বাইশ
এপ্রিল ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৭টা ছুঁই ছুঁই। ২২ ঘণ্টা বাস জার্নি শেষে
ইতালির রোম শহর থেকে জার্মানের বন শহরে এসে পৌঁছল আমাদের ফ্লিক্স বাসটি।
দীর্ঘ সময় ভ্রমণ হলেও এই ভ্রমণটা আমার আর আমার স্ত্রীর কাছে ততটা কষ্টদায়ক
মনে হয়নি। কারণ বাসটির অভ্যন্তরীণ সুযোগ সুবিধা বিমানের মতোই ছিল।
অ্যাটাস্ট বাথরুম, ইন্টারনেট, ওয়াই ফাই সুযোগ সুবিধা। তাছাড়া জানালা দিয়ে
একপলক বাইরে তাকালেই তো মন ভরে যায়। কারণ ইউরোপের সৌন্দর্য সত্যিই মন
মাতানো। রোম থেকে মিলান হয়ে জার্মানির মিউনিখের ওপর দিয়ে আমাদের বাস বন-এ
এসে পৌঁছল। গন্তব্য হচ্ছে আমার প্রিয় বকুল দিদির বাড়ি। রাইন নদীর তীর
ঘেঁষে প্রকৃতির অপরূপ রূপে রূপান্বিত রিমাগেন গ্রাম যেখানে আমার প্রিয় বকুল
দিদি থাকেন সপরিবারে দীর্ঘ ২৫ বছর। বকুল দিদির বাড়িতে ওই দিন ছিল বর্ষবরণ
অনুষ্ঠান। তাই আগে থেকেই আমাদের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ ছিল। বাস কোথায় এলো,
কিভাবে আসতে হবে সবকিছুই দিদির পর্যবেক্ষণে ছিল। তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
হচ্ছিল। তীব্র ঠাণ্ডায় আমার স্ত্রী কাঁপছিল, গাড়ি থেকে নামার পর মনে হলো
উত্তর মেরুর কোথাও এসে নামলাম। তাপমাত্রা তখন ১ ডিগ্রি মাত্র। তাড়াতাড়ি
লাগেজগুলো নামিয়ে যাত্রী ছাউনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। বকুল দিদির ছোটভাই আশীষ
দাদা আমাদের স্টেশন থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা।
কিন্তু তখনো তিনি এসে উপস্থিত
হননি। অল্প দূরেই আমি একটি স্ন্যাকস শপ দেখে এগিয়ে গেলাম। ধোঁয়া ওঠা কফির
কাপ হাতে একজন জার্মানির কাছে জানতে চাইলাম বন ট্রেন স্টেশনটা কতদূর,
ইংরেজি শুনতেই যেন তার চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে গেলো। বুঝলাম তিনি ইংরেজি
জানেন না। কিন্তু একটি ব্যাপার লক্ষ করলাম- ইংরেজি জানেন না বলে তিনি
কিন্তু পিছিয়ে জাননি, ভদ্রলোক তার এক বন্ধুকে ডেকে আনলেন আমার সাথে ইংরেজি
বলার জন্য। যাক সমস্যার সমাধান হলো। জানতে পারলাম ৩০০ মিটার সামনে বন ট্রেন
স্টেশন। আরো জানলাম একজন জার্মান নাগরিকের কতটুকু সৌজন্যবোধ। ফিরে এসে
দেখি আমার সহধর্মিণীর ঠাণ্ডায় প্রায় চোখ কান সাদা হয়ে গেছে। বুঝলাম তাকে
কফি খাওয়াতে হবে। বললাম, চলো সামনের দিকে। লাগেজগুলো হাতে টেনে টেনে ট্রেন
স্টেশনের দিকে আগাচ্ছি। ১০০ মিটার যেতেই চোখ পড়ল সেই আশীষ দাদা। দৌড়ে এলেন।
সরি বললেন। বৃষ্টির জন্য ক্রনি ট্রেন মিস করেছেন তাই ত্রিশ মিনিট দেরি হয়ে
গেল। অতঃপর ট্রেন স্টেশনে মেকডোনাল্ড কফি শপে খানিকটা বসলাম, কফি ও
¯œ্যাকস জাতীয় কিছু খেলাম সবাই। কারণ খিদেও ছিল। এবার ট্রেনে উঠলাম সবাই।
বিশ মিনিট পর ট্রেন থামল রিমাগেন স্টেশনে। প্লাটফর্ম অতিক্রম করে এগিয়ে
গেলাম ট্যাক্সির জন্য। কী বিলাসবহুল ট্যাক্সি। মার্সিডিজ বেঞ্জ। একটু চমকিত
হলাম আমাদের দেশে কোটিপতি ছাড়া মার্সিডিজ গাড়ি কল্পনাও করা যায় না। দেরি
না করে উঠে পড়লাম ট্যাক্সিতে, কারণ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাইরে এক
ডিগ্রি তাপমাত্রা, দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই কষ্টকর। মাত্র পাঁচ মিনিটেই বকুল
