Thursday, September 8, 2016

ফিলিপাইনে সন্ত্রাসের রাজত্ব

গত ৯ মে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই রোদ্রিগো দুতার্তে তথাকথিত ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। এতে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে এক হাজার ৯০০ মানুষ। এদের মধ্যে ৭৫৬ পুলিশের হাতে বাকি এক হাজার ১৬০ জন কথিত ‘নজরদারি কমিটির সদস্যদের’ গুলিতে। এটা পুলিশের দেয়া ২৪ আগস্ট পর্যন্ত রিপোর্ট। এই হত্যাকাণ্ডে বেশ খুশি দুর্তাতেকে এখন পর্যন্ত খুশি বলেই মনে হচ্ছে এবং যত দিন প্রেসিডেন্ট থাকবেন তত দিন এই ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ চলবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনায় বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। তিনি নির্বাচিতই হয়েছেন অপরাধের মূলোৎপাটনের অঙ্গীকার করে। এমনকি প্রয়োজনে এক লাখ গ্যাংস্টার হত্যা এবং তাদের লাশ ম্যানিলা উপসাগরে নিক্ষেপ করার ঘোষণা দিয়েছেন। আরো উদ্বেগের বিষয় হয়েছে, দারিদ্র্যপীড়িত এবং ক্রমাগত অপরাধীদের হাতে নির্যাতিত ফিলিপিনোরা এই রক্তপাতকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে এই সন্তুষ্টি বেশি দিন থাকবে না। নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যা কখনোই কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এতে দুর্দশাই কেবল বাড়ে।
দুতার্তের শিশুকাল কেটেছে মিন্দানাওয়ের সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে। ফিলিপাইনের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সবচেয়ে বড় দ্বীপটি অরাজকতা দেখেছে বহু দিন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটি বহু দিন লড়াই করেছে স্বাধীনতার জন্য। কমিউনিস্টরাও এ অঞ্চলে সক্রিয়। স্বাধীনতাকামীদের লড়াই স্তিমিত হলেও বিচ্ছিন্ন কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের কর্মকাণ্ড এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। সহিংস অপরাধকবলিত মিন্দানাওয়ের দাভাও শহরে ২২ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন দুতার্তে। তিনি দাভাও শহরকে অপরাধীমুক্ত করার দাবি করলেও রেকর্ড বলে তার মেয়াদে সেখানে অপরাধের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ এবং এখনো শহরটি খুনেদের শহর হিসেবে পরিচিত। এখন তিনি দাভাওয়ের কৌশল টেনে এনেছেন ম্যানিলায়। একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোসের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে পচন ধরে তা থেকে দেশটিকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টরাও বের করে আনতে পারেননি। ফিলিপাইনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো আইন ও নীতির তোয়াক্কা না করেই মানুষ হত্যা করছে। কারো বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ, সঠিক নিয়ম অনুসরণ বা বিচারের কাঠগড়ায় কোনো অপরাধীকে দাঁড় করানোÑ এ সব কিছুর ধার ধারছে না তারা। দেশটির পুলিশ প্রধান রোনাল্ড ডেলা রোসা সম্প্রতি বলেই দিয়েছেন, নিহতরা নাকি পরিণতির জন্য নিজেরাই দায়ী। কিন্তু পরিস্থিতি তা বলে না।
বলা হচ্ছে, গ্রেফতার অভিযানকালে বন্দুকযুদ্ধে অপরাধীরা মারা যাচ্ছে। যদি তাই হতো, তাহলে অপরাধী নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হতাহত সংখ্যাও সমানতালে বাড়ত। কিন্তু তা হচ্ছে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় নিহতরা আগে থেকেই পুলিশের হেফাজতে ছিল। