Wednesday, September 7, 2016

মোদির ভাষণ ও পয়গাম

মার্ক পেরি একজন মার্কিন লেখক, প্রতিরক্ষা বিষয় ও আঞ্চলিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ওপর যার বেশ অভিজ্ঞতা রয়েছে। মার্ক পেরি জানুয়ারি ২০১১ সালে আমেরিকার বিখ্যাত ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখেছেন, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ পাকিস্তানের পথ ধরে ইরানি বেলুচিস্তানে হস্তক্ষেপ করছে। পেরি আমেরিকার সিআইএ’র কিছু দলিলপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছেন, মোসাদের এজেন্টরা মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহার করে এবং মার্কিন সিআইএ’র প্রতিনিধি হয়ে বেলুচ যুবকদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। যেসব যুবক রাজি হয়ে যায়, তাদের জুনদুল্লাহতে ভর্তি করে নেয়া হয়। ওই সশস্ত্র সংগঠন ইরানি বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ওই সংগঠনের নেতা আবদুল মালিক রিগিকে ইরান ২০১০ সালে বেশ নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করে। রিগি দুবাই থেকে কিরগিজস্তান যাচ্ছিলেন। অ্যামিরেট এয়ারলাইন্সের বিমানটি যখন ইরানের সীমানা অতিক্রম করছিল, তখন ইরান বিমানবাহিনী ওই বিমানকে বন্দর আব্বাসে অবতরণে বাধ্য করে। এরপর ইরান রিগিকে গ্রেফতার করে, যিনি আফগান পাসপোর্ট নিয়ে সফর করছিলেন। রিগি করাচির একটি মাদরাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। তবে তিনি খ্যাতি লাভ করেন ২০০৭ সালে যখন ভয়েস অব আমেরিকার ফারসি সার্ভিস তার সাক্ষাৎ প্রচার করে। ওই সাক্ষাৎকারে দাবি করা হয়েছিল, আবদুল মালিক রিগি একজন ডক্টর, যিনি ইরানে বেলুচদের অধিকারের জন্য সশস্ত্র আন্দোলনে লিপ্ত রয়েছেন। মার্ক পেরি নিশ্চিত যে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ আবদুল মালিক রিগির মতো যুবকদের শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলো থেকেও ভর্তি করা হয় এবং তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করা হয়। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে মার্ক পেরির প্রবন্ধ প্রকাশের পর ইসরাইলি সরকার বেশ অসন্তুষ্ট হয়, কেননা ইতঃপূর্বে মার্কিন মিডিয়ায় এ দাবি করা হয়েছিল যে, আমেরিকার সিআইএ ইরানি বেলুচিস্তানে জুনদুল্লাহকে সহযোগিতা করছে।
এবিসি নিউজ এপ্রিল, ২০০৭ এবং সেইমোর হার্শ নিউইয়োর্কার ম্যাগাজিনে জুলাই, ২০০৭ সালে স্পষ্ট দাবি করেছেন, সিআইএ জুনদুল্লাহকে সহযোগিতা করছে। মার্ক পেরি জুনদুল্লাহর সম্পর্ক সিআইএ’র পরিবর্তে মোসাদের সাথে জুড়ে দিয়েছেন এবং কিছুকাল পরে এ দাবিও করেছেন যে, ইসরাইল আজারবাইজানে ইরানি সীমান্তের কাছে চুপি চুপি কিছু সেনাক্যাম্প তৈরি করে ফেলেছে। মার্ক পেরি মোসাদের এজেন্টদের মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহারের ব্যাপারে ২০১০ সালে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছিলেন। যখন ব্রিটিশ সরকার অভিযোগ করেছিল, মোসাদের এজেন্ট ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাই গেছে, যেখানে ১৯ জানুয়ারি ২০১০ একটি হোটেলে হামাসের এক নেতাকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর ২৩ ফেব্র“য়ারি ২০১০ সালে আবদুল মালিক রিগি দুবাই থেকে কিরগিজস্তান রওনা হলে ইরান কেমন করে জানতে পারল যে, অ্যামিরেট এয়ারলাইন্সের বিমানে জুনদুল্লাহর কমান্ডার ইন চিফ আফগান পাসপোর্টে সফর করছেন? এটা কি কোনো শক্তিধর গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে মোসাদের জন্য পয়গাম ছিল যে, আমাদের নাম ব্যবহার বন্ধ করো, নতুবা আমরা হাটে তোমাদের হাঁড়ি ভেঙে দেবো? আবদুল মালিক রিগির গ্রেফতার ও মার্ক পেরির প্রবন্ধ থেকে এটা অনুমান করা কঠিন যে, বেশির ভাগ সময় শক্তিধর গোয়েন্দা সংস্থা সব জেনে থাকে, কবে এবং কোন ওয়ান্টেড ব্যক্তি কোথা থেকে কোন দেশের পাসপোর্ট নিয়ে কোন দিকে সফর করছে। তবে তারা নিজ নিজ পলিসির কারণে চুপ থাকে। ওয়ান্টেড ব্যক্তির পরিচয় তখনই উন্মোচন করে দেয়া হয়, যখন কাউকে কোনো পয়গাম দেয়ার উদ্দেশ্য থাকে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও পাকিস্তানকে পয়গাম দিতে চেয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি এই পয়গাম দিতে চেয়েছেন, যদি পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলনের সহায়তা বন্ধ না করে, তাহলে ভারত বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করবে। তিনি এই ভুলটি করলেন যে, পশ্চিমা দেশগুলোয় অবস্থান করা কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচের প্রতি আহ্বান জানালেন, তারা যেন মোদির ভাষণকে সমর্থনের পাশাপাশি কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামীদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে। ব্রাহুমদাগ বুগতি ও দু’জন নারী মোদির নির্দেশ পুরোপুরি পালন করেছেন। তবে তিন বেলুচ নেতা মোদির পক্ষে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অস্বীকারকারীদের যুক্তি হচ্ছে, মোদির প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনে আমাদের কোনো দোদুল্যমানতা নেই, তবে কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের নিন্দা করে আমরা নিজেদের ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অনুগত দাস হিসেবে কেন প্রমাণ করব? পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার অর্থ কি ভারতের গোলামি? মোদির ভাষণের প্রতি কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচের সমর্থন আর কিছু অংশের পক্ষ থেকে ওই ভাষণের বিষয়ে নীরবতা বিশেষ চিন্তার বিষয়। বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচদের একটি গ্র“প মোদিকে অবিশ্বস্ত মনে করে। কেননা মোদি একই সময়ে ইরান, ইসরাইল ও আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। অথচ এ গ্র“প পাকিস্তানি বেলুচিস্তান ও ইরানি বেলুচিস্তানকে এক করে নতুন রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন দেখছে।
আমার ব্যক্তিগত জানা মতে, নরেন্দ্র মোদির ১৫ আগস্ট ২০১৬ সালের ভাষণ ইরানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে হইচই ফেলে দিয়েছে। মার্কিন স্কলার ক্রিস্টাইন ফেয়ার ২০০৯ সালের মার্চে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন, ইরানি বেলুচিস্তানের জাহেদান শহরে ভারতীয় কনসুলেট পাকিস্তানি বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ সরবরাহ করছে। তবে পাকিস্তানের কাছে বেলুচিস্তানে ভারতীয় হস্তক্ষেপের কোনো শক্ত প্রমাণ ছিল না। পাকিস্তানি সংস্থা বেলুচিস্তান থেকে ভারতের গোয়েন্দা কুলভুষন যাদবের গ্রেফতারিকে বড় ধরনের সাফল্য আখ্যায়িত করেছে। তবে ওই গ্রেফতারি সত্ত্বেও বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারা যায়নি। ৮ আগস্ট কোয়েটায় বোমা হামলা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় বড় দাবি আর কৃতিত্ব সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই বোমা হামলার জন্য ‘র’কে দায়ী করেছেন, অথচ আইএস এবং তালেবানের একটি গ্র“পও ওই বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে। পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো বেশ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। তবে নরেন্দ্র মোদির ভাষণ বেলুচিস্তানে আগামী যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় ‘র’-এর কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। ওই ভাষণের পর ইরানেও এটা ভাবা হচ্ছে যে, মোদি ইরানের বন্ধু, নাকি শত্র“? ভারত ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা একসাথে পাকিস্তানি বেলুচিস্তান ও ইরানি বেলুচিস্তানে কোনো খেলা খেলছে না তো? মোদি কি জানেন না যে, জুনদুল্লাহ চাবাহারে বেশ কয়েকটি হামলা করেছে এবং এটা সেই এলাকা, যেখানে ভারত একটি বন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে? বন্দর নির্মাণের আড়ালে নাশকতা কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হচ্ছে না তো?
নরেন্দ্র মোদির ১৫ আগস্টের ভাষণকে তার জীবনের বড় রাজনৈতিক ভুলগুলোর একটি গণ্য করা হতে পারে, তবে পাকিস্তানিদের এ কথা কখনোই ভাবা উচিত নয় যে, মোদির অপরাধ স্বীকারের পর বেলুচিস্তানে সব সমস্যা মিটে যাবে। এ বাস্তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, বেলুচ জনগণের বেশির ভাগই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে নেই। কেননা পাকিস্তান ও ইরানকে ভেঙে একটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করা বেশ কঠিন। তবে বেলুচদের বঞ্চনার অনুভূতি এমন এক বাস্তবতা, যা অস্বীকার করা পাকিস্তানের সাথে ভালোবাসা নয়, শত্র“তার নামান্তর। যতক্ষণ পর্যন্ত এ বঞ্চনার অনুভূতি দূর না হবে, ততক্ষণ পাকিস্তানের শত্র“দের জন্য স্থানীয় জনগণকে কাছে পেতে সহজ হবে বেলুচিস্তানে ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে। চিন্তার বিষয় হলো, নরেন্দ্র মোদিকে ১৫ আগস্টের ভাষণ দিতে কে বাধ্য করল? এটা কি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভাষণের প্রতিক্রিয়া ছিল? একেবারেই নয়। মোদিকে এ ভাষণ দিতে বাধ্য করেছে অধিকৃত কাশ্মিরের জনগণের সুদীর্ঘ হরতাল। আর ওই হরতালের কারণে মোদি ও ব্রাহুমদাগ বুগতির সম্পর্ক উন্মোচিত হয়ে গেছে। পাকিস্তানের জনগণ এই মোদিকে সার্ক সম্মেলনের অনুষ্ঠানে পাকিস্তানে এসে আরো একটি ভাষণ দেয়ার অনুমতি দেবে কি?
দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com

No comments:

Post a Comment