Thursday, September 8, 2016

কোরবানির পশু হলে কেমন হতো! by মাসুদ মজুমদার

সামনে কোরবানির ঈদ। ঈদুল আজহা। এটা হজের মওসুম। লাব্বায়িক ধ্বনিতে মক্কা নগরী এখন মুখরিত। হজের আনুষ্ঠানিকতায় কোরবানি একটি মৌলিক বিষয়। মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম আ:-এর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল আ: আল্লাহর কাছে যেভাবে শর্তহীনভাবে নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন, যে ত্যাগ ও কোরবানির পরীক্ষায় হজরত ইবরাহিম আ: উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষায় হজরত হাজেরা আ: যেভাবে সফল হয়েছিলেনÑ মুসলিম উম্মাহর সদস্যরা কাবায় উপস্থিত হয়ে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার সাথে সেসব স্মরণ করে প্রতীকী ইবাদত করবেন। ত্যাগ ও কোরবানির কথা এখন সবার মনে জাগরিত। এমন সময়টিতে বারবার মনে হচ্ছে, কোরবানির পশু হলে কেমন হতো? এমন একটি উদ্ভট প্রশ্ন বেশ কিছু দিন ধরে মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ধরনের প্রশ্ন জাগার কারণ হতে পারে অনেকগুলো। প্রথম কারণ হতে পারে, মানুষকে পশুর মতো জবাই হতে দেখে মনের গভীরে এক ধরনের ভীতি কিংবা ঘৃণার বুদবুদ জন্ম নিয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, কোরবানির পশুকে যেভাবে পরম মমতায় যতœআত্তি করা হয়, গোসল করিয়ে, দোয়া-কালাম পড়ে গলায় ছুরি চালানো হয়; তেমনি পরপর ছয়টা ফাঁসি দেখলাম, দোয়া-কালামের সুযোগ দিয়ে অজু-গোসল করিয়ে তওবা-ইস্তেগফার করার ব্যবস্থা করে, সময় নির্ধারণ করে, নিñিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে গলায় ফাঁসির রশি ঝুলিয়ে দম বন্ধ করে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গনের সুযোগ করে দেয়া হয়। কোরবানির পশু জবাইয়ের সাথে এই আশ্চর্য মিলটি মনের ভেতর কোনো দীর্ঘশ্বাস অথবা মাতমের জন্ম দেয় না; একধরনের জিজ্ঞাসার মুখোমুখি করে দেয়।
জিজ্ঞাসার আসল কথাÑ আমরা যে কোরবানি দেই, পশু জবাই করি, নিজেরা যেসব ত্যাগ-তিতিক্ষার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিÑ সেসব আল্লাহর ওয়াস্তে হচ্ছে তো? কেউ কেউ অবলীলায় ক্ষমাভিক্ষা না করে ধীরস্থিরভাবে ফাঁসির মঞ্চে উঠে যাচ্ছেন, নানা ধরনের তৎপরতায় অংশ নিয়ে বুক পেতে গুলি নিচ্ছেনÑ তাদের বিশ্বাসী মনের শক্তির উৎস শুধু আবেগ নয় তো? আলেম-ওলামার কাছে শুনেছি, কোরবানির পশু আল্লাহর কাছে যায় না; এর রক্ত-মাংস কিছুই না। আল্লাহর কাছে যায় কোরবানিদাতার পরিশুদ্ধ মনের বাসনা। মানুষের মৃত্যুর পর যে দোয়া পড়া হয়, সেটার সরল অর্থÑ ‘রূহ’ আল্লাহর কাছ থেকে আসে, আল্লাহর কাছে চলে যায়। মানুষ অত্যন্ত যতœ করে পূর্ণমর্যাদার সাথে মৃতদেহ কবরে দাফন করে থাকে। সবাই জানে, দেহটা পচনশীল। তাই কবরস্থ বা দাহ না করলে পচনশীল দেহটা জীবিত মানুষের জন্য অসহনীয় বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠবে। এ কারণে মৃতের সৎকার ও জানাজায় বিলম্ব করার নিয়ম নেই। ধর্মেও এমনটি বলা হয়েছে। অথচ গুলশান ও নারায়ণগঞ্জে ‘জঙ্গি’দের লাশ পশুর মর্যাদাও পায়নি। তারা কোন ভরসায়, কিসের তাড়নায়, কোন বিশ্বাসের জোরে এতটা বেপরোয়া হয়ে মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে জঙ্গি অভিযোগ মাথায় নিতে পারে? সৃষ্টিকর্তার কাছে তাদের বিনিময় কী? কোনো কোনো স্বজন এদের লাশ নিতেও রাজি হয়নি। এর কারণ হয়তো রক্তের উত্তরাধিকার অস্বীকার করা নয়, সামাজিক সমস্যা ও বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার ইচ্ছা। বাস্তবতা হচ্ছে, এ দেশে লাশের সাথেও যুদ্ধ হয়। লাশও যেন কর্তৃত্বপরায়ণদের পিছু ধাওয়া করে, তাড়া করে। তাই বাবার কারণে সন্তান, স্বামীর কারণে স্ত্রীকে রাজনৈতিক প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হচ্ছে। এ আরেক নিষ্ঠুরতা। মৃত্যুর পর মৃতের আর কোনো শত্রু থাকার কথা নয়। লাশ কারো উপকার করতে পারে না; ক্ষতিও করতে পারে না। তাহলে মৃত্যুও কি কারো কারো জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাচ্ছে না? পবিত্র কুরআনে আছেÑ ‘ওদের মৃত বলো না।’ তাহলে তারা কি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হচ্ছে বা হবে?