দিদির বাসায় চলে এলাম। সকাল ৮.৩০ মিনিট প্রায়। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের জন্য
বকুল দিদির বাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। বকুল দিদি এবং দুলাভাই আমাদের পেয়ে
আনন্দে আত্মহারা। যা হোক, বাসায় ঢুকে তাড়াতাড়ি গোসল সেরে বিশ্রাম নিলাম।
ধীরে ধীরে জার্মানির বিভিন্ন শহরের বাঙালি মেহমানেরা এসে উপস্থিত হলেন।
কিছুসংখ্যক জার্মানি নাগরিক পরিলক্ষিত হলো, যারা বকুল দিদির প্রতিবেশী ও
অফিস কলিগ। দুপুরের পরপরই নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হলো। ‘এসো হে বৈশাখ এসো
এসো’। দিদির গানের গলা এত সুন্দর তা আগে জানতাম না। গানের ফাঁকে ফাঁকে
খাবার পরিবেশন নববর্ষের পানতা ইলিশ তো আছেই। শেষ বিকেলের যে গানটি শুনে আমি
সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলাম- ‘মধু কই কই বিষ খাওয়াইলা’ কোন কারণে ভালোবাসার দাম
না দিলা’। সহধর্মিণী আমার খুবই উচ্ছ্বসিত ও পুলকিত। রাতে বারবিকিউ সাথে
কৌতুকে, উল্লসিত ছিল সবাই। আমিই ছিলাম একমাত্র পুলিশ অফিসার অনুষ্ঠানটিতে,
আমার মিশন অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম সবার সাথে। রাত গভীর হতে লাগল। অনুষ্ঠান
শেষে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেলো। আমরাও নিদ্রায় আচ্ছন্ন হলাম। পরদিন আকাশ
খানিকটা ভালো। দুপুরের পর সূর্য কিছুটা উঁকিঝুঁকি মারছে। বকুল দিদি বলল,
চলো আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি স্মৃতি দেখে আসি। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে
দিদির গাড়ি নিয়ে বের হলাম সবাই। পাঁচ মিনিট গাড়ি চলতেই এসে উপস্থিত হলাম
রাইন নদীর তীরে। এক দিকে বয়ে গেছে শান্ত রাইন, তার ঠিক উল্টো দিকে সবুজে
সবুজে ঘেরা পাহাড়, বনরাজি, তারই মাঝখানে শান্ত রেমাগেন। শহরের সব উপকরণ
নিয়ে এই ছোট গ্রামখানি। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে রেললাইন। সুন্দর
পরিচ্ছন্ন নিরিবিলি এই গ্রামটিতে নেই ভারী যানবাহনের কোলাহল। নেই ইউরোপের
অন্যান্য শহরের মতো অতি পরিচিত দৃশ্য হরেক কিসিমের লোকজন। এখানকার বেশির
ভাগ বাসিন্দা জার্মান। এখানে ছড়ানো ছিটানো আছে কিছু তুর্কি ও আফ্রিকান।
কিছুদূর এগিয়ে চোখে পড়ল একটি ব্রিজের ভাঙা অংশ।
বকুল দিদিকে জিজ্ঞাসা
করলাম,এই ব্রিজটি ভাঙা কেন, দিদি জবাবে বলল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়
আপাত; শান্ত এই এলাকাটি পালন করেছিল বিশেষ ভূমিকা। নদীর ওপর দিয়ে এপারে
ওপারে সংযোগ রেমাগেন ব্রিজের দর্শন নিয়ে জার্মান ও মিত্রশক্তির মাঝে হয়েছে
লড়াই। এ পাহাড়ের চূড়ায় ছিল হিটলারের গোপন দুর্গ। সিডিনগেরিতে বা সেভেন
মাউনটেইন নামে খ্যাত এই পাহাড়ের চূড়ায় গোয়েন্দাকে এড়িয়ে হিটলার তার
সেনাবাহিনী নিয়ে গোপনে পরিচালনা করেছে যুদ্ধ কৌশল। রেমাগেন থেকে সামান্য
দূরে রাইন নদী। এই রেমাগেন ব্রিজের কাছাকাছি যেতে যেতে তা দেখে মনে হলো আর
পাঁচ-দশটি ভাঙা পরিত্যক্ত ব্রিজের মতো এটিও একটি। তার কাছে আমাদের মতো আরো
দু’চারজন পর্যটক চোখে পড়ল। বাইরে থেকে বোঝা দায় এর ভেতরে কি রয়েছে, মনে হবে
দু’টি বিশাল বিশাল পিলার। অথচ এর ভেতরে গেলেই অবাক করা ব্যাপার। টিকিট
