Saturday, September 3, 2016

বিচারহীনতার নোংরা বলয় ও রিসা by সোনিয়া ইসলাম নিশা

তনু হত্যার পর বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত আমি ‘ধর্ষণ’ শব্দটার সাথে পরিচিত ছিলাম না। ২০০৫ সালে যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, আব্বু বাড়িতে পত্রিকা (প্রথম আলো) রাখার ব্যবস্থা করলেন। গ্রামে সকালের পত্রিকা আমার হাতে এসে পৌঁছাত সন্ধার পর। বেশিরভাগ সময় বিনোদন বা খেলার পাতা গায়েব থাকত। তখন পত্রিকার এক কোণায় একটি খবর প্রায়ই চোখে পড়ত- শাজনীন হত্যাকাণ্ড বিষয়ক। ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে গুলশানে নিজ বাড়িতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন শাজনীন তাসনিম রহমান। সেই প্রথম আমি ‘ধর্ষণ’ শব্দটার সাথে পরিচিত হই...
দলছুট ব্যান্ডের গান ‘আহা ইয়াসমিন’ আমি এখন শুনছি। সুযোগ পেলে আপনারাও শুনবেন প্লিজ। দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিনকে নিয়ে দলছুট ব্যান্ড এই গানটা করেছিল। পুলিশ ভ্যানে পুলিশের হাতে ধর্ষিত হওয়া ইয়াসমিনের হত্যাকারীদের শেষ পর্যন্ত বিচার হয়েছিল, দিনাজপুরবাসীর আন্দোলনের মুখে।
পত্রিকার পাতায় তৃষার ছবির কথা মনে পড়ে, ফুটফুটে একটা মেয়ে। ২০০২ সালের ১৭ জুলাই বিকেলে মধ্যপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তৃষা স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে তিন বখাটের ধাওয়া খেয়ে পালাতে গিয়ে পুকুরে ডুবে মারা যায়। ২০১২ সালে আদালত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। অদ্ভুত তাই না!
সিমি নামের একটি সাধারণ মেয়ে, যে নারায়ণগঞ্জ চারুকলায় পড়াশুনা করত। বিয়ে বাড়িতে আলপনা এঁকে পড়াশোনার খরচ চালাত। কাজ শেষে প্রতিদিন ঘরে ফেরার পথে বখাটেদের উৎপাত সহ্য করতে হতো। একদিন আর সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করছিল সিমি। মারা যাবার আগে সিমি চিরকুটে লিখে রেখেছিল ছয় বখাটের নাম, তার মধ্যে একজন খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক বাশার। ২০১১ সালের ১০ অক্টোবরে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সবাই জামিনে মুক্ত। বর্তমান পরিস্থিতি আমার জানা নেই।
২০০৩ সালে বখাটেদের লাঞ্চনার শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে রুমি, ২০০২ সালে মহিমা, ২০১৫ সালে মাদারীপুর সদরের চরমুগরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সাথী আকতার। আরও আছে, লিখতে গেলে এই তালিকা কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে...
ফেসবুকের কল্যাণে তনু, আফসানার কথা আমরা সবাই জানি। তনু মৃত্যুর আগে, ১৭ মার্চ শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়ায় বেড়াতে গিয়েছিল ওর নাট্যদলের বন্ধুদের সাথে। সেখান থেকে ফেরার পথে গেয়েছিল- ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান যেন ভুলে যেয়ো না...’। সেদিনই কী সে জানত তার জীবনটাই অশ্রু দিয়ে লেখা হয়ে যাবে!
আফসানার লাশ পেতে ওর আত্মীয়-স্বজনরা রীতিমতো সাত ঘাটের জল খেয়েছে! প্রথমে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ, সেখান থেকে মিরপুরের আল-হেলাল হাসপাতাল, কাফরুল থানা হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাওয়া যায় আফসানার লাশ! কারণ কী? এ দেশে জন্ম নেওয়াই কী তাহলে আজন্ম পাপ হয়ে দাঁড়াল।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে সরব যোগাযোগীয় মাধ্যম ফেসবুকে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন জনের মতামত পড়ছিলাম। মেয়েটার ছবি শেয়ার করার মতো মানসিক জোর আমার নেই। রিসার সহপাঠিরা ‘বিচার চায়’। এই সব ফুটফুটে কিশোর/কিশোরীদের মনে আমরা শঙ্কা ঢুকিয়ে দিয়েছি। আমাদের বিচারহীনতার ঐতিহ্য আর নোংরা চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, নির্বিঘ্নে বছরের পর বছর ধরে ঘটে আসছে ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যায় প্ররোচনা। আমরা অন্ধ হয়ে গেছি। ধর্ষণের পর, ইভটিজিং-এর পর আমরা মেয়েটার দোষ খুঁজি, মেয়েটার পোশাকের দোষ খুঁজি। আমি একটুও অবাক হব না, কেউ যদি এই হত্যাকাণ্ডে রিসাকে দায়ী করে, এই ফেসবুকেই অবলীলায় রিসার চরিত্র হরণ করার লোক আছে। জ্বি হ্যাঁ! আছে কিছু নপুংসক! এই দেশে আসলে মেয়ে মানে তনুর গাওয়া সেই গানটার মতো- ‘অশ্রু দিয়ে লেখা...’।
>>>প্রিয়.কম। সোনিয়া ইসলাম নিশা:প্রভাষক, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments:

Post a Comment