আজ ১০ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) উদ্যোগে ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিবসটি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় বিধানের আলোকে ছোটবেলা থেকেই আমরা ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’- একথা শোনার পাশাপাশি বিশ্বাস করে আসছি। আইন অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডনীয় অপরাধও বটে। তা সত্ত্বেও সমাজে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। বলাবাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব এবং ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো-যা কোনো কিছুর বিনিময়েই এবং কোনোভাবেই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেয়া হয়, তেমনি অপরদিকে একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে ‘আন্মহত্যা’ নামক এ মহাপাপ সংঘটিত হয়ে আসছে এবং এটিকে কোনো দেশ কিংবা কোনো সমাজ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি এবং আগামীতেও দেখবে না। একজন ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ নিহিত থাকে, তার মধ্যে রয়েছে- বিষণ্ণতা বা Depression, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনোকষ্ট, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা,
গ্লানি বা হতাশা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, কর্মব্যস্ততাহীন দিনযাপন), পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত ডিসঅর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্ণতার শিকার। WHO-এর বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করছেন এই মর্মে, ২০২০ সালের মধ্যে হৃদরোগের পরই বিষণ্ণতা মানবসমাজের বিপন্নতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হবে। WHO-এর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১.৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০১২ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আট লাখ চার হাজার। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১টি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০টি, যার মধ্যে ৫৮ থেকে ৭৩ শতাংশ আত্মহত্যাকারীই নারী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে : পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তিজনিত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্ময়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার সংবাদ;
কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা, ‘ এ পৃথিবীতে কেউ আমাকে চায় না’ বা ‘আমি সবার বোঝাস্বরূপ’ কিংবা ‘আমি পরিবারের কলংক’ কিংবা ‘এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আমার কোনো লাভ নেই’- এ জাতীয় বদ্ধমূল চিন্তা ইত্যাদি। এসব চিন্তার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। আর তখন থেকেই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতাও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। যেমন, পরিবারের কোনো সদস্যকে বিদেশে পাঠানো বা ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে না পারা, পরিবারের সব সদস্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারা, দীর্ঘদিনেও ঋণমুক্তির উপায় খুঁজে না পাওয়া, পরীক্ষায় পরিবারের কিংবা নিজের আশানুরূপ ফলাফল অর্জিত না হওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও প্রেমে ব্যর্থতাসহ অনেক সময় প্রেমিক-প্রেমিকার ইচ্ছা পূরণের জন্য জেদের বশবর্তী হয়েও অনেক তরুণ-তরুণীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়। একথা সত্য, একজন শিক্ষার্থীকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে তার অভিভাবকসহ ওই শিক্ষার্থীকে অনেক ধরনের ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়, করতে হয় অনেক সংগ্রাম, পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই স্মরণ রাখা উচিত, অনেক আশা-ভরসা নিয়ে বাবা-মা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করাতে পাঠান যেন তারা মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশ, জাতি, সমাজ ও মানবতার সেবা করতে পারেন। বলাবাহুল্য,
আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যা প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। যেমন : জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। এসব ফ্যাক্টরকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক ইত্যাদি আত্মহত্যা প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। এছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। মানুষ শারীরিক রোগের মতো অনেক সময় মানসিক রোগেও ভুগে থাকেন। একজন শিক্ষার্থী বা কেউ যখন আত্মহত্যা করেন বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালান, তখন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয়, এটি হচ্ছে তার মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক অশান্তি বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হওয়ার ফলাফল। দেশের প্রচলিত আইন অনুয়ায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
আর ধর্মীয় বিধানমতে আত্মহত্যা একটি মহাপাপও বটে। আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো এবং এর শাস্তি সম্পর্কে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে বেঁচে যান, তবে দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী তিনি এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর করা হলে পরবর্তী সময়ে তা আত্মহত্যা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো রোধে শিক্ষার্থীদেরই সর্বাগ্রে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কমপক্ষে একজন করে হলেও পেশাদার পরামর্শক বা কাউন্সেলর নিয়োগ দেয়া। এসবের পাশাপাশি আত্মহত্যা যে মহাপাপ ও দণ্ডনীয় অপরাধ এবং আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে বিভিন্নভাবে তার প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, জীবন একটাই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে তা আর কোনো কিছুর বিনিময়ে এবং কোনোভাবেই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনটাকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে একে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই, সবারই উচিত হবে নিজ নিজ জীবনকে ভালোভাবে সাজানো এবং ভালোভাবে উপভোগ করা; নিশ্চয়ই আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনটাকে শেষ করে দেয়া নয়।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, সিটি ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, সিটি ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com
No comments:
Post a Comment