কেটে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে কয়েকটি ফ্লোর। বাংকার দিয়ে উঁকি মারলে চোখে পড়ে
রাইনের অন্য পাড়ে এর অন্য সংযোগ পিলার। দুই তীরে বিশাল পিলারগুলো ইতিহাসের
অমর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাঝখানে উড়ে গেছে ব্রিজ। মজার ব্যাপার হলো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দখল নিয়ে লড়াই হয়ে যাওয়া এই ব্রিজের নাম রাখা হয়েছে
শান্তির ব্রিজ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সামরিক জেনারেল সৈন্য,
অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম পশ্চিম ফ্রান্সে পারাপারের কারণে
৩২৫ মিটার দীর্ঘ এই ব্রিজটি নির্মাণ করেন। রাইন নদীর পানির লেভেল থেকে
১৪.৮০ মিটার উঁচু দিয়ে এপার ওপার হয়ে গেছে জার্মান আর্কিটেক্ট কার্ল
স্টিনারের ডিজাইন করা এই ব্রিজটি। দু’টি রেললাইন ছাড়াও পথচারীদের পারাপারের
ব্যবস্থা ছিল এই ব্রিজে। রাইন নদীর ওপর দিয়ে আরো আনেক ব্রিজ থাকলেও এই
রেমাগেন ব্রিজটি ছিল স্টিলের তৈরি সবচেয়ে মজবুত ও দৃষ্টিনন্দন। যুদ্ধের
সাক্ষী ছাড়া এই ব্রিজটি ১৯২৮ সালে এক ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রেমাতোনের দমকল বাহিনী ত্বরিত ব্যবস্থায় এর ক্ষতি ব্যাপক হতে পারেনি, যার
পুরস্কারস্বরূপ জার্মান ন্যাশনাল রেলওয়ে থেকে রেমাতোন দমকল কর্তৃপক্ষ সে
সময় পনেরো শত মার্ক পুরস্কার লাভ করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের
৭ মার্চ আমেরিকান লে. কর্নেল এইচ টিয়াম্যানের নেতৃত্বে ইউএস নবম আর্মড
ডিভিশন এই ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, এই আমেরিকান সেনা
কর্মকর্তা ছিলেন জার্মান আমেরিকান। এর আগে মিত্র শক্তির অগ্রগতি ব্যাহত
করার উদ্দেশ্যে হিটলার বাহিনী এই ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার জন্য দুবার ব্যর্থ
প্রচেষ্টা চালায়। এই ব্রিজ দখল ‘মিরাকেল অব রোগেন হিসেবে খ্যাত’ জেনারেল
আইজেন হাওয়ার এই ব্রিজ স্বর্ণের চেয়ে বেশি মূল্যবান বলে উল্লেখ করেন।
কিন্তু এর কিছু দিন পর জার্মান হাই কমান্ডের নির্দেশে বোমা মেরে এই ব্রিজ
উড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এমনকি একই উদ্দেশ্যে ফ্রগম্যান নিয়োগ করা
হয়। প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় হিটলার এমন ক্ষুব্দ হন যে, তিনি
সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত বসিয়ে পাঁচ জার্মান অফিসারের মৃত্যুদণ্ড দেন। এদের
চারজনের ফাঁসি হয় ওয়েস্টার ওয়ার্ল্ড ফরেস্টে। ব্রিজ ধ্বংসের হিটলারের সব
প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও ১৯৪৫ সালের ১৭ মার্চ অতিরিক্ত চাপের কারণে এই
ব্রিজটি আপনাতেই ধসে পড়ে। তাতে মারা যায় ২৮ জন আমেরিকান সেনা। যুদ্ধ শেষে
এই স্থানটি হয়ে ওঠে দর্শনীয় ও ইতিহাস খ্যাত। দেশ বিদেশ থেকে লোকজন ছুটে আসে
রাইন নদীর তীরে এই অতি শান্ত এলাকাটিতে, শ্রদ্ধা জানায় নিহতদের। ব্রিজটির
রেমাতোন অংশে গড়ে উঠেছে ছোট্ট মিউজিয়ম। এতে রয়েছে ব্রিজটির সংক্ষিপ্ত
ইতিহাস। আমার প্রিয় বকুল দিদি এবং দুলাভাই সুশীল বড়–য়ার আন্তরিক আতিথেয়তায়
রেমগেনকে উপভোগ করতে পেরেছিলাম আমি আর আমার সহধর্মিণী, যা কোনো দিন ভুলব
না।

No comments:
Post a Comment