Thursday, September 1, 2016

তলাবিহীন ঝুড়ির সোনার বাংলায় কেরি... by প্রভাষ আমিন

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঝড়ো সফর, সত্যিকারের অর্থেই ঝড়ো ছিল। দশ ঘণ্টারও কম সময়ের এই সফরে ঝড়ের মতই পাল্টে গেছে বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক। টার্নিং পয়েন্ট শব্দটার অনেক ব্যবহার-অপব্যবহার করি আমরা।
তবে জন কেরির এই সফর সত্যিই বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টার্নিংপয়েন্ট। ব্যবসা-বাণিজ্য, সন্ত্রাসবিরোধী সহায়তা, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফিরিয়ে দেয়া ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ তো আছেই; আমার কাছে টার্নিং পয়েন্ট হলো, বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন অবস্থানের ঘোষিত বদল। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টানাপড়েনের সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকেই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন পাকিস্তানী হানাদারদের পক্ষে ছিল।
বাংলাদেশের জন্ম ঠেকাতে নিক্সন প্রশাসন সপ্তম নৌবহর পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয় অর্জিত হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ব্যক্তিগত পরাজয় হিসেবে নিয়েছিলেন তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে ঘৃণিত মানুষদের মধ্যে একজন এই কিসিঞ্জার। গ্রামে-গঞ্জে কেউ খারাপ কিছু করলে বা কূটবুদ্ধি চাললে, লোকজন তাকে বলে, কিসিঞ্জারি বুদ্ধি।
স্বাধীনতার পর একটি শিশু রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর বদলে কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে অভিহিত করেছিলেন ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’হিসেবে। মানে হলো, বাংলাদেশ হবে তলাবিহীন ঝুড়ি, এখানে যতই অর্থ ঢালা হোক, তলা না থাকায় তা হারিয়ে যাবে। কিন্তু কিসিঞ্জারের আশঙ্কা মিথ্যা করে দিয়ে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আর সেই উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এখন তার উত্তরসুরী জন কেরির কণ্ঠে। তবে জন কেরি পদে কিসিঞ্জারের উত্তরসুরী হলেও আদর্শের উত্তরসুরী নন।
নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের অল্পকিছু লোক বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের পাশে। আজকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সেই প্রতিবাদী জনগণের একজন। সদ্য কলেজ উত্তীর্ণ টগবগে তরুণ মার্কিন অবস্থানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। জন কেরির আদর্শের পূর্বসূরী এডওয়ার্ড এম কেনেডি, যিনি টেড কেনেডি নামে পরিচিত, তিনি একাত্তরের ভারতে এসে দেখে গেছেন বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুর্দশা।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশেও এসেছিলেন টেড কেনেডি। সংহতি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে টেড কেনেডির রোপণ করা বটগাছটি এখনও সেই বন্ধুত্বের স্মৃতি বহন করছে। ঢাকায় জন কেরির একমাত্র পাবলিক বক্তৃতায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে একাত্তর, টেড কেনেডি। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসার মাধ্যমে আসলে জন কেরি যুক্তরাষ্ট্রের একাত্তরের ভূমিকার বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্পষ্ট করলেন।
ঢাকায় জন কেরির পাবলিক বক্তৃতার ভেন্যু ছিল ধানমন্ডির ইএমকে সেন্টার। এই সেন্টারটির নামকরণ করা হয়েছে এডওয়ার্ড এম কেনেডির নামে। আমার ধারণা এটি মোটেও কাকতালীয় নয়। জন কেরি তার আদর্শিক গুরুর নাম বহনকারী প্রতিষ্ঠানেই কথা বলতে চেয়েছেন। প্রসঙ্গটি তিনি উল্লেখ করেছেন তার বক্তব্যেও।
পচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার বিচার হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনার ষড়যন্ত্রের বিচার হয়নি। বলা হয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জড়িত থাকতে পারে। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের অন্তত দুই জন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছে।
জন কেরি ঢাকায় নেমে হোটেলে অল্পসময় বিশ্রাম নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু করেন তার সফর। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান। ঘুরে দেখেন ১৫ আগস্টের নৃশংসতার চিহ্ন। থমকে দাঁড়ান সেই ঐতিহাসিক সিঁড়ির সামনে এসে, যেখানে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর মরদেহ। সেই নির্মমতার ৪১ বছর পর কোনো মার্কিন নীতি নির্ধারক প্রথম ৩২ নম্বরের সেই বাড়িতে গেলেন।
৪০ মিনিট ঘুরে ঘুরে দেখে শোক বইয়ে তিনি লেখেন ‘একটি সহিংস ও কাপুরুষোচিত ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কা্ছ থেকে সাহসী ও উজ্জ্বল এক নেতৃত্বকে কেড়ে নেয়া হয়। কিন্তু এখন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বন্ধু হতে পেরে গর্বিত এবং তাঁর সেই স্বপ্নপূরণে দৃঢ় সমর্থক। আমরা শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’
এই ছোট্ট নোটেই জন কেরি স্পষ্ট করে দিয়েছেন তার সফরের টোন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের নৃশংসতার টাটকা স্মৃতি নিয়ে জন কেরি যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফিরিয়ে দেয়ার প্রসঙ্গ তুললে, জন কেরি বলেন, আপনার বেদনা আমি বুঝি। তিনি দেশে ফিরে এ ব্যাপারে প্রক্রিয়া শুরুর আশ্বাস দেন।
