বন্যা, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন এ দেশে প্রায়
প্রতি বছরই হয়ে থাকে। বাংলাদেশের নি¤œাঞ্চলের প্রায় ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড
বন্যাকবলিত হয়ে থাকে। অতিবৃষ্টি বা ব্যাপকভাবে বন্যা হলে সমগ্র দেশের ৫৫
শতাংশের অধিক ভূখণ্ড বন্যার প্রকোপে পড়ে। গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রধান
প্রধান নদীতে বর্ষা মওসুমে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি হয় অতি বৃষ্টিজনিত কারণে,
দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিংয়ের অভাব, পুকুর, খাল-বিল,
ডোবাগুলো ভরাট করার ফলে এবং পার্শ্ববর্তী দেশের নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির
প্রবাহের কারণে। পার্শ্ববর্তী দেশে বন্যা হলে সেখানকার বাঁধগুলো
নির্দ্বিধায় খুলে দেয়া হয়। সেখানে অবশ্যই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রয়োজন
রয়েছে। বাংলাদেশে সংঘটিত বন্যাকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায় : মওসুমি
বন্যা, আকর্ষিক বন্যা, জোয়ারে সৃষ্ট বন্যা। ১৯৮৮ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বর
মাসে অস্বাভাবিক বন্যায় সারা দেশে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় হয়। সে সময়ে সমগ্র দেশের
৬০ শতাংশেরও অধিক এলাকা প্লাবিত হয় এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের
রাজধানী ঢাকা শহরও তখন ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়। তবে ঢাকা শহরের বন্যা বা
জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল অপ্রতুল ড্রেনেজ-ব্যবস্থার জন্য। তা ছাড়া ১৯৮৯
সালেও সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এলাকায় বন্যায় ছয় লাখ লোক পানিবন্দী
হয়ে পড়ে। এ বছরও পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যায় বানভাসি
মানুষের দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়েছে। উজানের ঢলে বাড়িঘর, েেতর ফসল তলিয়ে
যাওয়া ও নদী ভাঙনের পর লাখ লাখ মানুষ ঘরের চালে, নৌকায় অথবা বেড়িবাঁধ ও
উঁচু রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়ে অমানবিক জীবনযাপন করেছে। বন্যায় তিগ্রস্ত
মানুষের পাশাপাশি পোলট্রি খামার, ছাগল, ভেড়া, গৃহপালিত গবাদিপশুও বিপন্ন
অবস্থায় পতিত হয়েছে।
কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া,
টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ জেলার পদ্মা-যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা,
সুরমা-কুশিয়ারায় পানি বৃদ্ধির ফলে বন্যার পানি মধ্য-নি¤œাঞ্চলে ধাবিত হয়ে
জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যাকবলিত স্থানগুলোর আগের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ
করে ওইসব স্থানের ঘরবাড়ি উঁচু করে নির্মাণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে,
তাহলে বন্যার পানি অন্তত বাড়িঘরে প্রবেশ করবে না। খাল-বিল, পুকুর এবং নদী
খনন ও পুনঃখনন করে অধিক পরিমাণে পানি ধরে রাখতে পারলে নদীর পানিবৃদ্ধি ও
অতিবৃষ্টির জন্য বন্যার প্রকোপে পড়তে হবে না। অপর দিকে, খাল-বিল, নদীতে
অধিক পরিমাণে পানি সংরণ করতে পারলে শীত মওসুমে কৃষিকাজে পানির প্রয়োজন
মেটানো সহজ হবে। এ জন্য প্রতি বছরই বন্যার সমস্যা সমাধানের জন্য নদীতে
ড্রেজিং ও খাল খননের ওপর বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় এবং প্রচুর অর্থ
ব্যয় হয়। কিন্তু সঠিক কৌশল ব্যবহার না করায় বাঁধের দুই পাশে বৃষ্টির পানি
জমে তীরবর্তী মানুষের কষ্ট ও তি বাড়িয়ে দেয়। ফলে মাঝে মাঝে ক্রুদ্ধ
গ্রামবাসী বাঁধ কেটে জমে থাকা পানি নদীতে ছেড়ে দেয়। দেখা যায়, সিমেন্টের
ব্লক দিয়ে নির্মাণ বাঁধ সচরাচর পানির স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে ব্লকগুলো
অতি সহজেই নদীতে গড়িয়ে পড়ে। এভাবে ধীরে ধীরে নদীর তলদেশে সিমেন্টের ব্লক
জমা পড়ে নদী ভরাট শুরু হয় এবং নদীতে পলিমাটি বৃদ্ধি পায়, এতে নদীর নাব্যতা
কমে যায়। ফলে নদীর পানি সামান্য বৃদ্ধি পেলে ও অতি বৃষ্টি হলে নদীর
তীরবর্তী গ্রামে বন্যা দেখা দেয় ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এই কারণে সিমেন্টের
ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কারণ ভবিষতে নদীতে ড্রেজিং করা
অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই, সিমেন্টের ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ না করে ষষ্ঠভুজ