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত শক্ত হাতে ইন্দোনেশিয়া শাসন করেন সুহার্তো। তার আমলে ১৯৮৩ সালে বেশ কিছু রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা ‘পেট্রাস কিলিং’ নামে পরিচিত। দুই বছরে তিন থেকে দশ হাজার অপরাধী নিহত হয়। সংখ্যার এই ব্যাপক তারতম্যের কারণ দেশটির নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এবং সে সময়ে এসব খবর জানতে পারা ছিল দুরূহ ব্যাপার। এদের বেশির ভাগ মাদকসেবী বলে ধারণা করা হয়। কোনো রকম বিচার ছাড়াই এদের হত্যা করা হয়। অতি সম্প্রতি ২০০৩ সালে থাইল্যান্ডে থাকসিন সিনাওয়াত্রা শুরু করেছিলেন মাদকবিরোধী যুদ্ধ। প্রায় দুই হাজার ৮০০ মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে সরকারি তদন্তে দেখা যায়, এদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মাদকের সাথে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল না। সুহার্তো ও সিনাওয়াত্রা দু’জনেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হন।
ফিলিপাইনের অবস্থা দেখে মনে হয়, দুতার্তে সারা দুনিয়াকে বিশ্বাস করাতে চাচ্ছেন যে, দেশটির দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ পুলিশবাহিনী হঠাৎ করেই সর্বজ্ঞ হয়ে উঠেছে। তারা কাউকে দেখেই বলে দিতে পারে কে নিরপরাধ, আর কে অপরাধী; কে বেঁচে থাকবে, আর কাকে মরতে হবে। নির্বাচিত হয়েই তিনি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত সন্দেহভাজন দেড় শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার একটি তালিকা প্রকাশ করেন। এদের মধ্যে দু’জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে। এ মুহূর্তে দুতার্তে সংযত হবেন বলে মনে হচ্ছে না। দেশটির প্রধান বিচারপতি যখন গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতেই কাউকে আটকের নির্দেশ দেন, তখন প্রেসিডেন্ট হুমকি দেন ‘সামরিক আইন’ জারির। আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যখন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন তাকে ‘মেয়েলি স্বভাবে’র বলে উপহাস করেন দুতার্তে। নির্বাচিত হওয়ার চার মাসের মাথায় দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছেন দুতার্তে, তাতে অনেকেই তাকে থামানোর উপায় খুঁজছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়ার কথা ভাবছেন। ২০০২ সালে স্বাক্ষরিত রোম স্ট্যাটিউট অনুযায়ী ফিলিপাইনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেসব অপরাধের বিচার করবে না বা করতে অনিচ্ছুক হবে, আইসিসি সেগুলোর বিচার করতে পারবে। এই আইনে দেশটির প্রেসিডেন্টকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেন আন্তর্জাতিক আদালত।
রোম স্ট্যাটিউটে বলা হয়েছে, কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক ও প্রণালীবদ্ধভাবে পরিচালিত খুন বা হত্যাকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তাই মাদকবিরোধী যুদ্ধের নামে ফিলিপাইনে যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে, তা ইতোমধ্যে আইসিসির সংজ্ঞার আওতায় পড়ে গেছে। রোম স্ট্যাটিউটে আরো বলা হয়েছে, এই স্ট্যাটিটিউটের আওতায় রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে কেউ অপরাধের দায়দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবেন না। ফিলিপাইনের প্রথম সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সিনেটর ও সাবেক আইনমন্ত্রী লেইলা দি লিমা ইতোমধ্যে দুতার্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আইসিসিকে আহ্বান জানিয়েছেন। লাতিন আমেরিকায় মাদকবিরোধী লড়াই এবং অন্যান্য দেশে এমন ‘ডার্টি ওয়ার’-এর অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় বিচারবহির্ভূত হত্যা কখনোই সমস্যার সমাধান করেননি। বরং পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে। এতে বহু নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, অপরাধী চক্রগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পরিস্থিতি কাজে লাগায়। তাৎক্ষণিক বিচার নিশ্চিতভাবে দেশটিতে আতঙ্ক, ঘৃণা ও প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। আইনের শাসন বলে কিছু থাকবে না। অর্থনীতি ধসে পড়বে, বিনিয়োগকারীরা পালিয়ে যাবে। দুতার্তে যে পথে যাচ্ছেন, তাতে দেশটি ক্রমাগত দরিদ্র ও সহিংস হয়ে উঠবে।

No comments:

Post a Comment