গুম হয়ে যাওয়া মানুষেরা কোন নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে, তাও জানি না। নিখোঁজ কিংবা অপহৃত মানুষদের কষ্ট-যাতনা সবার উপলব্ধির বাইরে। তাদের স্বজনদের আহাজারি দিয়ে টের পাই, কত বড় কষ্টের পাথর তাদের বুকের ওপর চেপে বসে আছে। গুম-অপহরণ যেই করুকÑ রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার কোনোভাবে দায়মুক্ত হতে পারে না। কোনো নাগরিক সম্পর্কে সরকার অজ্ঞাত থাকবেÑ এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। লাশের মিছিল নিয়ে আজ কথা বলব না। সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতদের লাশ ছুঁয়ে যারা শপথ নিয়েছিলেন কিংবা আসাদ-মতিউরদের মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে আছেন, যারা সাক্ষী হলেন একাত্তরের লক্ষ প্রাণের, পঁচাত্তর অবধি হাজার মানুষের; তারাই তো এখনো লাশের মিছিল গুনছেন, কোনোটা ‘জঙ্গি’র লাশ, কোনোটা ব্লগার নামের নতুন খেতাব পাওয়া তরুণের। অপঘাতে মৃতের সংখ্যা বাদই দিলাম, ঠাণ্ডামাথায় যাদের লাশ বানিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদের রক্ত-মাংস হাড়গোড় কি কোনো দিন প্রশ্ন তুলবে না! বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি অথবা অবিচারের যেসব অভিযোগ, তার দায় বহনের বোঝা কার ওপর রেখে যাচ্ছি? বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু প্রসিকিউশনকে এড়াতে পারেননি। আজ যারা বাড়াবাড়ি করছেনÑ তারা বিচারের ঊর্ধ্বে থাকবেন, এটা আশা করা কিভাবে সম্ভব? বিচারেরও বিচার হচ্ছে।
অবিচারের সাথে সংশ্লিষ্টরা ছাড় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ভালো কথা, শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না জামিন পেলেনÑ অপর মাহমুদুর রহমান জামিনও পাননি। প্রশ্ন উঠবেইÑ শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, শওকত মাহমুদ, আসলাম চৌধুরীসহ আরো যারা রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে সরকারের রোষানলে পড়ে, রাষ্ট্রশক্তির একচোখা নীতির জন্য শত শত মামলায় চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়লেন, এখনো যারা পড়ছেনÑ তাদের সব যাতনা মুছে দেয়ার জন্য এমন কী ধন্বন্তরি রয়েছে সরকারের হাতে! একটি ন্যায়বিচার ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে। অন্য দিকে একটি অবিচার প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আমরা ইতিহাসের পণ্ডিত না হয়েও জানি, ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ঘটনার প্রায় ৬০ বছর পর বিলাতের মাটিতে খুন হয়েছিলেন পিতৃহত্যার প্রতিশোধকামী এক ভারতীয় সুশিক্ষিত তরুণ নাগরিকের হাতে। বড় হয়ে মায়ের কাছে সেই ভারতীয় তরুণ শুনেছিলÑ তার বাবা সৈনিক ছিলেন না, ছিলেন একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ। তার কথিত অপরাধ ছিল, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদবিরোধী প্রতিবাদী মিছিল-সমাবেশে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন। তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। যদ্দূর মনে পড়ে, একজন খলিফা যিনি কিনা ইসলামের চার খলিফার একজন ছিলেন, তিনি পশুপাখি কিংবা তৃণলতা হয়ে যাওয়ার মধ্যে কল্যাণ ভেবেছিলেন। কারণ,
