ্মীর- তিন পক্ষকেই একসঙ্গে বসতে হবে। কাজটি কঠিন। কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই।
মুহাম্মদ রুহুল আমিন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments:

Post a Comment