ইএমকে সেন্টারে ৩২ মিনিটের বক্তৃতায় জন কেরি নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। পুরো সফরে তিনি একটি বাংলা শব্দ উচ্চারণ করেছেন, আর সেটি হলো ‘সোনার বাংলা’। ৭২ সালে এক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে বলেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। আর ৪৫ বছর পর আরেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে বলছেন ‘সোনার বাংলা’। এই অর্জন, এই অগ্রগতি অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের।
জন কেরি স্বীকার করেছেন বলেই নয়, তিনি আসলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, ৪৫ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সত্যি বিস্ময়কর। বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে, দারিদ্য কমেছে, বৈষম্য কমেছে। নানা সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বে উদাহরণ। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিও সক্ষমতার দৃষ্টান্ত। বিশ্বব্যাংককে মুখের ওপর না বলে বাংলাদেশ নিজেদের টাকায় নির্মাণ করছে পদ্মা সেতৃ। এই সেতু বাংলাদেশের স্বাবলম্বিতার, সক্ষমতার প্রতীক। তাই বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেই হয় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
গত কয়েকবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা টানাপড়েন চলছিল। বাংলাদেশে নিযুক্ত আগের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনাকে অনেকে মজা করে বিএনপি মহাসচিব বলতেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য অনেক দৌড়ঝাপ করেছেন মোজেনা। এমনকি তিনি দিল্লী পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। নির্বাচনটিও ভালো হয়নি।
১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাওয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথেই এক ধরনের প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নৈতিকভাবে দুর্বল হলেও আইনগত বৈধতার সুযোগ নিয়ে সরকার দেশ চালাচ্ছে। এতদিন বলা হচ্ছিল, ভারতের জোরেই আওয়ামিী লীগ এমন দুর্বল নির্বাচন করেও প্রবলভাবে দেশ চালাচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচন গ্রহণ করেনি।
বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা, গুম-খুন, গণতান্ত্রিক স্পেস না থাকা নিয়েও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ করা হচ্ছে। জন কেরি উড়াল দেয়ার আগে শেষ মুহুর্তে তাড়াহুড়ো করে বেগম খালেদা জিয়া জন কেরির কাছে এসব বিষয় তুলেও ধরেছেন। কিন্তু জন কেরির দিনভর ব্যস্ততায় এ প্রসঙ্গগুলো ছিলই না। বরং তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, বাংলাদেশের উন্নয়ন আর পারস্পরিক সহায়তার বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
কাদের মোল্লার ফাসিঁর রায়ের পর এই জন কেরি নিজে ফোন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আরো অনেক অনুরোধের মত এটিও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আরেক যুদ্ধারপরাধী মীর কাশের আলীর রিভিউ নিয়ে যখন নানা সন্দেহ-অবিশ্বাস, ঠিক তখন জন কেরির সফর নিয়েও নানা উৎকণ্ঠা ছিল। কিন্তু জন কেরি যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি ভুলেই গেছেন। একবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি। মার্কিন কার্ড দিয়ে বিএনপি-জামাত অনেক হম্বি-তম্বি করেছে। সে কার্ডের খেলা শেষ।
জন কেরির সফরের পর এটা বলাই যায়, আওয়ামী লীগের দিল্লী খুটির সাথে এবার যোগ হলো ওয়াশিংটন খুটি। জন কেরির এই অবস্থান বদল নাটকীয় হলেও অস্বাভাবিক নয়। আর কেরি যে খুব নিঃস্বার্থভাবে বাংলাদেশকে সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন তাও নয়।
বাংলাদেশ এখন এমন অবস্থানে পৌছে গেছে, বাংলাদেশকে উপেক্ষা করার সুযোগ কারোই নেই। চীনের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলে ভারতকে পাশে লাগবে যুক্তরাষ্ট্রের। আর ভারতকে পেতে হলে লাগবে বাংলাদেশকেও। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধে বাংলাদেশকে পাশে চাই যুক্তরাষ্ট্রেরও। তাই তো দিল্লী যাওয়ার আগে বাংলাদেশকে আস্থায় নিলেন কেরি।
ইএমকে সেন্টারের বক্তৃতায় জন কেরি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পার্টনার নয়, বন্ধু হতে চায়। খুব ভালো কথা। ঝটিকা সফর কেরির জন্য কতটা সফল জানি না, বাংলাদেশের জন্য দারুণ সফল। তবে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে জন কেরির আচরণ ছিল অপমানজনক, গর্হিত। এ দুজনের সাথে সাক্ষাতের কোনো কর্মসূচি ছিল না। রওশন এরশাদকে ডাকা হয়েছে ইএমকে সেন্টারে।
বক্তৃতা দিয়ে নামার সময় রওশন এরশাদ রীতিমত পথ আটকে জন কেরির কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন। পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট রওশন এরশাদকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এটা খুবই আপত্তিকর, অপমানজনক। অপমানটা আমার গায়েই লাগছে। এখানে অপমানটা ব্যক্তি রওশন এরশাদের নয়, এটা বাংলাদেশের অপমান। তিনি ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান।
মুখে গণতন্ত্রের কথা বলবেন, আর সংসদে বিরোধী দলীয় নেতাকে সময় দেবেন না, এটা হয় না, হওয়া উচিত নয়। একই ঘটনা ঘটেছে বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্যও তার হাতে কোনো সময় ছিল না।
বিএনপি অনেক তত্বির করে একটু সময় পেয়েছে বটে, তবে দেখা করার জন্য খালেদা জিয়াকে ছুটে যেতে হয়েছে মার্কিন অ্যাম্বাসিতে, বসে থাকতে হয়েছে। এই উপেক্ষা, এই অপমান নিছক খালেদা জিয়ার নয়; বাংলাদেশের অপমান, গণতন্ত্রের অপমান। গণতন্ত্রকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে সবার কথা শুনতে হবে জন কেরিকে, সম্মান দিতে হবে সবাইকে। >>>পরিবর্তন ডট কম।
প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
probhash2000@gmail .com

No comments:

Post a Comment