আকৃতির ডিজাইনের ব্লক নির্মাণ করে বাঁধ করলে ব্লকগুলো একে অপরের সাথে আঁকড়ে
থাকবে। ফলে এগুলো নদীতে গড়িয়ে পড়বে না। দেখা যায়, প্রতি বছরই সিমেন্টের
ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়; কিন্তু তা কোনো কাজে
লাগে না। ষষ্ঠভুজ আকৃতির ডিজাইনের ব্লক দিয়ে নদী ভাঙন রোধ করলে একবার খরচের
মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে। কারণ নদীভাঙন না হলে নদীতীরবর্তী
গ্রামগুলো বন্যা প্লাবিত হবে না, জান-মালের য়-তি বন্ধ হবে, সেই সাথে গবাদি
পশু-পাখিও রা পাবে। নদী ভাঙনে পৈতৃক ভিটা-বাড়ি, ফসলের জমি বিলীন হয়ে মানুষ
হয়ে পড়ে সর্বহারা, শেকড় ছেঁড়া। এর চেয়ে দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক আর কী হতে
পারে? বানভাসি মানুষেরা সহায়-সম্বল হারিয়ে জীবনযাপনের জন্য উঁচু রাস্তায়
কিংবা বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটায়। তাই এ কথা মনে রেখে
নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা
অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তীব্র নদীভাঙন এলাকার পূর্ব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ
করে নদীভাঙন এলাকাগুলোতে ফাডবেড পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। ফাডবেড
পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ করলে যেমন নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব তেমনি
বাঁধের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করে চর অঞ্চলে মানুষের যোগাযোগের এক
অন্যন্য ব্যবস্থা করা সম্ভব। অবকাঠামোগত ও অকাঠামোগত পদপেগুলো বন্যা ও
নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কিছু কৌশলগত পদপে জনজীবনে দুর্ভোগসহ
গবাদি পশু-পাখি ও ফসলের তি কমানো সম্ভব। এগুলো হচ্ছে : ০১. বন্যার পানি
বৃদ্ধির আগেই বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ তথ্য ও পদ্ধতি জনসাধারণের মাঝে
দ্রুত পৌঁছে দেয়া। ০২. বন্যাকবলিত এলাকায় বন্যাপরবর্তী ব্যবস্থাপনা
সম্পর্কে জনসাধারণকে প্রশিণ দেয়া। ০৩. বন্যাকবলিত গ্রামগুলোতে উঁচু করে
বন্যা-আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ জরুরিভাবে বাস্তবায়ন করা। এই
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বছরের অন্য সময়ে স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তাহলে
বন্যাকবলিত শিশুদের স্কুলের পড়ালেখা বন্ধ হবে না। ০৪. বন্যা-পরবর্তী
চাষাবাদের জন্য ভাসমান বীজতলা তৈরিতে সাহায্য করতে হবে,
ফলে বন্যার পানি
হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে কৃষক তার তি পুষিয়ে নিতে পারবে। ০৫. প্রয়োজনবোধে
দীর্ঘ জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতে ভাসমান সবজি চাষে কৃষককে সাহায্য করা। ০৬.
প্লাবনভূমিগুলোকে ও তীব্র নদীভাঙন এলাকাগুলো বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করা এবং
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবায়নে ভূমি ব্যবহার জোন তৈরি করা।
০৭. ষষ্ঠভুজ আকৃতি ডিজাইনের ব্লক নির্মাণ করে নদীভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ
করা। ০৮. তীব্র নদীভাঙন এলাকাগুলোতে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে ফাডবেড
পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ করা। ‘দরিয়ার দেশে দরিদ্রতা নয়’ অর্থাৎ নদীমাতৃক
দেশে দারিদ্র্য থাকতে পরে না। কেননা নদী হবে কৃষিকাজে সেচের উৎস, নদী হবে
মাছ চাষের আধার, নদী যোগাযোগের পথ সুগম করবে, নদী পরিবেশের ভারসাম্য রা
করবে। নদী পরিবেষ্টিত বাংলাদেশে নদীকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে
বাংলাদেশে দরিদ্রতা থাকবে না। বন্যা প্রতি বছরই হবে, যেমন হচ্ছে বর্তমানে,
হয়েছে নিকট অতীতে এবং কোনোটি হবে মাঝারি আকারের, কোনোটি ভয়াবহ। সব ধরনের
বন্যার জন্যই প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। বন্যা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ
ব্যবস্থাপায় সঠিক পদপে নিতে পারলে জনদুর্ভোগ কমানো সম্ভব। তাই ভবিষ্যতে
দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন এবং এ জন্য পরিকল্পনা
অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মাঠকর্মী, কর্মকর্তাদের প্রশিণের পাশাপাশি জনসাধারণকে
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিণে সম্পৃক্ত করতে হবে। অবকাঠামোগত ও অকাঠামোগত
পদপেগুরো জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক
No comments:
Post a Comment