আদালতে আখেরাতে পশুপাখি ও তৃণলতার জবাবদিহিতা নেই। সব মানুষকে তো বটেই, শাসক ও কর্তৃত্বপরায়ণদের জবাবদিহি করতে হবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্যই। আদেশ-নিষেধের জন্য। দায়িত্বের জন্য। আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাব দেয়ার ভয়ে আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর রশিদ এবং অটোমান সুলতান সুলেমান কবরের মধ্যে জীবিত শুয়ে নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতেন, তারা ন্যায়ানুগ কাজ করছেন কি না। ক্ষমতার আমানত সংরক্ষণ করতে পারছেন তো? তাদের মধ্যে অসৎ উদ্দেশ্য, প্রতিহিংসা ও অহমিকা ঠাঁই নিয়েছে কি না; গর্ব-অহঙ্কার বাসা বাঁধেনি তো? ক্ষমতার কারণে লোভ এবং অতিমাত্রায় কর্তৃত্বপরায়ণতা ঠাঁই নেয়নি কি না; যার কারণে ইনসাফ থেকে তারা দূরে সরে গেছেন! মানুষের হক নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে বেখেয়ালি হয়ে উঠেছেন! এটা তো মানতে হবে, ক্ষমতা মানুষকে বেপরোয়া বানায়; বেপরোয়া মানুষের হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়ন বাড়িয়ে দেয়। জবাবদিহিতার অনুভূতি লুপ্ত করে দেয়। ইনসাফ রাজনীতির নিচে তখন চাপা পড়ে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ক’ঘণ্টার সফর আমাদের দগদগে রাজনৈতিক ক্ষতের ওপর কোনো মলম লাগিয়েছে কি না জানি না। নাকি আরো বেশি পরনির্ভরশীল করে তুলেছেÑ সে প্রশ্ন করা যাবে, উত্তর মিলবে না। ১৬ কোটি মানুষ এখন একটা মাত্র উত্তর চায়Ñ গণতন্ত্রের বিশুদ্ধ বাতাসে তারা নিঃশ্বাস নেবে কবে? না পশুর হাটের নাদুসনুদুস পশুটার মতো শুধুই কোরবানি হবে। কিন্তু অর্থবিত্ত, ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শরাফতি ঠিকরে পড়াÑ এসব লোক দেখানো কিছুই সৃষ্টিকর্তার কাছে কবুল হবে না। শোষক, নিপীড়ক কোনোভাবে নিষ্কৃতি পাবে না। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে জঙ্গি বানিয়ে বা সাজিয়ে দেয়া হচ্ছে। জঙ্গি বলা, জঙ্গি সাজানো, জঙ্গিপনার অভিযোগ করে হত্যা করা যেন এক ধরনের রাজনৈতিক খেলা। একেক সময় একেক নাম দিয়ে রাষ্ট্রের সন্তানতুল্য নাগরিক হত্যা যেন একধরনের উৎসবের নাম। এবার এই উৎসব বন্ধ করা উচিত। হত্যা ও মৃত্যু কোনো খেলা নয়।
একটি মৃত্যু আরেকটি মৃত্যুর দুঃসংবাদ বয়ে আনে। একটি হত্যা আরেকটি হত্যার পেক্ষাপট রচনা করে। প্রতিহিংসার চিতায় আগুন ধরালে, সেই চিতা সহজে নেভে না। ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে। কোরবানির পশুর সাথে ঠাণ্ডা মাথায় নিজেকে এবং হত্যাকে মিলিয়ে দেখা অনুচিত। একটি নিখাদ ইবাদত, অন্যটি রাষ্ট্রাচার কিংবা রাষ্ট্রশক্তির বাড়াবাড়ি। একটির সাথে আছে বন্দিগির অনুভূতি, ত্যাগের মাহাত্ম্য। অন্যটির সাথে থাকতে পারে রাজনৈতিক অভিলাষ। ভিন্নমত ও প্রতিপক্ষ খতম করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ফন্দি-ফিকির কোনো দিন ভালো পরিণতি ডেকে আনে না। বুজুর্গদের কাছে শুনেছিÑ কিছু মৃত্যু মানুষকে পাপমুক্ত করে। কিছু মৃত্যু তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। কোনো কোনো মৃত্যুর জবাব আদালতে আখেরাতের আগে মেলে নাÑ সেই সব মৃত্যুর সান্ত্বনা কী জানি না। তবে এটা নিশ্চিত জানি, জন্ম-মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে হয় না; হয় আসমানে। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার বাইরে কোনো প্রাণের মৃত্যু নেই; স্থানান্তর বা লোকান্তর আছে। তাহলে এই সান্ত্বনাটুকু তো নেয়া সম্ভব যে, সব মৃত্যুর ফয়সালা আসে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে। আর তিনিই আদালতে আখেরাতের একচ্ছত্র অধিপতি। যার যা প্রাপ্য, তিনি সেখানেই কড়ায়-গণ্ডায় পাইয়ে দেবেন।
সংশোধনী
গত বৃহস্পতিবারের ‘আতাতুর্ক থেকে এরদোগান’ শীর্ষক লেখায় ‘এরদোগান আরো এক মেয়াদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন’-এর স্থলে পড়তে হবে “এর আগে তিনি দু’বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।”

No comments:

Post a Comment